অরু এখন ঢাকাতেই আছে। তার ডাক্তারী পড়া বন্ধ। সে একটা কিন্ডারগার্টেনে মাস্টারি করে এবং আজাহার হোসেনের সঙ্গে জীবনযাপন করে। সেই জীবন কেমন এ বাড়ির কেউ জানে না। অরুর সঙ্গে এদের কোনো যোগাযোগ নেই। এ বাড়িতে অরুর ব্যবহারী প্রতিটি জিনিস নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। শাহানাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, আপনার ছেলেমেয়ে কি? তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেন, আমার দুই মেয়ে। এটা বলতে তাঁর কথা আটকে যায় না বা তিনি কোনোকষ্টবোধ করেন না।
কিংবা কে জানে, হয়ত করেন, কাউকে বুঝতে দেন না। গত ঈদে অরু এসেছিল। শাহানা রাগে কাঁপতে-কাঁপতে বলেছিলেন, তোর এত সাহস! তুই এ বাড়িতে আসতে পারলি? এক্ষুনি বের হ। এক্ষুনি। অরু চলে গিয়েছিল এবং আর কখনো আসে নি।শাহানার ধারণা জহিরের সঙ্গে অরুর হয়ত কোনোযোগাযোগ আছে। এই বিষয়ে জহিরকে তিনি কখনো কিছু জিজ্ঞেস করেন নি। আজকাল মাঝে-মাঝে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে।তরুর অস্থির ভাবটা আরো বাড়ল।জহির ভাই এখনো বের হচ্ছেন না। কী করছেন তিনি?
চা খাচ্ছেন? ককাপ চা? এই ঝাঁঝাঁ দুপুরে চা খাবার দরকারটা কি? তার ইচ্ছা করছে উঁকি দিয়ে দেখতে। ইচ্ছা করলেও যাওয়া যাবে না। সবাই ঘুমুচ্ছে। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করবে কে? তরু বসার ঘরে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। তার তখনি চোখে পড়ল জহির ভাই বেরুচ্ছেন। আজ তাকে অন্যরকম লাগছে। কেন অন্যরকম লাগছে? গায়ে তো সেই পুরনো হলুদ শার্ট। এরকম বিশ্রী রঙের শার্ট কেউ পরে? কপয়সা আর লাগে ভালো একটা শার্ট কিনতে। কত সুন্দর-সুন্দর শার্ট আজকাল বের হয়েছে! জহির কলিং বেলে হাত দেয়ার আগেই জানালার ওপাশ থেকে তরু বলল, জহির ভাই।
জহির জানালার পাশে এগিয়ে এসে বলল, তুমি কলেজে যাও নাই? না। আপনি ঐ চায়ের দোকানে বসে কী করছিলেন? দেখেছ নাকি? হাঁ দেখেছি। আপনি ওখানে কী করছিলেন? চা খাচ্ছিলাম, আবার কি? এ বাড়িতে আমরা কি চা বানাতে পারি না যে দোকানে গিয়ে চা খেতে হয়?জহির কথা ঘুরাবার জন্যে বলল, দরজা খোল তরু, জানালা দিয়ে কথা বলব?তরু দরজা খুলল, তার মুখ ভার-ভার, বিষণ্ণ।
জহির বলল, কেউ নেই নাকি? ঘর এমন চুপচাপ। তরু করুণ গলায় বলল, এ বাড়ি এখন তো চুপচাপই থাকে। এ বাড়িতে হৈচৈ-এর মানুষ কোথায়? বসুন জহির ভাই। কেন জানি আপনাকে দেখে আজ খুব ভালো লাগছে। জহির লজ্জিত মুখে বলল, মামা এখনো ফেরেন নি? উহুঁ। আপনাকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে কেন জহির ভাই? কেমন অচেনা-অচেনা লাগছে।চুল কেটেছি।আপনাদের পুরুষদের এই একটা অদ্ভুত ব্যাপার, দুই দিন পরপর চুল কাটেন আর চেহারাটা বদলে যায়।
মানুষ তো আর বদলায় না।কে জানে হয়ত বদলায়।তোমার মনটা মনে হয় খারাপ। কিছু হয়েছে নাকি? না, কি আর হবে।মামী কোথায়?ঘুমুচ্ছেন। ডাকব?না, ডাকার দরকার নেই।
জহির খানিক ইতস্তত করে বলল, জিনিসটা কেমন দেখ তো তরু। এনগেজমেন্টের একটা আংটি কিনলাম। মানে মামা বললেন—তাই।তরু হাত বাড়িয়ে আংটির বাক্সটি নিল। জহিরের অসময়ে আসার উদ্দেশ্য তার মনে পড়ল। আজ যোল তারিখ, মেয়ে দেখার দিন; তরুর মনেই ছিল না।জহির নিচু গলায় বলল, তোমাকে নিয়ে কিনতে চেয়েছিলাম, ভাবলাম তোমাকে নিয়ে গেলে তুমি শুধু দামিগুলো কিনতে চাইবে। মানে আমার তো আবার
আংটিটা সুন্দর হয়েছে।সত্যি বলছ? হ্যাঁ, সত্যি। খুব সুন্দর।আঙুলে লাগবে কি-না কে জানে।লাগবে। জহির ভাই আমি একটু পরে দেখব? পর। দেখ আবার যেন দাগ না লাগে।তরু একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ জহিরের দিকে তাকিয়ে আংটি পরল। জহির বলল, লেগেছে? হ্যাঁ।টাইট হয় নি তো?। না।
অবশ্যি হলেও অসুবিধা হবে না। ওরা বলেছে ফেরত নিবে। আংটিটা এখন খুলে ফেল তরু, ঘষাটসা লাগলে দাগ পড়ে যাবে।পড়বে না। সোনাতে অত সহজে দাগ পড়ে না। চা খাবেন জহির ভাই।না। ঠাণ্ডা কিছু দেব? শরবত করে দেই, লেবু আছে।না না কিছু লাগবে না। তুমি বস তো।তরু তার সামনে বসল। নিচু গলায় বলল, আংটিটা আমাকে একদম মানাচ্ছে না, তাই না জহির ভাই? গায়ের রঙ আরো ফর্সা হলে মানাতো। যার গায়ের রঙ সোনার মতো তাকেই সোনার গয়নায় মানায়। আমাদের কলেজে সায়েন্স গ্রুপে একটা মেয়ে পড়ে, তার গায়ের রঙ অবিকল কাঁচা সোনার মতো।তাই নাকি?
হ্যাঁ। একবার কয়েকগাছি চুড়ি পরে এসেছিল, চুড়িগুলো গায়ের রঙের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেল যে কোনগুলো চুড়ি বোঝা যাচ্ছিল না।বল কী।তবে মেয়েটা দেখতে ভালোনা। মেয়েটার দিকে তাকালে মনটা খারাপ হয়ে যায়। এতো সুন্দর গায়ের রঙ, এতো সুন্দর শরীর।বলতে-বলতে তরু লজ্জা পেয়ে গেল। সুন্দর শরীর কথাটা বলা ঠিক হয় নি, জহির ভাই কী মনে করলেন কে জানে।জহির ভাই।বল।
সবারই তো একইরকম নাক-মুখচোখ, তবু কাউকে সুন্দর লাগে, কাউকে লাগে না কেন? কি জানি কেন।তরু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি নিজে দেখতে তো ভালো না এইজন্যে এটা নিয়ে আমি খুব ভাবি।তুমি দেখতে খারাপ কে বলল? খারাপ না তবে সাধারণ। খুব সাধারণ।সাধারণই ভালো।ছেলেদের জন্যে ভালো। মেয়েদের জন্যে না। একটা মেয়ের কেমন বিয়ে হবে, কী রকম বর হবে তা নির্ভর করে মেয়েটা দেখতে কেমন। মেয়েটি বুদ্ধিমতী কি-না, পড়াশুনায় কেমন, তার মনটা কেমন এইসব দেখা হবে না।জহির বিস্মিত হয়ে বলল, তুমি কি বিয়ে নিয়ে খুব ভাব?
ভাবি। আপার এ কাণ্ডের পর ভাবি। নিজের চেহারাটা আরেকটু ভালো হলে তেমন ভাবতাম না।তোমার চেহারা খারাপ না।তা ঠিক। খারাপ না, তবে ভালো না।তরু হাত থেকে আংটি খুলে বাক্সে ভরতে-ভরতে বলল, বাবা বলছিলেন আজকে যে মেয়েটিকে দেখতে যাবেন সে খুব সুন্দর তবে রোগা। জহির কিছু বলল না। তরু বলল, ওদের নাকি খুব আগ্রহ। আগের কয়েকটা বিয়ে লাগানী-ভাঙানীর জন্যে ভেঙে গেছে তাই…. তরু কথা শেষ না করে উঠে গেল।
জহির ঘড়ি দেখল। চারটা চল্লিশ; অথচ বাইরে এখনো কড়া রোদ। আকাশে মেঘের ছিটাফোঁটাও নেই। সে ভেতরের বারান্দায় এল। দুটো গোলাপ গাছে অসুখ ধরেছে। পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে। গাছের কষ্টটা দেখেই বোঝা যায়। গোলাপের এই অসুখটা খুব খারাপ। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাল-পরশুর মধ্যে ওষুধ এনে দিতে হবে। জহির গাছগুলোর কাছে নেমে এল। অসুস্থ পাতাগুলো ফেলে দিতে হবে। গাছের গোড়ায় কিছু ছাই দিতে পারলে হত। শহরে ছাই কোথায় পাওয়া যাবে।তরু বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার ভঙ্গি দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে সে কিছু বলতে চায়। জহির বলল, কিছু বলবে তরু?না।তোমার মনটা খুব খারাপ বলে মনে হচ্ছে। কিছু হয়েছে?
না মাথা ধরেছে।চোখ বন্ধ করে ঘরটা অন্ধকার করে শুয়ে থাক।আপনার এই হলুদ রঙের শার্টটা দেখলেই আমার মাথা ধরে যায়। একদিন আপনার বাসায় গিয়ে শার্টটা পুড়িয়ে দিয়ে আসব। হাসবেন না, সত্যি-সত্যি পুড়িয়ে দেব কিন্তু। জহির দেখল তরু মুখ থেকে বিষণ্ণ ভাবটা চলে গেছে। সে হাসছে। হাসলে এই মেয়েটাকে সুন্দর দেখায়। হাসলে সবাইকে সুন্দর দেখায় কিন্তু এই মেয়েটিকে একটু বেশি সুন্দর লাগে।
এ বাড়ির মানুষেরা কথা কম বলে। শুধু শাহানা কিছু বেশি কথা বলেন। তরু, অরু এবং মীরু এই তিন বোন তো কথাই বলে না। বনেরা মিলে গল্প করার দৃশ্যও জহির খুব বেশি দেখে নি তবে এই তিন বোনর মধ্যে তরু খানিকটা সহজ। বাইরের লোকজন এলে সে এগিয়ে গিয়ে গল্প করে। তাও অবশ্যি অল্প কিছুক্ষণ। মনে হয়। কিছুক্ষণ গল্প করার পরই তার আগ্রহ নিভে যায়। তরু নরম গলায় বলল, জহির ভাই? বল।অসুন্দর মেয়ে হবার সবচে বড় সমস্যা কি জানেন? না।একটা অসুন্দর মেয়ে যদি কাউকে পছন্দ করে সে তা জানাবার সাহস পায় না। মনের মধ্যে চেপে রাখতে হয়।এইসব আজেবাজে জিনিস নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়? যাও আমার জন্যে চা বানিয়ে আন।শাহানার ঘুম ভাল।
ঘুম ভাঙলে প্রথম তিনি যে কাজটি করেন তা হচ্ছে মতির মাকে বকাঝকা। আজ বকাঝকা চূড়ান্ত রকমের হতে পারে। মতির মারও ঘুম ভেঙেছে। সে এই বকাঝকা মোটও গ্রাহ্য করল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকে বলল, আফা দেহি আমারে একফোঁটা চা দেন।জহিরের চা খাওয়া শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বরকত সাহেব ঢুকলেন। আজ কেন জানি তাঁকে ক্লান্ত ও বিরক্ত লাগছে। তিনি জহিরকে দেখে বললেন, এসে পড়েছ? মেয়ের এক বড় খালু আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বললেন, সন্ধ্যার পর যেতে। রাতে ঐ বাড়িতে খেতে বলেছে। খাওয়াটা কি ঠিক হবে? চা-মিষ্টি খাওয়া এক জিনিস আর ভাত খাওয়া অন্য জিনিস। আমি অবশ্যি হ্যাঁ-না কিছুই বলি নি। খাওয়াতে চাচ্ছে খাওয়াক। তুমি কী বল?
আপনি যা ভালো মনে করেন।এরেঞ্জড্ ম্যারেজ এখন ভয়ঙ্কর সমস্যা। ছেলেগুলোর চরিত্রের ঠিক নাই, মেয়েগুলোও তেমন। বিরাট টেনশান। তরুর একটা বিয়ে কোনো মতে দিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিত হই।এখনই তরুর বিয়ে? হ্যাঁ, এখনই। তুমি জান না বখা ছেলেগুলো খুব যন্ত্রণা করছে। তরু তোমাকে কিছু বলে নি?জহির বিস্মিত হয়ে বলল, না তো! লজ্জায় বলে নি। বলার মতো জিনিস তো না। তুমি আবার নিজ থেকে জিজ্ঞেস করো না–লজ্জা পাবে।না আমি কিছুই জিজ্ঞেস করব না।
জহিরের মন খারাপ হল। বেশ মন খারাপ। সে তরুকে পছন্দ করে। অনেকখানিই করে। এই মেয়েটা মনে কষ্ট নিয়ে ঘুরছে ভাবতেই খারাপ লাগে। কি করেছে। ছেলেগুলো? খারাপ কোন গালাগাল দিয়েছে? নাকি গায়ে হাত-টাত দিয়েছে? সারাদিন ঝাঁ-ঝাঁ রোদ ছিল। অথচ সন্ধ্যা মেলাবার আগেই মেঘ জমে আকাশ কালো হয়ে গেল। বরকত সাহেব জহিরকে নিয়ে রাস্তায় নামতেই ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল। বরকত সাহেব বললেন, বৃষ্টি হলে বাঁচা যায়, কি বল জহির?
জহির চুপ করে রইল। বরকত সাহেব বললেন, অফিসে আমার মাথার ওপরের ফ্যানটা ছিল নষ্ট। গরমে সারাদিন খুব কষ্ট করেছি।বৃষ্টির ফোঁটা ঘন হয়ে পড়তে শুরু করেছে। বরকত সাহেবের সঙ্গে ছা আছে তবে তিনি ছাতা মেললেন না। আনন্দিত গলায় বললেন, বৃষ্টি যাত্রা খুবই শুভ। তোমার এই বিয়েটা হবে বলে মনে হচ্ছে। যদি হয় তোমার জন্যেও সুবিধা। কাওরানবাজারে মেয়ের নামে ছোট্ট একটা ঘর আছে। ঐখান থেকে রেগুলার ভাড়া পাবে। চল প্রথমে কিছু মিষ্টি কিনে নিই। খালি হাতে যাওয়া ঠিক না।
দুকেজি মিষ্টি কেনা হল। বরকত সাহেব জহিরকে মিষ্টির দাম দিতে দিলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, মিষ্টি তো তুমি নিচ্ছ না। আমি নিচ্ছি। যার বাসায় যাচ্ছি সেই ভদ্রলোক আমার পরিচিত। আমাদের অফিসের পারচেজ অফিসার জব্বার সাহেবের ভায়রা ভাই, মেয়ের বড় খালু।বরকত সাহেব পনের টাকায় একটা রিকশা নিলেন। বৃষ্টিতে রিকশা করে যাওয়ার। আনন্দই নাকি আলাদা। রিকশায় উঠার পরপর মুষলধারে বর্ষণ শুরু হল। বরকত সাহেব বললেন, ভালো বর্ষণ হচ্ছে, তাই না জহির? জ্বি মামা।ইংরেজিতে এই ধরনের বৃষ্টিকে বলে ক্যাটস এন্ড ডগস। কেন বলে কে জানে। তুমি কি ভিজে যাচ্ছ নাকি?
জহির ভিজে যাচ্ছিল, তবু বলল, না।বরকত সাহেব বললেন, আমি ভিজে যাচ্ছি কেন তা তো বুঝলাম না। কোত্থেকে যেন হুড়হুড় করে পানি ঢুকছে।বরকত সাহেব প্রবল বাতাসের বিপরীতেও সিগারেট ধরালেন। গলার স্বর খানিকটা নামিয়ে বললেন, রিকশা নিয়েছি কারণ তোমাকে কয়েকটা কথা বলা দরকার। বেবিটেক্সিতে গেলে শব্দের যন্ত্রণাতেই কিছু শোনা যেত না।জহির শংকিত গলায় বলল, কী কথা?
ঐ মেয়ে সম্পর্কে দুএকটা কথা। ওর কিছু ইতিহাস আছে। আমি আগে জানতাম না। আজই জানলাম। মেয়ের বড় খালু বললেন। উনার কাছ থেকে সব শুনে একবার ভাবলাম মেয়ে দেখা ক্যানসেল করে দেই। বাংলাদেশে মেয়ের তো অভাব নেই, তাই না? তারপর চিন্তা করলাম, এর একটা মানবিক দিক আছে। তাছাড়া তুমি যেমন কলসিডারেট ছেলে সব দিক বিবেচনা করে তুমি হয়ত… ব্যাপারটা কি মামা? মেয়ের আগে একটা বিয়ে হয়েছিল।জহির প্রথম ভাবল সে কানে ভুল শুনছে। মেয়ের আগে বিয়ে হয়েছে মানে? এ কেমন কথা? জহির অস্পষ্ট স্বরে বলল, কী বলছেন এসব?
তুমি যা ভাবছ তা না। কাগজে-পত্রে বিয়ে। কাগজে-পত্রে ঠিক না। টেলিফোনে। টেলিফোনে এক সময় বিয়ের খুব চল হল না? ছেলে বিদেশে—মেয়ে দেশে টেলিফোনে বিয়ে হয়ে যায়। তারপর মেয়ে চলে যায় স্বামীর কাছে। ঐ রকম বিয়ে। ছেলে ইউনিভারসিটি অব ওয়াশিংটনে মেরিন বায়োলজিতে পিএইচডি করত। টেলিফোনে বিয়ে হল। মেয়ে চলে যাবে কিন্তু ভিসার জন্যে যেতে পারে না। আমেরিকানরা ভিসা দিতে বড় ঝামেলা করে। ভিসা পেতে লাগল নমাস। যাবার সব ঠিকঠাক, হঠাৎ ছেলের এক টেলিগ্রাম এসে উপস্থিত, মেয়ে যেন না আসে। যা বৃষ্টি! কি বলছি শুনতে পাচ্ছি জহির? জ্বি পারছি।
যাই হোক, মেয়ের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তার সপ্তাহখানেক পর ছেলের চিঠি এসে উপস্থিত। সে এই বিয়েতে আগ্রহী নয়। তাকে যেন ক্ষমা করা হয়। পুরো ব্যাপারটার জন্য সে খুবই লজ্জিত এবং অনুতপ্ত। ক্ষতিপূরণ হিসেবে সে পাঁচ হাজার ডলারের একটা ড্রাফট পাঠাল। মেয়ে অবশ্যি কিছুতেই তা নিবে না। মেয়ের আত্মীয়স্বজনরা মেয়ের কথা শুনল না। কাওরানবাজারে মেয়ের নামে একটা ঘর রাখল।কতদিন আগের কথা?
বছর দুই। বিনা অপরাধে মেয়েটার শাস্তি হচ্ছে। মেয়েটার আগে বিয়ে হয়েছে এটা শুনেই সবাই পিছিয়ে যায়। কী রকম বিয়ে, কী সমাচার কিছুই জানতে চায় না। জানলেও পিছিয়ে পড়ে। মেয়ের বাবা ক্ষমতাবান হলে ভিন্ন কথা ছিল। বাবা স্কুল মাস্টার। চার পাঁচটা ছেলেমেয়ে, তাই আমি ভাবলাম—তোমার যদি আপত্তি থাকে। তাহলে নাহয় বাদ দাও। তবে আমার কি মনে হয় জান জহির, দুঃখ পাওয়া মেয়ে তো, এ ভালো হবে।জহির চুপ করে রইল।তুমি কি মেয়ে দেখতে চাও না? চাই।
দ্যাটস গুড। মেয়ে পছন্দ হলে বিয়ে করে ফেলা সমস্যায় পড়া একটা পরিবারকে সাহায্য করা হবে। এর ফল শুভ না হয়েই যায় না। তাছাড়া তোমার মন ভালো। এই মেয়ের জন্য একটা ভালো মনের ছেলে দরকার।পল্লবীতে বাড়িটার সামনে তারা যখন রিকশা থেকে নামল তখন দুজনই চুপসে গেছে। পনের টাকায় ঠিক করে আনা রিকশাওয়ালা চাচ্ছে পচিশ টাকা। ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে চারদিকে ঘন অন্ধকার।টর্চ লাইট জ্বালিয়ে এক ভদ্রলোক ছাতা হাতে এগিয়ে এলেন। বিনীত গলায় বলতে লাগলেন, বড় কষ্ট হল। আপনাদের বড় কষ্ট হল। গত পাঁচ বছরে এমন বৃষ্টি হয় নাই। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে ভাইসাব।বসার ঘরটা ছোট।
এই ছোট একচিলতে ঘরের ভেতর একটা সোফা সেট ছাড়াও একটা খাট। খাটের মাথার দিকে পড়ার টেবিল। পড়ার টেবিলের কোণ ঘেঁষে একটা বুক শেলফ। বুক শেলফের বই দেখে মনে হয় এ বাড়িতে রহস্য-রোমাঞ্চ প্রেমিক কোনো পাঠক আছে। জহির বসেছে কোনার দিকে বেতের চেয়ারে। বুক শেলফের বইয়ের নাম পড়তে চেষ্টা করছেনরপিশাচ, ভয়ংকর রাত, তিন গোয়েন্দার অভিযান, একটি রক্তপিপাসু প্রেতের কাহিনী।
টেবিলের ওপর একটা হারিকেন জ্বলছে। হারিকেন থেকে যত না আলো আসছে। তারচে বেশি আসছে ধোঁয়া। বয়স্ক একজন লোক বিরক্ত গলায় বললেন, হারিকেনটা ঠিক করে দাও না কেন? তের চৌদ্দ বছরের একটি বালিকা হারিকেন ঠিক করতে এসে হারিকেন নিভিয়ে ফেলল। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার। ভদ্রলোক বিরক্ত গলায় বললেন, এরা যদি একটা কাজও ঠিকমতো পারে। যাও এই জঞ্জাল নিয়ে যাও এখান থেকে। মোমবাতি আন।
মোমবাতি আনতে দেরি হল। সেই মেয়েটিই মোমবাতি নিয়ে এসেছে। মোমবাতি টেবিলে বসাতে-বসাতে বলল, বাবা ওনাদের খাবার দেওয়া হয়েছে।বরকত সাহেব বললেন, এখনই খাবার কি? কথাবার্তা বলি।বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, খাবার বোধহয় বেড়ে ফেলেছে। এরা কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। বললাম ঘন্টাখানিক পরে খাবার দিতে অন্ধকারের মধ্যেই দিয়ে বসে আছে। আসুন চারটা খেয়ে নেই। আসুন, ভেতরে আসুন। আরে গাধাগুলো কি বারান্দায় আলো দেবে না?
তিনজন খেতে বসলেন। জহির, তার মামা এবং বুড়ো এক ভদ্রলোক, যার নাম দিদার হোসেন। ইনিই মেয়ের বড় খালু। খাবার টেবিলের কোনা ঘেঁষে মাথা নিচু করে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে একপলক দেখে জহির হতভম্ব। এই কি সেই মেয়ে। মানুষ এত সুন্দর হয়! এত স্নিগ্ধ চেহারা কারোর হয়? দ্বিতীয়বার তাকাবার সাহস তার হল না। যদি দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখে আগের দেখায় ভ্রান্তি ছিল।দিদার হোসেন বিরক্ত গলায় বললেন, কাঠের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন মা। মেহমানদের স্লামালিকুম দাও।মেয়েটি ক্ষীণ স্বরে বলল, স্লামালিকুম।দিদার হোসেন বললেন, এর নাম আসমানী। তুমি খাদিমদারি করে তো মা।লোকজন খাওয়ানোয় মেয়েটি মনে হয় খুবই আনাড়ি। জহির প্লেটে হাত ধুয়েছে, সেই পানি না সরিয়েই আসমানী সেখানে এক হাতা পোলাও দিয়ে লজ্জায় বেগুনি হয়ে গেল।
দিদার হোসেন রাগী গলায় বললেন, এরা কোন একটা কাজ যদি ঠিকমত পারে। এই ছেলে কি পানিভাত খাবে? জহির আরেক পলক তাকাল মেয়েটির দিকে। বেচারির চোখে পানি এসে যাচ্ছে। জহিরের মনটা মায়ায় ভরে গেল। মেয়েটা জহিরের প্লেটটা সরিয়ে নিতে গেল। ধাক্কা লেগে একটা পানির গ্লাস উল্টে গেল।দিদার হোসেন তিক্ত মুখে বললেন, এ বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ গাধা। আসমানী তুই যা তো এখান থেকে।মেয়েটি পালিয়ে বাঁচল। জহির বুঝতে পারছে রান্নাঘরে ঢুকে এই মেয়েটা হাউমাউ করে কাঁদবে। আহা বেচারি! দিদার হোসেনের মেজাজ আরো খারাপ হল। কিছুক্ষণ পরপর ছোটখাট বিষয় নিয়ে তিনি হৈচৈ করতে লাগলেন, আচ্ছা লেবু কে কেটেছে। একটা লেবুও কি এরা ঠিকমত কাটতে জানে না? এইসব কী? এটা কি মানুষের বাড়ি না আস্তাবল?
রাত দশটায় ফেরার ঠিক আগে আগে বরকত সাহেব বললেন, মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। আমরা একটা আংটি নিয়ে এসেছি। আপনারা যদি অনুমতি দেন তাহলে আংটিটা আসমানী মার হাতে পরিয়ে দিতে পারি।দিদার হোসেন আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁর চোখে অশ্রু চিকচিক করতে লাগল। যারা খুব সহজে রাগতে পারেন তারা খুব সহজে আনন্দিত হতে পারেন। দিদার হোসন গাঢ় স্বরে বললেন, এই মেয়েটাকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। সে যে কত ভালো মেয়ে আপনারা যত দিন যাবে তত বুঝবেন। মেয়েটা দুঃখী। দুঃখী মেয়েটাকে আপনি সুখ দিলেন। আল্লাহ আপনার আলো করবে।আংটি নেবার জন্যে মেয়েটা বসার ঘরে এল। জহিরের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আরেকবার মেয়েটির দিকে তাকাতে। বড় লজ্জা লাগছে। কেউ না দেখে মত সে কি একবার তাকাবে?
জহির তাকাল। আশ্চর্য, মেয়েটিও তাকিয়ে আছে। কী গভীর মায়া, কী গভীর ভালবাসা মেয়েটির চোখে। চোখ দুটি ফোলা-ফোলা।আহা বেচারি বোধহয় কাঁদছিল।করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কিসের কার্ড জহির? জহির কোনো শব্দ করল না। মাথা নিচু করে ফেলল। নিজের বিয়ের কার্ডের কথা মুখ ফুটে বলা যায় না, লজ্জা লাগে। করিম সাহেব খাম খুলতে খুলতে বললেন, বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গেল? জ্বি স্যার।ঐ মেয়ে? মালিবাগ না কোথায় যেন থাকে বলছিলে?
যাত্রাবাড়িতে থাকে স্যার।ও আচ্ছা যাত্ৰাবাড়ি। ভেরি গুড। খুবই খুশির সংবাদ।মেয়ে স্যার ইন্টারমিডিয়েট পাস। হায়ার সেকেন্ড ডিভিশান পেয়েছে। পাঁচশ বিরাশি, ফোর্থ পেপার থাকলে ফার্স্ট ডিভিশান পেয়ে যেত। সায়েন্স গ্রুপ স্যার।ভালো, খুবই ভালো। বিয়ে কবে? সামনের মাসের বার তারিখ। এই মাসেই হত—এই মাসটা আসমানীর জন্ম মাস।মেয়ের নাম বুঝি আসমানী? জ্বি। ডাকনাম বুড়ি। আদর করে ছোটবেলায় ডাকতে-ডাকতে বুড়ি নাম হয়ে গেল।
Read more
