খালেক বলল, ঘর সাজানো আমার স্ত্রীর ডিপার্টমেন্ট। নিজের বাড়িতে যখন ঢুকি তখন মনে হয় নাটকের সেটে ঢুকে পড়েছি। বিশ্ৰী লাগে। নিজের ঘরে ঢুকব, জুতা খুলে একদিকে ফেলব, শার্ট আরেক দিকে ফেলব। তখনই না মজা।খালেকের স্ত্রী শামা ঘরে ঢুকে জোয়ার্দারকে অস্বস্তিতে ফেলে বলল, আপনার মতো পুণ্যবান মানুষ আমার বাড়িতে, আজ আমার ঈদ। বলেই কদম বুসি করল। মেয়েটি শ্যামলা, অপরূপ মুখশ্ৰী। চোখ মায়ায় টলমল করছে।
জোয়ার্দার থতমত খেয়ে গেলেন। কী বলবেন ভেবে পেলেন না। কথার পিঠে কথা তিনি বলতে পারেন না।খালেক বলল, স্যার রাতে খাবেন। ফ্রিজে কিছু আছে? না থাকলে ড্রাইভার পাঠিয়ে আনাও। বৃষ্টি বাদলার দিনে ইলিশ ফ্রাই জমবে। মোরগ পোলাও ইলিশ ফ্রাই।শামা বলল, তোমার স্যার কে আমি আমার খাবার খাওয়াব। তোমার কিছু না।জোয়ার্দার অবাক হয়ে বললেন, দুজনের খাবার আলাদা নাকি?
শামা বলল, জি। ওর ঈগারের খাবার আমি খাই না। বাবার কাছ থেকে আমি কিছু টাকা পেয়েছি। আমি ওই টকায় বাজার করি। ওর ফ্রিজ আলাদা। আমারটা আলাদা আমি নিজের খাবার নিজে খাই। আমার বাবাও ছিলেন। আপনার মতো সন্ন্যাসী টাই মানুষ। সেই অর্থে আমি সন্ন্যাসীর মেয়ে। আমি রান্নার জাগাড় দেখছি। তুমি তোমার স্যারের সঙ্গে গল্প করো। আধঘণ্টার মধ্যে নাশতার ব্যবস্থা করছি। স্যার, আপনি গোসল করবেন না?
জোয়ার্দার অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। অফিস থেকে ফিরে দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করা তার অনেক দিনের অভ্যাস। অন্যের বাড়িতে নিশ্চয়ই এটা করা যায় না।শামা বলল, স্যার, আমার বাবাকে দেখেছি অফিস থেকে ফিরেই অনেক সময় নিয়ে গোসল করতেন। তামার ধারণা, আপনিও তা-ই করেন।জোয়ার্দার বললেন, হুঁ।বাথরুমে সব কিছু আছে। আমি পরিষ্কার লুঙ্গি দিচ্ছি। আমার বাবার লুঙ্গি।জোয়ার্দার বললেন, দরকার নাই।শামা বলল, অবশ্যই দরকার আছে। আপনি বাথরুমে ঢুকুন, আমি নাশতার জোগাড় দেখি।
শামা চলে যেতেই খালেক বিরক্ত গলায় বলল, কথায় কথায় সন্ন্যাসী বাবা। সন্ন্যাসী বাবা। অস্থির হয়ে গেছি। কয়েকবার বলেছি তুমিও সন্ন্যাসী হয়ে যাও। পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো গুহা খুঁজে বের করি, গুহায় দাখিল হয়ে যাও। গুহার ভেতর হাগা মুতা কর। জংলী মশার কামড় খাও। সন্ন্যাসী বাবার কাণ্ডটা শুনুন স্যার। ঢাকা শহরে দুটা বাড়ি, দুটাই দান করে দিয়েছে। একটা মাত্র মেয়ে সে কিছু পায় নাই। নগদ কিছু টাকা দিয়ে খালাস। সেই টাকার পরিমাণ কত তাও জানি না। আমি তো সন্ন্যাসী না। আমাকে বলবে কেন? জোয়ার্দার কথা ঘোরাবার জন্য বললেন, আপনার মেয়ে কোথায়?
সে তার ছোট চাচার বাড়িতে। মেয়ের মধ্যেও সন্ন্যাসী ভাব দেখা দিয়েছে। আমি দুষ্ট লোক, আমার সঙ্গে কথা বলে না বললেই চলে। তার মা আমার গাড়িতে উঠে না বলে মেয়েও উঠে না। লোন করে গাড়ি কিনেছি, লোনের কাগজপত্ৰ দেখিয়েছি, তাতেও লাভ হয় নাই। স্যার, যান গোসল করে আসুন। আমার স্ত্রী একবার যখন মুখ দিয়ে গোসলের কথা বের করেছে। তখন গোসল করতেই হবে। বাথরুমে যদি না যান, বালতিতে করে পানি এনে মাথায় ঢেলে দেবে। সন্ন্যাসি বাবার মেয়ের নাড়ি নক্ষত্র আমি চিনি।
রাত নটার মধ্যে খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। শামা বলল, স্যার, আপনার কি পান খাওয়ার অভ্যাস আছে? জোয়ার্দার বললেন, না।শামা বলল, আপনার তো খালি বাসা। একা বাসায় থেকে কী করবেন? এখানে থেকে যান।জোয়ার্দার মনে করতে পারলেন না তাঁর বাসা যে খালি এই খবর এদের দিয়েছেন কি না। দেবার তো কথা না।শামা বলল, বাইরে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে স্যার, থেকে যান। গেস্ট রুম রেডি করে দিই? খালেক বলল, স্যারের বাড়িতে কেউ নাই?
জোয়ার্দার বললেন, না। ওরা কক্সবাজার বেড়াতে গেছে। সেখান থেকে গেছে সেন্টমার্টিন। কাল পরশু চলে আসবে।খালেক স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যারের বাড়ি যে খালি এই খবর তুমি কিভাবে জানলে? স্যার তোমাকে বলেছেন? কখন বললেন? শামা জবাব না দিয়ে উঠে গেল।খালেক বিরক্ত গলায় বলল, বাড়িতে মহিলা পীর নিয়ে বাস করি। না বলতেই ঘটনা জানে। বাড়ি তো না, হুজরাখানা। স্যার বুঝলেন, মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে বনে জঙ্গলে চলে যাই।
শামা অনেক চেষ্টা করেও জোয়ার্দারকে থেকে যাবের জন্য রাজি করাতে পারল না।খালেকের ড্রাইভার তাকে নামিয়ে দিতে গেল। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। রাস্তাঘাটে পানি উঠে গেছে। গাড়ি কিছুদূর যাবের পরই ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলল, স্যার, একটা কথা বলি? যদি মনে কিছু না নেন।বলো।অপরাধ নিবেন না স্যার।না অপরাধ নিব না।রাস্তায় পানি উঠে গেছে। পানির ভিতর দিয়ে গাড়ি নিয়ে গেলে ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাবে। আমার চাকরি চলে যাবে।আমি কি এখানে নেমে যাব? নামলে ভালো হয় স্যার।গাড়িতে কি ছাতা আছে? জি না।
জোয়ার্দার বৃষ্টির মধ্যেই নেমে গেলেন। গাড়ি হুস করে তাকে পুরোপুরি ভিজিয়ে দিয়ে বের হয়ে গেল। জোয়ার্দার মহা ঝামেলায় পড়লেন। চারদিক অন্ধকার। তিনি কোথায় আছেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। বৃষ্টিও নেমেছে আকাশ ভেঙে। তিনি ফুটপাত ধরে এগোচ্ছেন। কিছুদূর যেতেই রাস্তা দুই ভাগ হয়ে গেল। এখন তিনি কোন দিকে যাবেন? খালেকের ড্রাইভার তাকে নিতে কেন রাজি হলো না। তিনি বুঝতে পারছেন না। প্রচুর গাড়ি চলাচল করছে। একটা গাড়ি তো তার গা ঘেষে গেল। রাস্তার নোংরা পানিতে তিনি দ্বিতীয়বার মাখামাখি হয়ে গেলেন। রাস্তায় কোনো রিকশা নেই। রিকশা থাকলে জিজ্ঞেস করে জানা যেত। তিনি কোথায়, তাঁকে কত দূর যেতে হবে? মিয়াঁও।
জোয়ার্দার চমকে তাকালেন। তার ডান দিকে পুফি। কুকুর যেমন লেজ উঁচু করে রাখে সেও লেজ উঁচু করে রেখেছে। মনে হয় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে। তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। বিড়াল হাঁটতে শুরু করেছে। তিনি বিড়ালের পেছনে পেছনে যাচ্ছেন। জোয়ার্দার নিশ্চিত এই বিড়াল তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। বিড়াল পানি পছন্দ করে না। কিন্তু এর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তিনি মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, বিড়ালও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা নিয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করতে পারলে ভালো হতো। কার সঙ্গে আলাপ করবেন? সবার সঙ্গে সব কিছু নিয়ে আলাপ করা যায় না। ডাক্তায় শায়লাতো পাত্তাও দিলো না। আজ রাত নটায় তার সঙ্গে দেখা করার কথা। লাভ কি। তাছাড়া যাবেনও বা কি ভাবে?
রাত এগারোটার দিকে জোয়ার্দার নিজ বাসার সামনে উপস্থিত হলেন। বিড়ালটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। তিনি ক্ষীণ গলায় বললেন, থ্যাংক য়্যু। বলেই নিজের ওপর খানিকটা রাগ লাগল। বিড়াল থ্যাংক য়্যুর মর্ম বুঝবে না।জোয়ার্দারের সারা শরীর কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে ছিল। তাকে দ্বিতীয়বার গোসল করতে হলো। এখন শুয়ে পড়ার সময়ঃ কিন্তু তিনি অভ্যাসবশে টিভির সামনে বসলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে মহিষের মতো দেখতে কোনো এক প্রাণীর জীবনবৃত্তান্ত দেখাচ্ছে। তিনি আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, বিড়ালটাও আগ্রহ নিয়ে দেখছে।
অনেকক্ষণ হলো টেলিফোন বাজছে। তার চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা শরীরে আলস্য। মনে হচ্ছে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়বেন। নিতান্ত অনিচ্ছায় টেলিফোন ধরলেন। সুলতানী টেলিফোন করেছেন।এই, টেলিফোন ধরছ না কেন? তিনবার কল করলাম।জোয়ার্দার বললেন, হুঁ।কী প্রশ্ন করেছি। আর কী উত্তর। হুঁ আবার কী? রাতে খাওয়াদাওয়া করেছ? হুঁ।হোটেলে খেয়েছ? জোয়ার্দার আবারও বললেন, হঁ। ঝামেলা এড়ানোর জন্য হুঁ বলা।কী দিয়ে খেয়েছ? কৈ মাছ, মুরগির মাংস, ছোট মাছ, ঘি। ঘি?
হুঁ। গরম ভাতে এক চামচ ঘি নিয়েছি।হোটেলে ঘি দেয়? ঠিক করে বলো তো কোথায় খেয়েছ? তুমি আমার সঙ্গে লুকাছাপা করো, এটা আমি জানি। বলো কোথায় খেয়েছ? জোয়ার্দার প্রশ্নের জবাব দেবার আগেই পাশের ঘরে খিলখিল হাসির শব্দ হলো।সুলতানা বললেন, হাসছে কে? জোয়ার্দার জানেন কে হাসছে। খালি বাড়ি পেয়ে জামাল চলে এসেছে। বিষয়টা সুলতানাকে বলা অর্থহীন। কী বুঝতে কী বুঝবে।এই কথা বলছি না কেন? কে হাসে? কেউ না।কেউ না মানে। আমি পরিষ্কার শুনছি। খালি বাড়ি পেয়ে কাকে তুমি নিয়ে এসেছ? মেয়েটার নাম কী? রাস্তা থেকে এনেছি? বেশ্যা মেয়ে? কত টাকা দিয়ে এনেছ?
জোয়ার্দার টেলিফোন লাইন কেটে দিলেন। সুলতানার কথা শুনার চেয়ে জন্তুর কাণ্ড কারখানা দেখা যাক। এর মধ্যেও নিশ্চয়ই শিক্ষণীয় কিছু আছে। মহিষের মত জানোয়ারটার নাম জানতে পারলে ভাল হতো। অনিকা বলতে পারত।টেলিফোন আবার বাজছে। বাজুক। ওই দিকে কান না দিলেই হলো।জোয়ার্দার ঠিক করলেন, আজ আর বিছানায় যাবেন না। সোফাতেই ঘুমাবেন। জামালের লাফালাফিটা বাড়াবাড়ি রকমের। মাঝে মাঝে বিড়ালের মিয়াঁও শব্দও কানে আসছে। সেও যুক্ত হয়েছে জামালের সঙ্গে।
জোয়ার্দার সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন। টিভি চ্যানেলের শব্দ। জামালের হৈচৈ, একটু পর পর টেলিফোনের বেজে ওঠা কিছুই তাঁর ঘুমের সমস্যা করল না। স্তবা অনেক দিন পর দুঃস্বপ্নটা দেখলেন।কালো রঙের মাঝারি সাইজের চেয়েও ছোট একটা কুকুর তাকে কামড়ে ধরেছে। জামাল কুকুরটাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। একসময় কুকুরটা তাকে ছেড়ে জামালকে কামড়ে ধরল। জামাল বুকফাটা আৰ্তনাদ করল, বাজান, বাজানগো।জোয়ার্দারের স্বপ্ন এ পর্যন্ত হয়। বাজান বাজান শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। আজ ঘুম ভাঙ্গল না। স্বপ্নটা চলতে থাকল। তিনি দেখলেন জামাল চার পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার পেট ফুলে আছে। পেটভৰ্তি কুকুরের বাচ্চা। পেটের চামড়া ভেদ করে বাচ্চাগুলো দেখা যাচ্ছে। কী ভয়ংকর দৃশ্য!
বাচ্চাগুলি কাঁদছে। কান্নার আওয়াজ টেলিফোনের রিং টোনের মত। জোয়ার্দার জাগলেন। কুকুরের বাচ্চা কাঁদছে না। টেলিফোন বাজছে। পুফি মোবাইল ফোন কামড়ে ধরে তার বিছানার কাছে বাসা। জামালকেও দেখা যাচ্ছে। সে জোয়ার্দারের পায়ের কাছে বসেছে। নিতান্ত অনিচ্ছার জোয়ার্দার টেলিফোন ধরলেন। নিশ্চয়ই সুলতানা চিৎকার চেচামেচি করে রাতের ঘুমের বারটা বাজিয়ে দেবে। জোয়ার্দার বললেন, সুলতানা বল কি বলবে।অপরিচিত তরুণী কণ্ঠ বলল, আপনার স্ত্রীর নাম সুলতানা।জোয়ার্দার বললেন, আপনি কে?
আমার নাম শায়লা। ডাক্তার শায়লা।ও, আচ্ছা।আজ আপনার আসার কথা ছিল।জোয়ার্দার বললেন, ঝড় বৃষ্টিতে আটকা পড়েছিলাম।বুঝতে পারছি। আমি অপেক্ষা করেছিলাম। ভাল কথা আপনার মামা কি বেঁচে আছেন? কোন মামা? শায়লা বললেন, যে মামার কারণে আমাদের বিয়েটা হয় নি।ও বড় মামা। হ্যাঁ বেঁচে আছেন। প্যারালাইসিস হয়েছে। বিছানা থেকে নামতে পারেন না।সরি টু হিয়ার দ্যাট। আপনি আপনার বড় মামার ঠিকানাটা আমাকে দেবেন। আমি তাকে একটা থ্যাংক য়্যু লেটার পাঠাব।কেন?
উনার কারণে আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় নি। নিজের মধ্যে প্রচন্ড জেদ তৈরী হয়েছিল। পড়াশোনা করেছি। রেজাল্ট ভাল করেছি। একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয় নি।আপনার স্ত্রী কি হাউস ওয়াইফ।জ্বি।আপনার বড় মামা বাগড়া না দিলে আমাকেও বাকি জীবন হাউস ওয়াইফ হয়ে থাকতে হত। বৎসর বৎসর বাচা পয়দা করতাম। আমার কথা শুনে রাগ করছেন? না।
আমার ধারণা আমি উল্টা পাল্টা কথা বলছি। নিজের উপর কনট্রোল নেই বলেই বলছি। আমি রাতে নিয়ম করে দুগ্লাস রেড ওয়াইন খাই। এই অভ্যাস বিদেশ থেকে Ph.D ডিগ্রির সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আজ আপনি না। আসায় খানিকটা মেজাজ খারাপ ছিল বলে হুইস্কি খেয়েছি। চার পেগ।জোয়ার্দার বললেন, ও আচ্ছা।শায়লা বললেন, নিজের উপর কনট্রোল নেই বলেই এত রাতে আপনি ঘুমুতে যান। সরি ফর এভরিথিং।জোয়ার্দার টেলিফোন পাশে রেখে ঘুমুতে গেলেন।
বিস্ময়ে চোখ কপালে তোলার ব্যবস্থা থাকলে সুলতানা চোখ কপালে তুলতেন না, ব্ৰহ্মতালুতে তুলে ফেলতেন। বাসার একি অবস্থা! প্রতিটি বালিশের তুলা ছেড়া। ঘরের মেঝেতে তুলার সমুদ্র। শুধু যে বালিশের তুলা বের করা হয়েছে তা না, লেপ নামিয়ে লেপের তুলাও বের করা হয়েছে।তুহিন তুষার ঘটনা দেখে মজা পাচ্ছে। কানাকানি করছে; হাসি চ্যাপার চেষ্টা করছে। ইদানীং তারা অতি অল্পতেই মজা পায়।অনিক ভীষণ অবাক। তার কোলে পুফি, পুফিও মনে হচ্ছে অবাক এবং ভীত। অনিক মারি দিকে তাকিয়ে বলল, বাসায় কি হয়েছে মা? সুলতানা তিক্ত গলায় বললেন, তোমার বাবা লীলাখেলা করেছেন এগুলি লীলাখেলার আলামত।অনিকা বলল, লীলাখেলা কি মা?
সুলতানা কঠিন গলায় বললেন, অকারণ কথা বলবে না। এখন আমার মাথা গরম। বিড়াল নিয়ে সামনে থেকে যাও। তুহিন তুষার তোমরাও সামনে থেকে যাও। খিকখিক করছ, কেন? খিকখিক করার মতো কিছু হয়েছে? তুহিন তুষার তাদের ঘরে গেল। অনিকা গেল পেছনে পেছনে। লীলাখেলা ধ্যাপারটা কী জানতে হবে।অনিকার প্রশ্নের জবাবে তুহিন বলল, খালুজান খালি বাড়ি পাইয়া এক মেয়েছেলে নিয়া আসছে। তার সাথে লটর পটার করছে। শুদ্ধ ভাষায় লক্টরপটিক্সারে কয় লীলাখেলা।
অনিক বলল, ঐ মেয়ে আমাদের বালিশ ছিঁড়েছে কেন? তুষার বলল, শইল গরম হইছে। এই জন্যে বালিশ ছিঁড়ছে। শইল গরম হইলে মাথার ঠিক থাকে না। এখন বুঝছ? অনিক কিছু না বুঝেই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল।সুলতানা জোয়ার্দারের অফিসে টেলিফোন করেছেন। এই মুহূর্তেই সব কিছুর ফয়সালা হওয়া উচিত।সুলতানা প্রায় চেঁচিয়ে বললেন, হ্যালো! হ্যালো।জোয়ার্দার বললেন, তোমরা চলে এসেছ? সবাই ভালো? কারোর অসুখ বিসুখ হয় নিতে? সুলতানা বললেন, এই মুহূর্তে তুমি বাসায় আসো।অফিস ছুটি হবে পাঁচটায়। এই মুহুর্তে কিভাবে আসব?
আমি কোনো কথা শুনতে চাই না! তুমি আধঘণ্টার মধ্যে আসবে। এত চাকরি। যদি চলে যায় চলে যাবে।রওনা হলেন। ফ্ল্যাট বাড়ির কোথায় কি হচ্ছে এই খবর দারোয়ানদের কাছে থাকবেই। তারা হচ্ছে ফ্ল্যাট বাড়িয় গেজেট।গতকাল রাতে ডিউটি কার ছিল? ম্যাডাম আমার।তোমাদের স্যার কাল রাতে কখন বাসায় ফিরেছেন? অনেক রাত করে ফিরেছেন। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফিরলেন। কাদায় পানিতে মাখামাখি।তোমার স্যারের সঙ্গে যে মেয়েটা ছিল তার বয়স কত? স্যারের সঙ্গে কোনো মেয়ে ছিল না।তোমার নাম রশিদ না?
জি।রশিদ আমার সঙ্গে টাল্টুবাজি করবে না। বুঝতে পারছি তোমাকে টাকা খাইয়েছে। কত টকা খাইয়েছে বলে। সে যদি পাঁচশ টাকা দিয়ে থাকে আমি দেব। হাজার। সত্যি কথা বলতে হবে।রশিদ চুপ করে আছে। সুলতানা বললেন, এই নাও হাজার টাকার নোট। এখন বলো মেয়ে ছিল? হুঁ।কম বয়েসি মেয়ে? হুঁ।সারারাত ছিল? হুঁ।মেয়েটা দেখতে কেমন?
ভালো। দেখতে সৌন্দৰ্য আছে। তয় গায়ের রঙ শ্যামলা।শ্যামলা রঙ আমি তোমার স্যারকে গিলায়ে খাওয়াব।সুলতানী তাঁর ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হলেন।অনিকা, তুহিন তুষারের ঘরে। ঘর ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। অনিকা চোখ মুখ লাল করে বসে আছে। তুহিন তুষার তাকে লীলাখেলার মূল বিষয়টা বুঝাচ্ছে। বুঝাতে গিয়ে দুবোনই আনন্দ পাচ্ছে। অনিকা তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু খারাপ শব্দও শিখল। ভয়ে এবং আতঙ্কে অনিকার হাত পা কাঁপছে।সুলতানা আবার টেলিফোন করলেন। জোয়ার্দারকে কঠিন গলায় বললেন, মেয়ের নাম কি বলো? জোয়ার্দার অবাক হয়ে বললেন, কেমন মেয়ের নাম?
ন্যাক সাজছ? কোন মেয়ের নাম তুমি জানো না! সব বের করে ফেলেছি। দারোয়ান মেয়েকে দেখেছে।ও আচ্ছা।সুলতানা বললেন, ও আচ্ছা আবার কি। ও আচ্ছা তোমাকে গিলায়ে দিব। আজ শুধু বাসায় আসো। এখন বল মেয়ের নাম বল।জোয়ার্দার কিছু না ভেবেই বললেন, শায়লা।রাস্তার মেয়ে না-কি অন্য কিছু।ডাক্তার।ও আচ্ছা ডাক্তার। ডাক্তার মেয়ে সারারাত তোমার চিকিৎসা করেছে। চিকিৎসায় আরাম হয়েছে। শরীরের গরম কমেছে।সুলতানা। এইসব কি বলছ।এখনো কিছুই বলছি না। কিছুই করছিনা। আজ বাসায় ফিরে দেখা কি বলি আর কি করি।
সুলতানা তার ভাই রঞ্জকে খবর দিয়ে আনালেন। রঞ্জুর গায়ে এরশাদ সাহেবের সাফারি। বঁ হাতে কালো সিল্কের রুমাল। প্রচুর টাকা পয়সা হবার পর রঞ্জু ঘন ঘন নিজের লেবাস বদলাচ্ছ! কোনটাতেই তাকে মানাচ্ছেন না। লম্বাটে ঠোঁটের কারণে চেহারায় কিছুটা বাঁদর ভাব থেকেই যাচ্ছে।রঞ্জু বলল, ঘটনা তো মনে হয ভয়ঙ্কর। বালিশ লেপ কাটাকুটির বিষয়টা বুঝা যাচ্ছে না। দুলাভাইয়ের মাথা ঠিক আছে তো?সুলতানা বললেন, মাথা ঠিক না থাকলে এখন ঠিক হবে। মাথা ঠিক করার অষুধ দেয়া হবে। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরুক। দেখ আমি কি করি।শুরুতেই হৈচৈয়ে যাবে না বুবু। ঠাণ্ডা মাথায় ক্রস এগজামিন করবে।সুলতানা বললেন, যে অবস্থা এই লোক করেছে তারপর কি আর মাথা ঠাণ্ডা থাকবে?
রঞ্জু বলল, কথাবার্তা কী হবে তা কাজের মেয়ে দুটির শোনা ঠিক হবে। না। আমি এই দুজনকে নিয়ে যাচ্ছি।তোর যা ভালো মনে হয় কর।অনিকা থাকুক তোমার সঙ্গে। তোমার মনের যে অবস্থায় একা না থাকাই ভালো। ডিসকাশন যখন শুরু হবে তখন অনিককে পাশের ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিলেই হবে। তোমাদের পুরো কথা বার্তার একটা অডিও রেকর্ড থাকা দরকার। আমার এই মোবাইলে চার ঘণ্টা অডিও রেকর্ড হয়। তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। তুমি সময় বুঝে বোতাম টেপে দিও।
জোয়ার্দার অফিস ক্যানটিনে বসে আছেন। তার সামনে হাফ প্লেট কাচি বিরিয়ানি। তিনি অর্ডার দিয়েছেন পাবদা মাছ, সবজি, ডাল। ক্যানটিনের বয় তাঁর সামনে কাঁচ্চি বিরিয়ানি রেখেই চলে গেছে। সে চরকির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।খালেক এগিয়ে এল। তাঁর সামনের চেয়ারে বসতে বলল, স্যার আছেন।কেমন? ভালো।একটা কথা বলেন তো স্যার। গত রাতে ড্রাইভার কি আপনাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল? নাকি বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে?
জোয়ার্দার জবাব দিলেন না। তিনি ক্যানটিনের বয়কে খুঁজছেন। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। খাবারটা বদলানো দরকার।খালেক বলল, আমার বাসায় এই নিয়ে বিরাট ক্যাচাল। আমার স্ত্রী একশ ভাগ নিশ্চিত ড্রাইভার আপনাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভারের কোনো কথাই শামা শুনবে না। ড্রাইভারের চাকরি নষ্ট হয়ে গেছে।তাই নাকি? ভালো একজন ড্রাইভার পাওয়া আর গুপ্তধন পাওয়া একই ব্যাপার। ঐ জিনিস শামা বুঝবে না।আপনার ড্রাইভার খুব ভালো?
অবশ্যই ভালো। গাড়িটাকে সে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে। এক বছর হয়েছে গাড়ি কিনেছি, এখনো গাড়িতে দাগ পড়ে নাই। এখন আপনি কি স্যার দয়া করে আমার স্ত্রীকে বলবেন ড্রাইভার আপনাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। তাহলে গরিব বেচারার চাকরিটা থাকে, আমাকেও একজন ভালো ড্রাইভার হারাতে হয় না।আচ্ছা আমি বলব।
Read more
