নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

থাকার জায়গা আহামরি ধরনের হবে জাতীয় ধারণা শওকত সাহেবের ছিল নাঅজ পাড়াগায়ে রাজপ্রাসাদ থাকার কোনই কারণ নেইতবে বজলুর রহমান যিনি এই জায়গার খোজ তাঁকে দিয়েছেন, তিনি বার তিনেক উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছেন, আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন

নীল অপরাজিতা

এত সুন্দর বাড়ি যে কল্পনাও করতে পারবেন নাশওকত সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, তাজমহল ধরনের বাড়ি

তাজমহলতাে বাড়ি নাতাজমহল হচ্ছে কবরখানামমতাজ মহলের কবরআপনাকে যে বাড়িতে পাঠাচ্ছি সেটা গৌরীপুর মহারাজার বর্ষা মন্দির। বামন্দির মানে

শীতের সময় কাটানোর জন্যে মহারাজার একটা বাড়ি ছিলসেটার নাম শীতমন্দিরতেমনি বর্ষাকাল কাটানাের জন্যে একটা বাড়ি তার নাম বর্ষা মন্দিরদোতলা বাড়িবৃষ্টির শব্দ যাতে শােনা যায় সে জন্যে বাড়ির ছাদ টিনেরবৃষ্টি দেখার জন্যে বিরাট টানা বারান্দাউত্তরেও বারান্দা, দক্ষিণেও বারান্দাউত্তরের বারান্দায় দাড়ালে গারাে পাহাড় দেখা যায়দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়ালে দেখবেন সােহাগী নদী। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

কি নদী? সােহাগী নদীবর্ষাকালে যাবেন, নদী থাকবে কানায় কানায় ভরাবৃষ্টির ফোটা নদীতে পড়লে কী যে সুন্দর দেখা যায় তা বাড়ির বারান্দায় না দাড়ালে বুঝবেন নাবাড়িটার চারদিকে কদমের গাছবর্ষাকালে কদম ফুলে গাছ ছেয়ে যায় সে এক দেখার মত দৃশ্যবাংলাদেশের কোথাও একসঙ্গে এতগুলি কদমের গাছ দেখবেন না। 

শওকত সাহেব খুব একটা উৎসাহ বােধ করলেন নাবজুলুর রহমানের কোন কথায় উৎসাহী হয়ে ওঠা ঠিক নাভদ্রলােক মাথা খারাপ ধরনেরনিজেকে মহাকবি হিসেবে পরিচয় দেনশােনা যায় সতের বছর বয়সে বঙ্গ বন্দনা নামে মহাকাব্য লেখা শুরু করেছিলেনশেষ করেছেন চল্লিশ বছর বয়সেএখন কারেকশান চলছেদশ বছর হয়ে গেল, কারেকশান শেষ হয় নি। 

মহাকবি বজলুর রহমান অদ্ভুত, অসাধারণ, পাগল হয়ে যাবার মতবিশেষণ ছাড়া কথা বলতে পারেন না। একবার গুলশানের এক বাড়িতে বাগান বিলাস গাছ দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে ফিরলেনচোখ বড় বড় করে বললেন, এই জিনিস না দেখলে জীবন বৃথাইন্দ্রপূরীর বাগান বিলাসও এর সামনে দাড়াতে পারবে নালাল রঙের যে টা শেড আছে তার প্রতিটি গাছের পাতায় আছেবেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

তাকিয়ে থাকলে বুকে ব্যথা করেএ্যাবসুলিউট বিউটি সহ্য করা মানুষের পক্ষে খুবই কঠিনবুঝলেন ভাই সাহেব গাছটার সামনে দাড়িয়ে মনে হল, পাগল হয়ে যাব। 

পাগলতাে আছেনইনতুন করে কি আর হবেন? ঠাট্টা না ভাইসতি বলছিএকদিন আমার সঙ্গে চলুনআপনার দেখা উচিত। 

শওকত সাহেব মহাকবিকে সঙ্গে নিয়ে একদিন গেলেনবাড়ির সামনে দাড়িয়ে বললেন, আপনি কি নিশ্চিত এই সেই বিখ্যাত ইন্দ্রপুরীর গাছ ? মহাকবি মাথা চুলকে বললেন, জি এইটাই সেই বাগানবিলাসতবে আজ অবশ্যি সেদিনের মত লাগছে নাব্যাপারটা কি বুঝতে পারছি নাSomething is definitely wrong.  শওকত সাহেব ধরেই নিয়েছেন বর্ষা মন্দির, বাগানবিলাসের মতই হবেবাড়ির সামনে দাড়িয়ে তিনিও মহাকবির মত বলতে বাধ্য হবেন Something is definitely wrong. তবে সােহাগী নামের নদী তাকে খানিকটা আকর্ষণ করল। 

শুধু নামটির কারণে এই নদী একবার দেখে আসা যায়। 

মহাকবি বললেন, আপনি গরীবের কথাটা রাখুনকয়েকটা দিন বাড়িতে থেকে আসুনস্বর্ণবাসের অভিজ্ঞতা হবেআপনার লেখা অন্য একটা ডাইমেনশন পেয়ে যাবেবাড়ি সম্পর্কে যা বলেছি তার ষােল আনা যদি না পান নিজের হাতে আমার কান দুষ্টা কেটে নেড়ি কুত্তা দিয়ে খাইয়ে দেবেনআমি কিছুই বলব না। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

যদি যাই খাওয়াদাওয়া কোথায় করব? বাবুর্চি সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে? কিছুই নিয়ে যেতে হবে নাময়নাতলা স্কুলের এ্যাসিসটেন্ট হেডমাষ্টার 

সাহেবকে আমি একটা চিঠি দিয়ে দেবখুবই মাই ডিয়ার লােকযা করার সেই করবেএবং যে দিন থাকবেন আপনাকে মাথায় করে রাখবে। তিনি ময়নাতলায় মহাকবির ব্যবস্থা মতই এসেছেন। 

মহাকবি তাঁকে ট্রেনে তুলে দিতেও এসেছিলেনময়নাতলা জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে আরেকবার উচ্ছ্বসিত হলেনতবে ট্রেন ছড়িবার আগ মুহূর্তে লজ্জিত গলায় বললেন, ভাই আপনাকে একটা রং ইনফরমেশন দিয়েছিনদীটার নাম সােহাগী নাআসলে নদীটার কোন নাম নেইসবাই বলে ছােট গাঙসােহাগী নামটা আমার দেয়া। 

শওকত সাহেব হেসে ফেলে বললেন, কদমের বনও নিশ্চয়ই নেই? আপনার কল্পনা। 

মহাকবি উত্তেজিত গলায় বললেন, আছেঅবশ্যই আছেনদীর নাম ছাড়া বাকি সব যেমন বলেছি তেমনযদি এক বিন্দু মিথ্যা হয়, আমার কান দুটা কেটে কুত্তা দিয়ে খাইয়ে দেবেনআমি বাকি জীবন ভ্যানগগের মত কান মাফলার দিয়ে বেঁধে ঘুরে বেড়াবঅনেস্টনদীর নামের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি ক্ষমা প্রার্থনা করছিনামতে বড় না, জিনিসটাই বড়অসাধারণ নদী, একবার সামনে দাঁড়ালে পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছা করে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

 বাড়ির সামনে শওকত সাহেব বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছেনপাগল হয়েযাবার মত কিছুই দেখছেন নাঅতি পুরাতন জরাজীর্ণ দোতলা ভবনছাদ ধ্বসে গেছে কিংবা ভেঙ্গে পড়েছে বলে পরবর্তি সময়ে টিন দেয়া হয়েছেটানা বারান্দা ঠিকই আছে তবে রেলিং জায়গায় জায়গায় ভেঙ্গে পড়েছেবারান্দায় হাঁটাহাঁটি করা বিপদজনক হতে পারেবর্ষাকাল, বৃষ্টির পানিতে বারান্দা পিচ্ছিল হয়ে আছে। 

শওকত সাহেব বললেন, এটাই কি বর্ষামন্দির

করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনার কথা কিছু বুঝলাম না স্যারবর্ষামন্দির বলছেন কেন

বাড়িটা কি গৌরীপূরের মহারাজার ? 

জ্বি না

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *