তোমার সঙ্গে এই নিয়ে ডিসকাস করা উচিত না। তবু তুমি যখন শুনতে চোচ্ছ তখন বলছি- সে তার ভাবি স্ত্রীর হাত ধরেছে— এটা এমন কি অপরাধ? আমি যতদূর জানি তোমরা ক্লাসের ছেলের হাত ধরাধরি করে হাঁট। তখন অপরাধ হয় না? তারা কি পরিমাণ রাগ করেছে তা-কি তুমি জান? মুনির টেলিফোনে কাঁদছিল। মুনিরের বাবা টেলিফোন করেছেন, মুনিরের এক মামা পুলিশের এ আই জি উনি টেলিফোন করেছেন। জিয়ার আমলে পাটমন্ত্রী ছিলেন যে ভদ্রলোক উনিও টেলিফোন করেছেন।জরীর মা ক্ষীণ গলায় বললেন, এখন কি করা?
ইউসুফ সাহেব বললেন, এইটা নিয়েই চিন্তা করছি। মুনিরের বাবার সঙ্গে কথা হলো।জরী বলল, কি কথা হলো? তোমার তা শোনার দরকার নেই। তুমি ঘরে যাও।জরী উঠে চলে গেল। ইউসুফ সাহেব বললেন, মুনিরের বাবা বলেছেন তারা কাজী ডাকিয়ে বিয়ে পড়িয়ে দিতে চান। দেরী করতে চান না, কারণ ছেলে খুব মন খারাপ করেছে।জরীর মা বললেন, বিয়ের পর ওরা আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিবে।কষ্ট দিবে কি জন্যে? বিয়ে হয়ে গেলে সব সমস্যার সমাধান। আর একবার বিয়ে হয়ে গেলে কেউ কিছু মনে রাখবে না।বিয়ে কখন হবে?
ওরা পঞ্জিকা টঞ্জিকা দেখছে। যদি দিন শুভ হয় আজ রাতেও হতে পারে।এইসব কি বলছেন ভাইজান।চিন্তা ভাবনা করেই বলছি। চিন্তা ভাবনা ছাড়া কাজ করা আমার স্বভাব না।জরী যে কাণ্ড করেছে তারপর এ ছাড়া অন্য পথ নেই।মেয়েটার মত নাই।বাজে কথা বলবে না। মত নাই আগে বলল না কেন? এনগেজমেন্টের আগে বলতে পারল না? জরীকে এখন কিছু বলার দরকার নেই। ওদের টেলিফোন আগে পাই ওরা যদি আজ রাতে বিয়ের কথা বলে তখন আমি জরীকে বুঝিয়ে বলব।জরীর মা ক্ষীণ গলায় বললেন, আরো কয়েকটা দিন সময় দিলে মেয়েটা ঠাণ্ডা হত।আমার মতে আর এক মুহুর্ত সময়ও দেয়া উচিত না। সময় দিলে ক্ষতি। বিরাট ক্ষতি। ওদের কিছু না, ক্ষতি আমাদের… ।
ইউসুফ সাহেবের কথা শেষ হবার আগেই টেলিফোন এল। মুনিরুদিনের বাবা টেলিফোন করেছেন। সবার সাথে কথা টথা বলে ঠিক করেছেন-বিয়ে আজ রাতেই পড়ানো হবে। রাত দশটার মধ্যে বিয়ে পড়ানো হবে। এগারটার দিকে তারা বৌ নিয়ে চলে যাবেন। সামনের সপ্তাহে হোটেল সোনারগাঁয়ে রিসিপশন।ইউসুফ সাহেব জরীর মাকে বললেন, তুমি তোমার গুণবতী মেয়েকে আমার কাছে পাঠাও।ভাইজান একটা বিষয় যদি বিবেচনা করেন।সব দিক বিবেচনা করা হয়েছে। বিবেচনার আর কিছু বাকি নেই।মনসুর আলি সাহেব বাগানে গোলাপ গাছের কাছে খুপড়ি হাতে বসেছিলেন। পাঁচটি গোলাপ এই গাছটায় একসঙ্গে ফুটেছে। টকটকে লাল গোলাপ। মনে হচ্ছে গাছে যেন আগুন লেগে গেছে। গাছটা যেন আনন্দ, গর্ব এবং অহংকারের সঙ্গে উঁচু গলায় বলছে দেখ তোমরা আমাকে দেখ।
এ রকম একটা গাছের একটু যত্ন নিজের হাতে না করলে ভালো লাগে না। মনসুর সাহেব মাটি আলগা করে দিচ্ছেন। মাটির ফাঁকে ফাঁকে যেন গাছের জীবনদায়িনী নাইট্রোজেন প্রচুর পরিমাণে যেতে পারে।মেঘবতী এগিয়ে এল। খুব ধীর পায়ে আসছে। বেচারীর শরীর ভালো না। কাল রাতে সে কিছুই খায় নি। খাবার খানিকক্ষণ ওঁকে নিজের জায়গায় চলে এসেছে। দুটি থাবার মাঝখানে মুখ রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।তিনি মেঘবতীর দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বললেন, আয় আয়। দেখ ফুলের বাহার দেখি।মেঘবতী কাছে এসে তাঁর পাঞ্জাবীর এক কোণ কামড়ে ধরে চুপ করে বসে রইল। তিনি মাটি কুপিয়ে দিতে লাগলেন। বড় ভালো লাগছে। শীতের সকালের এই চমৎকার রোদ, ফুলের গন্ধ, গা ঘেষে বসে থাকা প্রিয় প্রাণী। এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দের যোগফল বিরাট একটি সংখ্যা। সেই সংখ্যা অসীমের কাছাকাছি।
মনসুর সাহেব খুড়পি নামিয়ে পাঞ্জাবীর পকেটে চুরুটের জন্যে হাত দিলেন।মেঘবতী পাঞ্জাবীর পকেট এখনো কামড়ে ধরে আছে।মেঘবতী, ছাড়তো দেখি, চুরুট নেব।মেঘবতী ছাড়ল না।তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। কিছুক্ষণ তাঁর চোখে পলক পড়ল না। মেঘবতী মরে পড়ে আছে। মৃত্যুর আগে আগে সে কিছু একটা বলতে এসেছিল। বলতে পারে নি। পরম মঙ্গলময় আল্লাহ তার হৃদয়ে ভালোবাসা দিয়েছিলেন, মুখে ভাষা দেন নি। মৃত্যুর আগে আগে যে কথাটি সে বলতে এসেছিল তা বলতে পারে নি। সে তার প্রভুর পাঞ্জাবীর পকেট কামড়ে ধরে অচেনা অজানার দিকে যাত্রা করেছে।মনসুর সাহেব ভাঙ্গা গলায় ডাকলেন, আনুশকা। আনুশকা। আনুশকাকে ডাকতে গিয়ে তার গলা ভেঙ্গে গেল।
আনুশকা ছুটে এলা। মনসুর সাহেব ভাঙ্গা গলায় বললেন, তোমার মেঘবতীর গায়ে একটু হাত রাখ মা।আনুশকা কয়েক পলক মেঘবতীর দিকে তাকিয়ে ছুটে গেল নিজের ঘরের দিকে।এই বিশাল বাড়িতে সে ছিল নিঃসঙ্গ। মেঘবতী তাকে সঙ্গ দিয়েছে। কত রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে ভয় পেয়ে ডেকেছে, মেঘবতী।ওম্নি জানালার কাছে মেঘবতীর গর্জন শোনা গেছে। সে জানিয়ে গেছে— আছি আমি আছি। তোমার মা তোমাকে ছেড়ে চলে গেছেন, তোমার বাবা ঘুরছেন জাহাজে জাহাজে, কিন্তু আমি আছি। আমি আমার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থাকব। আমি পশু, আমি মানুষের মতো প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়া শিখি নি।আনুশকা ফুলে ফুলে কাঁদছে।মনসুর সাহেব আনুশকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।মা এমন করে কাঁদলে চলবে? রাত নটা বাজে। আজ না তোমাদের দারুচিনি দ্বীপে যাবার কথা।আমি কোথাও যাব না।
তাতো হয় না মা। তুমি না গেলে তোমার বান্ধবীরা যাবে না। তোমার একার কষ্টের জন্যে তুমি অন্যদের কষ্ট দিতে পার না। সেই অধিকার তোমার নেই মা? বললামতো আমি যাব না।তুমি মানুষ হয়ে জন্মেছ মা। মানুষ শুধু একার জন্যে বাঁচে না— মানুষ অন্যদের জন্যেও বাঁচে। এইখানেই মানুষ হয়ে জন্মানোর আনন্দ। এইখানেই মানুষ হয়ে জন্মানোর দুঃখ। মা উঠ। তোমার বান্ধবীরা সব মুখ কালো করে বসে আছে।আনুশকা নড়ল না।মনসুর সাহেব বললেন, তোমার মা যেদিন হঠাৎ করে এলে আমাকে বলল, আমি তোমার সঙ্গে বাস করতে পারছি না। আমি চলে যাচ্ছি। সেদিনও আমি কিন্তু ঠিক সময়ে অফিসে গিয়েছি। মা, তুমিতো আমার মেয়ে। আমার মেয়ে না?
হ্যাঁ আমি তোমারই মেয়ে।তাহলে তুমি ওঠ তো।আনুশকা উঠে বসল। মনসুর সাহেব বললেন তোমার আনন্দ তুমি সবাইকে দেখাবে। দুঃখ কাউকে দেখাবে না। তোমার মা আমাকে ছেড়ে যাওয়ায় আমি যে দুঃখ পেয়েছিলাম তা কি কখনো কাউকে দেখিয়েছি? আমার এত প্রিয় যে মেয়ে তার কাছেও আজ মাত্র স্বীকার করলাম।আনুশকা চোখ মুছে বন্ধুদের কাছে গিয়ে হাসতে হাসতে বলল, এখনো অনেক সময় আছে। চলতো সবাই ছাদে খানিকক্ষণ হৈ চৈ করে আসি।ফরিদা হাসি মুখে বললেন, এই নে তোর টাকা গুণে দেখ এক হাজার আছে কি না। এখন খুশি?
তাঁর মুখে হাসি। তিনি মনের আনন্দ চেপে রাখতে পারছেন না। মুনা তার বড় মামার কাছে চাওয়া মাত্র টাকা পেয়েছে। কোনো সমস্যা হয় নি।কি গুণে দেখলি না? সঞ্জু বলল, কি আশ্চর্য গুণে দেখতে হবে কেন? ভাত দিয়ে দাও মা।মাত্র আটটা বাজে। এখনি ভাত খাবি কি? তোর ট্রেন সেইতো রাত সাড়ে দশটা।একটু আগে আগে যাওয়া দরকার। টিকিটের ঝামেলা আছে।তোর বাবাওতো সঙ্গে যাবে।সঞ্জু বিস্মিত হয়ে বলল, বাবা যাবে মানে? তাঁর যাওয়ার দরকার কি? যেতে চাচ্ছে যাক না। তুই বিরক্ত হচ্ছিস কেন?
সবাই বলবে কি? ট্রেনে তুলে দিতে বাবা চলে এসেছেন। আমি কি কচি খোকা না-কি? না মা তোমার পায়ে পড়ি, যে ভাবেই হোক তুমি সামলাও, প্লীজ।বেচারা এত আগ্রহ করে যেতে চাচ্ছে।না-মা, না, প্লীজ। সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। এমিতেই ওরা আমাকে খোকা বাবু ডাকে।খোকা বাবু ডাকে? হুঁ। কেনইবা ডাকবে না। ইউনিভার্সিটির সব কটা পরীক্ষার সময় বাবা উপস্থিত। হাতে কাটা ডাব। পরীক্ষা দিয়ে এসেই ডাব খেতে হবে। কি রকম লজ্জার ব্যাপার বলতো।লজ্জার কি আছে? ডাবের পানিতে পেটটা ঠাণ্ডা থাকে।উফ, মা তুমি বুঝবে না। তুমি বাবাকে সামলাও।আচ্ছা দেখি বলে দেখি।মুনা এসে বলল, ভাইয়া বাবা তোমাকে ডাকছেন।
সঞ্জু বাবার ঘরের দিকে রওনা হলো। আবারো হয়ত খানিকক্ষণ ইরাকের যুদ্ধের কথা শুনতে হবে। বাবার ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসে থাকার কোনো মানে হয় না। বাবার সঙ্গে তার বলার কোনো কথা নেই। মাঝে মাঝে সে মনেও করতে পারে না বাবাকে আপনি করে বলে না তুমি করে বলে। কলেজে যখন পড়ে তখন একদিন বাবা তাকে ডেকে বললেন, তুই আজ আমার অফিসে একটা চিঠি নিয়ে যেতে পারবি? সঞ্জু বলল, জ্বি স্যার পারব।সোবাহান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, স্যার বলছিস কেন? সঞ্জু কোন জবাব দিতে পারে নি। মাথা নিচু করে দাড়িয়েছিল।এখনো সে ঐদিনকার মত চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।সোবাহান সাহেব বললেন, বোস।সঞ্জু বসল।
টাকা পয়সা কি লাগবে বললি নাতো।মা টাকা দিয়েছে।ও আচ্ছা। ঠিক আছে ঠিক আছে নে আরো দুশ টাকা রেখে দে।লাগবে না বাবা।রেখে দে।লাগবে না। মা এক হাজার টাকা দিয়েছে।সোবাহান সাহেবের মন একটু খারাপ হলো। তিনি ভেবেছিলেন, বাড়তি দুশ টাকা পেয়ে ছেলে খুশি হবে। তিনি তার আনন্দিত মুখ দেখবেন।সঞ্জু তোর বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কেউ সিগারেট খায়? সঞ্জু অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার মানে কি সে বুঝতে পারছে না। সোবাহান সাহেব বিব্রত গলায় বললেন, আমার অফিসের এক কলিগ ঐ দিন আমাকে এক প্যাকেট ডানহিল সিগারেট দিল। আমিতো সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। প্যাকেটটা পড়ে আছে। তোর বন্ধু বান্ধবদের জন্যে নিয়ে যাবি? অবশ্য সিগারেট খাওয়া ভালো না। বদ অভ্যাস।
সঞ্জু মিথ্যা করে বলল, কেউ সিগারেট খায় না বাবা।ও আচ্ছা। আচ্ছা তাহলে থাক। তোর ট্রেনতো সাড়ে দশটায়? জ্বি।আমি তুলে দিয়ে আসব, কোনো অসুবিধা নেই। সাড়ে নটার দিকে বেরুলেই হবে।আপনার যেতে হবে না বাবা।সোবাহান সাহেব আর কিছু বললেন না। পত্রিকা চোখের সামনে মেলে ধরলেন। সঞ্জু বাবার ঘর থেকে বের হয়ে মনে মনে বলল, বাঁচলাম।ইয়াজউদ্দিন সাহেব বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসেছিলেন।শুভ্র এসে বলল, বাবা আমি যাচ্ছি। ইয়াজউদ্দিন বিস্মিত হয়ে বললেন, এখন যাচ্ছ মানে? এখন বাজে রাত নটা।গাড়িতে স্টেশনে যেতে তোমার সময় লাগবে পাঁচ মিনিট।
আমাদের সবারই একটু আগে যাবার কথা। তাছাড়া আমি গাড়ি নিচ্ছি না। রিকশা করে যাচ্ছি।রিকশা করে যাচ্ছ? জ্বি।কেন জানতে পারি? নিজের মতো করে যেতে চাচ্ছি বাবা।গাড়ি নিয়ে গেলে বুঝি পরের মতো করে যাওয়া হবে? শুভ্র কিছু বলল না।ইয়াজউদ্দিন সাহেব বললেন, সত্যি করে বলতো, তুমি কি কোনো কারণে আমার উপর বিরক্ত? বিরক্ত হব কেন? প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্নের উত্তর আমার পছন্দ না। তুমি আমার উপর বিরক্ত কি বিরক্ত না সেটা বল। হ্যাঁ অথবা না।হ্যাঁ।ইয়াজউদ্দিন অনেকক্ষণ ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শুভ্ৰ হ্যাঁ বলেছে এটা বিশ্বাস করতে তার সময় লাগছে।তুমি বিরক্ত কেন?
এখনতো আমার সময় নেই বাবা পরে গুছিয়ে বলব।স্টেশনে যেতে তোমার লাগবে পাঁচ মিনিট।আমিতো রিকশা করে যাচ্ছি।রিকশাতেও কুড়ি মিনিটের বেশি লাগার কথা না। শুভ্ৰ স্বাভাবিক গলায় বলল, তোমার উপর কেন বিরক্ত সেটা বলতে আমার সময় লাগবে। আমি ফিরে এসে বলব।অনেক দীর্ঘ কথাও খুব সংক্ষেপে বলা যায়। তিন পাতার যে রচনা তার সাবসটেন্স সাধারণত দুই তিন লাইনের বেশি হয় না।শুভ্র বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তোমার উপর বিরক্ত কারণ তুমি আমাকে অবিকল তোমার মতো করতে চাও।সব বাবাই কি তাই চায় না?
চাওয়াটা ঠিক না। এটা চাওয়া মানে ছেলেদের উপর চাপ সৃষ্টি করা। অন্যায় প্রভাব ফেলা।আমি তোমার উপর অন্যায় প্রভাব ফেলছি? চেষ্টা করছ কিন্তু পারছ না।মনে হচ্ছে মানুষ হিসেবে তুমি আমাকে তেমন পছন্দ কর না।পছন্দ করি, কিন্তু তুমি সব সময় নিজকে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান মনে কর। এটা আমার পছন্দ না।তোমার ধারণা আমি অন্যদের চেয়ে বুদ্ধিমান নই? আমার তাই ধারণা বাবা। তুমি অন্যদের চেয়ে কৌশলী, কিন্তু বুদ্ধিমান নও।কিভাবে বুঝলে আমি বুদ্ধিমান নাই? এক জন বুদ্ধিমান মানুষ অন্যদের বুদ্ধি খাটো করে দেখে না। এক জন বোকা লোকই তা করে। তুমি সব সময় আমার বুদ্ধিকে খাটো করে দেখেছ। মাকে খাটো করে দেখেছ।
আমি যে যথেষ্ট বুদ্ধিমান সেটা তুমি এখন বুঝতে পারছ- আগে না। এর আগ পর্যন্ত তোমার ধারণা ছিল আমি পড়ুয়া এক জন ছেলে। বই পত্র ছাড়া কিছুই বুঝি না। আমি জগতের বাইরে এক জন মানুষ যে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছাড়া আর কিছুই পারে না।শুভ্ৰ তুমি বস। তোমার সঙ্গে কথা বলি।আমারতো সময় নেই বাবা।এক কাজ করলে কেমন হয়। আমি বরং তোমার সঙ্গে রিকশা করে যাই। অনেক দিন রিকশা চড়া হয় না। যেতে যেতে কথা বলি।আমি একাই যেতে চাই বাবা।তোমার মনে যে এতটা চাপা ক্ষোভ ছিল তা আমি বুঝি নি।বুদ্ধি কম বলেই বোঝ নি। অন্য যে কোন বাবা সেটা বুঝতেন।আই এ্যাম সরি। আই এ্যাপোলোজাইজ।শুভ্ৰ হেসে ফেলে বলল, এ্যাপোলোজি একসেপটেড। বাবা যাই।বন ভয়াজ মাই ডিয়ার সান। বন ভয়াজ।
শুভ্ৰ নিচু হয়ে বাবাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেল। ইয়াজউদ্দিন সাহেব ছেলেকে তা করতে দিলেন না, জড়িয়ে ধরলেন।শুভ্র বলল, আমি যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি বাবা। এই ভালোবাসার মধ্যে কোনো রকম খাদ নেই। একজন মানুষ অন্য এক জনকে তার গুণের জন্যে ভালোবাসে। আমি ভালোবাসি তোমার দোষগুলোর জন্যে। তুমিই আমার দেখা একমাত্র মানুষ যার দোষগুলোকে গুণ বলে মনে হয়।ইয়াজউদ্দিন সাহেব ছেলেকে রিকশায় তুলে দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বললেন, খুব ধীরে টেনে নিয়ে যাও। বলেই তাঁর কি মনে হলো তিনি বললেন, না ঠিক আছে তুমি যে ভাবে যাও সেভাবেই যাবে। ধীরে যেতে হবে না।
রিকশাওয়ালা উল্কার বেগে ছুটল। কমলাপুর রেলস্টেশানের কাছাকাছি এসে স্পীড-ব্রেকার ধাক্কা খেয়ে রিকশা উল্টে গেল। লোকজন ছুটে এসে আজকে টেনে তুলল। শুভ্র বলল, আমার কিছুই হয় নি। শুধু চশমাটা ভেঙ্গে গেছে।শুভ্র কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আলো এবং ছায়া তার চোখে ভাসছে। চশমা ছাড়া সে সত্যি সত্যি অন্ধ।শুভ্র বলল, আপনার কেউ কি আমাকে দয়া করে কমলাপুর রেল স্টেশনে নিয়ে যাবেন। আমি চশমা ছাড়া কিছুই দেখতে পাই না। প্লীজ আপনারা কেউ আমাকে একটু সাহায্য করুন।
Read more
