বাবু দাড়ি শেভ করতে বসেছে।ব্লেডটা পুরানো কাজেই গালে সাবান লাগিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকতে হবে। দাড়িগুলিকে নরম হবার সময় দিতে হবে। সে তাই করছে। সাবান লাগিয়ে বসে আছে। রুবা দাঁত মাজতে মাজতে ভাইকে লক্ষ্য করছে।কতক্ষণ বসে থাকবে ভাইয়া? এই কিছুক্ষণ। দাড়ি নরম হোক।কি বিরাট যন্ত্রণা তোমাদের, তাই না ভাইয়া? হুঁ।বিশেষ করে তোমার মত যাদের টাকা-পয়সা কম তাদের আরো বেশি যন্ত্রণা। এক ব্লেড যাদের এক মাস ব্যবহার করতে হয়।বাবু জবাব দিল না। আয়না হাঁটুর উপর রেখে ব্লেড হাতে নিল। রুবা তখন খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নতুন কেনা ঝকঝকে শেভিং বাক্স তার সামনে এনে রাখিল। বাবু অবাক হয়ে বলল, ব্যাপার কি? টাকা কোথায় পেলি?
যেখান থেকেই পাই তাতে তোমার কি। দাও ব্রেড় ভরে দেই। জিনিসটা সুন্দর ভাইয়া? এই দেখ সঙ্গে ব্রাশও আছে।বাবু বিস্মিত হয়ে বলল, এতো দামী জিনিসরে।হুঁ দামী। দুশি পঁচিশ টাকা পড়েছে।বলিস কি? আপা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছে, ঐ টাকায় কিনলাম। হা করে তাকিয়ে থাকিবে না তো? দাড়ি কাটতে শুরু কর আমি দেখি।টাকা নষ্ট করলি? সংসারে দিলে কাজে লাগত। এতগুলি টাকা। এটা এখন ফেরত দিলে ফেরত নেবে না?
না নেবে না।টাকাটা পানিতে ফেললি রুবা।মোটেই পানিতে ফেলি নি। তুমি মুখটা ফেনায় ফেনায় ভর্তি কর তো ভাইয়া, আমি দেখি।বাবু লজ্জিত মুখে ব্রাশ ঘসছে। শেভ করতে তার কেন জানি লজ্জা লজ্জা লাগছে। রেজার টানতেই গাল খানিকটা কেটে গেলে। ধবধবে সাদা ফেনার লাল রক্ত। রুবা তাকিয়ে আছে। বাবু বিব্রত মুখে বলল, বড়লোকি জিনিসে অভ্যাস নেই। এই দেখ গাল কেটে ফেলেছি।রুবা ভাইয়ের পাশে বসল। গলা নিচু করে বলল, ভাইয়া তুমি আপাকে একদিন গিয়ে দেখে আস না কেন? তাদের নতুন ফ্ল্যাটে তুমি একদিনও যাও নি।ইলা কি কিছু বলেছে?
না বলে নি। আপা কোনদিন কিছু বলবে না। না গেলে কষ্ট পাবে–এই পর্যন্তই।যাব। একদিন যাব। খালি হাতে তো যাওয়া যায় না। হাতেও টাকা-পয়সা নেই। একসের মিষ্টি তো অদ্ভুত নিয়ে যাওয়া উচিত।একসের মিষ্টির দম আমি তোমাকে দেব।বলিস কি।আমার কাছে টাকা আছে। ইলা আপা পাঁচশ টাকা দিয়েছে।এত টাকা সে পেল কোথায়? দুলাভাই দিয়েছে। এ ছাড়া আর কোথায় পাবে? বাবুর গাল আবার খানিকটা কেটেছে। সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। এতগুলি টাকা বোনকে দিয়ে দিল, জামান জানতে পারলে অশান্তি করবে। লোকটা টাকা পয়সার ব্যাপারে খুব কৃপণ। জামানকে না জানিয়ে ইলার উচিত নয় এত টাকা এদিক-ওদিক করা। পাঁচশ টাকা অনেক টাকা, জামানের স্বভাব ভাল না। জামানের স্বভাব যে খারাপ তা বাবু ইলার বিয়ের এক সপ্তাহ পরই টের পেয়েছে। বোনকে দেখতে গিয়েছিল।
ভেবেছিল যাবে আর দেখা করে চলে আসবে। ইলা কিছুতেই আসতে দেবে না। কেঁদে-টেদে এককাণ্ড–খেয়ে আসতে হবে।খাবার টেবিলে জমান বলল, ভাইসাহেব আপনার ব্যবসা কেমন চলছে? চলছে। ক্যাপিটেলের অভাব। ক্যাপিটেল ছাড়া সবই আছে। ছোটখাট একটা অর্ডার পেয়েছি। ক্যাপিটাল জোগাড় না হলে অর্ডার নিতে পারব না। হাজার দশেক টাকার মামলা।জামান সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমার হতি তো একদম খালি। আপনাকে তো দিতে পারব না।বাবু বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি কেন দেবেন? আপনার কাছে তো টাকা চাই নি।চাইতে হবে কেন? আমার তো নিজ থেকেই দেয়া উচিত। সম্ভব হচ্ছে না–হাত একেবারে খালি। ধার-দেনা করে বিয়ে।বাবুর গলায় খাবার অটিকে যেতে লাগল। কিছুই মুখে কুচছে না। অল্প সময়ে প্রচুর আয়োজন করেছে ইলা। পোলাও করেছে। রোস্ট করেছে। না খেলে কষ্ট পাবে।
জামান বিরক্ত গলায় বলল, গরমের মধ্যে পোলাও কেন? প্লেন ভাত করতে পারলে না? আর তিনজন মানুষ আমিরা, এত কি রান্না করেছ? পঞ্চাশজন লোক এ দিয়ে খাওয়া যায়। এমন অপচয় মানুষ করে? ইলা অসম্ভব লজ্জা পেয়েছিল। তার ফর্সা মুখ টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিল। খাবার সময়টাতে সে আর সামনে থাকে নি। হয়ত বাথরুমে দরজ্জা বন্ধ করে কেঁদেছে।রুবা এখনো হা করে বাবুর দাড়ি শেভ করা দেখছে। সে ব্যাপারটায় খুব মজা পাচ্ছে। বাবু বলল, ইলাকে কেমন দেখে এলি? ভালই দেখলাম।কথায় বার্তায় কি মনে হয় সে সুখী? সুখী অসুখী কি আর কথায়বার্তায় বোঝা যায়?
তা ঠিক বোঝা যায় না। যেমন আমার কথাই ধর। আমাকে দেখে সবাই মনে করে অসুখী। আমি কিন্তু আসলে সুখী, বেশ সুখী।তুমি এবং নাসিম ভাই তোমরা দুজনেই যে সুখী তা কিন্তু তোমাদের মুখ দেখে বোঝা যায়। শুধু সুখী না–মহা সুখী। তোমরা কি ঐ বিলটা পেয়েছ ভাইয়া? না।পাবে মা? বুঝতে পরাছি না। নাসিম অবশ্যি আশা ছাড়ে নি। এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখন চেষ্টা হচ্ছে আধ্যাত্মিক লাইনে। রোজ সন্ধ্যায় এক পীর সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে।বাবু শব্দ করে হেসে ফেলল। রুবাও হাসতে লাগল।সুরমা রান্নাঘর থেকে অনেকক্ষণ থেকেই দেখছেন ভাই বোন বারান্দায় বসে গুনগুন করছে। হাসাহাসি করছে। দুজনের খুব খাতির। ইলা যখন আসে তখন তিনজন মিলে গুনগুন করে। তিনি কাছে গেলে তাদের গুনগুনানি থেমে যায়। তারা অবশ্যি বলে–এস মা। বস।
তিনি প্রায়ই বসেন তখন তাদের কথাবার্তা আর জমে না। এদের সংসারে তিনি যেন আলাদা মানুষ।আজো দুজন বসে গুনগুন করছে। তিনি পাশে গেলেই থেমে যাবে। সুরমা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলেন। বিরক্ত গলায় বললেন–তোরা সারাদিন বারান্দায় বসে থাকবি? নাশতা নিয়ে বসে থাকা ছাড়া আমার অন্য কাজ নেই? রুবা বলল–তুমি যাও মা আমরা আসছি। সুরমা চলে এলেন। দুঃখে তাঁর চোখে পানি এসে যাচ্ছে। কি রকম কথা–তুমি যাও মা। তিনি যেন কাছেও থাকতে পারেন না। আশেপাশে থাকলেও দোষ।বাবুর গাল আরেক জায়গায় কেটেছে। রুবা বলল, গালটা কি অবস্থা করেছ ভাইয়া। মোরব্বা বানিয়ে ফেলছ।তাই তো দেখছি। তোর এই জিনিস আমার পোষাচ্ছে না রে। আমাকে মনে হয় আগের জিনিসে ফিরে যেতে হবে। বরং একটা ক্ষুর কিনে নেব।
আমারো তাই মনে হচ্ছে ভাইয়া।এই বলেই রুবা হঠাৎ গলার স্বর পাল্টে বলল–আচ্ছা ভাইয়া, তুমি কি জান আপা নাসিম ভাইকে বিয়ে করতে চেয়েছিল? জানি।কিভাবে জান? কে বলেছে তোমাকে? কেউ বলে নি। অনুমান করেছি।আমি পুরো ব্যাপারটা জানি। আমারটা কিন্তু অনুমান না।রুবা গলার স্বর আরো নিচু করে বলল, যে রাতে আপা মাকে ঘুম থেকে তুলে বলল, আমি সেই রাতেই জানি। আমি আসলে একজন স্পাই টাইপের মেয়ে। মাঝ রাতে আপা বিছানা ছেড়ে উঠে গেল। আমি তার পেছনে পেছনে চুপি চুপি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। আড়ালে পাড়িয়ে শুনলাম কথাবার্তা।কাজটা কি ঠিক হল রুবা?
ঠিক হয় নি। আমি তো ভাইয়া তোমার বা আপার মত ভাল মানুষ না। আমি খারাপ মানুষ। কে কি করছে, কে কি ভাবছে–এইসব আমি ধরতে চেষ্টা করি।আর করিস না।আচ্ছা আর করব না।রুবা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপার সঙ্গে নাসিম ভাইয়ের বিয়ে হলে খুব চমৎকার হত। মানুষ হিসেবে দুজনই অসাধারণ। আমি আমার জীবনে আপার মত ভাল মেয়ে যেমন দেখি নি, নাসিম ভাইয়ের মত ভাল ছেলেও দেখি নি। এই দুজন মানুষকে যে আমি কি পছন্দ করি তা তোমরা বুঝতে পারবে না। ঐদিন কথায় কথায় নাসিম ভাই বলল, একটা মেয়েকে তার খুব ভাল লেগেছে–শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে পানি এসে গেছে।
বাবু দাড়ি শেভ করা বন্ধ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রুবা ভাইয়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শান্ত গলায় বলল, তুমি কেন এ রকম করে তাকিয়ে আছি তা আমি বুঝতে পারছি ভাইয়া। তুমি যা ভাবছ তা কিন্তু না।আমি কি ভাবছি? তুমি ভাবছ–রুবারও কি ইলার মত সমস্যা হল? না, তা হয় নি।শুনে ভাল লাগল।বাবু হাসল। রুবাও হাসল।সুরমা অবাির বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। লক্ষ্য করলেন তাঁকে দেখেই দুই ভাই বোন হাসি বন্ধ করে দিয়েছে। কেন তারা এরকম করে। তারা মনে করার চেষ্টা করে না —–তাদের বাবা মারা যাবার পর এই সংসার তিনি একা টেনে তুলেছেন। প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন বাবার অভাব যেন এরা বুঝতে না পারে।এক সময় ছেলেমেয়ের কাছে তাঁর প্রয়োজন ছিল। আজ নেই। আজ তিনি এদের বিরক্তির কারণ।রুবা বলল, দাঁড়িয়ে আছ কেন মা? কিছু বলবে?
না।না। তাহলে দয়া করে অন্য কোথাও যাও তো মা। তুমি যেভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে অভিশাপ দিচ্ছ।সুরমা ক্লান্ত গলায় বললেন, অভিশাপ দিচ্ছি না। আর অভিশাপ দিলেও–মার অভিশাপ ছেলেমেয়েদের স্পর্শ করে না।কলিং বেল টিপে নাসিম অপেক্ষা করছে। তার হাতে কুড়িটা রজনীগন্ধার স্টিক। ফুলগুলি থেকে সে কোন গন্ধ পাচ্ছে না। গন্ধহীন রজনীগন্ধা। তার কাছে মনে হচ্ছে–ফুলের মধ্যে কোন ভেজাল আছে। সব কিছুতেই ভেজাল। এ বাড়ির কলিং বেলেও ভেজাল আছে মনে হয়। তিনবার টেপা হল। কেউ আসছে না। শব্দই হয়ত হচ্ছে না। দরজা ধাক্কাধাক্কি করাটা যুক্তিসঙ্গত নয়। এ বাড়িতে আজ নিয়ে তার দ্বিতীয় দফার আসা। প্রথমবার কাতল মাছ নিয়ে এসেছিল। আজ রজনীগন্ধা। নাসিম বিসমিল্লাহ বলে আরেকবার কলিং বেল টিপল। এবারে দরজা খুলল। বুড়ো একজন লোক দরজা খুললেন। সব বুড়ো মানুষ অসুখী অসুখী চেহারা করে রাখেন–এঁর চেহারা সুখী সুখী। চোখে সোনালী ফ্রমের চশমা। হাতে ইংরেজী গল্পের বই। মনে হচ্ছে জীবনের শেষ অংশটা তাঁর আনন্দে কাটছে।
কাকে চান? মিসেস মেহেরুন্নেসাকে একটু প্রয়োজন ছিল।মিসেস মেহেরুন্নেসাটা কে? ডাকনাম সম্ভবত তুহিন।তুহিন ডাকলামের কেউ এ বাড়িতে নেই।নাসিম ধাঁধায় পড়ে গেল। এর আগের বার তুহিন নামটা সে শুনেছে। ডাকনাম ঘনঘন বদলাবার নিয়ম আছে কি? আমি রহমান সাহেবের মেয়ের কাছে এসেছিলাম।ও, মেঝো বৌমা? মাহীনকে চাও? জ্বি।তুমি কে? নাম বললে আমাকে উনি চিনবেন না। আমার নাম নাসিম। বন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড থেকে এসেছি।তুমি বোস। বৌমা খোকাকে খাওয়াচ্ছে।আমার কোন তাড়াহুড়া নেই, আমি বসছি।বুড়ো ভদ্রলোক ভেতরে চলে গেলেন। নাসিম স্বস্তি পেল। মাহীনের আসতে দেরি হলেই ভাল। কিছুক্ষণ ঠাণ্ডামাথায় চিন্তা করার সুযোগ পাওয়া যাবে। কথাগুলি কিভাবে বলতে হবে প্রাকটিস করে নেয়। প্রথম কথা যা বলবে তা হচ্ছে–আপা আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
আরেকদিন এসেছিলাম। আমি বন এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের নাসিম। আপনাকে একটা কার্ড দিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের একটা বিলের ব্যাপারে। বিলটা আপনার বাবার কাছে আটকে আছে। আপা, আপনার কি মনে পড়েছে? আপনি বলেছিলেন সব ঠিকঠাক করে দেবেন। খুব সমস্যার মধ্যে আছি। লোকজনদের কাছ থেকে ধারটার নিয়ে কাজটা করেছি ওরা এখন আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলার মতলব করেছে। সবচে বেশি সমস্যা করছে আমার নিজের বোন…
চিন্তার সময় তেমন পাওয়া গেল না। পর্দা ঠেলে মাহীন ঢুকল। নাসিমকে দেখে তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। নাসিম তার সাজিয়ে রাখা কথা একটাও বলতে পারল না। মাহীন তীক্ষ্ণ গলায় বলল, আপনার সাহস তো কম না। আপনি আবার এসেছেন? নাসিম হকচকিয়ে গেল। এ জাতীয় আক্রমণ তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। মাহীন বলল, আপনার কথা শুনে ঐদিনই বাবার কাছে গিয়েছিলাম। বাবা আকাশ থেকে পড়েছেন। বাবা অনেক ঝামেলা করে আপনাদের কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন। আর এইভাবে স্ত্রীর নামে আজেবাজে কথা ছড়িয়ে আপনি তার প্রতিদান দিচ্ছেন? এত সাহস আপনার?
হৈচৈ শুনে বুড়ো ভদ্রলোক আবার ঢুকলেন। বিস্মিত হয়ে বললেন, কি হয়েছে বীমা? মাহীন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, দেখুন মা বাবা, এই লোক আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছে। বাবার নামে আজেবাজে কথা আমার কাছে বলছে।বুড়ো তীক্ষ্ণ গলায় বলল–কি চাও হে ছোকরা? কি ভেবেছ? মতলবটা কি? পুলিশের কাছে হ্যান্ডওভার করে দেব? বৌমা লালবাগ থানার নাম্বারটা কত বল তো? অতি দুঃখেও নাসিমের হাসি পেল। বুড়ো একজন মানুষের ভয় দেখানোর একি ছেলেমানুষি চেষ্টা–বৌমা লালবাগ থানার নাম্বারটা কত বল তো? ভাবটা এরকম যে তাদের আদরের বৌমা অবসর সময়ে সব থানার নম্বর মুখস্থ করে বসে থাকে। এটাই হচ্ছে আদরের বৌমার হবি।
নাসিম মিষ্টি করে হাসল। হাসিতে যদি কাজ হয়। কাজ হল না। বুড়ো আরো রেগে গেল।ছোকরা তোমার গায়ের চর্বি পানি বানিয়ে ছাড়ব। বৌমা লালবাগ থানার ওসিকে টেলিফোনে ধর। বল–খায়রুল ইসলাম কথা বলবেন।নাসিম বলল, স্যার আপনি বেশি রেগে গেছেন। এই বয়সে বেশি রেগে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। স্ট্রোক এখন ডালভাত হয়ে গেছে। বিশেষ করে আপনার মত দুধ ঘি খাওয়া মানুষদের জন্যে তো রাগ করা খুবই রিস্কি।শাট আপ–ইউ স্কাউনড্রেল।আমি তো শার্ট আপ করেই আছি। চিৎকার যা করার তো আপনিই করছেন।সান অব এ বিচ বলে কি? বৌমা টেলিফোনটা দেখি।নাসিম হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, মাহীন তুমি বুড়োমিয়াকে টেলিফোনটা দাও। বুড়োমিয়া কোথায় টেলিফোন করতে চায় করুক। আর শুনুন বুড়ো মিয়া, আমি একা এখানে আসি নি। দলবল নিয়ে এসেছি।
ওরা নিচে অপেক্ষা করছে। মালমসলা নিয়ে অপেক্ষা করছে। হৈচৈ শুনলে উপরে চলে আসতে পারে। উপরে চলে এলে আপনাদের সামান্য অসুবিধা হতে পারে।বুড়ো এবং তার বৌমা দুজনের মুখই শুকিয়ে গেল। নাসিম পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে খুব স্বাভাবিক গলায়–যেন ঘরোয়া আলাপ করছে এমন ভঙ্গিতে বলল, মাহীন শোন, তোমাকে এবং তোমার বাবাকে আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় দিলাম। এখন বাজে এগারটা পঁয়ত্রিশ। বুধবার এগারটা পঁয়ত্রিশের মধ্যে আমাদের অফিসে টাকা-পয়সা পৌঁছে দিতে হবে। এটা তুমি তোমার বাবাকে বলবে। আমি এম্নিতে অত্যন্তু মধুর স্বভাবের মানুষ আশা করি–ইতিমধ্যে তা বুঝতে পেরেছ। কিন্তু বুধবার এগারটা পঁয়ত্রিশের পর মধুর স্বভাব নাও থাকতে পারে। চলি, কেমন? বুড়ো মিয়া চলি?
আমার সঙ্গে তিনটা দুদীর কোটা আছে।ব্যবহার করলাম না। যদিও আপনার ব্যবহারে বেশ বিরক্ত হয়েছি। আজকের মৃত বিদায় হচ্ছি। ও মাহীন ভাল কথা, এই রজনীগন্ধাঙ্গুলি তোমার জন্যে এনেছিলাম। রেখে দাও। এগুলি দেখতে আসলের মত হলেও আসল না। গন্ধবিহীন রজনীগন্ধা। এর ডাঁটাগুলি তরকারী হিসেবে খাওয়া যায়। ঝাল ঝাল করে রান্না করতে হবে। চেষ্টা করে দেখতে পার।নাসিম মুখ ভর্তি করে ধোঁয়া ছাড়ল। মধুর ভঙ্গিতে হেসে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কয়েকবার শিস দেবারও চেষ্টা করল। পেছন থেকে কেউ কোন শব্দ করল না।নাসিম বলেছিল নিচে তার দলবল আছে। দলবল বলতে বাবু একা। সে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে চা খাচ্ছিল, নাসিমকে দেখে চায়ের কাপ রেখে এগিয়ে এল।কিছু হয়েছে?
না। ভয় দেখিয়ে এসেছি।সে কি–কি ভয় দেখালি? কোন টেকনিকই যখন কাজ করছে না–ভয় টেকনিকটা ট্রাই করলাম।বাবু চিন্তিত মুখে বলল, আমার মনে হচ্ছে তুই একটা ঝামেলা বাঁধিয়েছিস। টাকা উদ্ধারের আমি কোন আশা দেখছি না।টাকা ঠিকই উদ্ধার হবে, যে অসুখের যে অষুধ। বুধবারের আগেই দেখবি টাকা-পয়সা সব দিয়ে গেছে।বুধবার কেন? বুধবার পর্যন্ত ওদের সময় দিয়েছি। ফোর্টি এইট আওয়ার টাইম। ধর, সিগারেট নে। তুই মুখ এমন শুকনো করে রেখেছিস কেন? ভয় পাচ্ছিস না-কি? ভয়ের কিছু নেই। আমার তো মনে হচ্ছে ভয়ের অনেক কিছুই আছে।
তোর মত ভিতুর ডিম নিয়ে কাজ করা মুশকিল। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে ভিতুদের কোন স্থান নেই। বর্তমান কালটা হচ্ছে শরে। যে অন্যকে ভয় দেখাতে পারবে সেই টিকে থাকবে। অন্যরা পারবে না। তাদের স্থান হবে নর্দমায়।কি বলে ওদের ভয় দেখালি? কি কি বলেছি নিজেরো মনে নেই তবে বুড়ো এক লোক ছিল–তাঁর আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে। হাত থেকে বই পড়ে গেছে। মনে হয় লুঙ্গিও ভিজিয়ে ফেলেছে–হা হা হা। হো হো হো।তুই হাসছিস? আমার কিন্তু ভয় লাগছে।ভয়ের কিছু নেই।ভয়ের কিছু নেই বাক্যটি বিকেল নাগাদ মিথ্যা প্রমাণিত হল। পুলিশ এসে বন এন্টারপ্রাইজের অফিস থেকে নাসিমকে ধরে নিয়ে গেল।
