কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি প্রথম চিঠি লিখলেন লায়লা খালার ছােট বােনটিকেইনার নাম আমার মনে নেইএই দুইবােন আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেনতাদের বাবা কৃষি কর্মকর্তা ছিলেনচিঠিটি সেই তরুণী রাগী রাগী মুখে নিল

কিছু শৈশবচিঠি পড়ে বলল, কাজল, চিঠি আনাআনির কাজ আর কখনাে করবে নাএইসব ভালাে নাআরেকবার যদি চিঠি আন থাপ্পড় খাবে। 

আমি ফিরে এলামবড়মামা চিঠি পাওয়ার পর তরুণী কী করল জানতে চাইলআমি আসল ঘটনা চেপে গিয়ে বললাম, উনি খুশি হয়েছেনবড়মামার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হলােতিনি তরুণীকে লেখা আরাে কিছু চিঠি আমাকে দিয়ে পাঠালেনসেইসব চিঠি যথাস্থানে পৌছালাম না। চিঠির সঙ্গে পাওয়া পয়সা খুব কাজে এলাে। 

মেয়েটির প্রতি মামার প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগলতিনি শুরু করলেন গান লেখা আমি মামার গানের সর্বকনিষ্ঠ শ্রোতা

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি ক্লাস টুর 

শটু কক 

কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ভবন। 

ছাত্রসেইসব গানে ভাটি অঞ্চলের এক মেয়ের কথা থাকত । যে ঘাটে বসে থাকত আউলা চুলেতাকিয়ে থাকত উজানের দিকে। 

আমি শ্রাবণ মেঘের দিনছবির জন্যে একটা গান লিখেছিলাম— 

একটা ছিল সােনার কন্যা 

মেঘবরণ কেশ ভাটি অঞ্চলে ছিল 

সেই কন্যার দেশ 

এখন মনে হচ্ছে এই গানের বীজ বড়মামার রােপণ করা। তার ভাটি অঞ্চলের মেয়ে শ্রাবণ মেঘের দিনছবিতে মূর্ত হয়েছেএই ছবি দেখে যেতে পারলে তার নিশ্চয়ই খুব ভালাে লাগতবড়মামা আমাদের সঙ্গেই দীর্ঘদিন থাকলেনসিলেট থেকে বদলি হয়ে বাবা কত না জায়গায় গিয়েছেন, বড়মামা আছেন আমাদের সঙ্গেঅতি বুদ্ধিমান একজন মানুষ তার সমস্ত মেধা দুলাভাইয়ের সংসারে শেষ করে পড়ন্ত বেলায় নিজ অঞ্চলে চলে গেলেন। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

পরম করুণাময় তার কোনাে বাসনা পূরণ না করলেও একটি বাসনা কিন্তু পূরণ করলেনভাটি অঞ্চলের রূপসী এক কন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হলােপুরােপুরি বিয়ে না, আকদ অনুষ্ঠানবিয়ের লেখাপড়া শুভদিন দেখে বউ উঠিয়ে আনা হবে। 

ভাটি অঞ্চলের এই মেয়েকে দেখতে অনেকের সঙ্গে আমিও গেলামবড়মামা আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলে দিলেন, নজর করে মেয়ে দেখবেশুনেছি মেয়ে কালােএটা তাে ঠিক নাকালাে মেয়ে তাে আমি বিবাহ করবউজ্জ্বল শ্যামলা পর্যন্ত চলেতার নিচে চলে না। 

মেয়েটিকে দেখার দৃশ্যটি এখনাে আমার চোখে ছবির মতাে ভাসছেআমাকে একটি বিশাল বড় ঘরে নিয়ে যাওয়া হলাে পাকা দালানমেয়েটি পুরনাে আমলের খাটের উপর বসে আছেমেয়েটির পেছনে প্রকাণ্ড জানালাজানালা দিয়ে হাওর দেখা যাচ্ছেহাওর থেকে হাওয়া আসছেহাওয়ায় মেয়েটির চুল উড়ছেমেয়েটি হাত দিয়ে বারবার তার চুল ঠিক করছে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মেয়েটির একপাশে সবুজ রুমালে কী যেন বাঁধাসে হাত ইশারা করে আমাকে ডাকল [আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়িআমি অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছিকেন জানি খুব লজ্জাও লাগছেআমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েটি সবুজ সিল্কের রুমাল আমার হাতে তুলে দিয়ে মিষ্টি করে হাসল আমার কাছে মনে হলাে, মেয়েটার গায়ের রঙ কালাে কিন্তু মেয়েটা তাে খুবই রূপবতী। 

আমি রুমাল নিয়ে ফিরে এলাম রুমাল খুলে সবাই হকচকিয়ে গেল রুমালে আছে বিশটা রুপার টাকাতখন রুপার টাকার প্রচলন ছিলনজরানা এবং সালামি হিসেবে রুপার টাকা দেয়া হতােঅনেকেই টাকাগুলি আমার কাছ থেকে নিয়ে সাবধানে রাখতে চাইলআমি কিছুতেই রাজি হলাম নাপ্যান্টের পকেটে সব টাকা থাকতযেখানে যেতাম টাকার ঝনঝন শব্দ হতাে। 

একসময় জোর করে টাকাগুলি আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় । 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

বিয়েতে কিছু একটা সমস্যা হয় সমস্যার ধরন আমার কাছে পরিষ্কার না আমার ধারণা যৌতুক বিষয়ক সমস্যাএই লেখাটি শুরু করার সময় মার কাছে ঘটনা জানতে চেয়েছিলামতিনি এড়িয়ে গেছেনতিনি বলেছেন, ঘটনা দুঃখজনকযারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা কেউ বেঁচে নেইকেন আর পুরনাে কষ্ট খুঁজে বের করা

পুরনাে কষ্ট আমার খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করছেএই কষ্টের সঙ্গে আমার আনন্দও জড়িতভাটি অঞ্চলের কিশােরী একটি মেয়ে আমার হাতে সবুজ সিল্কের রুমাল তুলে দিয়েছিলরুমালভর্তি ঝকঝকে রুপার টাকা

আমি আরেকটি তথ্য বের করেছিমেয়ে দেখতে কার মতােমেয়েটি অবিকল অভিনেত্রী শাওনের মতাে। 

আচ্ছা, এটা কি প্রকৃতির কোনাে খেলা ? সে মানুষকে একই দৃশ্য বার বার দেখাতে পছন্দ করে ? কেন করে

আমার নানাজান শক্ত মানুষ ছিলেনযতদিন তিনি জীবিত ছিলেন ততদিন কেউ তার মুখের উপর কোনাে কথা বলতে পারে নিতার হুকুমে মেয়ে উঠিয়ে আনা হলাে নাদীর্ঘদিন এই বিয়ে ঝুলে রইলতারপর ভেঙে গেলআমি আমার বড়মামাকে নিয়ে একটি গল্প লিখেছি

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

যে বিয়ে বড়মামা করতে পারেন নি, লেখক হিসেবে সেই বিয়ে আমি তাকে দিয়েছিলেখক ঈশ্বরের মতােই অকৃপণলেখক কালাে মেয়েকে কলমের এক খোঁচায় পৃথিবীর সেরা রূপবতীদের একজন করে দেয় মধুর মিলনে সমাপ্তির ক্ষমতা লেখকের আছেআমার বড়মামাকে জানার জন্যে পাঠকরা গল্পটা পড়ন

গল্পের শিরােনাম বড়মামা এবং রাজকুমারী সুবর্ণরেখা। 

বড়মামা এবং রাজকুমারী সুবর্ণরেখা আমার বড়মামা ছিলেন খুব প্রতিভাবান মানুষপ্রতিভাবান মানুষদের সব লক্ষণ তার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিলআমরা ছােটরা তা খুব ভালাে বুঝতামবড়রা মােটেই বুঝত নাবড়দের ধারণা মামা হচ্ছেন মহাগাধাএতে অবশ্যি মামা রাগ করতেন নাপ্রতিভাবান মানুষরা সহজে রাগ করে নাকেউ রাগের কোনাে কথা বললে তারা হাসেসেই হাসি হচ্ছে ক্ষমাসুন্দর হাসি। 

মামাকে গাধা বললে আমরা রাগ করতামএই দেখে মামা আমাদের সবাইকে ডেকে ছােট্ট একটা বক্তৃতা দিয়ে দিলেন— 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

কাউকে গাধা বললে রাগ করা উচিত না, বরং খুশি হওয়া উচিতপ্রাণিজগতে গাধার স্থান অতি উচ্চেগাধা হচ্ছে অসম্ভব বিনয়ী নিরহংকারীতাকে বকাঝকা করলে সে কিছু বলবে নানীরবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবেগাধা হচ্ছে খুব পরিশ্রমীপর্বতপ্রমাণ বােঝা পিঠে নিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাবেগাধার অন্তরে আছে সঙ্গীতপিপাসা, যা অন্য প্রাণীদের মধ্যে কখনাে দেখা যায় না

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *