গনি সাহেব বললেন, ঠিকমতাে ভাঙাতে পারলে লাখখানিক টাকা হবার কথা।
আমি চুপ করে রইলাম। যে-কোনাে চিঠি মানুষ দু-তিনবার করে পড়ে। এই চিঠি দ্বিতীয়বার পড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না এবং চিঠি খুব অবহেলার সঙ্গেই রাখলাম টেবিলে, যেন টাকাটার আমার কোনো প্রয়ােজন নেই।
গনি সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে। তিনি হয়তাে আশা করেছিলেন আমি খানিকটা উচ্ছ্বাস দেখাব। দেখানােই তাে স্বাভাবিক।
কেউ কি এসেছিল আমার কাছে ? আপনার ভগ্নিপতি এসেছিলেন। খানিকক্ষণ বসে চলে গেছেন। কিছু বলে গেছেন ? জি-না। কিছুই বলে যান নি ?
শুধু বললেন, উনি আপনার ভগ্নিপতি। দায়িত্ব পালনের দেখা। এর বেশি কিছু না। মুখ কালাে করে বসেছিলেন এবং প্রতি মুহুর্তেই হয়তাে বিরক্তি বাড়ছিল। বাড়ি ফিরে হয়তাে অনুর সঙ্গে বড়
রকমের একটা ঝগড়া বাঁধিয়েছেন। তিনি হয়তাে বলেছেন, তােমার ভাইয়ের খোজে গিয়ে সারাটা দিন নষ্ট হলাে। অনু তার উত্তরে বলল, গিয়েছিলে কেন ? তােমাকে যেতে বলেছি ? অনু খুব শান্তমুখে কাটা-কাটা কথা বলতে পারে। এবং এত সহজে পুরনাে সব কথাবার্তা তােলে যে মনে হয় রাত-দিন সে এসব নিয়েই ভাবে। এমন তিক্ততার মধ্যে দুজন মানুষ বাস করে কীভাবে ?
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
অনুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেই মন ভার করে ফিরে আসতে হয়। মনে হয় বেঁচে থাকার মতাে শাস্তি আর নেই। অনু শান্তমুখে সহজ গলায় বলে, আমি এভাবে বেশি দিন থাকব না। এ কথায় সে কী বুঝাতে চায় আমি জানি না। জানতে চেষ্টাও করি না।।
একদিন-না-একদিন চলে যাব। কোথায় চলে যাবি ? তাও তাে ঠিক। আমার যাবার জায়গা নেই। | অনুকে বাড়িতেই থাকতে হবে। তার কোথাও যাবার জায়গা নেই, এই চিন্তাটিই কি তাকে সব সময় পীড়িত করছে ?
হাত-পা কুটকুট করছিল। গা ধােয়ার জন্যে বাথরুমে গিয়ে দেখি মাকড়সাটা বেরিয়ে এসেছে। শেষ দেখা দিতে এসেছে নাকি ? আমি বেশ শব্দ করে বললাম, কী-রে ব্যাটা, কেমন আছিস? বলাটা ঠিক হলাে না, কারণ এটা মেয়ে-মাকড়সা, এর পেটের নিচে ডিমের থলি। একে বলা উচিত কী-রে মা, কেমন আছিস ? কিন্তু এমন কুৎসিত জিনিসকে মা ডাকা যায় না আমি ওর গায়ে পানি ছিটিয়ে দিলাম। সে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তার কোনো গােপন জায়গায় লুকিয়ে পড়ল। আমাদের দুজনের বিদায়ের দৃষ্টি সঠিক সুখকর হলাে না। পানি না দিলেই
শরীর এখন বেশ ভালোই লাগছে। বাথরুমের আয়নাটা ভালাে না। কেমন ঢেউ-খেলানাে ছবি আসে, তবু নিজেকে খারাপ লাগছে না। এ মুখ ভরসা হারানাে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখের একটি নয়। ঠিক বললাম কি ? নাকি নিজেকে
এই মুহূর্তে বিশেষ কিছু ভাবছি ? যেন আমি সবার চেয়ে আলাদা ?
আমাদের ভাইবােনদের মধ্যে বাবুল ভাই-ই ছিল একটু অন্যরকম। তার এক ফোটা সাহস ছিল না, তবু সে মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব সাহসী কাণ্ডকারখানা করত। মােজাম্মেল স্যারের সঙ্গে যে কাণ্ডটা করল! স্যার ক্লাসে অঙ্ক করাচ্ছেন, সে উঠে বলল, স্যার, মনিরকে আপনি হাফইয়ারলির অঙ্ক প্রশ্ন আউট করে দিয়েছেন কেন? মােজাম্মেল স্যার রাগের চোটে তােতলা হয়ে গেলেন। চোখ–মুখ লাল করে বললেন, আ… আ… আমি… কোশ্চেন আউট করেছি ? বলেছে কে?
মনির বলেছে স্যার ।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
কথাটা খুবই সত্যি। মনির সব সাবজেক্টে গােল্লার কাছাকাছি পেয়েছে, শুধু অঙ্কে পেয়েছে বিরানব্বই। তবু মােজাম্মেল স্যার বাবুল ভাইকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেললেন। দু-তিনজনে মিলে তাকে বাসায় দিয়ে গেল। বাসায় বাবা দ্বিতীয় দফায় তার উপর চড়াও হলেন। শিক্ষককে অপমান! তাের বাপের নাম আজ ভুলিয়ে ছাড়ব। বাপের নাম তিনি ভােলাতে পারলেন না, তবে দিন সাতেকের জন্যে বিছানায় ফেলে দিলেন। | গা-টা ফুলে প্রচণ্ড জ্বর। বাবুল ভাই রাত-দিন শুয়ে থাকে। এক রাতে বিড় বিড় করে কী-সব বলতে লাগল। বাবা গিয়েছেন পাশের বাড়ি তাস খেলতে। বড় ভাই তাঁকে ডাকতে গিয়ে ধমক খেয়ে ফিরে এলেন। আমার কেন জানি ধারণা হলাে, বাবুল ভাই বাঁচবে না। এবং আশ্চর্য, এই ভেবে সূক্ষ্ম একটা আনন্দ বােধ করলাম। সে মরে গেলেই ভালাে হয়। বাবার একটা উচিত শিক্ষা হয়।
বাবাকে উচিত শিক্ষা দেয়া গেল না। বাবুল ভাই সেরে উঠল। বাবা তাকে মােজাম্মেল স্যারের বাসায় নিয়ে গেলেন। বাবুল ভাই পা ধরে বলল, স্যার, আর কোনােদিন করব না। মাফ করে দেন স্যার। রীতিমতাে নাটক। বাবা সে-রাতে ভাত খেতে খেতে বললেন, শিক্ষকের অমর্যাদা করলে বড় হতে পারবি না। শিক্ষক বড় মারাত্মক জিনিস। বাবা-মা’কে একবার সালাম দিলে হয়, কিন্তু শিক্ষককে সালাম দিতে হয় দশবার, বুঝলি?
আমরা কেউ কোনাে জবাব দিলাম না। বাবুল ভাই জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখতে লাগল। বাবা হষ্টচিত্তে বলতে লাগলেন, কোশ্চেন আউট করে সে খুব খারাপ কাজ করেছে কিন্তু তােরা তাে অঙ্ক শিখছিস তার কাছে। শিখছিস ? সেটাই বড়।
তার দিনকয়েক পর মােজাম্মেল স্যার বাবুল ভাইকে ডেকে নিয়ে বললেন, তুই এক কাজ করিস, সন্ধ্যায়-সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসিস, অঙ্কটা দেখিয়ে দেব। টাকাপয়সা কিছু দিতে হবে না। বলিস তাের বাবাকে।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
বাবুল ভাই রাজি ছিল না। কিন্তু বাবা বিনা পয়সায় সুযােগ হারাবার লােক নন। তিনি কড়া ধমক দিয়ে বাবুল ভাইকে পাঠাতে লাগলেন।
মােজাম্মেল স্যার অঙ্ক খুবই ভালাে জানতেন। স্কুলে তার নাম ছিল মুসলমান যাদব। বাবুল ভাই তাঁর কাছ থেকে ভালাে অঙ্ক শিখলেন। ভালাে বললে কম বলা হবে। খুবই ভালাে।
ওকে
আমার হাসপাতাল জীবন শুরু হলাে।
সােমবার বিকাল চারটায় রহমানের জোগাড়-করা জিপে চড়ে এলাম হাসপাতালে। এই জীবন দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হচ্ছে। এখন যেমন খারাপ লাগছে এক সময় তেমন খারাপ লাগবে না। ফিনাইলের গন্ধও আপন মনে হবে। ডাক্তারদের সঙ্গে পরিচয় হবে। নার্সদের কেউ কেউ হাসপাতালের গল্প শুনিয়ে যাবে । যে সুইপার বাথরুম পরিষ্কার করতে আসবে তাকে হয়তাে আমি নাম ধরে
মনসুর খুব উৎসাহ প্রকাশ করতে লাগল– ভালাে ঘর, কেমন হাওয়া দেখছিস নাকি ? ফাসক্লাস।
ঘরটি ভাললাই। পেছনে এক চিলতে বারান্দা। দাঁড়ালে শিশু পার্ক দেখা যায়। সে দিকটা বড় সবুজ। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখে ধাঁধা লাগে।
এই ফরিদ, অ্যাট্যাচড় ইংলিশ বাথরুম। -৩ | বাথরুম খুলেই মনসুর মহা উল্লসিত ভাবখানা এরকম যেন ইংলিশ বাথরুম ছাড়া আমি বাথরুম করতে পারি না )।
ফরিদ, ময়লা আছে, সুইপার দিয়ে ক্লিন করিয়ে দেব। পাঁচটা টাকা খাওয়াতে হবে। ফ্লাস্ক খােল; চা খাওয়া যাক।
Read more