ছয়–সাত বছরের একটি বালক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে বৃষ্টি দেখছে। সিলেটের বিখ্যাত বৃষ্টি। ফিনফিনে ইলসেড়ি না, ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টি এক নাগাড়ে সাতদিন পর্যন্ত চলতে পারে। ছেলেটি বৃষ্টি দেখছে তবে তার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নেই, বিস্ময়বােধ নেই, আছে দুঃখবােধ এবং হতাশা। তাকে সারাদিনের জন্যে আটকে রাখা হয়েছে। আজ সে ঘর থেকে বের হতে পারবে ।

সে একটি গুরুতর অপরাধ করেছে। কাঠের সিন্দুকের উপর পাঁচটা চিনামাটির প্লেট রাখা ছিল, সবকটা একসঙ্গে ভেঙেছে। বাসায় আর কোনাে
প্লেট নেই।
প্রাথমিক শাস্তি চড়থাপ্পড় এক দফা হয়েছে। বালক এই ধরনের শাস্তিকে হিসাবের মধ্যে ধরে না। বালকের মাতা এই তথ্য জানেন বলে মানসিক শাস্তির দিকে গেলেন। ঘােষণা করা হলাে, এখন থেকে সবাই প্লেটে করে খাবে, বালক খাবে মেঝেতে। মেঝের একটা অংশ পরিষ্কার করে রাখা হবে, সেখানেই ভাত তরকারি দেয়া হবে।
বালক এই মানসিক শাস্তিকেও আমল দিল না। কারণ সে জানে এই কাজটি করা হবে না। সে এই বয়সেই বুঝে গেছে, বড়দের কথা এবং কাজ এক না।
একটি দরিদ্র পরিবারের কাছে পাঁচটা চিনামাটির প্লেট যথেষ্ট গুরুতুপূর্ণ, এটা বােঝা গেল যখন বালককে ছুটির দিনে বন্দি করে রাখা হলাে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ
বন্দি ঠিকমতাে শাস্তি ভােগ করছে কি–না তা তার ভাইবােনরা এবং কাজের ছেলে রফিক মাঝে–মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে যাচ্ছে। সবচে‘ আনন্দিত রফিক। তার মুখভর্তি হাসি। এই বাসার যে-কোনাে শিশুকে শাস্তি পেতে দেখলে সে বিমল আনন্দ ভােগ করে।
দুপুরের ভাত খাবার সময় বালককে মুক্তি দেয়া হলাে । সে ছুটে বের হয়ে গেল। প্রথম কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে লাফালাফি করল। তারপর দৌড়ে রাস্তা পার হলাে। রাস্তার ওপাশেই মাঠ। মাঠে কিছু নিচু জায়গা আছে, সেখানে পানি
জমেছে। পানির উপর ঝাপাঝাপি করা যায়। মাথার উপর ঝুম বৃষ্টি, পায়ের নিচে পানি— কী আনন্দ!
বালককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবার জন্যে ছাতা দিয়ে রফিককে পাঠানাে হলাে। সে গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ বালকের লাফালাফি দেখল, তারপর ছাতা বন্ধ করে নিজেও ঝাপাঝাপিতে যুক্ত হলাে। যুক্ত কেনইবা হবে না? রফিক বালকের চেয়ে দু’এক বছরের বড়। বৃষ্টি বিলাস থেকে সে কেন নিজেকে দূরে রাখবে।
রফিকের নেতৃত্বে বৃষ্টি যাপনের অর্থ হলাে একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযান। তার একটি হচ্ছে দেয়াল টপকে প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে ঢােকা (অধ্যাপক এমসি কলেজ)। প্রফেসর সাহেবের বাগানভর্তি আমগাছ। ঝড়বৃষ্টিতে গাছতলায় নিশ্চয়ই অনেক আম পড়েছে।
অভিযান সফল হলাে। পকেটভর্তি আম নিয়ে বালক পরবর্তী অভিযানে বের হলাে। পাকা পুসকুনিতে গােসল। পাকা পুসকুনিতে সবদিন স্নানের সুযােগ হয় ।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ
বড় কেউ সঙ্গে গেলেই সুযােগ হয়। তখনাে সমস্যা, বড়দের কারণে মনের আশ মিটিয়ে পানিতে ডুবাডুবি খেলা খেলা যায় না।
মহানন্দে পুকুরে ঝাপাঝাপির এক পর্যায়ে রফিক লক্ষ করল, ছাতাটা সঙ্গে নেই। পরবর্তী অভিযান ছাতা খুঁজে বের করার অভিযান।
সন্ধ্যার আগে আগে তারা বাসায় ফিরল। দু‘জনের মুখ শুকনা। ছাতা হারানাে গেছে, না জানি কী হয়! | বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার, ছাতা নিয়ে কেউ একটা কথাও বলল না। মনে হয় বাসার কেউ রফিকের ছাতা নিয়ে বের হবার বিষয়টা জানে না। সারাদিন বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে কোনাে শাস্তি হলাে না। পারিবারিক আদালতের প্রধান বিচারপতি, বালকের বাবা, অপরাধের সব ফিরিস্তি শােনার পর কিছুই বললেন ।
রেডিওর নব ঘােরাতে লাগলেন। এই সময়ে আকাশবাণী‘ থেকে নাটক প্রচার হয়। তিনি নাটক শুনতেই বেশি আগ্রহী। বালক তখনাে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। তার ধারণা শাস্তির ব্যবস্থা হবে রেডিওর নব ঘােরানাে শেষ হবার পর। নব ঘােরানাে একসময় শেষ হলাে। প্রধান বিচারপতি বালকের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বললেন, দাঁড়িয়ে আছিস কী জন্যে ?
বালকের মা রাগী গলায় বললেন, এতক্ষণ তােমাকে কী বললাম ? প্রধান বিচারপতি বললেন, কী বলেছ ? কী বলেছি তুমি জানাে না ?
আবার বলাে ।
মা উঠে চলে গেলেন। প্রধান বিচারপতি পুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, তাের মা কি রাগ করে উঠে চলে গেল ?
পুত্র হঁা–সূচক মাথা নাড়ল।
তাের মা‘র রাগ ভাঙানোর ব্যবস্থা করতে হবে। জোরেসােরে বৃষ্টি নামলে বলবি— গুষ্ঠিসুদ্দ বৃষ্টিতে ভিজব। বৃষ্টিতে ভিজলে কী হয় জানিস ?
গায়ের ঘামাচি মরে। তাের কি ঘামাচি আছে ? গাভর্তি ঘামাচি।
কোনাে চিন্তা নাই, ঘামাচি ধ্বংসের ব্যবস্থা করছি। বৃষ্টিটা ভালােমতাে নামতে দে।
পাঠক, উপন্যাসের মতাে কি লাগছে ? মনে হচ্ছে কি ঔপন্যাসিক একটা পারিবারিক উপন্যাস কেঁদেছেন ? কিছুক্ষণের মধ্যেই নাটকীয় ঘটনা ঘটবে। কাহিনী এগুবে তরতর করে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ
উপন্যাস লিখছি না। নিজের শৈশবের কথাই লিখছি। পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। সবকিছু হুবহু মনে নেই। যে সব জায়গা মনে নেই সেসব জায়গায় Fill up the blank করেছি। লেখকের স্বাধীনতাও ব্যবহার করেছি, তবে যেটুকু না করলেই নয় শুধু ততটুকুই । উদাহারণ দেই— সারাদিন রফিককে নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা, ছাতা হারানাে, সব ঠিক আছে। এত বড় অপরাধের পর কোনাে শাস্তি হয় নি, তাও ঠিক আছে। শাস্তির বদলে ঐ রাতেই যে আবারাে সবাই মিলে বৃষ্টিস্নান উৎসব করেছে, তাও ঠিক আছে। শুধু শাস্তি–বিষয়ক কথােপকথন তৈরি করা— কারণ কেন শাস্তি হয় নি সেটা মনে করতে পারছি না ।
বৃষ্টিভেজা মীরাবাজার আমার স্মৃতির শহর কিন্তু পুরাে শহর না, শহরের ছােট্টখানিকটা জায়গা মীরাবাজারের এক অংশ, যেখানে আমি একা একা ঘুরতে পারি । সিলেটের কথা মনে হলে মীরাবাজারের কথাই মনে হয়। যে মীরাবাজার বৃষ্টিতে ভিজছে। মীরাবাজারের সঙ্গে ভিজছে এক অতি দুরন্ত বালক। তার সে–কী আনন্দ! পঞ্চাশ বছর পর হঠাৎ করে একদিন মনে হলাে, বৃষ্টির সময় একবার মীরাবাজারে গেলে হয় না! ঐ বালকের মতাে আমিও বৃষ্টিতে ভিজব। নানান কাজে অনেকবার সিলেটে গিয়েছি। তখন বৃষ্টি হয় নি বলে মীরাবাজারে যাওয়া হয় নি। একবার বৃষ্টি শুরু হলাে রাত তিনটায়। রাত তিনটায় নিশ্চয়ই কেউ স্মৃতি অনুসন্ধানী মিশন নিয়ে বের হয় না।
Read more