থাকার জায়গা আহামরি ধরনের হবে এ জাতীয় ধারণা শওকত সাহেবের ছিল না। অজ পাড়াগায়ে রাজপ্রাসাদ থাকার কোনই কারণ নেই। তবে বজলুর রহমান যিনি এই জায়গার খোজ তাঁকে দিয়েছেন, তিনি বার তিনেক উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছেন, আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন।

এত সুন্দর বাড়ি যে কল্পনাও করতে পারবেন না। শওকত সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, তাজমহল ধরনের বাড়ি?
‘তাজমহলতাে বাড়ি না। তাজমহল হচ্ছে কবরখানা। মমতাজ মহলের কবর। আপনাকে যে বাড়িতে পাঠাচ্ছি সেটা গৌরীপুর মহারাজার বর্ষা মন্দির। ‘বা–মন্দির মানে?
‘শীতের সময় কাটানোর জন্যে মহারাজার একটা বাড়ি ছিল। সেটার নাম শীত–মন্দির। তেমনি বর্ষাকাল কাটানাের জন্যে একটা বাড়ি তার নাম বর্ষা মন্দির। দোতলা বাড়ি। বৃষ্টির শব্দ যাতে শােনা যায় সে জন্যে বাড়ির ছাদ টিনের। বৃষ্টি দেখার জন্যে বিরাট টানা বারান্দা। উত্তরেও বারান্দা, দক্ষিণেও বারান্দা। উত্তরের বারান্দায় দাড়ালে গারাে পাহাড় দেখা যায়। দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়ালে দেখবেন – সােহাগী নদী।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
‘কি নদী? ‘সােহাগী নদী। বর্ষাকালে যাবেন, নদী থাকবে কানায় কানায় ভরা। বৃষ্টির ফোটা নদীতে পড়লে কী যে সুন্দর দেখা যায় তা ঐ বাড়ির বারান্দায় না দাড়ালে বুঝবেন না। বাড়িটার চারদিকে কদমের গাছ। বর্ষাকালে কদম ফুলে গাছ ছেয়ে যায় — সে এক দেখার মত দৃশ্য। বাংলাদেশের কোথাও একসঙ্গে এতগুলি কদমের গাছ দেখবেন না।
শওকত সাহেব খুব একটা উৎসাহ বােধ করলেন না। বজুলুর রহমানের কোন কথায় উৎসাহী হয়ে ওঠা ঠিক না। ভদ্রলােক মাথা খারাপ ধরনের। নিজেকে মহাকবি হিসেবে পরিচয় দেন। শােনা যায় সতের বছর বয়সে বঙ্গ বন্দনা নামে মহাকাব্য লেখা শুরু করেছিলেন। শেষ করেছেন চল্লিশ বছর বয়সে। এখন কারেকশান চলছে। দশ বছর হয়ে গেল, কারেকশান শেষ হয় নি।
মহাকবি বজলুর রহমান — “অদ্ভুত, অসাধারণ, পাগল হয়ে যাবার মত” বিশেষণ ছাড়া কথা বলতে পারেন না। একবার গুলশানের এক বাড়িতে বাগান বিলাস গাছ দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে ফিরলেন। চোখ বড় বড় করে বললেন, এই জিনিস না দেখলে জীবন বৃথা। ইন্দ্রপূরীর বাগান বিলাসও এর সামনে দাড়াতে পারবে না। লাল রঙের যে ক‘টা শেড আছে তার প্রতিটি ঐ গাছের পাতায় আছে। বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় ।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
তাকিয়ে থাকলে বুকে ব্যথা করে। এ্যাবসুলিউট বিউটি সহ্য করা মানুষের পক্ষে খুবই কঠিন। বুঝলেন ভাই সাহেব গাছটার সামনে দাড়িয়ে মনে হল, পাগল হয়ে যাব।
‘পাগলতাে আছেনই। নতুন করে কি আর হবেন? ঠাট্টা না ভাই। সতি বলছি। একদিন আমার সঙ্গে চলুন। আপনার দেখা উচিত।
শওকত সাহেব মহাকবিকে সঙ্গে নিয়ে একদিন গেলেন। বাড়ির সামনে দাড়িয়ে বললেন, আপনি কি নিশ্চিত এই সেই বিখ্যাত ইন্দ্রপুরীর গাছ ? মহাকবি মাথা চুলকে বললেন, জি এইটাই সেই বাগানবিলাস। তবে আজ অবশ্যি সেদিনের মত লাগছে না। ব্যাপারটা কি বুঝতে পারছি না। Something is definitely wrong. শওকত সাহেব ধরেই নিয়েছেন বর্ষা মন্দির, বাগানবিলাসের মতই হবে। বাড়ির সামনে দাড়িয়ে তিনিও মহাকবির মত বলতে বাধ্য হবেন – Something is definitely wrong. তবে সােহাগী নামের নদী তাকে খানিকটা আকর্ষণ করল।
শুধু নামটির কারণে এই নদী একবার দেখে আসা যায়।
মহাকবি বললেন, আপনি গরীবের কথাটা রাখুন। কয়েকটা দিন ঐ বাড়িতে থেকে আসুন। স্বর্ণবাসের অভিজ্ঞতা হবে। আপনার লেখা অন্য একটা ডাইমেনশন পেয়ে যাবে। বাড়ি সম্পর্কে যা বলেছি তার ষােল আনা যদি না পান নিজের হাতে আমার কান দুষ্টা কেটে নেড়ি কুত্তা দিয়ে খাইয়ে দেবেন। আমি কিছুই বলব না।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
‘যদি যাই খাওয়া–দাওয়া কোথায় করব? বাবুর্চি সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে? কিছুই নিয়ে যেতে হবে না। ময়নাতলা স্কুলের এ্যাসিসটেন্ট হেডমাষ্টার
সাহেবকে আমি একটা চিঠি দিয়ে দেব। খুবই মাই ডিয়ার লােক। যা করার সেই করবে। এবং যে ক’দিন থাকবেন আপনাকে মাথায় করে রাখবে। তিনি ময়নাতলায় মহাকবির ব্যবস্থা মতই এসেছেন।
মহাকবি তাঁকে ট্রেনে তুলে দিতেও এসেছিলেন। ময়নাতলা জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে আরেকবার উচ্ছ্বসিত হলেন। তবে ট্রেন ছড়িবার আগ মুহূর্তে লজ্জিত গলায় বললেন, ভাই আপনাকে একটা রং ইনফরমেশন দিয়েছি। নদীটার নাম সােহাগী না। আসলে নদীটার কোন নাম নেই। সবাই বলে “ছােট গাঙ”। সােহাগী নামটা আমার দেয়া।
শওকত সাহেব হেসে ফেলে বললেন, কদমের বনও নিশ্চয়ই নেই? আপনার কল্পনা।
মহাকবি উত্তেজিত গলায় বললেন, আছে। অবশ্যই আছে। নদীর নাম ছাড়া বাকি সব যেমন বলেছি তেমন। যদি এক বিন্দু মিথ্যা হয়, আমার কান দুটা কেটে কুত্তা দিয়ে খাইয়ে দেবেন। আমি বাকি জীবন ভ্যানগগের মত কান মাফলার দিয়ে বেঁধে ঘুরে বেড়াব। অনেস্ট। নদীর নামের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি – ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নামতে বড় না, জিনিসটাই বড়। অসাধারণ নদী, একবার সামনে দাঁড়ালে পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছা করে।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
বাড়ির সামনে শওকত সাহেব বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। পাগল হয়ে। যাবার মত কিছুই দেখছেন না। অতি পুরাতন জরাজীর্ণ দোতলা ভবন। ছাদ ধ্বসে গেছে কিংবা ভেঙ্গে পড়েছে বলে পরবর্তি সময়ে টিন দেয়া হয়েছে। টানা বারান্দা ঠিকই আছে – তবে রেলিং জায়গায় জায়গায় ভেঙ্গে পড়েছে। বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করা বিপদজনক হতে পারে। বর্ষাকাল, বৃষ্টির পানিতে বারান্দা পিচ্ছিল হয়ে আছে।
শওকত সাহেব বললেন, এটাই কি বর্ষা–মন্দির?
করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনার কথা কিছু বুঝলাম না স্যার। বর্ষামন্দির বলছেন কেন?
‘বাড়িটা কি গৌরীপূরের মহারাজার ?
‘জ্বি না।
Read more