ভদ্রলোক চোখ থেকে চশমা খুলে কাচ মুছতে মুছতে বললেন, আমার মনে হল তোমার বাবা আমার কথা শুনে খুশিই হয়েছেন। ওঁর খুশি হওয়াটা তেমন জরুরি নয়, তুমি খুশি কি না বা তুমি কী ভাবছ সেটা হচ্ছে জরুরি। জীবন নতুন করে শুরু করা অন্যায় কিছু না। পিছন দিকে তাকিয়ে বড় বড় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলার কোনো মানে হয় না। আজ উঠি। ভালো কথা, তোমার জন্যে দুটো বই এনেছি।সোমা তাঁকে বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল।
ভদ্রলোক চলে যাবার পরও সে অনেকক্ষণ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইল। বড় চাচার কথা শোনা যাচ্ছে—এক নাগাড়ে তিনি কথা বলে যাচ্ছেন। এখন কথা বলছেন আগের চেয়েও অনেক উঁচু গলায়।সমস্যা আবার কী? কীসের সমস্যা? কার বাপের সমস্যা? কাকে আমি ডরাই? কোন ব্যাটাকে ডরাই? তারা আমাকে কী ভাবে? এখনো হাতে এমন জোর আছে যে, একটা চড় দিলে দ্বিতীয় চড় দেওয়া যাবে না।
এক চড়েই পাউরুটি বিস্কুট হয়ে যাবে….. বড় চাচা কথা বলছেন। আরেক জন কে যেন কাঁদছে। কে কাঁদছে বোঝা যাচ্ছে না—মিথি, তিথি না বড় চাচি? সব পুরুষের কান্নার শব্দ যেমন এক রকম, সব মেয়েদের কান্নার শব্দও এক। কে জানে যখন মানুষ কাঁদে তখন বোধহয় সবাই সমান হয়ে যায়।সোমা দেখল বাবা আসছেন। হেঁটে হেঁটে আসছেন। আজকাল প্রায় রাতেই উনি দেরি করে ফিরছেন। পসার বোধহয় বাড়ছে। আগের বিমর্ষ ভাব এখন আর তাঁর মধ্যে নেই।
কে, সোমা?
জ্বি বাবা।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছিস কেন রে মা? তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। এত দেরি কেন? একটা কলে গিয়েছিলাম। ওরা আবার চা-টা খাইয়ে দিল।নামি ডাক্তার হয়ে যাচ্ছ মনে হয় বাবা।বাবা হাসলেন। সোমা অবাক হয়ে লক্ষ করল—এই যে বড় চাচা চেঁচামেচি করছেন বাবার কানে তা যাচ্ছে না। তিনি হাসতে হাসতে কথা বলছেন।এখানে তো বেশ বাতাস সোমা।জ্বি।
দাঁড়াই খানিকটা গায়ের ঘাম মরুক, কী বলিস? দাঁড়াও।তিনি ইতস্তত করে বললেন, তোকে একটা কথা বলা হয় নি। প্রফেসর সাহেবের বাসায় গিয়েছিলাম। মানে এমনি হঠাৎ ভাবলাম….হাজার হলেও প্রতিবেশী। তাই না? তা তো ঠিকই।ভদ্রলোককে যেরকম ভেবেছিলাম সেরকম না। খুবই ভদ্রলোক। ধরতে গেলে আমি তাঁর ব্যবহারে মুগ্ধ। তোর মাকে বলেছি সেকথা। খুবই ভালো মানুষ। পাড়াতেও খুবই সুনাম।ভালো মানুষ, সুনাম কেন হবে না বল? নিরহঙ্কারী লোক। এক দিন পানি ছিল না, উনি নিজেই রাস্তার মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে বালতি করে পানি নিয়ে গেলেন। সবাই পারে না। সঙ্কোচ বোধ করে। তাই না?
তা ঠিক।সম্মান যার আছে সে সম্মান যাওয়ার ভয় করে না। যার সম্মান নেই তার যত ভয়। তোমার গায়ের ঘাম বোধহয় মরেছে, চল ভেতরে যাই।দাঁড়া আরেকটু। বাতাসটা ভালোই লাগছে। সোমা, প্রফেসর সাহেব একটা প্রস্তাব দিয়েছেন, মানে—ইয়ে—তোর মা কি কিছু বলেছে তোতাকে? না।আচ্ছা তোর মার কাছ থেকে শুনিস। প্রস্তাবটা আমার পছন্দ হয়েছে। একটা ফ্ৰেশ স্টার্ট হলে ভালো হয়। বেশ ভালো হয়। চেঁচামেচি কে করছে রে?
বড় চাচা।
যন্ত্রণা হল দেখি।
সাইফুদ্দিন সাহেব বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেললেন।রাত বারটা দশ। বিজু এখনো ফেরে নি। মাঝেমাঝে সে খুব রাত করে। তার না কি পার্টি মিটিং থাকে। আজও বোধহয় পার্টি মিটিং ছিল। জাহানারা ভাত বেড়ে ক্লান্ত হয়ে অপেক্ষা করছিলেন।সোমা বলল, তুমি ঘুমিয়ে পড় মা। আমি জেগে আছি। আমি সন্ধ্যাবেলায় ঘুমিয়েছি। এখন আর ঘুম আসছে না।
জাহানারা সঙ্গে-সঙ্গে ঘুমুতে গেলেন। বাড়ি নিঝুম হয়ে গেল। বড় চাচার কথাও শোনা যাচ্ছে না। সম্ভবত তিনিও ঘুমুচ্ছেন। মাঝেমাঝে একটা ঘুমন্ত বাড়িতে একা একা জেগে থাকতে ভালো লাগে। অদ্ভুত-অদ্ভুত সব চিন্তা আসে। আজ অবশ্যি তেমন কোনো অদ্ভুত চিন্তা সোমার মাথায় আসছে না। সে প্রফেসর সাহেবের রেখে যাওয়া বইটি কোলে নিয়ে বসে আছে।এই ভদ্রলোককে সে কখনো কোনো নামে ডাকে নি। প্রথম পরিচয়ের দিন এক বার শুধু স্যার বলেছিল। উনি বলেছিলেন, সবার মুখে দিনরাত স্যার-স্যার শুনি। তুমি স্যার না বললে কেমন হয়?
সোমা বলেছিল, কী ডাকব?
তোমার যা ইচ্ছা তাই ডাকতে পার।
সোমা কিছু ডাকে নি।
দরজার কড়া নড়ছে। সোমা খুলে দিল। লজ্জিত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল বিজু।দেরি করলাম আপা। সরি। পার্টি মিটিং ছিল।তরকারি গরম করব, না যেমন আছে তেমনি খাবি? কিছু খাব না আপা। বিরিয়ানি খেয়ে এসেছি। চা খাবি? চা করে দেব? দাও। বেশি করে বানিও। ফ্লাস্কে ভরে রাখব।সোমা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছে। বিজু কাপড় ছেড়ে সিগারেট হাতে এসে বসল ববানের পাশে।সোমা চায়ে চিনি মেশাতে মেশাতে বলল, বিজু, ও নাকি রাতের বেলা বাসার সামনে দিয়ে হাঁটা হাঁটি করে?
কে বলেছে তোমাকে?
করে কি না বল।
আর করবে না। হেভি ধাঁতানি দিয়ে দিয়েছি।
মারধর করেছিস?
আরে না। তুমি কি ভাবো আমি রাতদিন মারামারি করে বেড়াই? আমি লোকটাকে কঠিন করে বলে দিয়েছি—আপনাকে তিন রাত এখানে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেছি। আর যেন না দেখি। মামদোবাজি আমি সহ্য করব না।সোমা শীতল গলায় বলল, এক জন লোক যদি বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, তা হলে তোর অসুবিধা কী? বিজু খুব অবাক হল।সোমা বলল, এমন তো না যে সে কারোর কোনো ক্ষতি করছে।ও একটা ক্রিমিন্যাল লোক আপা। বল, ক্রিমন্যাল না?
সোমা চুপ করে রইল।বিজু বলল, একটা কথা সত্যি করে বল তো আপা, তুমি ওর কাছে ফিরে যেতে চাও? না।কখনো কি তোমার মনে হয়েছে যে, চলে এসে তুমি ভুল করেছ? না।শুনে ভালো লাগল আপা। তোমার কাণ্ডকারখানায় মাঝে-মাঝে কনফিউজড হয়ে যাই।সোমা বলল, তুই যখন ঐ সব কথা ওকে বললি, তখনও ও কী বলল? তুমি এখনো ও সব নিয়ে ভাবছ?
কী বলল ও?
কিছুই বলে নি।
এখানে আসত কেন, জিজ্ঞেস করেছিলি?
না। কথা বলার অবস্থা ছিল না।
কেন?
মাথায় ব্যাভেজফ্যাভেজ দেখলাম। কেউ বোধহয় হেভি পিটন দিয়েছে।সোমার হাত থেকে চা ছলকে পড়ল।বিজু বলল, ঠাট্টা করছিলাম আপা। তোমার রিঅ্যাকশন দেখছিলাম। লোকটা বহাল তবিয়েতেই আছে। তবে মার একদিন সে খাবে। পাবলিক তাকে পিটিয়ে লম্বা বানাবে। তোমার শুনতে খারাপ লাগলেও কথাটা সত্যি।সোমা উঠে দাঁড়াল।বিজুও উঠল। সোমার পিছনে পিছন আসতে আসতে বলল, তুমি খুব শক্ত মেয়ে, তবে তোমার আরো শক্ত হওয়া দরকার।তোকে উপদেশ দিতে হবে না।
উপদেশ দিচ্ছি না আপা; আর শুধু একটা কথা বলব। তোমার ঐ প্রফেসর ভদ্রলোক-খারাপ না। ভালো। তুমি যদি এঁর বাসায় যাও, আমি রাগ করব না। বরং খুশিই হব। শুধু আমি একা না, এ-বাড়ির সবাই খুশি হবে।বড় চাচাকে নিয়ে যেতে মিথির দুই মামা এসেছেন।বাড়ির সামনে একটা পিকআপ এবং একটা ডাইহাট গাড়ি দাঁড়িয়ে।
পিকআপে জিনিসপত্র ভোলা হচ্ছে। ব্যাপারটা ঊর্মি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল। তার খুব খারাপ লাগল। সে ভেতরে এসে বিজুকে বলল, ওরা সবকিছু নিয়ে চলে যাচ্ছে।বিজু বলল, যাক না। তোর এত মাথাব্যথা কীসের? মিথি-তিথিরা খুব কান্নাকাটি করছে।বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখার কোন দরকার নেই। বড় আপা কোথায়? ঐ বাড়িতে।যা, আপাকে ডেকে নিয়ে আয়।ঊর্মি বলল, আমি পারব না। এইরকম কান্নাকাটির মধ্যে আমি যাব নাকি?
বড় চাচা ভীষণ হৈ চৈ করছেন। তিনি কিছুতেই যাবেন না। ক্রমাগত বলছেন—ওরা আমাকে নিয়ে মেরে ফেলবে। খুনীর দল আমাকে নিয়ে মেরে ফেলবে। আমাকে নিয়ে খুন করবে। খুন করতে নিয়ে যাচ্ছে।মিথির দুই মামা খুবই বিরক্ত হচ্ছেন। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। গাড়ির দুই ড্রাইভার তাঁর হাত ধরে তাঁকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তিনি গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছেন। তাঁকে ঘর থেকে বের করতে ড্রাইভার দু জনকে খুব বেগ পেতে হল।মিথির বড় মামা বিরক্ত গলায় বললেন, এই সামান্য কাজে তোমরা সারা দিন লাগিয়ে দিচ্ছ। হাত দুটা শক্ত করে ধর না কেন?
বাড়ি থেকে বের করে আনার পর বড় চাচা কিছুক্ষণের জন্যে চিৎকার করলেন। তারপর শিশুদের মতো শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। বিজুকে ডাকতে শুরু করলেন, ও বিজু, বিজুওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ও বিজু,–বিজু…..। আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বিজু…….ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।মিথির ছোট মামা বললেন, এক জন কেউ মুখটা চেপে ধর। চিৎকার সহ্য করা যাচ্ছে না। আহ, কি—যে যন্ত্ৰণা।বড় চাচাকে পিকআপে ওঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ড্রাইভার দু জন পেরে উঠছে না। সাহায্যের জন্যে মিথির বড় মামা এগিয়ে গেলেন। বড় চাচা ফুঁপিয়ে ডাকতে লাগলেন, ও বিজু, বিজু…….
বিজু বেরিয়ে এল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল বড় চাচার দিকে। তারপর গর্জন করে উঠল, একটা মানুষ যেতে চাচ্ছে না, তারপরও আপনারা তাঁকে জোর করে নিয়ে যাবেন? পেয়েছেন কী আপনারা? মগের মুলুক নাকি? বড় চাচা কান্না থামিয়ে উঁচুগলায় বললেন, ঘুষি মেরে ওদের নাক ফাঁটিয়ে দে বিজু। কথায় কাজ হবে না। কথার মানুষ এরা না।বিজু বলল, যান, রেখে আসুন।মিথির বড় মামা বললেন, কি বলছ তুমি? চিকিৎসা করাতে হবে না? এখানে চিকিৎসাটা কে কবে? আমরা করব। আমরা কি পানিতে ভেসে গেছি নাকি? একটা লোক ভয় পাচ্ছে, যেতে চাচ্ছে না, তবু তাকে নিয়ে যাবেন। পেয়েছেনটা কী?
বড় চাচা বললেন, খামাখা কথা বলে সময় নষ্ট করছিস বিজু। ঘুষি দিয়ে নাক। ফাটিয়ে দে। এরা কথার মানুষ না।বিজু বলল, যান রেখে আসুন। নইলে অসুবিধা হবে। পাড়ার লোক ডেকে থোলাই দিয়ে দেব।বড় চাচা আনন্দে হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, দেরি করিস না, ধোলাই দিয়ে দে। রাম থোলাই দিয়ে দে।বড় চাচাকে আবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিথি মিথিরা গাড়িতে উঠে বসেছিল, তারা নেমে আসছে। মালপত্র নামানো হচ্ছে। ঊর্মি বারান্দায় আছে।
বিজু একদিন ইলেকট্রিশিয়ানের সামনে তার গালে চড় মেরেছিল—এই অপরাধের জন্যে কোনোদিন সে বিজুকে ক্ষমা করবে না বলে ভেবে রেখেছিল। আজ ক্ষমা করল। সে এগিয়ে গেল জিনিসপত্র নামানোর কাজে বিজুকে সাহায্য করবার জন্যে। বড় চাচা এখন বেশ স্বাভাবিক। তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। সেখান থেকে চেচিয়ে বলছেন, কাচের জিনিস আছে। আস্তে নামা! এরা কোন একটা কাজ যদি ঠিকমতো করতে পারে। বিজু উৰ্মিটাকে একটা ধমক দে তো—কি রকম টানাটানি করছে। ভাঙবে না?
সোমা নতুন বই নিতে এসেছে। তিনি বই বেছে দিচ্ছেন। সোমা দেখল একটা কুচকুচে কালো বিড়াল তাঁর পায়ে গা ঘষছে।সোমা বলল, এই বিড়ালটা কি আপনার? না। বেড়াল আমার পছন্দের প্রাণী না। তবে আমার স্ত্রী পছন্দ করত। বেড়ালকে খেতেটেতে দিত। এই কালো বেড়ালটা হচ্ছে আমার স্ত্রীর পোষা বেড়ালগুলোর কোনো একটা বংশধর।আপনি কি একে খেতেটেতে দেন? হ্যাঁ দিই। আমার স্ত্রীর প্রতি মমতা থেকে দিই। এমনিতে কিন্তু কুকুর-বেড়াল কোনোটাই আমি পছন্দ করি না।
আমিও করি না।তিনি হাসতে হাসতে বললেন, লোকে বলে যারা পাখি পছন্দ করে তারা পশু পছন্দ করে না। তুমি কি পাখি পছন্দ কর সোমা? জানি না, করি বোধহয়।আজ এই বইটা নিয়ে যাও, প্রথম এক শ পাতা কষ্ট করে পড়তে হবে তারপর দেখবে–হাত থেকে বই নামাতে পারছ না।সোমা জবাব দিল না। সে কালো বিড়ালটার দিকে একদৃষ্টিতে কি যেন দেখছে। সোমা চাপা গলায় বলল, ও বিড়াল খুব পছন্দ করে। বলেই সে অসম্ভব লজ্জা পেয়ে গেল।তিনি অবাক হয়ে দৃশ্যটি দেখলেন। নরম স্বরে বললেন, উনি বেড়াল পছন্দ করতেন?
জ্বি। এক বার রাস্তা থেকে একটা বিড়াল ধরে নিয়ে এসেছিল। পিঠে ঘা হয়েছিল, তাই রোজ ডেটল দিয়ে ঘা ধুয়ে দিত। পুঁজ পরিষ্কার করত। আমার গা ঘিন ঘিন করত। ভাত খেতে পারতাম না। বিড়ালটা অবশ্যি বাঁচে নি। সাত দিনের দিন মরে গেল।উনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন মনে হয়।হ্যাঁ, হাউমাউ করে কিছুক্ষণ কাঁদল। তার পরপরই অবশ্যি খুব স্বাভাবিক। ওর কষ্ট বেশিক্ষণ থাকে না।সোমা? জ্বি।তুমি কিন্তু এখনো ঐ ভদ্রলোককে খুব পছন্দ কর।সোমা চুপ করে রইল।
তিনি নরম স্বরে বললেন, এস আমরা বাইরে খানিকক্ষণ বসি।তারা বারান্দায় এসে বসল। তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে সহজ গলায় বললেন, সোমা, আমার মনে হয় তোমার ঐ ভদ্রলোকের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত। তাঁকে আরেকটা সুযোগ দেওয়া উচিত।সে কেমন মানুষ আপনি কিছুই জানেন না বলে এটা বলতে পারলেন।ধরে নিলাম খুবই খারাপ মানুষ। কিন্তু তুমি তাকে বদলাবার কোনো চেষ্টা কি করেছ? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তুমি কর নি। করে দেখ না।সোমা তাকিয়ে আছে কোনো কথা বলছে না।তিনি বললেন, চা খাবে? সোমা বলল, না।
তিনি ভারি গলায় বললেন, তোমাকে ওঁর কাছে ফিরে যেতে বলছি কেন জান, ঐ মানুষটার জন্যে তোমার তীব্র ভালবাসা আছে, কিন্তু তুমি সেটা বুঝতে পারছ না।আমি যা বুঝতে পারি নি—আপনি কী করে তা বুঝে ফেললেন? বেড়াল তুমি পছন্দ কর না, কিন্তু গভীর মমতায় তুমি কালো বেড়ালটার দিকে তাকিয়ে রইলে। কারণ, তোমার খুবই প্রিয় এক জন বেড়াল পছন্দ করে।
সোমার চোখে পানি এসে গেল।তিনি বললেন, বড্ড চায়ের তৃষ্ণা হচ্ছে। তুমি কি আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াবে? রান্নাঘরে সবই হাতের কাছে আছে।সোমাচা বানানোর জন্যে উঠে দাঁড়াল।সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে।কামাল এখনো বিছানায়। দুপুরে ঘুমিয়েছিল, বিকেলে ঘুম ভেঙেছে, কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। এই সময়টা তার খুব খারাপ যায়। গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে। আজও কাঁদতে ইচ্ছা করছে।
বিড়ালের বাচ্চাগুলোর চোখ ফুটেছে। সব কটা এখন বিছানায়। বালিশ নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে। কি সুন্দর দৃশ্য। কাউকে দেখাতে ইচ্ছা করে। দেখানোর কেউ নেই।কামালের বুক হু-হু করে।ঘর অন্ধকার। আলো জ্বালতে ইচ্ছা করছে না। মাঝে-মাঝে কিছুই করতে মন চায় না।আকাশ মেঘে মেঘে ঢাকা। গুড় গুড় শব্দ হচ্ছে। মনে হয় ঢালা বর্ষণ হবে। একটু একটু বৃষ্টি বোধহয় হচ্ছেও। ঝির ঝির শব্দ কানে আসছে। একটা বিড়াল কামালের বুড়ো আঙুল কামড়াবার চেষ্টা করছে। কামাল বলল, তোরা কিন্তু বড় বেশি বিরক্ত করছি। লাথি খাবি।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
কামাল বলল, কে?
কেউ জবাব দিল না। আবার মদ টোকা পড়ল।
কামাল দরজা খুলে তাকিয়ে রইল। সোমা দাঁড়িয়ে।
সোমা বলল, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজে কী হয়েছি, দেখ না।
কামাল বলল, তুমি কেমন আছ সোমা?
বলতে বলতে তার চোখ ভিজে উঠল। সন্ধ্যাবেলার এই সময়টা ভালো না। এই সময় মানুষ বড় একাকী বোধ করে। তাদের বুক হু হু করে। অকারণেই তাদের চোখ ভিজে ওঠে। সন্ধ্যাবেলার এই অদ্ভুত সময়টাতে প্রিয়জনদের কাছে যেতে নেই। তবু সব মানুষই প্রিয়জনদের কাছে যাবার জন্যে এই সময়টাই বেছে নেয়। কেন বেছে নেয় কে জানে!
( সমাপ্ত )
Read more
