দ্বৈরথ পর্ব:৬
ঢাকা শহরে কামালের চেনা লোকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এটা তার জন্যে খুবই খারাপ। বছর চারেকের জন্যে এই শহর ছেড়ে অন্য কোথায়ও চলে যাওয়া দরকার। মুশকিল হচ্ছে যেতে ইচ্ছা করছে না। আলস্য এসে গেছে। বেশিরভাগ সময় এখন সে ঘরেই থাকে। খবরের কাগজ পড়ে। ঘুমায়। কিছু জমা টাকা আছে, এইগুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে এইভাবেই থাকবে। ঝামেলায় যেতে ইচ্ছা করে না। রোজ সন্ধ্যাবেলা সোমার জন্যে তার কেন জানি খুব খারাপ লাগে। মনে হয়, মেয়েটা বড় ভালো ছিল। আমার সঙ্গে থেকে খুব কষ্ট করে গেল।
সোমার কেমন যেন শীত শীত লাগছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। ফ্যানের শো-শোঁ শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বিজু ফ্যানটা ভালো কেনে নি। এত শব্দ হবার তো কথা না।সোমা উঠে বসল।পাশের খাটে ঊর্মি। কেমন এলোমেলল ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। ঊর্মির জীবনটা কেমন হবে কে জানে! এই ব্যাপারটা আগেভাগে জানা থাকলে ভালো হত। নিজেকে প্রস্তুত করে রাখা যেত। পৃথিবী বড় রহস্যময় জায়গা। সব রহস্যে ঢাকা। আগে থেকে কিছুই জানা যায় না।স্যান্ডেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সোমা খালি পায়েই দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি পড়ছে ঠিকই। বিজু শুয়েছে বারান্দায়। বৃষ্টির ছাট লাগছে গায়ে। তবু ঘুম ভাঙছে না। সে এসে বিজুকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। নিজের ঘর ছেড়ে বেচারাকে ঘুমুতে হচ্ছে বারান্দায়।
সোমা ডাকল, এই বিজু।
বিজু সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল, কি আপা?
জেগেছিলি নাকি?
হুঁ।
বৃষ্টিতে ভিজছিস তো, ভেতরে গিয়ে ঘুমো। আমি ঊর্মির সঙ্গে শোব।
দু এক ফোঁটা পানিতে আমার কিছু হয় না আপা।
বলতে বলতে বিজু মশারির ভেতর থেকে বের হয়ে এল। হাত বাড়িয়ে বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই বের করল। সোমা তাকিয়ে আছে। কত ছোট দেখেছে তাকে। ঘরময় হামাগুড়ি দিত। একটু পর পর বলত হাঁউ। এই ছেলে বয়স্ক লোকের ভঙ্গিতে মুহুর্তে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। কায়দা করে ধোঁয়া ছাড়ে।
আপা।কি।এ বাড়িতে রাতে তোমার ভালো ঘুম হচ্ছে না—তাই না? হবে না কেন, হয়।একটু পর-পর বিছানা থেকে ওঠে। পানি খাও। বারান্দায় হাঁটাহাঁটি কর। আবার গিয়ে শোও।তুই এতসব দেখিস কখন? জেগে থাকিস? হুঁ।তোরও ঘুম হয় না? হয়। তবে কম হয়। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে নানান চিন্তা করি।কি চিন্তা-ভাবনা? দ্রুত কীভাবে বড়লোক হওয়া যায়।এখনি মাথায় এই চিন্তা? হুঁ। এখনি। এবং দেখবে আমি হয়ে ছাড়ব। পুতু-পুতু লাইফ অসহ্য। বি এ পাশ করে পড়াশোনা স্টপ করে দেব। তারপর..তারপর কি?
এখন বলব না। আছে অনেক পরিকল্পনা। প্রথম পরিকল্পনা হচ্ছে—বড় চাচার উচ্ছেদ। কীরকম কায়দা করে এটা করি সেটাই শুধু দেখো।ছিঃ বিজু ছিঃ।বিজু কোনো উত্তর করল না। নিজের মনে হাসল। সোমা বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসল। বৃষ্টি দেখতে তার ভালো লাগছে।চা খাবে নাকি আপা? ফ্লাস্কে চা আছে। খেতে পার। দেব? দে।বিজু উঠে চা ঢালল। আপার জন্যে এবং তার নিজের জন্যে।আপা।বল।ঐখানে তুমি অনেক কষ্ট করেছ। আর তোমাকে কষ্ট করতে দেব না। তোমার ঝামেলাটা যখন হয় তখন আমি ছোট ছিলাম। আমার বয়স একটু বেশি হলে ঘটনা অন্যরকম হত।তুই বিরাট দায়িত্ববান হয়েছিস মনে হয়।
হ্যাঁ হয়েছি। তোমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক দায়িত্ববান কিন্তু হয়েছি। বিজু চুপ করে গেল। সে বৃষ্টি দেখছে। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। একটা ব্যাঙ লাফিয়ে বারান্দায় উঠেছে। এখন ঢুকতে চাচ্ছে। বিজু তা দেখেও চুপ করে আছে। সোমা মৃদু গলায় বলল, বিজু।
বল।
ঐ প্রফেসর সাহেব কি এখন আছেন? মানে ঐ যে……
জানি কার কথা বলছ। হ্যাঁ আছেন।
ঐ বাড়িতেই?
হুঁ।
কেমন আছেন—তুই কিছু জানিস? ভালেই আছেন। খারাপ থাকবেন কেন। তবে বেচারার বৌ মারা গেছে।কবে? তা প্রায় দুই বছর। মারা যাবার আগে ভদ্রমহিলার পুরোপুরি মাথা খারাপ হয়ে গেল। গলায় মাইক লাগিয়ে রাতদিন চেঁচাত। কানে আঙুল দিতে হয় এমন সব গালাগালি। বিশ্রী অবস্থা।সোমার খুব ইচ্ছে করছে জিজ্ঞেস করতে-ভদ্রলোক কি আবার বিয়ে করেছেন।জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগছে। বিজু কি মনে করবে কে জানে।ভদ্রলোক কি আবার বিয়ে করেছেন?
বিজু কঠিন স্বরে বলল, না।ব্যাঙটা এখনো লাফালাফি করছে। বিজু তার চায়ের কাপের গরম চা ব্যাঙটার উপর ঢেলে দিল।দোতলা বাড়িটা আগের মতোই আছে।নারিকেল গাছ দুটি বড় হয়েছে। আগে যেখানে ফুলের বাগান ছিল সেখানে টিনের ছাদ দেওয়া গ্যারাজ। বাড়ির পাঁচিল ভেঙে আরো উঁচু করা হয়েছে। এছাড়া সব আগের মতো।
সোমা গেট দিয়ে ঢুকে একটু ইতস্তত করতে লাগল। সরাসরি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যাওয়া কি ঠিক হবে? শোভন হবে? একতলায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না। দেখা গেলে জিজ্ঞেস করা যেত প্রফেসর সাহেব কি আছেন? একতলার বাসিন্দাদের জানার কথা না প্রফেসরআছেন কি নেই, তবু জিজ্ঞেস করা।সোমা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। এক বার শুধু মনে হল, কেন সে যাচ্ছে? মনের ভেতরের সেই প্রশ্ন তাকে কাবু করেই ফেলত যদি না দোতলার সিঁড়ি দিয়ে কাজের মেয়েটি না নামত। খালি বালতি হাতে সে নামছে। সোমাকে দেখে বলল, কারে চান। আফা?প্রফেসর সাহেব কি আছেন?
জ্বি আছেন। একটু আগে দেখছি।কাজের মেয়েটি তাকিয়ে আছে। তার চোখের সামনে থেকে নেমে চলে যাওয়া যায় না। সোমা দরজার কলিং বেলে হাত রাখল।দরজা খুলল।সোমা শুকনো গলায় বলল, আপনি আমাকে চিনতে পারছেন? ভদ্রলোক ভারি গলায় বললেন, এস সোমা। এস।সোমার পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে। সে নড়তে পারছে না। ভদ্রলোক চশমার ভেতর দিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বয়স তাঁর মধ্যে তেমন ছাপ ফেলতে পারে নি। শরীর একটু ভারি হয়েছে। কানের কাছের কিছু চুল রুপালি হয়ে গেছে। এতে তাঁকে আরো যেন সুন্দর দেখাচ্ছে।দাঁড়িয়ে আছ কেন সোমা? এস ভেতরে এস।
আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে চিনতে পারবেন না।কেন চিনতে পারব না বল তো? তুমি তো বদলাও নি। আগের মতো আছ। তোমার বয়স বাড়ে নি। এখন খুকির মতোই লাগছে। বস, এখানে বস।আজ যাই। অন্য একদিন আসব।সোমা বসতে-বসতে বলল, বাসায় কেউ নেই? কাজের একটা ছেলে এসেছে। কি যেন আনতে গেছে। এসে পড়বে। ও এলেই তোমাকে চা দেব।আপনার মেয়ে কোথায়?
ওকে মেয়েদের ক্যাডেট কলেজে দিয়েছি। ময়মনসিংহ। জান বোধহয়।হ্যাঁ জানি।একটু বস, আমি সিগারেট নিয়ে আসি। আগে সিগারেট খেতাম না। এখন হয়েছি চেইন মোকার।উনি সিগারেট আনতে অনেক দেরি করলেন। সোমা একা একা বসে রইল। আশ্চর্য! এই বাড়ির বারান্দায় একা একা বসে থাকতে খারাপ লাগছে না।সোমা।জ্বি।তোমার কথা প্রায়ই ভাবতাম। তুমি আমার স্ত্রীর উপর কোন রাগ রেখ না। ওর মাথার ঠিক ছিল না।আমি জানি।দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে এই অবস্থা হল। ঐদিন তোমার জন্যে যে কি খারাপ লেগেছে……
ঐ-সব বাদ দিন।বাদ দিতে পারলে তো ভালোই হত। কিছুই বাদ দেওয়া যায় না। সব থাকে।সোমা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।তিনি বললেন, তোমার খবর আমি সবই রেখেছি। অবশ্যি কখনো কোনোরকম যোগাযোগের চেষ্টা করি নি। ইচ্ছা করেই করি নি। এমনিতেই যথেষ্ট সমস্যা হয়েছে। আমি আর তা বাড়াতে চাই নি।সোমা কথা ঘোরাবার জন্যে বলল, আপনার লাইব্রেরি আগের মতোই আছে?
আছে। বই অনেক বেড়েছে। আগে বই পড়ার সুযোগ হত না। এখন সুযোগ পাই। প্রচুর পড়ি। ঠিক তুমি আগের মতো আসবে। এসে বই নিয়ে যাবে। এস আমার সঙ্গে বই দিয়ে দিই।আজ থাক। আরেক দিন এসে নেব। আজ বই নিতে ইচ্ছে করছে না।ইচ্ছে করছে না কেন? আমার বই পড়ার অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর বই পড়তে ভালো লাগে। না।তিনি সোমার সঙ্গে-সঙ্গে একতলায় নেমে এলেন। সোমা বলল, আপনাকে আসতে হবে না, আপনি কেন কষ্ট করছেন।তিনি হাসিমুখে বললেন, একটু কষ্ট না হয় তোমার জন্য করলাম। তুমি তো আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছ। করনি?
রাস্তায় নেমেই সোমা লক্ষ করল বিজু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সোমার চোখে চোখ পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বিজু চোখ নামিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করল। বিজুর হাতে সিগারেট। সে আধ-খাওয়া সিগারেট দূরে ছুঁড়ে ফেলল। তার মুখ গম্ভীর। থুথু করে সে কয়েক বার থুথু ফেলল।খাটের নিচে মিউ-মিউ শব্দ হচ্ছে। রাতে কামালের ঘুম সচরাচর ভাঙে না। আজ মিউ-মিউ শুনে ঘুম ভাঙল। বিড়াল নিৰ্ঘাত বাচ্চা দিয়ে দিয়েছে। শালি তা হলে খালাস হয়েছে। কামাল খাট থেকে নেমে বাতি জ্বালালউঁচু সুরে ডাকল, মিনু ও মিনু। কেউ সাড়া দিল না। কারণ মিনু বাড়িতে নেই। আজ সন্ধ্যায় তাকে কামাল নিজেই তার খালার বাড়িতে রেখে এসেছে।
ও মিনু।কামাল খাটের নিচে উকি দিল। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। দেয়াশলাই কাঠি জ্বালাতেই বিড়ালের জ্বলজ্বলে চোখ নজরে এল।ঐ বেটি, এবার কটা? বিড়াল বিরক্ত স্বরে মিউ করল। রাতদুপুরে এই জ্বালাতন আর সহ্য হচ্ছে না।কামাল বলল, সর না একটু দেখি। দেখি বাচ্চাগুলোকে।বিড়াল কি মানুষের কথা বুঝতে পারে? সে সত্যি-সত্যি সরে দাঁড়াল। ইদুরের মতো চারটা ক্ষুদে-ক্ষুদে বাচ্চা। চারটাই ধবধবে সাদা। চোখ ফোটে নি।
কামাল ওয়াদ্রবের ওপর থেকে টর্চ লাইট নিয়ে এসে ধরল। কি সুন্দরই না লাগছে। বাচ্চাগুলোকে। এখন চোখ ফোটে নি। এক জন গড়িয়ে অন্য জনের গায়ে পড়ে যাচ্ছে। মা বিড়ালটা তখন বিরক্ত মুখে মিউ করছে।কামাল আবার ডাকল, সোমা ও সোমা। তখন মনে পড়ল সোমা নেই। মনটা একটু খারাপ হল। আনন্দের জিনিস একা-একা ভোগ করা যায় না। কাউকে পাশে লাগে। কামাল পিরিচে দুধ ঢেলে এগিয়ে দিল। দরাজ গলায় বলল, খা বেটি, বেশি করে খা। বিড়ালটা যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় পিরিচের দুধে জিভ ভেজাল। মানুষটা এত করে বলছে না খেলে ভালো দেখায় না এরকম একটা ভাব।
কামাল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাত বেশি বাকি নেই। আবার ঘুমুতে যাবার মানে হয় না। ভরে উঠে মানিকগঞ্জ যেতে হবে। একটা পার্টি পাওয়া গেছে। খোঁজ এনেছে। মোশতাক আলি। মোশতাক আলি লোকটা বদের হাড়ি, অন্য কোনো মতলব আছে কি-না বোঝা যাচ্ছে না। মতলব থাকা বিচিত্র নয়। মানিকগঞ্জে যাওয়াটা ঠিক হবে কি-না কে জানে। কামাল বারান্দায় চেয়ারে এসে বসল। তার সামনেই ফুলের টবে-টবে বগনভিলিয়া। লাল-লাল পাতা ছেড়েছে। রাতে অবশ্যি কেমন কালচে দেখায়, কিন্তু দিনে অপূর্ব লাগে।
টব দুটো সোমাকে পাঠিয়ে দেওয়া দরকার। দুটো কেন, সবগুলোই পাঠিয়ে দিলে হয়। বেচারির শখের জিনিস। একটা ঠেলাগাড়ি ডেকে ঠিকানা দিয়ে দিলেই হয়। ঘর তো এমনিতেই খালি করতে হবে। একা মানুষ, এরকম বাড়ি নিয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। সব বিক্রি-টিক্রি করে একটা হোটেলে গিয়ে উঠলেই হয়। এতে কাজকর্মের সুবিধা। চট করে হোটেল বদল করা যায়। বাড়ি তো আর চট করে বদল করা যায় না। চিঠিপত্রের জন্যে সে অবশ্যি জি পি ও পোস্টবক্স ব্যবহার করে। পোস্ট অফিসের এই ব্যবস্থাটা ভালো।
কামাল নিজেই চা বানিয়ে আনল। বানাতে বানাতে চা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মেয়েরা চা বানালে এত দীর্ঘ সময় গরম থাকে কি করে কে জানে।ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দিতে দিতে কামাল ভাবতে লাগল মানিকগঞ্জে যাওয়াটা ঠিক হবে কি ঠিক হবে না। মানিকগঞ্জ না গেলে অনেকগুলো কাজ শেষ করা যায়। আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ অনেক দিন নেওয়া হয় না। খোঁজ নেওয়া দরকার। ঢাকায় তার আত্মীয় আছে তিন জন। তার বড় বোন, ভাবি এবং ছোট মামা। আরেক বোন আছে বগুড়ায়। এদের সবাইকেই সে মাসে-মাসে নিয়মিত টাকা দেয়। কামালের টাকাটা তাদের খুবই দরকার।
ছোট মামা তাদের দুই ভাই এবং দুই বোনকে নানান দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও নিজের কাছে রেখেছেন। বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। এখন বিপাকে পড়েছেন। ছেলেপুলে সব কটা অপদার্থ হয়েছে। ছোট মামাকে টাকা না দিয়ে সাহায্য করলে বিরাট অধর্ম হবে। আর বড় ভাবি, কামাল টাকা না পাঠালে না খেয়ে থাকবেন। চারটা বাচ্চা নিয়ে বিধবা হয়েছেন, এখন আছেন তার বনের বাসায়। বোন এবং বোনের জামাই যে তাদের বের করে দিচ্ছে না তার কারণ কামালের পাঠানো টাকা। কামাল ভালো করেই জানে যেদিন সে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবে সেদিনই তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সোজা হিসাব। বোন দুজনের মধ্যে বগুড়ায় যে আছে তার অবস্থা ভালো। তবু তাকে মাঝে-মাঝে টাকা পাঠাতে হয়। বগুড়ার বোন হচ্ছে। সবচেয়ে ছোট। বড় ভাইয়ের একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। তা ছাড়া সবাই যখন পাচ্ছে, সেই বেচারি একা বাদ যাবে কেন?
শেষ পর্যন্ত মানিকগঞ্জ যাবার পরিকল্পনা সে বাদ দিল। খবরের কাগজের কাজটা সেরে ফেলা যাক। শুধু-শুধু দেরি হচ্ছে।দুটি দৈনিকে সে বিজ্ঞাপন দিল। সব জিনিসের দাম বাড়ছে, সামান্য কয়েকটা শব্দের বিজ্ঞাপনে সাত শ আঠার টাকা বের হয়ে গেল। বিজ্ঞাপনটা এরকম।
জমি বিক্রয়
ঢাকার অদূরে ১১ কাঠার একটি প্লট জরুরি ভিত্তিতে বিক্রয় হইবে। উঁচু জমি। এই মুহূর্তে বাড়ি করা যাইবে, তবে জমিতে ব্যাংক-সংক্রান্ত লোনের জটিলতা আছে। যোগাযোগ করুন
সালামত শেখ, জিপিও বক্স নং-৬১৩
বিজ্ঞাপনের মূল আকর্ষণ হচ্ছে সামান্য জটিলতা। সামান্য জটিলতার লোভ লোকজন যোগাযোগ করবে। এদের মাঝখান থেকে এক জনের মাথায় কাঁঠাল ভাঙা হবে। দেশটা ভর্তি বুদ্ধিমান গাধায়। কাঁঠাল ভাঙা হবে ওদেরই কারোর মাথায়।
আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা কামাল বাতিল করে দিল। ইচ্ছা করছে না। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক কম থাকাই ভালো। সম্পর্ক কম থাকলেই টান থাকবে। সবসময় গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে রাখলে টান থাকে না। এটা হচ্ছে। জগতের নিয়ম। ছোট মামার কাছে অবশ্যি তার যেতে ইচ্ছা করছে। তবে নানান কারণেই যাওয়াটা ঠিক হবে না। বয়স বাড়ায় ছোট মামার প্যাচালপাড়া স্বভাব হয়েছে। সব জিনিস নিয়ে প্যাচাল পাড়বে। সোমা চলে গেল কেন এই প্রসঙ্গ উঠলে প্যাচাল পাড়তে পাড়তে মাথা ধরিয়ে দেবে।চলে গেল কেন? তুই কি করেছিলি? আগের বৌটাও তো চলে গেল।বাচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলে তো এরকম হত না।তোর বাচ্চা হয় না কেন? অসুবিধাটা কি? এক জন ডাক্তার দেখা। পীর-ফকিরের কাছে যা।
এক লক্ষ কথা বলবে। কথা আর উপদেশ। নিজের ছেলেকে উপদেশ দিয়ে কিছু করতে পারল না আর সে হল গিয়ে ভাগ্নে। বুড়ো হয়ে গেলে সত্যি-সত্যি ভীমরতি হয়। খালি উপদেশ দিতে ইচ্ছা করে। মামাকে এইবার বলতে হবে- মামা, উপদেশ খাতায় লিখে আমাকে দিয়ে দিও। অবসর সময়ে পড়ব। মুখে প্ৰত্যেক বার বল—কষ্ট হয়।কামাল দুপুরে দুটা খবরের কাগজ কিনে হোটেলে খেতে গেল। খবরের কাগজে মাঝে-মাঝে বেশ ইন্টারেস্টিং কেইস পাওয়া যায়। আজকের কাগজে তেমন কিছু ছিল না, তবে এক জন বিজ্ঞাপন দিয়েছে সেকেন্ডহ্যান্ড মিউজিক সেন্টার কিংবা ক্যাসেট ডেক কিনতে চায়। টেলিফোন নাম্বার দেওয়া আছে—এই ব্যাটাকে একটু খেলিয়ে দেখা যেতে পারে।
কামাল বিকালে টেলিফোন করল।ভাই আপনার বিজ্ঞাপনটা দেখলাম। ক্যাসেট ডেক একটা আমার কাছে আছে।ওপাশ থেকে আগ্রহের সুর শোনা গেল।কোন কোম্পানি সেটা তো ভাই বলতে পারব না। প্যাকেট খোলা হয় নি। ব্রান্ড নিউ জিনিস।তা হলে তো হবে না, আমি চাচ্ছিলাম সেকেন্ডহ্যান্ড যাতে কি-না কম দামে,ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা দেওয়া তো সম্ভব না। তাহলে তো দোকান থেকেই কিনতাম। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেব কেন?
সেকেন্ডহ্যান্ডের কমে পাবেন—চোরাই মাল।
চোরাই মাল মানে?
স্মাগলড করা জিনিস।
ও, আই সি।
দশ হাজারে দিয়ে দিতে পারি, জিনিসটা নিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। আমার টাকার দরকার।কোন কোম্পানির? বললাম তো ভাই আমি জানি না।আমি কি এসে দেখতে পারি? আপনার আসার দরকার নাই। আমি বাসায় এসে আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে যাব।তা হলে তো খুবই ভালো হয়। এখন আনতে পারবেন?এখন পারব না। পরশু দিন নিয়ে আসব। আপনার অ্যাড্রেসটা বলেন।
কামাল অ্যাড্রেস লিখে নিল। এই পার্টিকে শেষ পর্যন্ত ধরা হবে কি-না এটা পরে ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে। এক দিন সময় আছে, তাড়া নেই। কামাল হোটেল দেখতে বের হল। সস্তার মধ্যে ভালো হোহাটেল। এত দিন বাড়িতে থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে। হোটেল খুঁজতে যেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু উপায় কি? মানুষের ইচ্ছার উপর তো আর দুনিয়া চলে না। দুনিয়া চলে তার নিজের নিয়মে।
চোখ জ্বালা করছে। এই আরেক যন্ত্রণা হল চোখ নিয়ে। ডাক্তারের কাছে যেতে ইচ্ছা করে না।সন্ধ্যাবেলা সোমা চা বানাচ্ছিল। ঊর্মি এসে বলল, আপা একটু বাইরে যাও তো।সোমা বলল, কেন? কে যেন এসেছে। তোমাকে চাচ্ছে।সোমা পাংশু মুখে উঠে দাঁড়াল। আচমকা বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। উনি কি এসেছেন?বসতে বলেছিস? না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।বসতে বললি না কেন? বসতে বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারি নি।তুমি গিয়ে বল।সোমা বাইরে এসে দেখে উনি আসেন নি। কামাল দাঁড়িয়ে। সোমা শুকনো গলায় বলল, কি ব্যাপার?আধা ঘন্টা ধরে এই এলাকায় ঘোরাঘুরি করছি। বাসা চিনতে পারছি না। অথচ এর আগে তিন বার এসেছি।এখানে দরকারটা কি?
দরকার নাই কিছু, তোমার টব দুটা নিয়ে আসলাম। রেখেছি ঐ কোণায়। লাল রঙের পাতা ছেড়েছে। আমার ধারণা ছিল এই গাছগুলো ফাল্গুন মাসে পাতা ছাড়ে, এখন ছাড়ল কেন বুঝলাম না।সোমা বিরক্ত গলায় বলল, এগুলো আমার দরকার ছিল না।বাসা ছেড়ে দিচ্ছি তো। না এনে করব কি? হোটেলে গিয়ে উঠব। একা মানুষ।সোমা কিছু বলবে না বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, তোমার জন্যে হোটেলে থাকাই ভালল। ঘন ঘন বদলাতে পারবে।তা ঠিক। তোমাকে এমন রোগা লাগছে কেন? অসুখ বিসুখ না-কি? না অসুখ বিসুখ হবে কেন?
খুব রোগা লাগছে এই জন্যে বলছি।আমার স্বাস্থ্য নিয়ে তোমার চিন্তিত হবার দরকার আছে কি? সোমা লক্ষ করল লোকটা লজ্জা পেয়ে কেমন বিব্রত ভঙ্গিতে হাসছে। এই লোক বিব্রত ভঙ্গিতে হাসতেও পারে না-কি? আশ্চর্য তো!কামাল পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, বিড়ালটা বাচ্চা দিয়েছে। চারটা বাচ্চা। তিনটা খুব হেলদি। আর রোগা যেটা ঐটাকে তার মা দুধ খেতে দিচ্ছে না। ব্যাপারটা কিছু বুঝলাম না। আদর-যত্ন এটাকেই করা উচিত, অথচ…..
সোমা চুপ করে রইল। কি বলবে সে? ভাগ্যিস বিজু বাসায় নেই। বিজু থাকলে নিৰ্ঘাত হৈ চৈ চেঁচামেচি শুরু করত।বুঝলে সোমা, আমি ন্যাকড়ায় দুধ ভিজিয়ে ঐ বাচ্চাটার মুখের সামনে ধরেছিলাম, এক বার শুধু চুক-চুক করে খেয়েছে। এখন আর খাচ্ছে না। বিরাট প্রবলেম।আমাকে এসব বলছ কেন? ফুলের টব দিতে এসেছিলে, দেওয়া হয়েছে। এখন চলে যাও।কামাল নিচু গলায় বলল, তুমি চলে আসায় খুব খারাপ লাগছে। এতটা খারাপ লাগবে বুঝতে পারি নি।কিছুদিন খারাপ লাগবে তারপর আর লাগবে না।তা ঠিক, নিজের বাপ-মার কথাই এখন আর মনে হয় না। সোমা তা হলে যাই।আচ্ছা-যাও।তোমাদের বাসার সামনে একটা গাছ ছিল না, বিরাট গাছ। কেটে ফেলেছ না-কি?
হ্যাঁ।উচিত হয় নি। গাছ কাটা ঠিক না। যাই তা হলে সোমা। ইয়ে, শোন—একদিন এসে কি বিড়ালগুলোকে দেখে যাবে? না। কেন শুধু কথা বাড়াচ্ছ।আচ্ছা, আচ্ছা, তা হলে যাই।যাই বলেও সে দাঁড়িয়ে রইল। সোমা বলল, চোখের অবস্থা তো মনে হচ্ছে খুব খারাপ। ডাক্তার দেখিয়েছ?
না।
না কেন?
যাব একদিন। সব শালা ফক্কড়। যেতে ইচ্ছে করে না।সবাই ফক্কড়। আর তুমি হচ্ছ ভালো মানুষ? না। তা না।যাও, চলে যাও, দাঁড়িয়ে আছ কেন? আচ্ছা তা হলে যাই।কামাল যাচ্ছে কেমন ক্লান্ত ভঙ্গিতে। ওকে ডেকে বসিয়ে এক কাপ চা খাইয়ে দিলে খুব কি অন্যায় হয়? হা হয়। কেন শুধু শুধু চা খাওয়াবে? সোমা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকে গেল।জাহানারা কঠিন স্বরে বললেন, ও এসেছিল কেন?
ফুলের টব দিতে এসেছিল।সাহস তো কম না। ছোটলোক।সোমা শান্ত স্বরে বলল, কেন শুধু গালাগালি করছ মা। গালাগালির দরকারটা কি তা তো বুঝছি না।তোর কাকারখানা তো কিছু বুঝছি না। এত কি কথা তোর? আমার কোন কথা নেই মা। ওর কিছু কথা ছিল শুনেছি। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তো বের করে দিতে পারি না।ওর কি কথা ছিল?
তেমন জরুরি কিছু না। বিড়াল চারটা বাচ্চা দিয়েছে এইটাই বলল।জাহানারা অবিশ্বাসী গলায় বললেন, বিড়াল বাচ্চা দিয়েছে এই খবর দেবার জন্যে এখানে এসেছে? হ্যাঁ। পাগল না-কি? হ্যাঁ মা পাগল। পাগলের সঙ্গে থেকে-থেকে আমিও খানিকটা পাগল হয়ে গেছি। কারণ ঐ শয়তানটার জন্য আমার খারাপ লাগছে।সোমার গলা কেমন যেন ভারি শোনা গেল।
Read more
