মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছেন। রোগী লম্বা এক জন মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারণ লোকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমেও ফুল হাতা ফ্লানেলের শার্ট, ফুলপ্যান্টটি চকচকে কাপড়ের তৈরী; ছাঁটের ধরন দেখে মনে হয় সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেট থেকে কেনা। এ ধরনের ছাঁটের প্যান্ট ঢাকায় এখন চালু নেই। পায়ের জুতা জোড়া ঝকঝকি করছে।
মনে হচ্ছে এখানে আসবার আগে জুতা পালিশ করেছে। মিসির আলি লোকটির বয়স আন্দাজ করবার চেষ্টা করলেন। কুড়ি থেকে পাঁচিশের মধ্যে হবার কথা। এই বয়সের যুবকদের চেহারায় এক ধরনের আভা থাকে। যৌবনের আভা। এর তা নেই। অল্প বয়সে চুলও পৌঁকেছে বলে মনে হচ্ছে। কানের পাশে রুপোলি ছোঁয়া।
মিসির আলি বললেন, আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?…..সে জবাব দিতে দেরি করছে। যেন এই প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। মিসির আল মুদ্র করেন, আপনি কি আমার কাছে এসেছেন? জ্বি।আপনি মনে হয় আগেও কয়েক বার এসেছিলেন? জ্বি।এক বার একটি চিঠি লিখে গিয়েছিলেন, তাই না? লিখেছিলেন-সোমবার সন্ধ্যায় আসব।জ্বি স্যার।আমি কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আপনি আসেন নি।একটা কাজ পড়ে গিয়েছিল স্যার।
লোকটি খুব সহজেই স্যার বলছে। তার মানে ছোট কোনো চাকরি করে। অফিসের প্রায় সবাইকে বোধহয় স্যার বলতে হয়, যে-কারণে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খারাপ অভ্যাস। মিসির আলি বললেন, আপনি কী করেন?………সামান্য একটা কাজ করি।
বলার মতো কিছু না।আসুন। ভেতরে আসুন।আজ যাই স্যার। আরেক দিন আসব।মিসির আলি অত্যন্ত অবাক হলেন। এই লোকটি বারবার তাঁর খোঁজে আসছে, চিঠি লিখে যাচ্ছে। আজ দেখা হল, কিন্তু সে থাকতে চাচ্ছে না। মনের ভেতর বড় রকমের কোনো দ্বিধার ভাব আছে, যা সে কাটাতে পারছে না। মিসির আলি বললেন, আপনি চলে যেতে চাচ্ছেন, চলে যাবেন। কিছুক্ষণ বসে যান। আমার কাছে কেন এসেছেন, সেটা বলুন।
অন্য আরেক দিন আসব।সেদিন হয়তো আমাকে পাবেন না। আমি বাসায় খুব কম থাকি। আমার অনেক ঝামেলা।লোকটি খুবই অস্বস্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকল। জুতা জোড়া নিয়ে একটু চিন্তা করছে। খুলে ফেলবে কি ফেলবে না। মিসির আলি লক্ষ করলেন, লোকটি নিজেই বসার ঘরের দরজা বন্ধ করছে। ছিটিকিনি লাগানোর চেষ্টা করছে। এটাও হয়তো তার অভ্যাস।
সে খুব সম্ভব তার ঘরে ঢুকেই ছিটিকিনি লাগিয়ে দেয়। তাই যদি হয়, তাহলে লোকটি থাকে একা। যে বাড়িতে অনেকগুলি মানুষ থাকে, সে-বাড়ির কেউ ঘরে ঢুকেই ছিটিকিনি লাগানোর অভ্যাস করবে না।মিসির আলি বললেন, এ-বাড়ির ছিটিকিনি লাগানের একটা বিশেষ কায়দা আছে। আপনি পারবেন না। আপনি বসুন, আমি লাগাচ্ছি।
লোকটি বসল। বসার ভঙ্গি বিনীত। হাত মুঠি করে কোলের উপর রাখা। ঈষৎ কুঁজা হয়ে বসেছে। গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। অতিরিক্ত ফর্সা হবার কারণেই বোধহয় চেহারায় খানিকটা মেয়েলি ভাব চলে এসেছে। অবশ্যি এটা জোড়া ভুরু ও পাতলা ঠোঁটের কারণেও হতে পারে। এই ধরনের ছেলেদেরকেই স্কুলে সবাই মেয়ে বলে খেপায়। এবং উচু ক্লাসের কিছু বখা ছেলে বিশেষ কারণে এদের বন্ধুত্ব কামনা করে।
মিসির আলি বললেন, আপনার নাম কি? লোকটি জবাব দিল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। এখন সে তাকৃচ্ছে জানালা দিয়ে। মিসির আলি অবাক হয়ে বলতে কি আপনার আপত্তি আছে? জ্বি-না।তাহলে নাম বলুন। নাম দিয়েই শুরু করা যাক।আমার নাম রইসুদ্দিন।
শুধু রইসুদ্দিন! নাকি রাইসুদিনের সঙ্গে অন্য কিছু আছে?…….মোঃ রইসুদ্দিন।দেখুন ভাই, আপনি কিন্তু ঠিক নামটা বলছেন না। মিথ্যা কথা বলায় যারা অভ্যস্ত নয়, তারা যখন মিথ্যা বলে, তখন তাদের গলা কোঁপে যায়। খুব দ্রুত চোখের পাতা পড়ে এবং খানিকটা ব্লাশ করে। আপনার বেলায় এর সব কটি হয়েছে।আমার ভালো নাম মুনির ডাক নাম টুলু। চা খাবেন? দ্বি স্যার, খাব।আপনি আরাম করে বসুন, আমি চা বানিয়ে আনছি। ঘরে কাজের কোনো লোক নেই। সব আমাকেই করতে হবে। আপনি আমার কাছে কি জন্যে এসেছেন তা এখন বলবেন? না চা খেয়ে বলবেন?
স্যার আমি খুব বিপদে পড়েছি।বিপদে পড়লে লোকজন যায় পূরণের কাছে আমার কাছে কেন? আমি তো পুলিশ নই।অন্য রকম বিপদ। আপনি না শুনলে বুঝবেন না। আগে শুনতে হবে।বেশ শুনছি, তাতে লাভ হবে কি? আপনি অনেকের অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন–আমি অনেক কিছু আপনার সম্পর্কে শুনেছি।
শুনেছেন, খুব ভালো কথা। কী শুনেছেন, জানি না। তবে আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখি, আমার দৌড় খুব সামান্য। আমি অ্যাবনরমেল সাইকোলজি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছি–এই পর্যন্তই।মুনির মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো কথা সে শুনছে বলে মনে হচ্ছে না।
মিসির আলি বললেন, আপনার বাসা কোথায়?……..মুনির তার জবাব দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল। অর্থাৎ সে তার ঠিকানা জানাতে ইচ্ছুক নয়। মিসির আলি চাবানাতে গেলেন। ঘরে কোনো খাবার নেই। বিঙ্কিটটিঙ্কিটজাতীয় কিছু দিতে পারলে ভালো হত। লোকটি ক্ষুধার্তা। হয়তো অফিস শেষ করে সরাসরি চলে এসেছে। কিছু খাওয়া হয় নি। কিংবা বিকেলে কিছু খাবার মতো সামৰ্থ্য নেই। এটি হওয়াই স্বাভাবিক। নিম্ন আয়ের মানুষরা এ-দেশে পশুর জীবনযাপন করে।
মিসির আলি চা নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন। কেউ নেই। দরজা ভেজানো! লোকটি এক ফাঁকে উঠে চলে গিয়েছে। নিঃশব্দ প্ৰস্থান যাকে বলে। মিসির আলি হেসে ফেললেন। এ-জীবনে তিনি অনেক বিচিত্র মানুষ দেখেছেন। তাদের অদ্ভুত আচার-আচরণের সঙ্গে তিনি পরিচিত; এই লোকটির প্রস্থান ঘটনা হিসেবে তেমন অদ্ভুত নয়, তবু বেশ মজার।
তবে নিঃশব্দ প্রস্থানের এই ঘটনার ব্যাখ্যা বেশ সরল। লোকটি যে-বিপদের কথা বলতে এসেছিল, শেষ মুহূর্তে ঠিক করেছে তা সে বলবে না। এ-রকম মনে করারও অনেকগুলি কারণ হতে পারে। প্ৰথম কারণ— সম্ভবত মিসির আলিকে দেখে তার আশাভঙ্গ হয়েছে। মনে হয়েছে, এই লোকটিকে দিয়ে কাজ ভুল।
দ্বিতীয় কারণ-বিপদটা এখন শ্রেণীর যা বলার মতো মনের জোর তার নেই।স্যায়, আসব?…মিসির আলি চমকে উঠলেন। লোকটি ফিরে এসেছে। তার চোখে-মুখে অপ্ৰস্তুত ভঙ্গি। যেন সে বড় ধরনের অপরাধ করে এসেছে। এই অপরাধের জন্যে সে লজ্জিত, অনুতপ্ত।কোথায় গিয়েছিলেন? আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট আনতে গিয়েছিলাম। বেশি কিছু দেবার সামৰ্থ্য স্যার আমার নেই। আমি দরিদ্র মানুষ।তিনি হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট নিলেন।
বেনসন এণ্ড হেজেস, নির্ঘাৎ পঞ্চাশ টাকার মতো খরচ হয়েছে। লোকটি আগের মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখের পাতা পর্যন্ত ফেলছে না।আমাকে কী বলতে এসেছেন, বলুন।লোকটি কিছু বলল না। মিসির আলি সিগারেট ধরিয়ে হালকা স্বরে বললেন, যদি বলতে না-চান বলার দরকার নেই। আসুন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করি। গরম কেমন পড়েছে বলুন।
খুব গরম পড়েছে স্যার।এই প্ৰচণ্ড গরমে ফ্লানেলের শার্ট গায়ে দিয়েছেন কেন? আপনার গরম লাগছে না?আমার আর কোনো ভালো শার্ট নেই। আমি দরিদ্র।দরিদ্র হওয়াতে লজ্জাবোধ করার কিছু নেই। ধনী ব্যক্তিদের বরং লজ্জিত হওয়া উচিত। আপনার চা-ই মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
গরম করে আনব?…………জ্বি-না।লোকটি ঠাণ্ড চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। যেন সে একটি অপ্রিয় দায়িত্ব পালন করছে।আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি কিছু বলবেন? জ্বি স্যার, বলব।বলুন।মুনির চুপ করে আছে। ইনহিবিশন বলে একটা ব্যাপার আছে। এটা হচ্ছে তাই। প্রথম বাধাটি সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মিসির আলির মনে হল, লোকটি নিঃসঙ্গ প্রকৃতির। এক-একা থাকে।
মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস নেই। যা সে বলতে চায়, তা বলার জন্য তাকে প্রচুর সাহস সঞ্চয় করতে হবে। মিসির আদি তাকে সময় দিলেন।বাইরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আকাশ থমথমে দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় আসবে সম্ভবত। আসুক। এই গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না। ইচ্ছা করছে কোনো একটা পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে।
ঘর অন্ধকার। বাতি জ্বালান দরকার। মিসির আলি বাতি জ্বালালেন না। ইনহিবিশন কাটানোর জন্যে অন্ধকার একটা চমৎকার জিনিস।মুনির মূর্তির মতো বসে আছে। সে এবার ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে কথা বলা শুরু করল। তার গলার স্বর মিষ্টি। শুনতে ভালো লাগে। গলার স্বরে কোথাও একটি ধাতব চরিত্র আছে। মেয়েদের গলার স্বরে তা মানিয়ে যায়। পুরুষদের সঙ্গে ঠিক মানায় না।
আমার ডাক নাম টুলু। আমার একটা ছোট্ট বোন ছিল, ওর নাম ছিল নুন্টু টুনু উলটো করলে হয় নুটু। বাবা এই নাম রাখলেন। কারণ ওর স্বভাব ছিল আমার একেবারে উলটো। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব শান্ত প্ৰকৃতির। কারো সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতাম না! কেউ ধমক দিয়ে কিছু বললে সঙ্গে-সঙ্গে কেঁদে ফেলতাম। আর নুটু ছোটবেলা থেকেই হৈচৈ স্বভাবের মেয়ে! আমাদের বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটা জামগাছ ছিল।
নুটু ঐ জামগাছ বেয়ে ছাদে উঠে যেতে পারত। আমাদের বাড়িটা ছিল পুরনো ধরনের, ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না। ছাদে কোনো রেলিং ছিল না! বর্ষাকালের ভেজা ছাদে সে দৌড়াত, লাফালাফি করত। কারো কোনো কথা শুনত না। আমার মা এই জন্যে তাকে খুব মারধোর করতেন। তাতে কোনো লাভ হত না। শেষ পর্যন্ত এক বর্ষাকালে আমার মা কাঠমিস্ত্ৰি লাগিয়ে জামগাছটা কেটে ফেললেন।
এই পর্যন্ত বলতেই মিসির আলি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি তো নিতান্তই পারিবারিক গল্প শুরু করেছেন। আপনার যে-সমস্যা, তা তো আমার মনে হচ্ছে বর্তমান সময়ের সমস্যা। শৈশব থেকে শুরু করেছেন কেন বুঝতে পারছিনা।
এর কি দরকার আছে? ………….জ্বি স্যার, আছে।বেশ, বলুন! আমাদের বাসা ছিল নেত্রকোণায়। বাবা ছিলেন নেত্রকোণা কোটের উকিল। তাঁর খুব পসারছিল। সকালবেলা এবং সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাংলাঘরেমিক্কেল বসে থাকত। কেউ-কেউ রাতে থাকত। তাদের জন্যে আলাদা থালাবাটি ছিল, গামছা ছিল, খড়ম ছিল। মামলা করতে মহিলারাও আসতেন। তাঁদের জায়গা হত।
ভেতরের বাড়িতে। ভেতরের বাড়িতে তাঁদের জন্যেও আলাদা ঘর ছিল। ……আমরা ভাইবোন বাবার দেখা পেতাম না বললেই হয়। আমাদের সঙ্গে কথা বলার মতো অবসর তাঁর ছিল না। তবে রাতে ঘুমুবার সময় আমাদের দুই ভাইবোনকে দুপাশে নিয়ে ঘুমুতেন। অর্ডার দিয়ে বিশাল একটা খাট বানিয়েছিলেন। রেলিংঘেরা খাটা আমরা যাতে গড়িয়ে পড়ে যেতে না পারি। সেই ব্যবস্থা। বাবা আমাদের দু জনের পা তাঁর গায়ের উপর তুলে দিয়ে ঘুমুতেন।
তাঁর ঘুমও ছিল খুব সজাগ। আমরা কেউ পা নামিয়ে ফেললে তিনি সেই পা আবার তুলে দিতেন।…..বাবা খুব খরচে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। আমার মনে আছে, আমাদের দু ভাইবোনের একসঙ্গে আকিকা হয়। আমার বয়স তখন নয়, নুন্টুর সাত।আকিকা উপলক্ষে নেত্রকোণা শহরের প্রায় সবাইকে তিনি নিমন্ত্রণ করেন। দুপুঞ্জ বারটা থেকে খাওয়া শুরু হল, চলল রাত বারটা পর্যন্ত। রান্নার জন্য ডেকচি।
আর আনা হয়েছিল ময়মনসিং থেকে। শম্বুগঞ্জ থেকে এসেছিল হালুইকার। আমার মনে আছে, সারাদিন বাবা অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে ছোটাছুটি করলেন। নিমন্ত্রিত অতিথিদের বললেন, মাঘ মাসে গ্রামের বাড়িতেও একটা অনুষ্ঠান করবেন। গ্রামের লোকদের বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। ওরা মনে কষ্ট পাবে।
টাকা পয়সা তো খরচের ।……….আকিকা উপলক্ষে আমাদের নাম বদলে গেল। আমার নাম হল মনিরুল ইসলাম চৌধুরী। আর নুন্টুর নাম হল ফুলেশ্বরী। নাম নিয়ে খুব আপত্তি উঠল। মীেলানা সাহেব বললেন—এটা হিন্দু নাম। হিন্দু নাম রাখা যাবে না।বাবা বললেন, নামের আবার হিন্দু-মুসলমান কি? এইটা আমার খুব পছন্দের নাম। এই নামই রাখতে হবে।
আপনি আপত্তি করলে অন্য কাউকে ডাকি!…….মৌলানা সাহেব আপত্তি করলেন না। আমরা অসংখ্য বিচিত্র ধরনের উপহারের সঙ্গে নতুন নাম পেলাম। উপহার দিয়ে বাংলাঘরের একটা বিশাল চৌকি ভর্তি হয়ে গেল। পেতলের কলসি, ছাতা, কাসার বাসন, গায়ের চাদরী—এইসব ছিল উপহার। বাবা আকিকার পরপর ঘোষণা করলেন, এখন থেকে এদের ডাকনামে কেউ ডাকবে না। যদি কেউ ডাকে কঠিন শাস্তি হবে।
আমি ক্লাস নাইনে পড়বার সময় বাবা মারা গেলেন!। স্কুল থেকে এসে শুনি বাবা অসুস্থ! সকাল-সকাল কোর্ট থেকে চলে এসেছেন। শুয়ে আছেন তাঁর বিশাল খাটে। মশারি ফেলা। বাবা উহ্ আহ্ করছেন। বাবার মাথার পাশে ঘোমটা দিয়ে মা বসে আছেন। বাবার বন্ধু ইদারিস চাচা বসে আছেন চেয়ারে। তাঁর হাতে পানের বাটা। তিনি একটু পরপর পান মুখে দিচ্ছেন। ইদারিস চাচা বললেন, পেটের নিচে বালিশ দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে থােক। এটা হচ্ছে অম্বলের ব্যথা। বদহজম থেকে হয়েছে।
নিবারণকে খবর দিয়েছি, এসেই ব্যথা নামিয়ে ফেলবে!……নিবারণ হচ্ছেন তখনকার নেত্রকোণার খুব নামী কবিরাজ। তাঁর প্রসার ছিল সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবের চেয়েও অনেক বেশি। নিবারণ কাক এসে এক চামচ আনন্দভৈরব রুস খাইয়ে দিলেন। আনন্দভৈরব রস তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করতে হয়। বিস্তর আয়োজন করে জিনিসপত্র জোগাড় করা হল। হিটুল এক তোলা, গোলমরিচ এক তোলা, সোহাগা এক তোলা, পিপুল চূৰ্ণ এক তোলা, জীরকচূর্ণ এক তোলা এবং শোধিত মিঠা বিষ এক তোলা।…
আনন্দভৈরব রস খাওয়াবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বাবার পেটব্যথা অনেকখানি কমে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন।… রাত এগারটার দিকে তাঁর ঘুম ভাঙিল। তীব্র ব্যথায় তাঁর শরীর কাঁপছে। তিনি কয়েক বার বমিও করলেন। ডেকে বললেন, ওরে বেটি, মরে যাচ্ছি। রে!
আমার সময় শেষ।……..এক জন এমবিবিএস ডাক্তারকে ডেকে আনা হল। ডাক্তার গভীর হয়ে বললেন, এটা তো অ্যাপেণ্ডিসাইটিস। খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। এই মুহূর্তে অপারেশন দরকার! অপারেশন করতে পারেন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। তাও হাসপাতালে সব ব্যবস্থা আছে কি না কে জানে।
সরকারি ডাক্তারের খোঁজে লোকজন ছুটে গেল। তারা ফিরে এল মুখ শুকনো করে। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেব এক ঘন্টা আগে ময়মনসিং রওনা হয়ে গেছেন।… বাবা মারা গেলেন রাত একটা পাঁচশ মিনিটে। … মুনির থামল। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল।
ক্লান্ত গলায় বলল, স্যার, এক গ্লাস পানি দিতে পারেন?….মিসির আলি পানি এনে দিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, মুনির তৃষ্ণার্তের মতো পানির গ্লাসটি শেষ করবে। তা সে করল না। দুই চুমুক দিয়ে রেখে দিল। মুখ বিকৃত করল, যেন তিক্ত স্বাদের কিছু মুখে চলে গিয়েছে।স্যার, আমি উঠি? আপনার যা বলার তা কি বলেছেন? জ্বি-না স্যার, ভূমিকাটা বলেছি। এখন মূল জিনিসটা বলতে পারব, তবে আজ না। আজ আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।
অন্য এক দিন এসে বাকিটা বলব।ঠিক আছে। এখনি উঠবেন?…..জ্বি।বৃষ্টি পড়ছে কিন্তু।অসুবিধা হবে না। আমি খুব কাছেই থাকি।আপনি যাবার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি যে-গল্প বললেন, তার এক জায়গায় আমার একটু খটকা লেগেছে। এই খটকার কারণে আমার ধারণা হচ্ছে গল্পটা বানানো।মুনির বিস্মিত হয়ে তাকাল।
শীতল গলায় বলল, কোথায় খটকা লেগেছে?…আপনি যখন ক্লাস নাইনের ছাত্র তখন আপনার বাবা মারা যান। তার মানে আপনি নিতান্তই বাচ্চা একটি ছেলে। ঘটনাগুলি আপনি ঘটতে দেখেছেন এই পর্যন্তই। অথচ কবিরাজ নিবারণের আনন্দভৈরব রস কিভাবে তৈরি হল তার নিখুঁত বৰ্ণনা দিলেন। হিটুল এক তোলা, গোল মরিচ এক তোলা, সোহাগা এক তোলা … ইত্যাদি। এসব তো আপনার জানার কথা নয়।
এক জন কবিরাজ তাঁর ওষুধ তৈরিতে কি কি অনুপান ব্যবহার করেন তা বলেন না! আর বললেও ক্লাস নাইনের একটি ছেলে তা মুখস্থ করে রাখে না। কাজেই আমার ধারণা, গল্পের এই অংশটি বানানো। একটা অংশ যদি বানান হয়, অন্য অংশগুলিও কেন হবে না?…..মুনির ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বাবার মৃত্যুর পর সবার ধারণা হয়েছিল, কবিরাজ নিবারণ কাকুর অষুধ খেয়ে এটা হয়েছে।
সবাই নিবারণ কাকুকে চেপে ধরল। তিনি অসংখ্যবার বললেন কোন কোন অনুপান দিয়ে তাঁর এই অষুধটি তৈরি হয়েছে। সেই জন্যেই নামগুলি মনে গেথে আছে। এখন কি আপনার কাছে মনে হচ্ছে আমি সত্যি কথা বলছি ? হ্যাঁ, মনে হচ্ছে।তা ছাড়া মিথ্যা কথা বললে আমার গলার স্বর কোপে যেত। চোখের পাতা দ্রুত পড়তে থাকত। কিছুটা ব্লাশ করতাম।
তা কি করেছি?………মিসির আলি হেসে ফেললেন। হাসতে-হাসতেই বললেন, আপনার কথা শুনেছি অন্ধকারে। কাজেই চোখের পাতা দ্রুত পড়ছে কি না, ব্লাশ করছেন কি না—তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তবে গলার স্বর কোঁপে যাচ্ছিল বারবার। তা হচ্ছিল আবেগজনিত কারণে।
মুনির বলল, আপনি স্যার আমাকে তুমি করে বলবেন। আপনি আমার বাবার বয়েসী। আমাকে আপনি করে বললে খুব খারাপ লাগবে।বেশ, এখন থেকে তাই বলব! তুমি একটা ছাতা নিয়ে নাও। ভালোই বৃষ্টি হচ্ছে।ছাতা লাগবে না।মুনির বৃষ্টির মধ্যেই নেমে গেল। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। বৃষ্টির মধ্যে সবাই সাধারণত একটু দ্রুত হাঁটে। সে তাও করছে না। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটছে।
মিসির আলি ছেলেটির প্রতি তীব্র কৌতূহল অনুভব করলেন।মিসির আলি ভেবেছিলেন পরদিনই আবার আসবে। সন্ধ্যাবেল তাঁর একটা বিয়ের দাওয়াত ছিল। সেখানে গেলেন না। কিছু খাবার আনিয়ে রাখলেন। অভূক্ত একটি মানুষকে শুধু এক কাপ চা যেন দিতে না হয়।
সে এল না। তার পরদিনও না। দেখতে- দেখতে এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। মিসির আলির বিশ্বয়ের সীমা রইল না। ছেলেটির তাঁর কাছে না। আসার কোনো কারণ নেই। সে জরুরি কিছু বলতে চায়। তাঁর এক জন ভালো শ্ৰোতা দরকার। ভালো শ্রোতার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন, এবং প্রমাণও করেছেন যে তিনি অত্যন্ত মনোযোগী শ্ৰোতা।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?…….তিনি ছেলেটির গল্প নিয়েও বেশ চিন্তা-ভাবনা করেছেন। ছেলেটি বেশ চমৎকার ভঙ্গিতে স্মৃতিচারণা করেছে। কিন্তু এক জনকে বাদ দিয়ে। সে তার মা সম্পর্কে কিছুই সুভদ্রমহিলা জায়গাছটা কাটিয়ে ফেলেছেন, এইটুকুই শুধু বলা হয়েছে। এর বেশি নয়।
মা সম্পর্কে তার অস্বাভাবিক নীরবতার কারণ কী হতে পারে? একমাত্র কারণ, মাকে সে পছন্দ করেছে। না। স্মৃতিকথা বলবার সময় যাকে আমরা পছন্দ করি না, তার সম্পর্কে কটু কথা বলি। এই ছেলে তাও করছে না। কারণ মাকে সে এককালে পছন্দ করত, এখন করছে না। কেন করছে না, সেই সম্পর্কেও মিসির আলি অনেক ভাবলেন।
মোটামুটিভাবে একটা ঘটনা সাজালেন। ঘটনা এ-রকম দাঁড়াল–……উকিল সাহেবের মৃত্যুর পর খুব সম্ভব এই পরিবারটি গভীর সমূদ্র পড়ল। দেখা গেল উকিল সাহেব তাঁর জীবনে আয়ের চেয়ে ব্যয়ই বেশি করেছেন। শহরে তাঁর প্রচুর দেন। তাঁর আত্মীয়স্বজন, যারা তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় বিশেষ পাত্তা পায় নি। তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সম্পত্তির বিলি-ব্যবস্থা নিয়ে তাদেরকে বিশেষ চিন্তাযুক্ত মনে হতে লাগল।
