কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

ছয়সাত বছরের একটি বালক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছেসে বৃষ্টি দেখছেসিলেটের বিখ্যাত বৃষ্টিফিনফিনে ইলসেড়ি না, ঝুম বৃষ্টিএই বৃষ্টি এক নাগাড়ে সাতদিন পর্যন্ত চলতে পারেছেলেটি বৃষ্টি দেখছে তবে তার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নেই, বিস্ময়বােধ নেই, আছে দুঃখবােধ এবং হতাশাতাকে সারাদিনের জন্যে আটকে রাখা হয়েছেআজ সে ঘর থেকে বের হতে পারবে 

কিছু শৈশব

সে একটি গুরুতর অপরাধ করেছেকাঠের সিন্দুকের উপর পাঁচটা চিনামাটির প্লেট রাখা ছিল, সবকটা একসঙ্গে ভেঙেছেবাসায় আর কোনাে 

প্লেট নেই। 

প্রাথমিক শাস্তি চড়থাপ্পড় এক দফা হয়েছেবালক এই ধরনের শাস্তিকে হিসাবের মধ্যে ধরে নাবালকের মাতা এই তথ্য জানেন বলে মানসিক শাস্তির দিকে গেলেনঘােষণা করা হলাে, এখন থেকে সবাই প্লেটে করে খাবে, বালক খাবে মেঝেতেমেঝের একটা অংশ পরিষ্কার করে রাখা হবে, সেখানেই ভাত তরকারি দেয়া হবে। 

বালক এই মানসিক শাস্তিকেও আমল দিল নাকারণ সে জানে এই কাজটি করা হবে নাসে এই বয়সেই বুঝে গেছে, বড়দের কথা এবং কাজ এক না। 

একটি দরিদ্র পরিবারের কাছে পাঁচটা চিনামাটির প্লেট যথেষ্ট গুরুতুপূর্ণ, এটা বােঝা গেল যখন বালককে ছুটির দিনে বন্দি করে রাখা হলাে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

বন্দি ঠিকমতাে শাস্তি ভােগ করছে কিনা তা তার ভাইবােনরা এবং কাজের ছেলে রফিক মাঝেমাঝে উঁকি দিয়ে দেখে যাচ্ছেসবচেআনন্দিত রফিকতার মুখভর্তি হাসিএই বাসার যে-কোনাে শিশুকে শাস্তি পেতে দেখলে সে বিমল আনন্দ ভােগ করে। 

দুপুরের ভাত খাবার সময় বালককে মুক্তি দেয়া হলাে । সে ছুটে বের হয়ে গেলপ্রথম কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে লাফালাফি করলতারপর দৌড়ে রাস্তা পার হলােরাস্তার ওপাশেই মাঠ। মাঠে কিছু নিচু জায়গা আছে, সেখানে পানি 

জমেছেপানির উপর ঝাপাঝাপি করা যায়মাথার উপর ঝুম বৃষ্টি, পায়ের নিচে পানিকী আনন্দ

বালককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবার জন্যে ছাতা দিয়ে রফিককে পাঠানাে হলােসে গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ বালকের লাফালাফি দেখল, তারপর ছাতা বন্ধ করে নিজেও ঝাপাঝাপিতে যুক্ত হলােযুক্ত কেনইবা হবে না? রফিক বালকের চেয়ে দুএক বছরের বড়বৃষ্টি বিলাস থেকে সে কেন নিজেকে দূরে রাখবে। 

রফিকের নেতৃত্বে বৃষ্টি যাপনের অর্থ হলাে একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযানতার একটি হচ্ছে দেয়াল টপকে প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে ঢােকা (অধ্যাপক এমসি কলেজ)প্রফেসর সাহেবের বাগানভর্তি আমগাছঝড়বৃষ্টিতে গাছতলায় নিশ্চয়ই অনেক আম পড়েছে। 

অভিযান সফল হলােপকেটভর্তি আম নিয়ে বালক পরবর্তী অভিযানে বের হলােপাকা পুসকুনিতে গােসলপাকা পুসকুনিতে সবদিন স্নানের সুযােগ হয় 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

বড় কেউ সঙ্গে গেলেই সুযােগ হয়তখনাে সমস্যা, বড়দের কারণে মনের আশ মিটিয়ে পানিতে ডুবাডুবি খেলা খেলা যায় না। 

মহানন্দে পুকুরে ঝাপাঝাপির এক পর্যায়ে রফিক লক্ষ করল, ছাতাটা সঙ্গে নেইপরবর্তী অভিযান ছাতা খুঁজে বের করার অভিযান। 

সন্ধ্যার আগে আগে তারা বাসায় ফিরলদুজনের মুখ শুকনাছাতা হারানাে গেছে, না জানি কী হয়! | বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার, ছাতা নিয়ে কেউ একটা কথাও বলল নামনে হয় বাসার কেউ রফিকের ছাতা নিয়ে বের হবার বিষয়টা জানে না। সারাদিন বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে কোনাে শাস্তি হলাে নাপারিবারিক আদালতের প্রধান বিচারপতি, বালকের বাবা, অপরাধের সব ফিরিস্তি শােনার পর কিছুই বললেন 

রেডিওর নব ঘােরাতে লাগলেনএই সময়ে আকাশবাণীথেকে নাটক প্রচার হয়তিনি নাটক শুনতেই বেশি আগ্রহীবালক তখনাে নিশ্চিন্ত হতে পারছে নাতার ধারণা শাস্তির ব্যবস্থা হবে রেডিওর নব ঘােরানাে শেষ হবার পর। নব ঘােরানাে একসময় শেষ হলােপ্রধান বিচারপতি বালকের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বললেন, দাঁড়িয়ে আছিস কী জন্যে

বালকের মা রাগী গলায় বললেন, এতক্ষণ তােমাকে কী বললাম ? প্রধান বিচারপতি বললেন, কী বলেছ ? কী বলেছি তুমি জানাে না

আবার বলাে । 

মা উঠে চলে গেলেনপ্রধান বিচারপতি পুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, তাের মা কি রাগ করে উঠে চলে গেল

পুত্র হঁাসূচক মাথা নাড়ল। 

তাের মারাগ ভাঙানোর ব্যবস্থা করতে হবেজোরেসােরে বৃষ্টি নামলে বলবিগুষ্ঠিসুদ্দ বৃষ্টিতে ভিজববৃষ্টিতে ভিজলে কী হয় জানিস

গায়ের ঘামাচি মরেতাের কি ঘামাচি আছে ? গাভর্তি ঘামাচি। 

কোনাে চিন্তা নাই, ঘামাচি ধ্বংসের ব্যবস্থা করছিবৃষ্টিটা ভালােমতাে নামতে দে। 

পাঠক, উপন্যাসের মতাে কি লাগছে ? মনে হচ্ছে কি ঔপন্যাসিক একটা পারিবারিক উপন্যাস কেঁদেছেন ? কিছুক্ষণের মধ্যেই নাটকীয় ঘটনা ঘটবেকাহিনী এগুবে তরতর করে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

উপন্যাস লিখছি নানিজের শৈশবের কথাই লিখছিপঞ্চাশ বছর আগেকার কথাসবকিছু হুবহু মনে নেইযে সব জায়গা মনে নেই সেসব জায়গায় Fill up the blank করেছিলেখকের স্বাধীনতাও ব্যবহার করেছি, তবে যেটুকু না করলেই নয় শুধু ততটুকুই উদাহারণ দেইসারাদিন রফিককে নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা, ছাতা হারানাে, সব ঠিক আছেএত বড় অপরাধের পর কোনাে শাস্তি হয় নি, তাও ঠিক আছেশাস্তির বদলে রাতেই যে আবারাে সবাই মিলে বৃষ্টিস্নান উৎসব করেছে, তাও ঠিক আছেশুধু শাস্তিবিষয়ক কথােপকথন তৈরি করাকারণ কেন শাস্তি হয় নি সেটা মনে করতে পারছি না । 

বৃষ্টিভেজা মীরাবাজার আমার স্মৃতির শহর কিন্তু পুরাে শহর না, শহরের ছােট্টখানিকটা জায়গা মীরাবাজারের এক অংশ, যেখানে আমি একা একা ঘুরতে পারি সিলেটের কথা মনে হলে মীরাবাজারের কথাই মনে হয়যে মীরাবাজার বৃষ্টিতে ভিজছেমীরাবাজারের সঙ্গে ভিজছে এক অতি দুরন্ত বালকতার সেকী আনন্দ! পঞ্চাশ বছর পর হঠাৎ করে একদিন মনে হলাে, বৃষ্টির সময় একবার মীরাবাজারে গেলে হয় না! বালকের মতাে আমিও বৃষ্টিতে ভিজবনানান কাজে অনেকবার সিলেটে গিয়েছিতখন বৃষ্টি হয় নি বলে মীরাবাজারে যাওয়া হয় নিএকবার বৃষ্টি শুরু হলাে রাত তিনটায়রাত তিনটায় নিশ্চয়ই কেউ স্মৃতি অনুসন্ধানী মিশন নিয়ে বের হয় না। 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *