প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

তা ঠিক। 

আমি অবশ্যি বিয়ের পরই অ্যানিকে সব খুলে বলি। আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন, সে রাগ করে নি। 

হয়তাে রাগ করেছে, আপনাকে বুঝতে দেয় নি। 

ভদ্রলােক জবাব দিলেন না। দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, দেখি, আরেকটা সিগারেট দিন। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদআর খাবেন না। এখন সিগারেট খাওয়া না-খাওয়া আমার কাছে সমান । আমি আরেকটি সিগারেট বাড়িয়ে দিলাম। ফরিদ সাহেব! বলুন। ঘুম আসছে। 

হ্যা। 

ঘুমাবেন না। কুসংস্কার হােক যাই হােক, ঘুমাবেন না। ঠিক আছে, ঘুমাব না। 

আপনি যে বললেন সে রাগ করেছে এটা ঠিক না। রাগ করলে ঠিকই বুঝতে পারতাম। অসুস্থ অবস্থায় মানুষের সেসিটিভিটি বেড়ে যায়। সে ছােট ঘােট ব্যাপারগুলিও ধরতে পারে। 

তাহলে হয়তাে রাগ করেন নি। 

, করে নি। ভদ্রলােক বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গেলেন। ফিরে এলেন অনেকক্ষণ পর। ঘর পুরােপুরি অন্ধকার নয়। বারান্দায় বাতি জ্বলছে। তার আলােয় ঘরের ভেতরটাও আলােকিত। আবছা করে হলেও সবকিছু চোখে পড়ে। আমি বললাম, আপনি জেগে আছেন কেন? আপনি শুয়ে পড়ুন। 

হ্যা, শুয়ে পড়ব। ঘুম আসছে। তবে একটা কথা শােনেন— জীবনের উপর আমার একটা রাইট আছে। আছে কি-না? 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

হ্যা, আছে । 

যাকে ভালােবাসি তাকে যদি একদিনের জন্যেও পেতে চাই তা হলে সেটা কি খুব অন্যায় ? 

না, অন্যায় নয়। 

আপনি আমাকে সান্তনা দেবার জন্যে এটা বলেছেন। কিন্তু আপনি মনে মনে এটাকে অন্যায় ভাবছেন। 

, তা ভাবছি না। আমাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করবেন না। আমি কারাে সান্তনা চাই না। এসবের আমার দরকার নেই। 

আমি চুপ করে গেলাম। দ্রলােক শুয়ে পড়লেন। এবং বােধহয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লেন। আর কোনাে সাড়া পাওয়া গেল না। 

হাসপাতালের নিজস্ব কিছু ব্যাপার আছে। সে কখনাে ঘুমায় না। দিন-রাত্রি চব্বিশ ঘণ্টাই জেগে থাকে। এখন রাত বাজে প্রায় সাড়ে তিনটা। বারান্দায় কাদের কথা শােনা যাচ্ছে, হাসির শব্দও শুনলাম। রােগীদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়স্বজনরা হাঁটাহাঁটি করে। 

রােগীদের কেউ কেউ কাঁদে। ব্যথায় কাঁদে কিংবা ভয়ে কাঁদে। আয়ারা খাবারের ভাগ নিয়ে দুপুররাতে ঝগড়া করতে বসে। 

কম বয়সী ইন্টার্নি ডাক্তাররা নিজেদের মধ্যে রসিকতা করতে করতে বারান্দা দিয়ে হাঁটেন। 

কোনাে-একটি সময়ে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দেয়। রেসিডেন্ট সার্জন আসেন। নার্সরা ছােটাছুটি করতে থাকে। অপারেশন টেবিলে রােগীকে নিয়ে যাবার জন্যে ঘুমঘুম চোখে স্ট্রেচার হাতে অ্যাটেনডেন্টরা। এনেসথেসিয়া যিনি করবেন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

রেসিডেন্ট সার্জন ধৈর্য হারিয়ে চেচাতে থাকেন। 

ঘুম চটে গিয়েছিল । শুয়ে শুয়ে কত রকম শব্দ শুনলাম। সব অচেনা শব্দ। এই বিচিত্র শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে কত দিন লাগবে কে জানে! 

হাসপাতালের খাবারদাবার খুব খারাপ হয় বলে জানতাম। সকালের নাশতা আমার ভালােই লাগল। এক পিস মাখন লাগানাে রুটি, একটি সেদ্ধ ডিম, একটা কলা। 

পাশের বেডের ভদ্রলােক ঘুমাচ্ছেন। তাঁর নাশতা ঢাকা পড়ে রইল। তিনি ঘুম থেকে উঠলেন নটার দিকে এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাণ্ড একটি টিফিন ক্যারিয়ারে করে তার জন্যে খাবার এলাে । 

ফরিদ সাহেব। জি ? 

আপনি কি নাশতা করে ফেলেছেন ? হ্যা। 

এর পর থেকে করবেন না। অ্যানি সব সময় দুজনের জন্যে খাবার পাঠায়। আজ যখন সে আসবে আপনি তাকে বলে দেবেন কী কী জিনিস আপনার পছন্দ। 

ভদ্রলােকের সঙ্গে সারা দিন আমার আর একটি কথাও হলাে না। যেন তিনি আমাকে চেনেন না। একটি বই মুখের সামনে ধরে রইলেন। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম, কী পড়ছেন ? 

থ্রিলার। কথাটা বলেই এমনভাবে তাকালেন, যার অর্থ হচ্ছে আমাকে বিরক্ত করবেন 

দুপুরের পর থেকে চারদিক অন্ধকার করে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলাে। বেশ ভালাে #ড়। আজ কোনাে ভিজিটর আসবে না। এমন দিনে ঘর থেকে কেউ বেরুবে 

আজ অবশ্য কারাের আসর কথা নয়। তবু কেউ কেউ হয়তো আসতে চাইবে। পিছিয়ে যাবে ঝড় দেখে। ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমাকে দেখতে আসার কেউ নেই। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

আশ্চর্য, যার কথা কখনাে ভাবি নি সেই দুলাভাই এসে পড়লেন। দুলাভাই বলাটা ঠিক হচ্ছে কি-না কে জানে! বড় আপা মারা গেছেন সেই কবে! এর মধ্যে তিনি বিয়ে টিয়ে করে ঘরসংসার শুরু করেছেন। পুরনাে আত্মীয়তা বা সম্পর্কের কিছুই তাে এখন নেই। 

ফরিদ, কেমন আছ? ভালাে আছি। 

দুলাভাই বেশ কিছু কলা নিয়ে এসেছেন। সেগুলি থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। তাঁর গা বেয়েও জল ঝরছে। 

গামছা দিয়ে গা মুছে ফেলুন। অসুখ করবে। না, কী অসুখ করবে! তিনি সাবধানে কলাগুলি বেডের নিচে রাখলেন। মুখে কিছু বললেন না। তার স্বভাব বেশি বদলায় নি। তাকে আগের মতােই ভাবুক মনে হলাে। 

খবর পেয়েছেন কার কাছে দুলাভাই ? তোমার বন্ধু মনসুরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। 

অপারেশন ডেট দিয়েছে ? 

জি-না। টাকা-পয়সা লাগবে ফরিদ ? জি-না, লাগবে না। আপনি চলে যান দুলাভাই, ঠাণ্ডা লাগবে। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে যাব কোথায় ? বসি খানিকক্ষণ । ফ্লাস্কে চা আছে, খাবেন ? 

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *