কিছু শৈশব-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

হালকা ধরনের কথাবার্তারসিকতা তাঁর একেবারেই পছন্দ নানানাজান যদি হন আনন্দের ঈদ, দাদাজান শােকের মহররম। 

কিছু শৈশব

উনার চলে যাবার দিন ঘনিয়ে আসতেই আমরা খুশিযাক, মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে।যাবার দিনের ঘটনাসব শিশুর মুখে হাসিদাদাজান রিকশার সামনে দাঁড়িয়ে আছেনমালামাল তােলা হয়েছে, তিনি উঠছেন নাহঠাৎ তিনি ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। নাতিনাতনিদের ছেড়ে যেতে তাঁর নাকি খুব কষ্ট লাগছেরাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনি শেষ দফা মােনাজাতের জন্যে হাত তুললেনআমরা হাত তুললাম, রিকশাওয়ালা হাত তুললএকজন পথচারীও কী মনে করে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাত তুললতার প্রার্থনা এরকম— 

হে আল্লাহপাক, তুমি আমার নাতিনাতনিদের মনে দুঃখ দিতে চাইলে অবশ্যই দিবে, কিন্তু তারা যেন কারাে মনে দুঃখ না দেয়তােমার দরবারে তাদের জন্যে বিদ্যা প্রার্থনা করিধনদৌলতের বদলে তুমি তাদের দিবে বিদ্যাএকটা বেলাও তারা যেন অভুক্ত না থাকে, এইদিকে তুমি একটু নজর রাখবে

কিছু শৈশব-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

লবণ-ভাত হলেও যেন খেতে পারেতিনি কাঁদতে কাঁদতে রিকশায় উঠলেন। পাঞ্জাবির লম্বা আস্তিনে চোখ ঢেকে রাখলেনরিকশা চলতে শুরু করেছেআমরাও কাঁদতে কাঁদতে রিকশার পেছনে দৌড়াচ্ছিকী আশ্চর্য! এরকম তাে হবার কথা ছিল না। 

পাঠক হুমায়ূন আমার দাদি ছিলেন অসম্ভব রূপবতী একজন মহিলা এবং অসম্ভব বােকাবুদ্ধি মাপার IQ Test আছেবােকামি মাপার কোনাে টেস্ট নেইথাকলে তিনি হাই মার্ক পেতেনতিনি যে মহাবােকা, এই তথ্য আমি অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিলামনাতিনাতনিদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে এই দৃশ্য দেখলে তিনি কেন জানি খুব আনন্দ পেতেনখুশিতে ভঁর চোখমুখ ঝলমল করততাঁর বােকামির একটা নমুনা দেই | দাদাজান মারা যাচ্ছেনতার হেঁচকি উঠে গেছে তার কানের কাছে কলেমী তৈয়ব পড়া হচ্ছেহঠাৎ দাদিজান ব্যস্ত হয়ে বললেন, আপনি যে মারা যাচ্ছেন কাফনের কাপড়, এইসব খরচ কে দিবে কিছু বলে গেছেন? 

দাদাজান বহু কষ্টে বললেন, তােমার চিন্তা করতে হবে না, ছেলেরা যা পারে করবে। 

সিন্দুকে যে আঠারাে টাকা আছে সেটা কী করব

তুমি খরচ করাে। 

দাদির আরাে কিছু জটিল সাংসারিক প্রশ্ন ছিল, তার আগেই দাদাজান মারা গেলেনদাদি শােকে কাতর হলেন নাতিনি অস্থির হয়ে গেলেন মৃত্যুসংবাদটা তার মেয়েদেরকে কে তাড়াতাড়ি দিতে পারবে এই চিন্তায়

কিছু শৈশব-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

 আমার সঙ্গে দাদীর বৈরী সম্পর্ক ছিলআমি অতিরিক্ত দুষ্ট ছিলাম দাদির লক্ষ্যই ছিল কীভাবে আমাকে শাস্তি দেয়া যায়আমি তার প্রধান টার্গেট| খেলতে গিয়ে খড়ের গাদার খড় এলােমেলাে করে দিয়েছিদাদি দৌড়ে মাকে নিয়ে এসে অপরাধের বিশদ এবং ফুলানাে ফাঁপানাে বর্ণনা করে বলবেন, একে মার তাে বৌমা। 

শাশুড়ির মন রক্ষার জন্যে মা হয়তাে একটা থাপ্পড় দিলেনদাদির শান্তি হলাে নাতিনি বলবেন, এইটা কী মারলা, আরাে মার, শক্ত করে মার। 

দাদির নিয়ম ছিল চোখে পানি না আসা পর্যন্ত শাস্তি চলবেছেলেমেয়েদের শাস্তি দিতে মাকখনাে তেমন কোনাে আপত্তি ছিল না, কিন্তু অন্যের আদেশে শাস্তি দিতে আপত্তি ছিলতিনি বাবার কানে এই প্রসঙ্গ তুললেনবাবা বললেন, আমার মা বােকা মানুষবােকা মানুষের উপর কখনাে মন খারাপ করতে নেইযখন তিনি যাকে শাস্তি দিতে বলবেন, দিবে। | মা বললেন, তুমি তাে খুবই অন্যায় কথা বললে বিনা কারণে আমি আমার ছেলেকে কেন মারব

বাবা বললেন, তােমার শাশুড়ি মারতে বলছেন বলেই মারবেতিনি সকল ন্যায়অন্যায়ের ঊর্ধ্বেতিনি তােমার শাশুড়িশাশুড়ির আবার অন্যায় কী ? তার সবই ন্যায়

কিছু শৈশব-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার দাদি যে শুধু বাচ্চাদের মার খাওয়াতেন তাই না, তিনি ছেলেদের বৌদেরকে নিয়েও অনেক কথা নিজে নিজে বানাতেন এবং কাঁদতে কাঁদতে ছেলেদের কানে তুলতেনছেলেরা তাদের মায়ের স্বভাবের সঙ্গে পরিচিত ছিল বলেই কোনাে কথাই আমলে নিত নাদাদির কষ্টের চোখের জল বৃথা যেত। 

যাই হােক, দাদির মারের কাছ থেকে আমি কীভাবে চিরদিনের জন্যে রক্ষা পাই সেই গল্প বলি। 

দাদি একদিন আমাকে বললেন, এই পুলা, বাংলা পড়তে পারস না? দরগার প্রবেশপথের দু’পাশে এভাবেই সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হালুয়া (তুশা শিল্পী), গােলাপ জল, আগরবাতি, মোম বাতি, নকুলসহ নানান ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। 

আমি বললাম, পারিআমারে এই বইটার কয়েকটা পাতা পইড়া শুনা । 

দাদি আমার হাতে তাজকেরাতুল আউলিয়াকিংবা কিচ্ছাতুল আৰীয়া নামের একটা বই ধরিয়ে দিলেনআমি পড়তে শুরু করলামদাদি গালে হাত দিয়ে শুনছেনআউলিয়াদের জীবনী শুনছেন, এই কারণেই হয়তাে তার মনে গভীর ভাব উঠলতিনি কাদতে শুরু করলেনফিসফিস করে কাঁদেনশাড়ি দিয়ে চোখ মােছেন । 

এরপর রােজকার রুটিন হলােদুপুরের খাবার পর নানাবিধ গ্রন্থ পাঠ এর মধ্যে প্রধান গ্রন্থটির নাম বিষাদ সিন্ধুদাদির সঙ্গে তখন আরাে কিছু বৃদ্ধমহিলাও জুটেছেনতারাও চোখের পানি ফেলায় এক্সপার্টএকজন আবার আসরে আসেন অজু করেবিষাদ সিন্ধুপাঠ শােনা সােয়াবের কাজযে কোনাে সােয়াবের কাজ করতে হয় অজু করেবিষাদ সিন্ধুপড়তে পড়তে আমি নিজেও বৃদ্ধাদের সঙ্গে অনেকবার কাঁদলামকী অপূর্ব গতিময় ভাষাকী বর্ণনা ভঙ্গি

না না আমি যে আজকাল করিয়া কয়েক দিন কাটাইয়াছি, তাহার অনেক কারণ আছে

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *