প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১০)

আমার বােধহয় জানা উচিত ছিল কী নাম। আজ সােমবার।প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

হাসপাতালে ভর্তি হবার দিন। আজকের দিনটি অন্য আর দশটি দিনের মতাে নয়। একটু যেন অন্যরকম। আলাে যেন অন্য দিনের চেয়ে স্নান। বাতাস ভেজা-ভেজা। মানুষের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে দিন বদলে যায় নাকি ? 

ঘুম ভাঙল খুব ভােরে। শেভ করলাম। নতুন ব্লেড, খুব আরামের শেভ হলাে। দাঁত ব্রাশ করতে করতে করিম সাহেবকে বললাম, বেড-টি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, দিতে পারেন এক কাপ ? 

দুধ নাই। দুধ ছাড়া যদি চলে দিতে পারি। দুধ ছাড়াই দেন। আজ পাসপাতালে যাওয়ার কথা না ? জি। কখন যাবেন ? তিনটার দিকে। রহমান গাড়ি নিয়ে আসবে। 

বলতে বলতে আমার হাসি পেয়ে গেল। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে রহমান বেশ ছােটাছুটি করে গাড়ি যােগাড় করেছে। যেন হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারটা গাড়ি ছাড়া হবার নয়। গাড়ি করেই যেতে হবে। 

গাড়ির ব্যাপারে তার খুবই উৎসাহ। কিছু একটা হলেই সে ছােটাছুটি করে গাড়ি যােগাড় করে ফেলবে। একবার মিরপুর বােটানিক্যাল গার্ডেনে কয়েকজন মিলে যাওয়ার কথা। লাঞ্চ নিয়ে যাব। সারা দিন থাকব। সন্ধ্যাবেলা ফিরব। যাব পাঁচ নম্বর বাসে। ফিরবও বাসে।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

রওনা হবার কথা সকাল নটায়। দেখা গেল, সাড়ে আটটায় রহমান ব্রিটিশ আমলের এক জিপগাড়ি নিয়ে উপস্থিত। সে গাড়িতে দুটি সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। মেয়েদের ছাড়া পিকনিক জমে না, এই জন্যে সে নাকি বহু ঝামেলা করে এদের যােগাড় করেছে। এরা দুজনেই রহমানের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। 

আমাদের জিপগাড়ি টেকনিক্যালের সামনে এসে চারপায়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর নড়ে না। হুড খুলে বহু খোঁচাখুঁচি, বহু ঠেলাঠেলি। কিছুতেই কিছু হয় না। শেষ পর্যন্ত ঠিক করা হলাে, গাড়ি ফেলে রেখে গল্প করতে করতে হেঁটেই যাব। জেসমিন নামের মেয়েটি ঘাড় বাঁকিয়ে বলল, হিল পরে আমি হাঁটতে পারব না। আমি রিকশায় যাব। 

রিকশা ঠিক করা হলাে। সে একা একা এরকম অচেনা জায়গায় যাবে না। অন্য মেয়েটি কোনাে এক বিচিত্র কারণে তার সঙ্গে যেতে রাজি নয়। ছেলেদের একজনকে যেতে হয়। কে যাবে ? মনসুর বলল, ফরিদ অসুস্থ মানুষ, ওকে রিকশায় তুলে দিলেই হয়। 

জেসমিনের মুখ দেখে মনে হলাে ব্যাপারটা সে ঠিক পছন্দ করছে না। সে সম্ভবত যেতে চাচ্ছিল রহমানের সঙ্গে। কিন্তু ঐ মেয়েটি রহমানকে চোখে-চোখে রাখছে। 

রহমান আমাদের মধ্যে সবচে’ সুপুরুষ। কীভাবে কীভাবে যেন বিদেশী ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি যােগাড় করে ফেলেছে। চেহারার জোর বলাই বাহুল্য। বছরখানিক না ঘুরতেই শুনলাম তার নাকি একটা প্রমােশনও হয়েছে। এখন তার টেবিলে একটা পিবিএক্স লাইন, একটা ডিরেক্ট লাইন। কারাে টেলিফোনের দরকার হলে তার কাছে গেলেই হয়। শুধু সােমবার বাদ দিয়ে। কী জন্যে সােমবারটা বাদ, কে জানে ? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

 আমি রিকশায় উঠতেই রহমান বললু ছাড়লাম তাে দুজনকে, কী হয় কে জানে। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল। জেসমিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, কী অসভ্যতা করছেন রহমান ভাই! অসভ্যতা আমরা করলাম কোথায় ? অসভ্যতা তাে করছ তােমরা । আবার একটা হাসির দমকা উঠল। জেসমিন মুখ অন্ধকার করে বলল, এই রিকশা, চালাও, দাঁড়িয়ে আছ কেন ?

 পেছন থেকে ফজলু কী যেন বলল। অশ্লীল কিছু নিশ্চয়ই। কারণ ফজলু অশ্লীলতা ছাড়া কোনাে রসিকতা করতে পারে না। তার প্রতিটি রসিকতাতেই মেয়েদের শারীরিক কিছু বর্ণনা থাকবেই ।। 

কোনাে পরিচিত মেয়ের সঙ্গে গা-ঘেঁসাঘেসি করে যাওয়া এ আমার প্রথম। হাত-পা শিরশির করতে লাগল। আমি নিচু স্বরে বললাম, হুড তুলে দেব? 

না, আমার দম বন্ধ লাগে। 

মেয়েটি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হেঁটে গেলেই ভালাে হতাে। আমার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা কি-না বুঝতে পারলাম না। চুপ করে গেলাম। জেসমিন বলল, আপনার রােদ লাগলে হুড তুলে দেন। 

না, আমার রােদ লাগছে না। জেসমিন খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হেঁটে গেলে ভালাে হতাে, কেন বললাম জানেন ? বললাম, কারণ ওরা আজ সারাদিন আমাদের দুজনকে নিয়ে ঠাট্টা করবে । খুব খেপাবে। তাই বুঝি? হ্যা, নিজেই দেখবেন। আমি আসলে আসতে চাই নি। রহমান ভাই এত করে বললেন, তাই আসলাম, নয়তাে আসতাম না। 

আমি হালকা স্বরে বললাম, এসে ভালােই করেছেন, পিকনিকে দু-একজন মেয়ে না থাকলে খুব খারাপ লাগে। 

জেসমিন ঘুরে ফিরে রহমানের কথা বলতে লাগল। একজন সুন্দরী মেয়ের মুখে অন্য একজন পুরুষের কথা শুনতে ভালাে লাগে না। আমি হ্যা-হু দিয়ে যেতে লাগলাম। 

রহমান ভাই আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় ও তাই নাকি? হ্যা।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *