রিণরিণে গলায় বলল, লিচু চোর। লিখেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কিছুদূর। আবৃত্তি করেই সে গণ্ডগােল করে ফেলল। আবার শুরু করল গণ্ডগােল – আগের জায়গায় এসে আবারাে গণ্ডগােল। তারিনী বাবু ছেলেকে হাত ইশারায় ডাকলেন। সে কাছে এগিয়ে আসতেই, প্রচণ্ড চড় কষিয়ে বললেন – গাধা। যা পিছনে কানে ধরে বসে থাক।
শওকত সাহেব খুবই মন খারাপ করে লক্ষ্য করলেন ছেলেটি সত্যি সত্যি সবার পেছনে কানে ধরে চুপচাপ বসে আছে। তিনি এই স্কুলে আসার কারণে বাচ্ছা একটি ছেলে লজ্জিত ও অপমানিত হল।
অনুষ্ঠান শেষে হেডমাস্টার সাহেব ঘােষণা করলেন — মহান অতিথির এই স্কুলে পদার্পন উপলক্ষ্যে আগামী বুধবার স্কুল বন্ধ থাকবে।
আজ লিখতে খুব ভাল লাগছে।
কলম চলছে দ্রুত গতিতে। আকাশ মেঘলা। অল্প অল্প বাতাস দিচ্ছে। সেই বাতাসে বজরা দুলছে। এই দুলুনীর সঙ্গে কোথায় যেন লেখার খানিকটা মিল আছে। ঘুঘু ডাকছে। ঘুঘু নামের এই বিচিত্র পাখি সকালে বা সন্ধ্যায় কেন ডাকে ? বেছে বেছে ক্লান্ত দুপুরে ডেকে দুপুরগুলিকে কেমন অন্য রকম করে দেয়।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাণ্ড এক ছাতিম গাছের গুড়ির সঙ্গে নৌকা বাধা। বজরার জানালা থেকে ছাতিম গাছের ডালপালা এবং তার ফাক দিয়ে দূরের আকাশ দেখা যায়। শওকত সাহেব লেখা থামিয়ে ছাতিম গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার হঠাৎ মনে হল – বৃক্ষরাজি সব সময় আকাশ স্পর্শ করতে চায়। তারা সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। মানুষ চায় মাটি এবং জলের কাছাকাছি থাকতে। তিনি খুব কম মানুষকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছেন —।
“স্যার আপনের খাওয়া। বাবু টিফিন ক্যারিয়ার হাতে উঠে এসেছে। তিনি আকাশের কাছ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। বাবু হাঁটুর উপর লুঙ্গী তুলে
কালাে গেঞ্জী গায়ে চলে এসেছে। কি কুৎসিত ছবি।
‘আজ স্যার গােমাংস। বৃষ্টি বাদলার দিনতাে খাইয়া আরাম পাইবেন। ধুম বৃষ্টি হইব, আসমানের অবস্থা দেখেন।
‘তুমি টিফিন ক্যারিয়ার রেখে যাও। আমি খেয়ে নেব। ‘উপস্থিত থাইকা আপনেরে খাওয়াইতে বলছে। ‘কে বলেছে। পুষ্প ?” ‘পুষ্প ছাড়া আর কে? শেষ বাটির মধ্যে দৈ মিষ্টি আছে। ‘তুমি খেয়েছ? ‘জ্বি না। আপনের খাওয়া শেষ হইলে পুষ্প আর আমি খাইতে বসব।
আজ তিন দিন হল পুষ্পের সঙ্গে তার দেখা নেই। তার পক্ষে কাদা ভেঙ্গে বজরায় আসা অবশ্যি কষ্টকর, তবু ইচ্ছে করলে সে কি আর আসতে পারত না?
অবশ্যই পারত।
‘স্যার কি ‘মঠ’ দেখতে গেছিলেন ? ‘হ্যা।
‘আমি গতকাল পুষ্পেরে নিয়া গেলাম। ঢুকলাম ভিতরে। পুষ্প না করতেছিল – সাপখােপ থাকতে পারে। আমি বললাম, ভয়ের কিছু নাই। আমি সাপের বাবা সর্পরাজ। হা–হা–হা
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
“কি দেখলে?” ‘আরে দূর দূর – কিছু না – শিয়ালের গু ছাড়া কিছু নাই।।
শওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে খেতে বসলেন। যত তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করা যাবে তত তাড়াতাড়ি এই আপদ বিদেয় হবে।
‘স্যার আইজ কয় পৃষ্ঠা লেখলেন?” ‘লিখেছি কয়েক পৃষ্ঠা। ‘লেখা শেষ? ‘না। কিছুটা বাকি আছে। ‘এত লেখালেখি করেন আঙুল ব্যাথা করে না?” তিনি চুপ করে রইলেন। কথাবার্তা চালানাের কোন অর্থ হয় না।
‘আমি স্যার পরীক্ষার হলে তিন ঘন্টা লেখি তারপরে আঙুলের যন্ত্রণায় অস্থির হই। আঙুল যদি দাঁতের মত বাঁধানাের ব্যবস্থা থাকত তা হইলে লেখকরা সব আঙুল বাধিয়ে ফেলত। কেউ রূপা দিয়া কেউ সােনা দিয়া। ঠিক বললাম না। স্যার?
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
‘হ্যা ঠিক। ‘আপনে কি দিয়া বাধাইতেন? সােনা না রূপা ?” ‘বাবু। “জ্বি। ‘খাওয়ার সময় কথা বলতে আমার ভাল লাগে না। ‘জানতাম না স্যার।
কথা শুনতেও ভাল লাগে না। ‘আর কথা বলব না স্যার। কি লেখলেন একটু পইড়া দেখি। ‘না। লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কাউকে পড়তে দেই না।
বাবু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, পড়লেও কিছু বুঝব না। স্যার আপনি — লালুভুলু পড়েছেন? একটা হীট বই – চোখের পানি রাখা মুশকিল। আমি যতবার পড়ি ততবার কাদি।
শওকত সাহেব খাওয়া বন্ধ করে উঠে পড়লেন। ‘খাওয়া হয়ে গেল?
‘কিছুই তাে খান নাই। গাে–মাংস ভাল লাগে না স্যার?”
‘লাগে। আজ খেতে ইচ্ছা করছে না। তুমি এখন টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে যাও।
‘ভি আচ্ছা।
শওকত সাহেব খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তুমি পুষ্পকে একবার এখানে আসতে বলতাে।
‘কখন আসতে বলব, এখন?” ‘এক সময় এলেই হবে। ‘সন্ধ্যার সময় আমি সাথে করে নিয়ে আসব। কোন অসুবিধা নাই।
থাক সন্ধ্যায় আসার দরকার নাই।
Read more
