নি পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

নি পর্ব:০৪

মবিনুর রহমান নৌকার ছাদে বসে আছেন। নদীতে জোছনা যেন গলে গলে পড়ছে। পৃথিবী তাঁর কাছে এত সুন্দর এর আগে কখনো মনে হয় নি। এই ব্যাপারটাও তার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে। পৃথিবীর সৌন্দর্য নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তিনি কবি নন, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্যের চেয়ে প্রকৃতির নিয়ম-নীতির সৌন্দর্য তাঁকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে। আজ সারাদিন তিনি কিছু খান নি। কারণ ঘরে কোনো খাবার নেই। সব এক সঙ্গে শেষ হয়েছে। হরলিক্সের একটা কোটায় চিড়া ছিল। মুখ খুলে দেখা গেল পোকা পড়ে গেছে।

ডালের টিনে ডাল আছে। দুপুরে একমুঠ ডাল চিবিয়ে খেলেন। নাড়িতুড়ি উল্টে আসার জোগাড় হলো। বিকেল পর্যন্ত তিনি ক্ষিধেয় কষ্ট পেয়েছেন। এখন আর পাচ্ছেন না। ববং এখন মনে হচ্ছে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে হয় ক্ষুধার্ত অবস্থায়। ক্ষুধার্ত মানুষের স্নায়ু থাকে তীক্ষ্ণ। আহারে পরিতৃপ্ত একজন মানুষ ভোঁতা। স্নায়ু নিয়ে তেমন কিছু বোঝে না।রাত নটার দিকে জালালুদ্দিন এসে উপস্থিত হলেন।ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ডাকাডাকি করলেন। কেউ সাড়া দিল না। সাপেব ভয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন না। নদীর দিকে রওনা হলেন। ঘরে যখন নেই। নৌকায় থাকতে পারে। না-কি সাপের কামড়ে ঘরে মরে পড়ে আছে?

দূর থেকে জালালুদিনের মনে হলো নৌকার উপর একটা পাথরের মূর্তি বসে আছে। জীবন্ত মানুষ এইভাবে বসে থাকতে পারে না। সামান্য হলেও নড়াচড়া করে। জালালুদ্দিন ডাকলেন, মবিন, এই মবিন! পাথরের মূর্তি ডাক শুনতে পেল না। জালালুদিনের কেন জানি মনে হচ্ছিল শুনতে পাবে না। চিৎকার করে ডাকলেও এই মানুষ কিছু শুনবে না। গায়ে ঝাঁকি দিয়ে তাকে জাগাতে হবে।তিনি নৌকায় উঠে এলেন।মবিনুর রহমান চমকে উঠে বললেন, আপনি! স্কুলে যাও নাই, খোঁজ নিতে আসলাম। করছ কী?

জ্যোৎস্না দেখছি।কবি-সাহিত্যিকরা জ্যোৎস্না দেখে বলে শুনি–তুমি হলে গিয়ে সায়েন্সের লোক। আজ স্কুলে যাও নাই কেন? শরীব ভালো আছে? জি, শরীর ভালোই আছে।শরীর ভালো তো স্কুলে যাও নাই কেন? সারাদিন করেছ কী? ঘরে বসে ছিলে? জি-না। নৌকায় ছিলাম। কিছু করছিলাম না–এই দৃশ্য-টুশ্য দেখছিলাম।কী দৃশ্য দেখছিলে? সন্ধ্যাবেলা কয়েক ঝাক পাখি উড়ে গেল। দেখতে খুব ভালো লাগল। পাখির ঝাকে একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস লক্ষ করলাম। সব ঝাকে পাখি থাকে বেজোড় সংখ্যা।এর মধ্যে ইন্টারেস্টিং কী?

খুবই ইন্টাবেষ্টিং। পাখিদের নিয়ম হচ্ছে এবং সব সময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে। একটা পুরুষ পাখির সঙ্গে একটা মেয়ে পাখি থাকবেই। কিন্তু ঝাঁকগুলোয় একটা পাখি আছে সঙ্গীহীন। এর কারণটা কী? আর এই নিঃসঙ্গ পাখিটা পুরুষ না মেয়ে এটাও আমার জানার ইচ্ছ। কীভাবে সম্ভব হবে বুঝতে পারছি না। কীভাবে এটা বের করা যায় বলুন তো? জালালুদ্দিন কিছু বললেন না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এই মানুষটিকে তিনি আট বছর ধরে চেনেন। তবু মনে হচ্ছে আট বছরে ঠিকমতো চেনা হয় নি।মবিন।জি।ইয়ে একটা কাজে তোমার কাছে এসেছিলাম।কী কাজ? ফুড ফর ওয়ার্ক প্রোগ্রামে তুমি একবার কিছু গম এনেছিলে মনে আছে?

হ্যাঁ–মনে আছে।কয় বস্তা গম ছিল? দশ বস্তা।তোমার পরিস্কার মনে আছে তো? মনে থাকবে না কেন, আমি নিজে সই করে আনলাম।দশ বস্তাই ছিল? এর বেশি না? বেশি থাকবে কেন? অবশ্যি বস্তা আমি গুনি নাই। হেডসার গুনলেন। আমি শুধু সই করে দিয়েছি।হেড স্যার বস্তা গুনেছিলেন? এইসব জিজ্ঞেস করছেন কেন? এমনি। এমনি জিজ্ঞেস করছি। তোমার ঘরে কি চায়ের ব্যবস্থা আছে? না, আমি তো চা খাই না।

চায়ের একটা বাজে নেশা হয়েছে। বিকালে চা না খেলে ভালো লাগে না। আচ্ছা! আসছি। যখন তোমার চোঙটা দিয়ে আকাশ দেখে ফুই। শনির বলয় দেখা যাবে না? আজ দেখা যাবে না। চাঁদের আলো খুব বেশি।তাহলে থাক। নৌকায় বসে থাকতে তো ভালোই লাগছে। বড় সৌন্দর্য। কোরান মজিদে আল্লাহপাক কী বলেছেন জানো? সুরা কাহাফ-এর সপ্তম পারায় আছে–পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে। আমি সেগুলিকে তার শোভা কবেছি। এই অর্থ ধরলে চন্দ্র হচ্ছে পৃথিবীর শোভা। কি, ঠিক না?

মবিনুর রহমান জবাব দিলেন না। তার মাথায চমৎকার একটা চিন্তা এসেছে। যদি পৃথিবীর আহ্নিক গতি না থাকত তাহলে পৃথিবীব একদিকে থাকত সূর্যের আলো, অন্যদিকে চির অন্ধকার। তখন যদি চাদটার অবস্থান এমন হতো যে, চির-অন্ধকার পৃথিবীতে থাকবে চির-জ্যোৎস্না–তাহলে ব্যাপারটা কী দীড়াত? সেই চির জোৎস্নাব জগতের গাছগুলি নিশ্চয়ই অন্যরকম হতো। মানুষগুলিও হতো অন্যরকম। সেই অন্যরকমটা কী রকম?

জালালুদ্দিন ডাকলেন, মবিন! মবিন জবাব দিলেন না। তার সমস্ত চিন্তা-চেতনায় আছে চির-জ্যোৎস্নার দেশ। ঠিক এই রকম অবস্থায় মবিনুর রহমান দ্বিতীয় স্বপ্নটা দেখলেন। এই স্বপ্ন জাগ্রত অবস্থায্য ঘোরের মধ্যে দেখা। কাজেই তাকে হয়তো স্বপ্ন বলা যাবে না। মবিনুব রহমান স্পষ্ট দেখলেন–অসংখ্য বুড়ো মানুষ তার দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে। তারা এক সঙ্গে বলে উঠল— হচ্ছে, তোমার হচ্ছে। তুমি একজন প্রথম শ্রেণীর নি। তুমি তোমার প্ৰচণ্ড ক্ষমতা ব্যবহার কর।মবিন। এই মবিন! জি।কী হচ্ছে তোমার, এই রকম কবছ কেন? কী করছি? গোঁ গোঁ শব্দ করছিলে।মবিনুর রহমান ক্লান্ত গলায় বললেন,স্বপ্ন দেখছিলাম।স্বপ্ন দেখছিলে মানে? তুমি ঘুমুচ্ছিলে না-কি? মবিনুর রহমান বিব্রত গলায় বললেন, ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে হয়। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

রূপার বড় ভাই রফিক খুব আমুদে মানুষ। হৈ চৈ করতে পছন্দ করে। লোকজন জড়ো করে আড্ডা দেয়ায় তার খুব আগ্ৰহ। সে আসার পর থেকে রূপাদের বাড়িতে প্রচুর লোকজন। আসছে, যাচ্ছে, চা খাচ্ছে। বড় চায়ের কেতলি চুলায় আছেই।বাড়ি-ভর্তি মানুষ, কিন্তু রূপার অস্থিরতা কমছে না। সে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে, পারছে না। মনে হচ্ছে এ জীবনে আর কোনোদিনও সে স্বাভাবিক হতে পারবে না। রফিকের এক গল্প শুনে সে খুব শব্দ করে হাসল। রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, হাসছিস কেন?

রূপা ক্ষীণ গলায় বলল, হাসির গল্প তাই হাসলাম।আমি তো মোটেই হাসির গল্প বলি নি। আমাদের এক কলিগের স্ত্রী কীভাবে এ্যাক্সিডেন্ট করে পঙ্গু হয়ে গেছে, সেই গল্প করলাম। এর মধ্যে হাসির তো কিছু নেই।রূপা চুপ করে রইল। ভাইয়ার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও এখন তার ভয় ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে ভাইয়ার দিকে তাকালেই সে সব কিছু বুঝে ফেলবে।রূপা!জি।তোর কী হয়েছে বল তো? কিছু হয় নি।আমার তো মনে হয় কিছু-একটা হয়েছে। তুই কারো কথাই মন দিয়ে শুনছিস না। তোর মধ্যে একটা ছটফটানি ভাব চলে এসেছে। আগে তো তুই এমন ছিলি না।মানুষ তো বদলায় ভাইয়া।অবশ্যই–বদলায়–এমনভাবে বদলায় না। তুই মাকে ডেকে আন তো, মাকে জিজ্ঞেস করি।তাকে জিজ্ঞেস করার কী আছে?

ডেকে আনতে বলছি, ডেকে আন।রূপা মাকে ডেকে নিয়ে এলো। নিজে সামনে থাকল না। থাকতে ইচ্ছা করল না। সে লক্ষ করেছে তাকে নিয়ে বাড়িতে ঘনঘন বৈঠক হচ্ছে। বৈঠকে এমন কিছু আলোচনা হচ্ছে যেখানে তার উপস্থিতি কাম্য নয়। সবাই নিচু গলায় কথা বলছে–সে কাছে এলেই থেমে যাচ্ছে। এর মানে কী? রূপা বাগানে নেমে গেল। সাত দু বাজতে বেশি বাকি নেই। রূপা নিশ্চিত আজ স্যার আসবেনই। আজ ছতারিখ। ছতারিখ তার জন্যে খুব লাকি। ক্লাস এইটো বৃত্তি পাবার খবর সে পেয়েছিল ছতারিখে। মবিনুর রহমান স্যার প্রথম এ বাড়িতে এসেছিলেনও ছতারিখে। রূপা লক্ষ করল ভাইয়া মার সঙ্গে কথা বলছে এবং আড়চোখে তাকে দেখছে। রূপা এমন ভাব করল যেন সে বাগানের গাছগুলি দেখছে। যদিও গাছপালার প্রতি তার তেমন মমতা নেই।

বারান্দায় জেবা এসে দাঁড়িয়েছে। সে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রূপার দিকে। এই মেয়েটির চোখের দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে যে অস্বস্তি বোধ হয়। মনে হয় এই মেয়েটার দুটা চোখের ভেতরও কয়েকটা চোখ আছে। এক সঙ্গে অনেকগুলি চোখ যেন তাকে দেখে। রূপা জেবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাগান দেখবে জেবা? জেবা হ্যাঁ-না কিছু বলল না, তবে বাগানে নেমে এলো।রূপা বলল, এই বাগানের নাম কী জানো? জংলি বাগান। কোনো যত্ন নেই–গাছপালায় জঙ্গল হয়ে আছে। তাই জংলি বাগান।জেবা কিছু বলল না। এই মেয়েটা একেবারেই কথা বলে না।আমাদের এই জংলি বাগান তোমার কাছে কেমন লাগছে জেবা?

জেবা নিশ্চুপ। যেন সে পণ করেছে কোনো কথা বলবে না। রূপা হাসতে হাসতে বলল, তুমি কি কারো সঙ্গেই কথা বলো না? জেবা হাসল। ঠিক হাসিও না। তার ঠোঁট বাকাল না, তবে চোখে হাসি ঝিলিক খেলে গেল। সে এবার স্পষ্ট গলায় বলল–তুমি কার জন্য অপেক্ষা করছি ফুপু? রূপা চমকে উঠে বলল, কারো জন্যে অপেক্ষা করছি না তো! আমি কারো জন্যে অপেক্ষা করছি এটা তোমার মনে হলো কেন? জেবা এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাগান থেকে উঠে বারান্দায় চলে গেল। রফিক হাসিমুখে বলল, কী মা বাগান ভালো লাগল না? জেবা জবাব দিল না। রফিক আবার বলল, আমাদের এই বাড়ি তোমার পছন্দ হয়েছে তো মা? জেবা এ প্রশ্নের উত্তরেও কিছু বলল না। তাকে আরো প্রশ্ন করা হতে পারে এই ভয়েই হয়তোবা বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

রফিকের মা বললেন, তোর এই মেয়ে বোধহয় আমাদের কাউকে পছন্দ করছে না। কারো কোনো কথার জবাব দেয় না। রফিক বলল, ও এ রকমই মা। কথা বলার ইচ্ছা! হলেই কথা বলবে। ইচ্ছা না হলে বলবে না। খুব সমস্যা করছে। ঢাকায় নিয়ে ডাক্তাব দেখাব।ডাক্তার কী করবে? সাইকিয়াট্রিষ্ট, ওরা এইসব ব্যাপার জানে। বাচ্চারা থাকবে বাচ্চাদের মতো। ওকে দেখ কেমন বড়দের মতো ভঙ্গি করে ঘুরে। ওর কথা বাদ দাও মা। এখন রূপার ব্যাপারটা বলে। ওর হয়েছে কী? কিছু হয় নি তো!আগেও তো বললে কিছু হয় নি। ভালো কবে ভেবে বলো ও কারো প্ৰেমে-ট্রেমে পড়ে নি তো? কী বলিস তুই।আজগুবি কোনো কথা বলছি না মা, রূপার ভাবভঙ্গি আমার ভালো লাগছে না বলেই বলছি। শেষটায় বিয়ে ঠিকঠাক হবার পর দেখা যাবে সে বেঁকে বসেছে।এরকম কিছু নাই।জানো তো ভালোমতো?

জানি।কিন্তু আমার ভালো লাগছে না। রূপাকে দেখ কেমন মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। আগে তো। এ রকম ছিল না।রফিক ঘরের ভেতরে চলে গেল। ছোট মেয়ে রুবাবা তারস্বরে চিৎকার করছে। সে ছাড়া এই মেয়েকে কেউ সামলাতে পারে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এত চিৎকারেও রূপার কোনো ভাবান্তর নেই। যেন সে কিছু শুনছে না। এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছে।রূপা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত বাগানে বসে রইল। বাঁধানো বকুল গাছের নিচে বসার ব্যবস্থা আছে।রফিক বাইরে বেরোতে গিয়ে এই দৃশ্য দেখে বিবক্ত। গলায় বলল,এখনো বাগানে বসে আছিস কেন?

মাথা ধরেছে ভাইয়া। ফ্রেশ বাতাস নিচ্ছি।বর্ষার সময়, সাপখোপ বেরোবে। উঠে আয়।রূপা উঠে এলো। রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, তুই কি কাঁদছিলি না-কি? কাঁদব কেন শুধু শুধু? তোর গাল ভেজা, এই জন্যেই জিজ্ঞেস করছি।কাঁপা শাড়ির আঁচলে গাল মুছতে মুছতে বলল, হ্যাঁ কাঁদছিলাম। মাথার যন্ত্রণায় কাঁদছিলাম। মাঝে মাঝে এমন যন্ত্রণা হয়। মাথাটা কেটে ফেলে দিতে ইচ্ছা করে।সে কী যন্ত্রণা খুব বেশি? হুঁ।ডাক্তাব দেখিয়েছিস? না।তোদের নিয়ে বড় যন্ত্রণা। অসুখ-বিসুখ হবে, ডাক্তাব দেখাবি না? দেশে ডাক্তার আছে কী জন্যে? আচ্ছা। আমি বিধুবাবুকে নিয়ে আসব।কাউকে আনতে হবে না।যা ঘরে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাক। বাতে তোর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।এখন বলো।না এখন না। রাতে বলব। এখন একটা কাজে যাচ্ছি। আর শোন, তোর যদি বিশেষ কোনো কথা বলার থাকে যা আমাকে বা মাকে বলতে লজ্জা পাচ্ছিস তাহলে তোর ভাবিকে বলবি।আমার আবার বিশেষ কী কথা…

থাকতেও তো পারে। এই জন্যই বলছি।রূপা নিজের ঘরে এসে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রইল। তার এখন সত্যি সত্যি মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। অসম্ভব কষ্টও হচ্ছে। আজ ছ তারিখ, কিন্তু স্যার এলেন না। উনার কি কোনো অসুখ-বিসুখ করেছে? মোতালেবকে কি পাঠাবে খোঁজ নিতে? যদি পাঠায় কেউ কি তা অন্য চোখে দেখবে? অন্য চোখে দেখার তো কিছু নেই। একটা লোকের অসুখ-বিসুখ হলে খোঁজ নিতে হবে না!হারিকেন হাতে মিনু ঘরে ঢুকল। কোমল গলায় বলল, তোমার নাকি প্ৰচণ্ড মাথাব্যথা?

হ্যাঁ, ভাবি।মাথায় হাত বুলিয়ে দেব? না, তুমি এখন যাও। আমার একা থাকতে ইচ্ছা করছে। কিছুক্ষণ একা থাকলে মাথা ধরাটা কমবে।এরকম কি তোমার প্রায় হয়? হুঁ।মশারি খাটিয়ে শোও। মশা কামড়াচ্ছে তো।মশা কামড়াচ্ছে না ভাবি, তুমি যাও, হারিকেন নিয়ে যাও–আলো চোখে লাগছে।মিনু হারিকেন নিয়ে চলে যেতে যেতে বলল, তোমার স্যার এসেছিলেন। উনাকে বলেছি আজ পড়তে পারবে না। তোমার মাথাব্যথা। তাকে চলে যেতে বলেছি।রূপা উঠে বসল। তার বুক ধকধক করছে। মনে হচ্ছে, সে নিজেকে সামলাতে পারবে না। সে কাঁপা গলায় বলল, ভাবি উনি কি চলে গেছেন?জানি না। বলেছিলাম তো চ খেয়ে তারপর যেতে। বসেছেন কি-না জানি না।ভাবি প্লিজ, উনাকে একটু বসতে বলো।তোমার মাথাব্যথা?

এখন কমেছে। অনেকখানি কমেছে, জরুরি কিছু পড়া আছে দেখে নিই।কাল আসতে বলি? না ভাবি না।মিনু হারিকেন হাতে চলে গেল। রূপার অস্বাভাবিক আগ্রহ তার চোখ এড়াল না। অবশ্যি সে এটাকে তেমন গুরুত্ব দিল না। এই বয়েসী মেয়েদের আচার-আচরণ কোনো ধরাবাধা পথে চলে না। তাদের আগ্রহ ও অনাগ্রহ কোনোটারই সাধারণত কোনো ব্যাখ্যা থাকে না। এরা চলে সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে।মবিন সাহেবের হাতে দুদিনের পুরনো একটা খববের কাগজ। তিনি গভীব মনোযোগে খবরের কাগজ পড়ছেন। যে অংশটি পড়ছেন সে অংশ কেউ মন দিয়ে পড়বে না। সংবাদ শিরোনাম সিরাজগঞ্জের ধানচামীদের কীটনাশকের জন্যে আবেদন। ধানে পামরী পোকা ধরেছে। সেই পোকা বিনষ্ট করা আশু প্রয়োজন … ..ইত্যাদি, ইত্যাদি। খবরটা দুবার পড়বাব পর তিনি এখন তৃতীয় বারেব মতো পড়ছেন।

তবে ভুরু কুঁচকে আছে। তিনি অপেক্ষা করছেন চায়েব জন্য। অপরিচিত একজন মহিলা তাকে বলে গেছেন, বসুন চা খেয়ে যান। তিনি বসে আছেন। চা এখনো আসছে না। রূপার মাথাব্যথা। সে আজ পড়বে না। শুনে তিনি খানিকটা স্বস্তি বোধ করছেন। কারণ তাঁর মন ভালো না, পড়াতে ইচ্ছা করছে না। শুধু মন না-শরীরটাও খারাপ। পরপর তিন রাত ঘুম হয় নি। দিনের বেলা ঘুমোতে চেষ্টা করেন, লাভ হয় না। খানিকটা ঝিমুনির মতো আসে খুঁটিখাট শব্দে ঝিমুনি কেটে যায়। বাজারে এসেছিলেন ঘুমের ওষুধ কিনতে, ফেরার পথে ভাবলেন রূপার পড়াশোনার খোঁজ নিয়ে যাবেন।

একজন শিক্ষক সব সময় যে পড়া দেখিয়ে দেবেন তা তো না। মাঝে মাঝে তার উপস্থিতিই যথেষ্ট।মবিন সাহেব খবরের এই অংশ তৃতীয়বার পড়া শেষ করে দরজার দিকে তাকালেন। দশ-এগারো বছরের এক বালিকা পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে চেষ্টা করছে যেন তাকে দেখা না যায়। দেখা যাচ্ছেও না, তবে পর্দার ফাঁক দিয়ে তার উজ্জ্বল চোখ দেখা যাচ্ছে।মবিন সাহেব বললেন, তুমি কে? মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি কেউ না।এ উত্তর মবিন সাহেবের পছন্দ হলো। মেয়েটা ভালোই বলেছে সে কেউ না। হুঁ আর ইউ? আই অ্যাম নো বডি। বাহ ভালো তো!

তোমার নাম কী? জেবা।জবা? বাহ্‌ সুন্দর নাম! জবা না জেবা।ও আচ্ছা, জেবা। পর্দার আড়ালে কেন? কাছে আসি গল্প করি।মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে চলে গেল।মবিন সাহেব খুশিই হলেন। মেয়েটি গল্প করার জন্যে এগিয়ে এলে সমস্যা হতো। তিনি একেবারেই গল্প করতে পারেন না। তাছাড়া এই বয়েসী মেয়েরা কোন ধরনের গল্প শুনতে চায়। তাও জানেন না। তিনি চতুর্থ বারের মতো ধান গাছের পোকা বিষয়ে খবর পড়তে শুরু করলেন; কিছুতেই এটা মাথা থেকে সরাতে পারছেন না।চা নিয়ে রূপা ঢুকল! শুধু চা না–এক বাটি মুড়ি। মুড়ির উপর তিনটা ভাজা শুকনা মরিচ।স্যার কেমন আছেন? ভালো।এতদিন আসেন নি কেন?

 

Read more

নি পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *