নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৭)

আনিস থেমে থেমে বলল, ‘আমি যুদ্ধের কোনাে গল্প জানি না।’ ‘কেন, আপনি আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করেন নি? 

করেছি।’ 

সেই গল্প বলুন। ‘আমি যুদ্ধের গল্প বলি না। 

আভা মুখ কালাে করে ফেলল। লায়লা বলল, ‘চল, কনক। যাই, গায়ে হলুদের সময় হয়ে গেছে। কনক নড়ল না। থেমে থেমে বলল, ‘যুদ্ধের সময় আমি বড়াে কষ্ট করেছি আনিস ভাই।

নির্বাসনবরিশালের কাছে এক জঙ্গলে আমি, আমার মা আর দুই খালা এক সপ্তাহ লুকিয়ে ছিলাম। এক খালা সেই জঙ্গলেই ভয় পেয়ে মারা গিয়েছিলেন।’

 আনিস বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল কনকের দিকে। কনক গাঢ় স্বরে বলল, ‘খুব কষ্ট করেছি বলেই যারা যুদ্ধ করেছে তাদের আমার সব সময় খুব আপন মনে 

হয়।’ 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

কনকের কথার মাঝখানে আনিস হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি খুব অসুস্থ। তােমার সঙ্গে পরে আলাপ করব। রুনু, এই ছেলেটিকে নিয়ে যায় সে তার মাকে খুঁজে পাচ্ছে । 

বাবুকে রুনু কোলে তুলে নিতে গেল। বাবু চেয়ারে আরও ভালাে করে সেঁটে বসল। আনিসের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি যাব না। আমি এখানে থাকব।’ 

রুনু তাকে দু হাত ধরে উপরে তুলতেই সে পা ছুঁড়ে কাঁদতে শুরু করল। রুনু বলল, আনিস ভাই, আমরা যাই? 

আচ্ছা যাও! কিছু মনে করাে না কনক।’ না–না আনিস ভাই, আমি কিছু মনে করি নি। 

আলিস হাঁপাতে শুরু করল। অসহ্য! খুব ঘাম হচ্ছে। বুক শুকিয়ে কাঠ। দাঁতে দাঁত চেপে সে মনে মনে গুনল—এক শ’, নিরানব্বই দরজায় টোকা পড়ল। আনিস তাকাল ঘােলা চোখে বাবু আবার ফিরে এসেছে। আনিস চোখ বন্ধ করে ফেলল। বাবু বলল, ‘আমি এসেছি।’ 

আনিস কোনাে মতে বলল, ‘বাবু, এক গ্লাস পানি আল।’ 

আনিসের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। পেথিড্রিন দিতে হবে নাকি কে জানে। বড়ােচাচাকে খবর দেওয়া প্রয়ােজন। 

বাবু পানির খোঁজে বেরিয়ে একা একা ঘুরে বেড়াতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল ছাদে। সেখানে মিস্তিরিরা সামিয়ানা খাটাচ্ছে। সে অনেকক্ষণ তাই দেখল। তারপর নেমে এল দোতলায়। দোতলা খাঁ–খাঁ করছে। সবাই গিয়েছে গায়ে–হলুদে। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

সে এ–ঘর থেকে ও–ঘরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। 

জরীর বড়ােচাচা তাঁর রেডিওগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে বিরক্ত হয়ে বারান্দায় বসে ছিলেন। বাবু তাকে গিয়ে বলল, ‘পানি খাব।’ তিনি তাকে পানি খাইয়ে দিলেন। বাবু শান্ত হয়ে আনিসের ঘর খুজে বেড়াতে লাগল । 

পরীর ট্রেন ভাের সাড়ে আটটার মধ্যে ময়মনসিংহ পৌছানর কথা। কিন্তু গফরগাঁ আসতেই পৌনে ন’টা হয়ে গেল। মেল ট্রেন, অথচ ছােট–বড়াে সব স্টেশন ধরছে। লােক উঠেছে বিস্তর। ছাদে পর্যন্ত গাদাগাদি ভিড়। ফার্স্ট ক্লাস কামরাগুলি অপেক্ষাকৃত ফাঁকা ছিল। কিন্তু কাওরাইদে এক দঙ্গল ছাত্র উঠে পড়ল। বিপদের ওপর বিপদ।

পরীর মেয়ে লীনা কদিন ধরেই সর্দিতে ভুগছিল। ট্রেনে ওঠার পর থেকে তার জ্বর হু–হু করে বাড়তে লাগল। পরী মেয়েকে কোলে করে জানালার এক পাশে বসেছে, তার অন্য পাশে বসেছে পান্না। পান্না এক দণ্ডও কথা না বলে থাকতে পারে না। সে ক্রমাগত মাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। এটা কী মা? ঐ লােকগুলি নৌকায় কী করছে মা?’ ‘ঐ নৌকাটার পাল লাল, আর এইটার সাদা 

কেন মা? | হােসেন সাহেব ট্রেনে উঠেই একটা বই তাঁর নাকের সামনে সংখ। গাড়ির ভিড়, লীনার জ্বর বা পান্নার প্রশ্নমালা কিছুই তাঁকে বিচলিত করতে পাড়ে না। পরীর বিরক্তি ক্রমেই বাড়ছিল। এক সময় সে ঝঝিয়ে উঠল, ‘রাখ তোমার এই। দেখ মেয়েটার কেমন জ্বর। হােসেন সাহেব হাত বাড়িয়ে মেয়ের উত্তাপ দেখলেন। শান্ত গলায় বললেন, ‘ও কিছু নয়। এক্ষুণি রেমিশন হবে।‘ 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলেন। পালা বলল, ‘মা, রেমিশন কী? 

কি জানি কী। চুপ করে বসে থাক। 

গাড়ির অনেকেই কৌতূহলী হয়ে তাকাচ্ছে পরীর দিকে। পরী সেই ধরনের মহিলা, যাদের দিকে পুরুষেরা সব সময় কৌতূহলী হয়ে তাকায়। চোখে চোখ পড়লেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় না। 

 

Read More

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *