২৭শে তারিখ সকালে বাচ্চা দুটো সাথে নিয়ে তিনি আবার পালালেন। পুরো দেড় মাস এ বাসা ও বাসা করেন। শেষে মগবাজারের এক বাসা থেকে পাক বাহিনী তাকে আঠারো নং রোডের এই বাসায় নিয়ে আসে।১৮নং রোডে আসবার পূর্বকার মুহুর্তটি স্মরণ করে গভীর হয়ে গেলেন বেগম মুজিব। বললেন–আমি তখন মগবাজারে একটা বাসায় থাকি। আমার বড় মেয়ে হাসিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। সে, জামাই, আমার দেওর, জা, মেয়ে রেহানা, পুত্র রাসেলসহ বেশ কয়েকজন একসাথে ছিলাম মগবাজারের বাসাটাতে।
হঠাৎ একদিন পাকবাহিনী ঘেরাও করে ফেলল বাসাটা। একজন অফিসার আমাকে জানাল যে আমাকে তাদের তত্ত্বাবধানে অন্যত্র যেতে হবে।জানি না। কী হবে। ঠিক সেই মুহুর্তটাতে ভীষণ সাহসী হয়েছিলাম। আমি। কড়াভাবেই সেই অফিসারকে বললাম, লিখিত কোনো আদেশপত্র না দেখালে আমি এক পা-ও বাড়াব না। উত্তরে সে উদ্ধতভাবে জানাল যে ভালোভাবে তাদের সাথে না গেলে তারা অন্য পন্থা গ্ৰহণ করবে। তখন বাধ্য হয়ে আমি বললাম যে, আমার মগবাজার বাসায় যারা আছেন তাদের প্রত্যেককে আমার সাথে থাকতে দিতে হবে।
আমার কথায় তারা নিজেরা কী যেন আলোচনা করল, পরে তারা রাজি হয়ে নিয়ে এলো আমাদেরকে ১৮নং রোডের এই বাসাটাতে।১৮নং রোডে আসার প্রথম দিনের কথা বলতে গিয়ে আবার হেসে ফেললেন বেগম মুজিব। ময়লা আবর্জনা পূর্ণ এই বাড়িটাতে তখন বসবার মতো কোনো আসবাবপত্র দূরে থাক, একটা মাদুর পর্যন্ত ছিল না। জানালার পাশ ঘেসা ৩/৪ ফুট প্রশস্ত একফালি জায়গায় ঘেসাঘেসি করে বসেছিলেন তিনি এবং পরিবারের সমস্ত সদস্যরা।
অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে এইভাবে কষ্ট করে বসে থাকতে দেখে সেদিন বুক ফেটে যাচ্ছিল তাঁর। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন নি, শুধু অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলেন চারিদিক। হয়তো অসহায়ের করুণ ডাক আল্লাহতায়ালা সেদিন শুনেছিলেন। প্রহরী পাক-বাহিনীর এক পাঠান অফিসার অনুভব করেছিল তাঁর অসহায় অবস্থাকে। সেই অফিসার একজন ঝাড়ুদার সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে দেয় ঘর দুয়ারি–সংগ্রহ করে দিয়েছিল। কয়েকটি চেয়ার এবং একটি কম্বল।
বন্দি জীবনের নৃশংস পাক-পাহারাদার বাহিনীর মধ্যে এই অফিসারটিই ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম।ধানমণ্ডির এই বাড়িটার মাঝে অনেক দুঃখ দৈন্যের স্মৃতি চিরদিনের মতো বেগম মুজিবের বুকে আঁকা হয়ে গেছে, তবুও এই বাসাতেই তিনি তার প্রথম আদরের নাতিকে বুকে নিতে পেরেছিলেন–এ স্মৃতি তার কাছে কম উজ্জ্বল নয়।
দৈনিক বাংলা
বেগম মুজিবের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকার
ডিসেম্বরের দুপুর। বঙ্গবন্ধুব ৩২নং রোডের বাড়ির দ্বিতলের বসবার ঘরে বসে কথা বলছিলাম বেগম মুজিবের সাথে। গত বছরের বন্দি জীবনের দুর্বিষহ ও ভয়ঙ্কর মুহুর্তগুলোর কথা। বর্ণনা করছিলেন তিনি… ২৬শে মার্চের পর পরই বড় ছেলে কামাল চলে গেছে ওপারে। হাসিনার শরীর খারাপ। তবুও অসুস্থ শরীরে সে-ই ছিল আমার সব চেয়ে ভরসা।
মে মাসের ১২ তারিখ। ১৮নং রোডের সেই একতলা কারাগৃহে আমাদের নেয়া হয়। হানাদারদের পাহারাতে জীবন কাটাচ্ছিলাম। আমি। বাসার যে সব প্রহরী ছিল, তাদের মধ্যে দুজন সাদা পোশাকধারী সিভিল আর্মড ফোর্সের লোকও ছিল। এরা কাৰ্যত আমির প্রহরীদের ঠিক রাখতো।একদিনের ঘটনা। আমার শোবার ঘরে জামাল আর রেহানা ঝগড়া করছিল। বন্দি জীবন জামালের মতো ছেলে সহ্য করতে পারছিল না। কেমন যেন ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন তাই ওদের দুভাই বোনের ঝগড়াটা একটু বেশি রকমের শুরু হয়েছিল। ওদের ঝগড়ার মাঝেই হুট করে ঘরের মধ্যে সিভিল আর্মড ফোর্সের একজন অফিসার ঢুকল। চোখ লাল করে হিংস্রভাবে সে জামালকে বলল, তুমি আজকাল বেশি। বাড়াবাড়ি করছি। এভাবে গোলমাল করলে আমরা তোমাকে আমি ক্যাম্পে নিয়ে যাব।
পা দুটো উল্টো করে বেঁধে তোমাকে চাবুক মারা হবে। জীবনে আর যাতে কারো মুখ দেখতে না পাও, সে ব্যবস্থাও করা হবে। বেশ চিৎকার করেই অফিসারটি কথাগুলি বলেছিল। আমি প্রথমে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরীক্ষণেই সামলে নিয়ে তাকে বেরিয়ে যেতে বললাম ঘর থেকে। একটা হিংস্র। দৃষ্টি সে আমাদের ওপর নিক্ষেপ করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
অফিসারটি চলে যাবার পর বেগম মুজিব তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করে নিলেন। সে দিনই তিনি অফিসারটির জঘন্য আচরণের সমস্ত ঘটনা প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সমস্ত উপর মহলেই লিখে জানালেন।কিন্তু এ ঘটনার পর থেকেই জামাল যেন আরও অশান্ত হয়ে উঠল। পালাবার জন্য সমস্ত সময় সে সুযোগ খুঁজত। ২৭শে জুলাই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাসিনার সন্তান হলো।
আমাদের জীবনে এলো প্ৰথম নাতি। অথচ তাকে দেখবার জন্য আমাদের কাউকেই অনুমতি দেয়া হলো না। ঘরের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেছিলাম সেদিন। কেন্দেছিলাম পাক করুণাময় আব্দুল্লাহতায়ালার দরগায়।৫ই আগষ্ট জামাল পালিয়ে গেল বাসা থেকে। কয়েকদিন আগে থেকেই পালিয়ে যাবার জন্য সে চেষ্টা চালাচ্ছিল। আমাকে বলছিল। আমি যদি পালাতে পারি।
তাহলে ৩/৪ ঘন্টা ওদেরকে কোনো খবর দিও না। জামাল পালাবার পর বুঝতে পারলাম যে ও পালিয়েছে। মন আবার অশান্ত হলো। যদি ধরা পড়ে শেষ হয়ে যায়, আবার সান্ত্বনা পেলাম বাঁচলে এবার ও বাঁচার মতো বাঁচবে। বেলা দুটায় খাবারের সময় ওর খোঁজ পড়ল। খোঁজ খোঁজ, চারিদিকে খোঁজ। কিন্তু জামাল কোথায়? সন্তানের খোঁজে আমি তখন দিশেহারা হবার ভান করলাম।সরাসরি চিঠি পাঠালাম ওপর মহলে। আমার ছেলেকে তোমরা ধরেছ। এবার ফিরিয়ে দাও। হানাদারদের তরফ থেকে কিছুই বলার ছিল না।
কেননা আগেই আমি এ সম্পর্কে সজাগ হবার জন্য চিঠি লিখেছিলাম সর্বত্র। তদন্তের জন্য যে কর্নেলকে পাঠানো হয় সে মনে মনে শঙ্কিত হলো। হয়তো সত্যিই ওদের বাহিনীর কেউ জামালকে গুম করেছে। আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে কর্নেল ফিরে গেলেন। কিন্তু আমাদের ওপরে কড়াকড়ির মাত্রা আরেক দফা বাড়ল।আগষ্ট মাসের শেষের দিকে জামালের চিঠি পেলাম। এসময় আমার শাশুড়ির শরীর বেশি খারাপ থাকায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো।
প্রতিদিন দুঘন্টার জন্য আমাকে হাসপাতালে যাবার অনুমতি দেয়া হলো; রোগী দেখার ভান করে ওপার থেকেও অনেকেই আসত। ওদের মাথায় হাত রেখে হানাদার প্রহরীদের দেখিয়ে উপদেশ দিতাম ঠিকমতো ঘরে থেকে লেখাপড়া করার জন্য। এক ফাকে চিঠিটা হস্তগত করে নিজে সাথে করে নিচ পর্যন্ত পৌঁছে দিতাম। ওদেরকে। ভীষণ ভয় লাগত। ওদের জন্য। কিন্তু আল্লাহকে ডাকা ছাড়া কীইবা আমি করতে পারতাম তখন!
ঠিক এভাবেই কেটে গেছে আমার দিন। সামান্য যা কিছু সঞ্চয় ছিল, তা দিয়েই চলত আমার ছোট সংসার। দুঃখ-দৈন্য যন্ত্রণা দেহমানে সবকিছুই যেন আটকে গিয়েছিল! প্রতি মুহুর্ত একটি সন্দেহ দিয়ে ঘেরা মৃত্যুর রাজত্বে ধুকেধুকে দিন কাটতো আমাদের।প্রিয়জনরা ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। জানতাম না কেমন আছে ওরা। স্বামীর জন্য আর চিন্তা করতাম না। কেননা আল্লাহ ছাড়া তাকে বাচাবার সাধ্য যে আর কারো নেই।
একথা নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। তবুও মাঝে-মাঝে শিরা উপশিরাগুলো অবশ হয়ে আসত। কোথায় আমার বুকের সন্তানেরা আর এই কারাগৃহে আবদ্ধ আমাদের জীবনের স্থায়িত্বই বা কোথায়? নভেম্বরের শেষের দিকেই বুঝতে পেরেছিলাম ডিসেম্বরে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। আমার বন্দি জীবনে বাইরের সংবাদ আসার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু ট্রানজিস্টার সেটটা ছিল।
আমরা শুনেছিলাম ভারত বাংলাদেশকে যেদিন স্বীকৃতি দেবে সেই দিনই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে। তিনি তারিখের কলকাতার ঐতিহাসিক জনসভা শোনার জন্য তাই আমাদের প্রতীক্ষা ছিল একটু ভিন্নতর। ইন্দিরাজীর ভাষণ শেষ হলো। খুবই বিস্ময় লেগেছিল। কেন জানি ট্রানজিস্টারের সামনে থেকে নড়তে ইচ্ছা করছিল না। রাত বাড়ল, আকাশ বাণীর সংবাদ শেষ হলো। হঠাৎ ঘোষণা করা হলো শীঘই বিশেষ ঘোষণা প্রচার করা হবে।
সমস্ত দিনেক ব্লকান্ত দেহ,মন। পরিবারের সকলেই ঘিরে বসলাম ট্রানজিস্টারের চারিদিক। কিন্তু কোথায়, সে ঘোষণা! সময় কেটে যাচিছিল। একে একে বাচ্চারা ঘুমুতে চলে গেল। মাথার কাছে ট্রানজিস্টারটা খোলা রেখে প্রতীক্ষ্ণ করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি; ঘুম ভাঙল বিমান বিধ্বংসী কামানের কটকট শব্দে। বুঝলাম যুদ্ধ বেঁধে গেছে।
৬ই ডিসেম্বর ভারত স্বীকৃতি দিল স্বাধীন বাংলাদেশকে। সে এক অনন্য অনুভূতি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতির সংবাদ এলোমেলো করে দিচ্ছিল। আমার দেহ মনকে। বাচ্চারা কাঁদছিল ওদের আব্বার জন্য। আমি চেষ্টা করছিলাম ওদেরকে সান্ত্বনা দিতে, কিন্তু স্বাধীনতার স্বীকৃতি আর অতি প্রিয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কা আমার আত্মাকে যেন অসাড় করে তুলেছিল।
ডিসেম্বরের দিনগুলো প্রতিদিন যেন নতুন নতুন বিভীষিকা। হয়ে দাঁড়াতো। ১৮ তারিখ সকালে যখন পাক আর্মিকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল তখন শেখ মুজিবের বাসা থেকে শুধুমাত্র সিভিল আর্মড অফিসার দুজনকে সরিয়ে নেয়া হয়। এক্ষেত্রে সিভিল আর্মড অফিসার দুজনকে ফিরিয়ে নেয়ার সাথে সাথেই আর্মি প্রহরীরা উদ্ধৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল।
প্রথম দিকে ওরা আশা করেছিল যে, ওদেরও নিয়ে যাবার ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত যখন চারিদিক থেকে জয় বাংলা ধ্বনি ভেসে আসতে লাগল। তখন ভীষণ রকম ক্ষেপে গেল ওরা।আমাদের ঘরের মধ্যে কাপড় শুকোবার জন্য তার বাধা ছিল। রাতে তারটা ঝনঝন করে বেজে উঠতেই সবাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। রক্তের মতো লাল দুটো চোখ।
প্রহরী দলের অধিনায়ক সুবেদার রিয়াজ দাড়িয়ে ছিল বারান্দায়। কঠোরভাবে সে বলল, খোকাকে ডাকো। ঠাণ্ডা হয়ে বললাম, খোকা ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনো কথা থাকলে আমাকে বলতে পারো। আমার মুখের দিকে কঠোরভাবে তাকিয়ে সে বলল, সাবধানে থাকো।মেজর তারা সিং এলেন বেলা নটার সময়। তারা সিং সাধারণ বেশে এসেছিলেন। কিন্তু পেছনে তিনি একদল সৈন্যকে পজিশন নেয়া অবস্থাতে রেখে দিয়েছিলেন চারিদিকে।
খালি হাতে শুধু ওয়্যারলেস সেট সাথে নিয়ে তিনি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ওদেরকে বুঝাচ্ছিলেন। প্ৰথমে ওরা সারেন্ডার করতে চায় নি। শেষে দুঘণ্টা সময় চেয়েছিল। গেটের সামনে থেকে ওদের কথা শুনে মেজর তারা সিং যেই পা বাড়ালেন অমনি ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠল। বাচ্চারা–আপনি যাবেন না মেজর। যাবেন। না। সময় পেলেই ওরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। সত্যিই সময পেলে ওরা আমাদেরকে মেরে ফেলত। কিন্তু মেজর সিং তাদের আর সে সময় দেন নি। ঢুকে পড়েছিলেন গেটের মধ্যে।
পাশের বাঙ্কার থেকে কাঁপতে কাঁপতে হানাদাররা তখন বের হয়ে আসছে আত্মসমর্পণের জন্য।
*সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ
দলিলপত্র; ৮ম খণ্ড (পৃষ্ঠা : ৬৩৫)
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়
হাজি মতলুব মিয়ার নির্মাণ নীলগঞ্জ জামে মসজিদ এই এলাকার সবচে সুদৃশ্য পাকা দালান। হাজি মতলুব মিয়া জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ধর্মকর্মে মন দেন। তিনি ঘোষণা করেন, আসল ইবাদত হলো হাকুল ইবাদত। জনতার জন্যে কিছু করা। তিনি তখন তকুল ইবাদতের অংশ হিসাবে মসজিদ বানানো শুরু করেন। এই সময় তার বয়স সত্তরের কাছাকাছি। নানান ব্যাধিতে আক্রান্ত। মসজিদ তৈরি যেদিন শুরু করেন, সেদিন তিনি একটা স্বপ্ন দেখেন।
স্বপ্নে অলি ধরনের এক মানুষ, যার পরনে সাদা লম্বা কুর্ত, মাথায় পাগড়ি, হাতে বাঁকা লাঠি, তাকে দেখা দেন। সেই সুফি মানুষ হাতের বাঁকা লাঠি দিয়ে তাকে বুকে খোচা দিয়ে বলেন–মতলুব মিয়া, তোমার আয়ু শেষ হয়ে গিয়েছিল। তুমি একটি সৎকর্মে হাত দিয়েছ, এই সৎকর্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার মৃত্যু হবে না। সৎকর্ম সুন্দরভাবে সমাধা করো। এই বলেই সুফি পুরুষ অদৃশ্য হয়ে যান।
ঘুম ভেঙে মতলুব মিয়া দেখেন এই সুফি পুরুষ তার বুকের যে জায়গায় বঁকা লাঠি দিয়ে খোচা দিয়েছেন সেই জায়গা কালো হয়ে আছে।তিনি বিপুল উৎসাহে মসজিদ বানানো শুরু করেন। কাজ দ্রুত সমাধা করার প্রয়োজন নাই। ধীরে-সুস্থে হবে। ভালোমতো হবে! যেভাবেই হোক কাজটা লম্বা করতে হবে। মেঝেতে প্ৰথমে সমেন্ট করা হলো। সেই সিমেন্ট উঠিয়ে মোজাইক করা হলো। মিনার একটা করার কথা ছিল। তিনি চার মিনারের সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে সময় বেশি লাগবে। যত ইচ্ছা সময় লাগুক।
মসজিদ নির্মাণ পুরোপুরি শেষ করা যাবে না। একটা দরজা কিংবা একটা জানোলা বাকি থাকবে। এই ছিল তার পরিকল্পনা। শরিকল্পনা কার্যকর হলো না। এক মিনার তৈরি হবার পরপরই তার মৃত্যু হলো। মসজিদের শুরু হলো তার জানাজা পাঠের মাধ্যমে।হাজি মতলুব মিয়ার মসজিদের বর্তমান নাম এক মিনারি মসজিদ। ঈদের দিন দূরদূরান্ত থেকে এই মসজিদে লোকজন নামাজ পড়তে আসে।
জুম্মাবারেও মুসল্লিদের ভালো সমাগম হয়।নীলগঞ্জে মিলিটারি আস্তানা গাড়ার পর জুম্মাবারে লোক সমাগম আরো বেড়েছে। মসজিদের বাইরেও চাটাই বিছাতে হয়। জুম্মাবারে মিলিটারি ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেত দুএকজনকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। নামাজের শেষে তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার জন্যে এক ধরনের ব্যস্ততা সমাগত মুসল্লিদের মধ্যে দেখা যায়। ঘটনাটা বিস্ময়কর হলেও সত্যি। দুএকজন কোলাকুলিও করেন।
জুম্মার নামাজ মাওলানা ইরতাজউদ্দিন পড়ান। সেদিন তাঁর পরনে থাকে ইন্ত্রি করা আচকান, ধবধবে সাদা পাগড়ি। জুম্মাবারে তিনি চোখে সুরমা দেন। কানের লতিতে আন্তর। নবি-এ-করিমের সুগন্ধী পছন্দ ছিল। সুগন্ধ ব্যবহার করা সেই কারণেই প্রতিটি মুসলমানের জন্যে সুন্নত।নামাজ একটার সময় শুরু হয়, তবে মাঝে-মাঝে একটা বাজার পরেও অপেক্ষা করা হয়। ক্যাপ্টেন সাহেবের জন্যে অপেক্ষা। মসজিদের মুয়াজ্জিন মুনশি ফজলুল হক ক্যাপ্টেন সাহেবের অপেক্ষায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন।
এখান থেকে থানা কম্পাউন্ড পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। ক্যাপ্টেন সাহেব থানা কম্পাউন্ড থেকে ঢোলা কুর্ত পরে যখন বের হন, তখন মুনশি ফজলুল হকের ভেতর অন্যরকম উত্তেজনা দেখা যায়।ইরতাজউদ্দিন জুম্মাবারে মসজিদে বারোটার মধ্যে এসে পড়েন। তখন মুয়াজ্জিনও আসে না। মসজিদ থাকে খালি। এক একজন করে মুসল্লি আসে, তাদের আসা দেখতে তার ভালো লাগে।
কাউকে দেখে মনে হয় তার অসম্ভব তাড়া। বসে থাকতে পারছে না, সারাক্ষণ ছটফট করছে। আঙুল ফোটাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ আসে নিতান্তই অনাগ্রহে। তাদের চোখেমুখে থাকে কী বিপদে পড়লাম? দূর দূরান্ত থেকে কিছু আগ্রহী লোকজনও আসে। এরা হাদিস-কোরান শুনতে চায়। এরা অনেক আগে চলে আসে। তাদের সঙ্গে হাদিসা-কেরান নিয়ে কথা বলতে ইরােতাজউদ্দিন পছন্দ করেন। ধর্মের কত জটিল বিষয় আছে। কত সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি আছে। এইসব নিয়ে আলাপ করতেও उठाনা व्लांकों!
এখন সময় অন্যরকম। এই সময়ের নাম সংগ্রামের সময়। এই সময়ে মানুষজন কোনো বাধাধরা নিয়মে চলে না। জুম্মাবারে মুসল্লিরা প্ৰবল আতঙ্ক নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং কেউ কিছু শুনতে চান না।ইরতাজউদ্দিন মাথা নিচু করে ইমামের জায়নামাজে বসে আছেন। তাঁর হাতে তসবি। তসবির নিরানব্বইটা দানা তিনি এক এক করে টানছেন এবং একেক দানায় আল্লাহপাকের একেকটি নাম স্মরণ করছেন।
ইয়া রাহমানু : হে দয়াময়।
ইয়া সাদেকু : হে সত্যবাদী।
ইয়া কুদ্দুসু : হে পবিত্র।
ইয়া মুমীতু : হে মৃত্যুদাতা।
ইরতাজউদ্দিন ইয়া মুমীতু বলে থেমে গেলেন। আল্লাহপাকের পরের নামগুলি এখন আর তাঁর মনে পড়ছে না। ঘুরেফিরে মাথায় আসছে ইয়া মুমীতু ইয়া মুমীতু।মসজিদের বাইরে উঠানের দক্ষিণ পাশে কদমগাছের ছায়ায় চারজন হিন্দু বসে আছে। তাদের একজন মিষ্টির দোকানের মালিক পরেশ, ধুতি পরে আছে। চরম দুঃসময়ে সে ধুতি পরার সাহস দেখিয়েছে।
কারণ আজ জুম্মা নামাজের পর তারা মুসলমান হবে। মুসলমান হবার পর লুঙি-পাঞ্জাবি পরবে। কাজেই শেষবারের মতো ধুতি পরা যায়। চারজন হিন্দুর মধ্যে দুজন নমশূদ্র। নমশূদ্ররা সাহসী হয়–এমন কথা চালু থাকলেও এরা ভয়ে কুঁকড়ে আছে।হিন্দু মুসলমান হচ্ছে–এই দৃশ্য দেখার জন্যে ক্যাপ্টেন সাহেব আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই চার হিন্দুর জন্যে মুসলমান নাম তিনিই ঠিক করে দিয়েছেন।
আবদুর রহমান।
আবদুর কাদের।
আবদুর হক।
আবদুর সালেহ।
ক্যাপ্টেন সাহেবের ইচ্ছা ছিল চারজনকেই একটা করে কোরান শরীফ দেবেন। নীলগঞ্জের একমাত্র লাইব্রেরিতে কোনো কোরান শরীফ পাওয়া যায় নি। ক্যাপ্টেন সাহেব এতে বিরক্ত হয়েছেন।
যে চারজনকে আজ মুসলমান করা হবে তাদের যেন নিয়মমাফিক খৎনা করানো হয়–সেই বিষয়েও ক্যাপ্টেন সাহেব নির্দেশ দিয়েছেন। হাজামকে খবর দেয়া হয়েছে। সে ধারালো বাঁশের চল্টা দিয়ে খৎনা করবে। ক্যাপ্টেন সাহেবের ধারণা এই দৃশ্যও উপভোগ্য হবে। তার নিজের ক্যামেরা ছিল না। এই মজার দৃশ্য ক্যামেরায় তুলে রাখার জন্যে তিনি ক্যামেরার ব্যবস্থাও করেছেন।
পৌনে একটায় জুম্মার নামাজের আযান দেয়া হলো। আযানের পরপরই ইরতাজউদ্দিন মসজিদ থেকে বের হয়ে কদমগাছের কাছে গেলেন। গাছের নিচের চারজনই নড়েচড়ে বসল। এদের একজন শুধু তার চোখে চোখ রাখল। অন্যরা মাটির দিকেই তাকিয়ে রইল।ইরতাজউদ্দিন বললেন, আপনারা ভালো আছেন? তিনজন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। একজন অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।ইরতাজউদ্দিন বললেন, আপনারাই শুধু মুসলমান হবেন? আপনাদের রবারের কেউ হবে না?
পরেশ বলল, সবেই হবে। প্রথমে আমরা, তারপর পরিবার।ইরতাজউদ্দিন বললেন, আপনাদের ধর্ম কী বলে আমি জানি না। আমাদের ধর্ম বলে জীবন বাঁচানো ফরজ। মুসলমান হলে যদি জীবন রক্ষা হয়, তাহলে মুসলমান হন। জীবন রক্ষা করেন।
মুকুল সাহা ধুতির এক প্রান্ত দিয়ে চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল। ইরতাজউদ্দিন তার দিকে তাকিয়ে বললেন, পবিত্র কোরান মজিদে একটা বিখ্যাত আয়াত আছে— লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দ্বিনি। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। ইসলাম অন্য ধর্মের উপর জবরদস্তি করে না।ইরতাজউদিনের আরো কিছু বলার ইচ্ছা ছিল, এর মধ্যেই মুয়াজ্জিন মুনশি ফজলুল হক তার কাছে ছুটে এসে বলল, ক্যাপ্টেন সাহেব থানা কম্পাউন্ড থেকে বের হয়েছেন।
আজ তাঁর সঙ্গে ছয়জন আছেন। ক্যাপ্টেন সাহেবকে নিয়ে সাতজন।ইরতাজউদ্দিন বললেন, জুম্মার নামাজ আমি পড়াব না। এখন থেকে আপনি পড়াবেন।এইটা কী বলেন! ইরতাজউদ্দিন বললেন, কেন জুম্মার নামাজ পড়াব না। সেই ব্যাখ্যা আজ নামাজ শুরুর আগে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দিব না। আমি এখন চলে যাব।জুম্মার নামাজও পড়বেন না? না!
এইসব কী বলতেছেন! যা বলতেছি চিন্তাভাবনা করে বলতেছি। এখন থেকে আমি জুম্মার নামাজ পড়ব না। পরাধীন দেশে জুম্মার নামাজ হয় না। নবি-এ-করিম যতদিন মক্কায় ছিলেন জুম্মার নামাজ পড়েন নাই। তিনি মদীনায় হিজরত করার পর একতা সূরা নাজেল হয়। সূরার নাম জুমুয়া। সেই সূরায় জুম্মার নামাজের নির্দেশ দেয়া হয়। তখন তিনি জুম্মার নামাজ শুরু করেন।মাথা খারাপের মতো কথা বলবেন না। ক্যাপ্টেন সাহেব চলে এসেছেন।আসুক। আমি চলে যাচ্ছি।
মাওলানা ইরতাজউদ্দিন বাড়িতে ফিরে জোহরের নামাজ আদায় করলেন। নামাজের শেষে মোনাজাতের সময় তিনি বললেন, হে গাফুরুর রহিম। আমি যদি ভুল করে থাকি আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই। আমার বুদ্ধি এবং জ্ঞান দুই-ই অল্প। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা আমার অল্প বুদ্ধি এবং অল্প জ্ঞানের ফসল। এতে যদি ক্রটি হয়ে থাকে, তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার ক্ষমার সাগরে হাত পাতলাম।
ক্ষমা চাইবার সময় তার চোখে পানি চলে এলো। তিনি অনেকক্ষণ কাদলেন। নামাজের সময় তার চোখে পানি আসে না। অনেকদিন পর চোখে পানি এলো। তিনি মোনাজাত শেষ করে জায়নামাজে বসে রইলেন। গায়ের পোশাক বদলালেন না। কারণ তিনি জানেন ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে ডেকে পাঠাবেন। জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তিনি ক্যাপ্টেন সাহেবকে যা যা বলবেন তা মোটামুটি ঠিক করা আছে। এইসব কথা ক্যাপ্টেন সাহেবের পছন্দ হবে না। যদি পছন্দ না হয় তাহলে নদীর পাড়ে তাকেও যেতে হতে পারে।
মৃত্যু নিয়ে তিনি ভীত না। কে কখন কীভাবে মারা যাবে তা আল্লাহপাক নির্ধারিত করে রেখেছেন। লাওহে মাহফুজে এইসব দলিল রাখা আছে। যে মৃত্যু আল্লাহপাক কর্তৃক নির্ধারিত— সেই মৃত্যুকে ভয় পাবার কিছুই নেই।ওসি সাহেবের স্ত্রী কমলা এসে কয়েকবার ঘুরে গেছে। ইরতাজউদ্দিন জয়নামাজে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন বলে কিছু বলতে সাহস পায় নি। এইবার সে সাহস করে বলল, চাচাজি, কী হয়েছে? তিনি বললেন, মনটা সামান্য অস্থির হয়ে আছে। আর কিছু না।ভাত খাবেন না চাচাজি?
না, এখন খাব না। মা, আমি এখন কী বলব। মন দিয়ে শোন। যদি আমার ভালোমন্দ কিছু হয় তুমি হেডমাস্টার সাহেবের কাছে চলে যাবে। উনি অতি শুদ্ধ মানুষ। উনি যা করার অবশ্যই করবেন। কমলা ভীত গলায় বলল, এইসব কথা কেন বলতেছেন? ইরতাজউদ্দিন বললেন, আমার মন অস্থির হয়ে আছে বলেই বলতেছি। অস্থির মানুষ অনেক কথা বলে।চাচাজি, এক কাপ চা কি বানায়ে দেব?
না গো মা, কিছুই খাব না। তবে এক গ্রাস পানি খাব। এই পৃথিবীর যাবতীয় খাদ্যের মধ্যে পানি হলো শ্ৰেষ্ঠ খাদ্য এবং আল্লাহপাকের দেয়া অতি পবিত্র নেয়ামত। যতবার পানির গ্লাসে চুমুক দিবে ততবারই মনে মনে আল্লাহপাকের শুকুর গুজার করবা, তোমার প্রতি এই আমার একমাত্র উপদেশ।
আছরাওয়াক্তের আগে আগে ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেত ইরতাজউদ্দিনকে ডেকে পাঠালেন। তাকে থানা কম্পাউন্ডে নিয়ে যাবার জন্যে থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি দুজন কনষ্টেবল নিয়ে এসেছেন। ওসি সাহেব একবারও ইরতাজউদিনের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে যে-কোনো কারণেই হোক এই মানুষটির দিকে চোখ তুলে তাকানোর মতো অবস্থা তার না।
ইরতাজউদ্দিন থানার দিকে রওনা হবার আগে অজু করলেন। কমলার ছেলেটিকে কোলে নিয়ে আদর করলেন। নবি-এ-করিম শিশুদের পছন্দ করতেন। তাদের বলতেন, বেহেশতের ফুল। শিশুদের প্রতি স্নেহ ও মমতা দেখানো সুন্নত। সেই মমতা ইরতাজউদ্দিন কেন জানি দেখাতে পারেন না। শাহেদের মেয়ে রুনি ছাড়া কোনো শিশুই তাকে আকর্ষণ করে না। এটা অবশ্যই তাঁর চরিত্রের বড় একটা দুর্বলতা। তবে কমলার এই ছেলেটার প্রতি তাঁর মায়া পড়ে, গেছে।
এই ছেলেকে কোলে নিলেই সে খপ করে তার দাড়ি ধরে ফেলে। তার হাত ছুটানো তখন সমস্যা হয়ে যায়। হাত ছাড়িয়ে নিতে গেলে কাঁদতে শুরু করে।ক্যাপ্টেন বাসেতের সামনে কফির কাপ। চিনি-দুধাবিহীন কালো কফি। তিনি একেকবার কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কড়া কফির তিক্ত স্বাদে মুখ বিকৃত করছেন। ইরতাজউদ্দিন তার সামনে চেয়ারে বসে আছেন। তাকেও কফি দেয়া হয়েছে। তিনি কফিতে চুমুক দেন নি।
ক্যাপ্টেন বাসেত সিগারেট ধরালেন। লম্বা করে ধোঁয়া ছেড়ে হাত ইশারা করলেন। ঘরে দুজন সিপাই এবং একজন হাবিলদার মেজর ছিল, তারা ঘর ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়াল। তাদের দৃষ্টি ঘরের ভেতর। ক্যাপ্টেন বাসেত খানিকটা বুকে এসে বললেন, আমি খবর পেয়েছি আপনি জুম্মার নামাজ পড়াবেন না, কারণ আমি জুম্মার নামাজ পড়তে যাই। আমার মতো খারাপ মানুষকে পেছনে নিয়ে নামাজ হয় না–এই জাতীয় বক্তৃতাও না-কি দিয়েছেন।
