তাহলে মুখ এমন গোমড়া করে রাখবেন না। আজহারের প্রেমে পড়েছিলাম কেন জানেন? ঐ লোকটা মুখ গোমড়া করতে পারত না। ভয়ঙ্কর কঠিন সময়েও হেসে ফেলত। আর এমন সুন্দর করে হাসতো যে তার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতাম। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করত—ফিরি ফিরি নিতি তব চরণে আসিব।জহির অবাক হয়ে লক্ষ করল, অরুর চোখে পানি এসে গেছে, সে চোখ মুছছে।অরু বলল, এতো অল্প সময়ে বেশি কিছু রাঁধতে পারি না। একটা পচা বেগুন ছিল ভর্তা করে ফেলেছি।
পচা বেগুনের ভর্তা খুবই ভালো জিনিস। ডাল রান্না হয়েছে। আমার ধারণা ডালের মধ্যে তেলাপোকা ডিম পেড়েছিল। কেমন তেলাপোকা-তেলাপোকা গন্ধ। আপনার স্ত্রী আসমানী এসে সব ঠিক করবে।জহির বলল, এতোদিন কোথায় ছিলে? মাই গড, একেবারে জীবনানন্দ দাশ-এতোদিন কোথায় ছিলেন? হাসপাতালে ছিলাম। এম, আর, করিয়েছি। এম. আর. কি জানেন?না।পেটে যদি আনওয়ান্টেড কোনো শিশু চলে আসে, তাহলে বর্তমান আধুনিক ডাক্তারী শাস্ত্ৰ মাকে কোনো রকম কষ্ট না দিয়ে শিশুটিকে মেরে ফেলতে পারে।
শিশুটি হয়ত কষ্ট পায়, কিন্তু সে তার কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারে না বলে আমরা তা জানি না। জহির ভাই, আপনি এমন ঘৃণা-ঘৃণা চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন কেন? আপনার কি মনে হচ্ছে আমি একজন খুনী? না।আমি জানি হচ্ছে। আপনার চোখ দেখে বুঝতে পারছি। আপনার কোনো দোষ নেই। আমারও নিজেকে খুনী মনে হয়। সারাক্ষণ মনে হয় ঐ শিশুটা দূরে থেকে আমাকে দেখছে। আমার কি ধারণা জানেন? আমার ধারণা ঐ শিশুটা একটা মেয়ে। আমি ওর নাম দিয়েছি রাত্রি, যদিও তার এখন আর নামের কোন দরকার নেই। রাত্রি নামটা কি সুন্দর না জহির ভাই?
হ্যাঁ সুন্দর। খুব সুন্দর।আপনার যদি কোনোদিন মেয়ে হয়, আপনি এর নাম রাখবেন রাত্রি।আচ্ছা রাখব।প্রমিজ করুন।করছি।
না, এভাবে করলে হবে না, আমার হাত ধরে করুন।জহির অরুর হাত ধরল, নরম গলায় বলল, যে কাজটা করে তুমি এত কষ্ট পেলে সে কাজটা কেন করলে?রাগ করে করলাম জহির ভাই। প্ৰচণ্ড রাগ হল। সবার ওপর রাগ। ঐ বুদ্ধিমান অথচ হৃদয়হীন মানুষটির ওপর রাগ। কেন জানি আপনার ওপরও রাগ হয়েছিল।আমি তো তোমার রাগের যোগ্য নই, অরু। আমি অতি নগণ্য একজন, অতি তুচ্ছ।
হ্যাঁ, তুচ্ছ, তুচ্ছ তো বটেই।অরু ভাতের থালা সরিয়ে উঠে পড়ল।জহির বলল, কি হয়েছে?অরু বলল, বুঝতে পারছি না, সম্ভবত বমি আসছে।
সে ছুটে গেল বাথরুমে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে ফিরে এল। হালকা গলায় বলল, জহির ভাই আমাকে বাসায় পৌঁছে দিন।কোন বাসায়? আমার স্বামীর বাসায়, আবার কোথায়! অবশ্য আপনি যদি এখানে থেকে যেতে বলেন, তাহলে ভিন্ন কথা। বলবেন? সাহস আছে?রিকশায় যেতে-যেতে অরু বলল, আমার বায়োলজি খাতাটা আপনার বাসায় দেখলাম। খাতায় লেখা কথাগুলি কি আপনি বিশ্বাস করেছেন?
হ্যাঁ।আপনি আসলেই বোকা। সব মিথ্যা। আজহারকে কষ্ট দেয়ার জন্যে লিখেছিলাম।জহির নিচু গলায় বলল, সব মিথ্যা? হ্যাঁ, সব। বাচ্চা নষ্ট করার যে গল্পটি করলাম, তাও মিথ্যা। জহির ভাই, আমি চমৎকার একজন অভিনেত্রী। এতো চমৎকার যে, আমার কোনটা অভিনয় আর কোনটা অভিনয় নয়—তা আমি নিজেও জানি না।তোমার বাচ্চা তাহলে নষ্ট হয় নি? না। জহির ভাই আপনি দয়া করে আরেকটু সরে আসুন। আমি অচ্ছুৎ কেউ না। আমার গায়ে গা লাগলে পাপ যদি হয় আমার হবে, আপনার হবে না।জহির বলল, তোমাকে দেখে আজহার সাহেব খুব খুশি হবেন।হা হবেন। আচ্ছা জহির ভাই, একটা মজার কথা বলি?
বল।মাঝে-মাঝে আপনার বোকামিতে আমার গা জ্বলে যায়, আবার আপনার এই বোকামিটাকেই আমি ভালবাসি। সেই সঙ্গে আপনাকেও।অরু চুপ কর তো।অরু হাসতে-হাসতে বলল, আরে বাবা, অভিনয় করছি। আপনি কি ভাবছেন এগুলো সত্যি কথা? কোনো সুস্থ মাথার মেয়ে কি রিকশায় বসে প্রেমের সংলাপ বলতে পারে? আপনি নিজেকে যতটা বোকা ভাবেন আসলে আপনি তার চেয়েও বোকা।জহির চুপ করে রইল।অরু গুনগুন করছে…..জনম জনম কাঁদিব…..। এটা বোধহয় তার খুব প্রিয় গান।
একটা সূক্ষ্ম কোন পরিবর্তন ঘটে গেছে।কেউ কিছু বলছে না কিন্তু বোঝা যাচ্ছে। সব বলতে হয় না। না বললেও অনেক কিছু বোঝা যায়। তা ছাড়া আসমানী বোকা মেয়ে নয়। সে বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে এবং তাকে নিয়েই হয়েছে। সেই কিছুটা কি? তাকে কেউ বলছে না। কখনো বলে না। সে কি নিজেই কাউকে জিজ্ঞেস করবে? এতটা নির্লজ্জ কি সে হবে? জহির নামের যে ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে আছে, আজ থেকে মাত্র চারদিন পর যে বিয়ের অনুষ্ঠানটি হবে তাতে কি কোন সমস্যা?
ওরা কি হঠাৎ ঠিক করল এরকম বিয়ে হওয়া মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়া যায় না? তারা কি অন্য একটি মেয়ের খোঁজ পেয়েছে যার আগে বিয়ে হয় নি? বিয়ে মানে কি ছিঁড়ে নেয়া ফুল? যে ফুল আর ব্যবহার করা যাবে না।আসমানী রান্নাঘরে ঢুকল। তার মামী কড়াইয়ে কী যেন নাড়ছেন। সে কি কিছু জিজ্ঞেস করবে মামীকে? মামী একা থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত। তিনি একানো। তিনচারজন মানুষ রান্নাঘরে। এদের মধ্যে অপরিচিত সুন্দরমতো একটি মেয়েও আছে। এর সামনে কিছু জিজ্ঞেস করার অর্থই হয় না।আসমানীকে ঢুকতে দেখেই মামী বললেন, কিছু বলবি না-কি রে আসমানী?
আসমানী বলল, না।যাচ্ছিস কোথায়?কোথাও না।
আসমানী লক্ষ করল রান্নঘরে উপস্থিত সবাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সমস্যাটা কি? তাকে বলে ফেললে কি হয়? তার মন এখন শক্ত হয়েছে। সে এখন আগের মতো না। অল্পতেই ভেঙ্গে পড়ে না, পড়বেও না।রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসমানী ভেতরের বারান্দায় খানিকক্ষণ ইতস্তত হাঁটল। ভেতরের বারান্দায়ও বেশ কিছু মানুষ। বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনরা আসতে শুরু করেছেন।ওরা সবাই এমন করে তাকাচ্ছেন কেন? সুতিয়াখালির বড় ফুপুও দেখি এসেছেন। ইনাকে আসমানীর মোটেই পছন্দ না। সুতিয়াখালির ফুপু ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে ভয়ঙ্কর সব ঝগড়া করেন। ঝগড়ার পর কঠিন অভিশাপ দেন। লোকে বলে, তাঁর অভিশাপ নাকি সঙ্গে-সঙ্গে লেগে যায়।
বড় ফুপু বললেন, আসমানী যাস কই?একটু বাইরে যাচ্ছি বড় ফুপু।তোর সাথে কথা আছে।
মামী রান্নাঘর থেকে এই কথা শুনতে পেয়ে ছুটে এসে বললেন, না না কোনো কথা নেই। আসমানী যেখানে যাচ্ছে যাক।আসলে আসমানীর কোথাও যাবার জায়গা নেই। ঘর থেকে শুধু বের হওয়া। বের হয়েইবা সে কোথায় যাবে? সে শুনেছে পুরুষদের একা-একা ঘুরতে ভালো লাগে। মেয়েদের লাগে না-অন্তত তার লাগে না। তার সব সময় ইচ্ছা করে পাশে কাউকে না কাউকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটার সময় ছোটখাট দুএকটা কথা হবে, গল্প হবে, হাসাহাসি হবে। তবেই না হেঁটে আনন্দ।আসমানী একটা রিকশা নিল।
রিকশাওয়ালাটা বেশ মজার। কোথায় যাবে কিছু জিজ্ঞেস করে নি। উঠে বসার সঙ্গে-সঙ্গে চালাতে শুরু করেছে। যেন সে আসমানীর গন্তব্য জানে। আসমানীও কিছু বলল না। যাক না যেখানে যেতে চায়।আচ্ছা, ঐ লোকটির বাসায় হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হলে কেমন হয়? খুব কি অন্যায় হয়? না কোনো অন্যায় হয় না। থাক, বাসা ভর্তি লোকজন থাকলে সে লজ্জা পাবে। আসমানী আবার ভাবল, লোকজন বোধহয় থাকবে না। ঐ লোকটি বড়ই একা।
জহির দরজা খুলে তাকিয়ে রইল।আসমানী লাজুক গলায় বলল, আসব?আসমানীর পরনে হালকা সবুজ রঙের একটা শাড়ি। চুলগুলি বেণী করে বাঁধার কারণে তাকে বালিকা-বালিকা দেখাচ্ছে।জহির বলল, এস।কি করছিলেন?রান্না করছিলাম।
আপনি কি নিজেই রান্না করেন? মাঝে-মাঝে করি। তবে বেশিরভাগ সময় বাইরেই খাই। ঘরে একটা কাজের লোক আছে, ও আবার রান্না জানে না।বসব? বস বস। কেন বসবে না? আপনাকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে খুব কষ্টে আছেন। আপনার কী হয়েছে? কিছু হয় নি।মনে হচ্ছে আপনার খুব শরীর খারাপ।না আমার শরীর খারাপ না।ইস ঘরটা আপনি এত বিশ্রী করে রেখেছেন। এত ক্যালেন্ডার কেন আপনার ঘরে? পুরানো ক্যালেন্ডারও দেখি আছে। ফেলতে মায়া লাগে, তাই না?
হ্যাঁ।আমারও মায়া লাগে। আমিও সব পুরানো জিনিস জমা করে রাখি। আপনি আজ কী রান্না করছেন? তেমন কিছু না। ভাত আর ডিম।আসমানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনার সম্পর্কে আমি একটা খুব অদ্ভুত কথা শুনেছি, আপনি নাকি সাত বছর বয়স থেকে মিথ্যা কথা বলেন না।কার কাছ থেকে শুনেছ? যার কাছ থেকেই শুনি না কেন, সত্যি না মিথ্যা সেটা বলুন।ঠিকই শুনেছ। আমার এক বাংলার স্যার বলেছিলেন কেউ যদি চল্লিশ বছর মিথ্যা কথা না বলে থাকতে পারে, তাহলে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়। তখন আমার বয়স ছিল কম। কম বয়সী বাচ্চারা তো পৃথিবীর সব কথাই বিশ্বাস করে। আমিও করেছিলাম। আমি তখন থেকেই মিথ্যা বলি না।আসমানী বলল, মিথ্যা না বললে যে অদ্ভুত ব্যাপারটা হয়, সেটা কি?
অদ্ভূত ব্যাপারটা হচ্ছে তখন আল্লাহ ঐ লোকের একটি প্রশ্নের জবাব দেন। প্রশ্নটি যত কঠিনই হোক, জবাব পাওয়া যায়।আসমানী লজ্জিত গলায় বলল, ঐ দিন আমি আপনাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছিলাম। এটা ভেবে আমার এখন খুব খারাপ লাগছে। আপনি কিছুমনে করবেন না। আমি বাকি জীবনে কখনো আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলব না। ঐ লোকটির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আমি সারাদিন উনার সঙ্গে ছিলাম।
জহির শান্ত গলায় বলল, আমি জানি।আপনি জানেন?হ্যাঁ, জানি। কেউ মিথ্যা বললে আমি ধরে ফেলতে পারি।সত্যি।
হ্যাঁ সত্যি। সারাজীবন পরের বাড়িতে মানুষ হয়েছি। আমাকে সারাক্ষণ খেয়াল রাখতে হয়েছে কে আমার সম্পর্কে কি ভাবছে, কে আমাকে কীভাবে দেখছে। এইসব দেখতে দেখতে একসময় টের পেলাম আমিও অনেক কিছু বুঝতে পারি। কেউ যখন সত্যি করে বলে ভালবাসি, সেটা যেমন বুঝি, আবার কেউ যখন মিথ্যা করে বলে ভালবাসি, সেটাও বুঝি। শুধু একজনেরটাই পারি না।
সেই একজনটা কে? জহির চুপ করে রইল।আসমানী বললআপনার মামাতো বোন অরু, তাই না?হ্যাঁ।দেখলেন তো আমিও অনেক কিছু বুঝতে পারি।তাই তো দেখছি।আচ্ছা উনি কি বয়সে আমার বড়?না মনে হয়।উনি কি খুব কথা বলেন।না। ও সবচেয়ে কম কথা বলত। এখন খুব কথা বলে। সারাক্ষণ কথা বলে। কেন বলে জানেন? না।
আমি জানি। উনি উনার স্বামীর কাছ থেকে বেশি কথা বলা শিখেছেন। নিশ্চয়ই উনার স্বামী খুব কথা বলেন। বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর মতো হয়ে যায়।জহির হো-হো করে হেসে ফেলল।আসমানী বলল, দেখলেন আমার কত বুদ্ধি? এখন আপনি দয়া করে একটু সরুন, আমি আমার নিজের জন্য এক কাপ চা বানাব।মেয়েটা হাসছে। এত ভালো লাগছে দেখতে। জহির লক্ষ করল তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। তার বড়ই লজ্জা লাগছে। সে খুব চেষ্টা করতে লাগল চোখের পানি শুকিয়ে ফেলতে।আসমানী বলল, জানেন আপনার এখানে আমি খুব ভয়ে-ভয়ে এসেছি।কেন বল তো?
আজ বাসায় কি জানি হয়েছে। মনে হয় বিরাট কোনো ঝামেলা। আমার বিয়েটা সম্ভবত ভেঙ্গে গেছে।জহির বিস্মিত হয়ে বলল, কি বলছ এসব! সত্যি বলছি। আমি আগে-আগেই অনেক কিছু বুঝতে পারি।আশ্চর্যের ব্যাপার, বিয়েটা ভেঙ্গে গেল।বিয়ের ঠিক তিন দিন আগে ফর্সা লম্বা লাল টাই পরা একটা ছেলে প্রচণ্ড শব্দে আসমানীদের ঘরের কড়া নাড়তে লাগল। যেন সে অসম্ভব ব্যস্ত। যেন তার হাতে এক সেকেন্ড সময় নেই।দরজা খুলল আসমানী।লাল টাই পরা মানুষটি হাসিমুখে বলল, আসমান বল তো আমি কে?আসমানী তাকিয়ে আছে। তার চোখ মাছের চোখের মতো হয়ে গেছে। সেই চোখে কোনো পলক নই। আমাকে চিনতে পারছ, না পারছ না?
পারছি।
আমি ভেতরে আসব, না আসব না?
আসুন।
দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে আসব কি করে?
আসমানী দরজা ছেড়ে দিল।
মানুষটি হাসতে-হাসতে বলল, আমি যে আসব তা তো সবাইকে টেলিগ্রাম করে জানিয়েছিকেউ তোমাকে কিছু বলে নি? না।খুবই আশ্চর্যের কথা। অবশ্যি না বলে একদিকে ভালোই করেছে। আমি নিজেই বলব। কিন্তু এখন আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না।পারছি। পারব না কেন? আমি জানি আমার ওপর তোমার প্রচণ্ড রাগ। আমার একটা গল্প আছে, গল্পটা শুনলে রাগ থাকবে না।আসমানী শান্ত গলায় বলল, আমার কিছুই শুনতে ইচ্ছে করছে না।ইচ্ছে না করলেও শুনতে হবে। এবং এখানে দাঁড়িয়ে এই গল্প আমি বলব না। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি, Lets go.
আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।যেতে ইচ্ছে না করলেও তুমি যাবে। If I call you, you have to be there. লোকটি অতি সহজ, অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আসমানীর হাত ধরল।গাড়ি চলছে ঝড়ের গতিতে। আসমানীর ইচ্ছে করছে বলে, আস্তে চালান; এ্যাকসিডেন্ট হবে। আবার বলতেও ইচ্ছে করছে না।আসমানী? জ্বি।গল্পটা শুরু করি—আমাদের হেলথ ইনসিওরেন্সের জন্য একটা মেডিক্যাল চেকআপ হয়। সেই চেক-আপে আমার একটা ম্যালিগন্যান্ট গ্রোথ ধরা পড়ল। ডাক্তাররা আমার আয়ু বেঁধে দিলেন তিন বছর। এইসব খবর তোমাকে দিলাম না। শুধু বিয়েটা ভেঙ্গে দিলাম। আসমানী? জ্বি। তুমি মিরাক্যলে বিশ্বাস কর? মিরাকল অর্থাৎ-বাংলা শব্দটা মনে পড়ছে …. অবিশ্বাস্য ধরনের কিছু বলতে পার।বিশ্বাস করি।আমি করতাম না। এখন করি।
কারণ পৃথিবীর যে অল্পকিছু লোক ক্যান্সার জয় করেছে আমি তাদের একজন। আজ আমার শরীরে কোনো ক্যান্সার নেই। আজ আমি একজন সুস্থ মানুষ।বলতে-বলতে লোকটি বাঁ হাত আসমানীর কোলের ওপর রেখে আসমানীর দিকে তাকিয়ে হাসল। আসমানী বলল, আপনি দয়া করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালান। আপনি তো এ্যাকসিডেন্ট করবেন।আসমানী? জ্বি।আমি জহির সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তাঁর কাছে নতজানু হয়ে তোমাকে প্রার্থনা করেছি। মানুষটির হৃদয় দেখে আমি মুগ্ধ। তিনি কী বলেছেন শুনতে চাও? ধরা গলায় আসমানী বলল, না, উনি কি বলবেন আমি জানি।
রাত প্ৰায় দশটা।
জহির রান্না বসিয়েছে।
তেলটা খারাপ। প্রচুর ধোঁয়া হচ্ছে। জহিরকে বার-বার চোখ মুছতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে বুঝি খুব কাঁদছে। আসলেই তাই। ধোঁয়া ছাড়াই জহিরের চোখ বারবার ভিজে উঠছে।অরুর শরীরটা খুব খারাপ। আজ তৃতীয় দিন। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিল। ক্রমাগত ব্লিডিং হচ্ছে। ছব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছে। আরও দিতে হবে। আজ সন্ধ্যায়, ডাক্তাররা বলেছেন অবস্থা ভালো না।জহির সারাদিন পাশে বসে ছিল। একসময় অরু বলল, এত মন খারাপ করে আমার পাশে বসে থাকবেন না। আমার পাশে বসতে হলে হাসিমুখে বসতে হবে।জহির বলল, আমি তোমার মতো কথায়-কথায় হাসতে পারি না।ইচ্ছা করেন না তাই পারেন না। ইচ্ছা করলেই পারবেন।
জহির বলল, সত্যি করে বল তো তোমার কি খারাপ লাগছে না? অরু ক্লান্ত গলায় বলল, নিজের জন্য লাগছে না, বাচ্চাটার জন্য লাগছে। এত সুন্দর পৃথিবীর কিছুই সে দেখবে না? না দেখেই মরে যাবে? চুপ করে শুয়ে থাক অরু। বেশি কথা বলা বারণ।জহির ভাই, আসমানী কি তার স্বামীর সঙ্গে চলে যাবার আগে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল? হ্যাঁ।কিছু বলেছিল? না। অরু বলল, আপনি খুব ভাগ্যবান মানুষ জহির ভাই।কেন বল তো? এই মেয়েটি জনম জনম আপনার জন্য কাঁদবে। এত বড় সৌভাগ্য কজন পুরুষের হয় বলুন?
বড্ড ধোঁয়া হচ্ছে। জহির রান্নাঘর থেকে বারান্দায় চলে এল। অবাক হয়ে দেখল বারান্দার রেলিং ধরে আজহার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। আকাশের দিকে।জহিরকে দেখেই বললেন, অরুর খুব শখ ছিল তার মেয়ের নাম রাখবে রাত্রি কেন জানেন? কারণ রাত্রি কখনো সূর্যকে পায় না। অবশ্য তাতে তার কোনো ক্ষতি নেই, কেননা তার আছে অনন্ত নক্ষত্ৰবীথি।আজহার সাহেব চাদরে চোখ মুছতে-মুছতে বললেন, ভাই আপনাকে একটা খারাপ খবর দিতে এসেছি। আপনি মনটাকে শক্ত করুন।
( সমাপ্ত )
Read more
দ্বৈরথ পর্ব:১ হুমায়ূন আহমেদ
