বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

সুধাকান্তবাবু বললেন, মেয়েটার কথা শুনবেন

হ্যা, শােনা যেতে পারেতবে আমি নিজে অবিশ্বাসী ধরনের মানুষ, কাজেই গল্পের মাঝখানে যদি হেসে ফেলি কিছু মনে করবেন না। 

এই গল্পটা কাউকে বলতে ভালাে লাগে নাঅবশ্যি অনেককে বলেছিএখানকার সবাই জানে। 

আপনার গল্প এখানকার সবাই বিশ্বাস করেছে

সুধাকান্তবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, আমি যদি এখানকার কাউকে একটা মিথ্যা কথাও বলি, এরা বিশ্বাস করবেএরা আমাকে সাধুবাবা বলে ডাকেআমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে কোনাে মিথ্যা কথা বলেছি বলে মনে পড়ে নাআমি থাকি একাএকাআমার প্রয়ােজনও সামান্যমানুষ মিথ্যা কথা বলে প্রয়ােজন এবং স্বার্থের কারণেআমার সেই সমস্যা নেইএইসব থাক, আমি বরং গল্পটা লি। 

বলুন। 

ভেতরে গিয়ে বসবেন? এখানে মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা লাগছেঅগ্রহায়ণ মাসে হিম পড়ে। 

‘আমার অসুবিধা হচ্ছে না, এখানেই বরং ভালাে লাগছেগ্রামে তেমন আসা হয়নাআপনি শুরু করুন। 

সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করতে গিয়েও শুরু করলেন নাহঠাৎ যেন একটু অন্য রকম হয়ে গেলেনযেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু দেখতে চেষ্টা করছেনখসখস শব্দ হলনতুন কাপড় পরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, সেরকমতার প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই কাঁচের চুড়ির টুংটুং শব্দের মতাে শব্দআমি বললাম, কী ব্যাপার বলুন তাে?” 

বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)

সুধাকান্তবাবু ফ্যাকাসে মুখে হাসলেনআমি বললাম, কিসের শব্দ হল

তিনি নিচু গলায় বললেন, কিছু না, আপনি গল্প শুনুনআজ ঘুমিয়ে কাজ নেই, আসুন গল্প করে রাত পার করে দিইগাছমছমে পরিবেশবাড়ির লাগােয়া ঝাঁকড়া কামিনী গাছ থেকে কামিনী ফুলের নেশাধরান গন্ধ আসছেকুয়ার আশেপাশে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছেনিভছেউঠোনের চুলা থেকে ভেসে আসছে পােড়া কাঠের গন্ধআকাশভরা নক্ষত্রবীথি। 

সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করলেন। 

যুবক বয়স থেকেই আমাকে সবাই ডাকত সাধুবাবা

যদিও ঠিক সাধু বলতে যা বােঝায় আমি তা নইতবে প্রকৃতিটা একটু ভিন্ন ছিলসবকিছু থেকে নিজেকে দূরেদূরে রাখার স্বভাব আমার ছিলশুশান, কবরস্থান এইসব আমাকে ছােটবেলা থেকেই আকর্ষণ করতঅল্প বয়স থেকেই শুশান এবং কবরস্থানের আশেপাশে ঘুরঘুর করতামআমার বাবা শ্যামাকান্ত ভৌমিক তখন জীবিতআমার মতিগতি দেখে অল্প বয়সেই আমার বিবাহ ঠিক করলেনপাশের গ্রামের মেয়েভবানী মিত্র মহাশয়ের প্রথমা কন্যা আরতিখুবই রূপবতী মেয়েগ্রামাঞ্চলে রকম মেয়ে সচরাচর দেখা যায় নাআমি বিবাহ করতে রাজি হলামকথাবার্তা পাকাপাকি হয়ে যাবার পর একটা দুর্ঘটনায় মেয়েটা মারা যায়। 

কী দুর্ঘটনা

সাপের কামড়আমাদের এই অঞ্চলে সাপের উপদ্রব আছেবিশেষ করে কেউটে সাপ। 

তারপর কী হল বলুন। 

মেয়েটির মৃত্যুতে খুব শােক পেলামপ্রায় মাথাখারাপের মতাে হয়ে গেলকিছুই ভালাে লাগে নারাতবিরাতে শ্মশানে গিয়ে বসে থাকিসমাজসংসার কিছুতেই মন বসে নাগভীর বৈরাগ্য। কিছু দিন সাধুসন্ন্যাসীর খোঁজ করলামইচ্ছা ছিল উপযুক্ত গুরুর সন্ধান পেলে মন্ত্র নেবতেমন কাউকে পেলাম না। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)

আমার বাবা অন্যত্র আমার বিবাহের চেষ্টা করলেনআমি রাজি হলাম নাবাবাকে বুঝিয়ে বললাম যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা না যে আমি সংসারের বন্ধনে আটকা পড়িপরিবারের অন্যরাও চেষ্টা করলেন আমি সম্মত হলাম নাসব আমার প্রথম যৌবনের কথানাবললে আপনি গল্পটা ঠিক বুঝতে পারবেন নাআপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন

আমি বললাম, না, বিরক্ত হব কেন?‘ 

সুধাকান্তবাবু বললেন, প্রথম যৌবনের কথা সবাই খুব আগ্রহ করে বলেআমি বলতে পারি না। 

আপনি তত ভালােই বলছেনথামবেন না বলতে থাকুন। 

সুধাকান্তবাবু আবার শুরু করলেন 

এরপর অনেক বছর কাটলশুশানেশুশানে ঘুরতাম বলেই বােধহয় ঈশ্বর আমার ঘরটাকেই শুশান করে দিলেনপুরােপুরি একা হয়ে গেলামমানুষ যেকোনাে পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়আমিও মানিয়ে নিলামআমার প্রকৃতির মধ্যে একধরনের একাকীত্ব ছিল, কাজেই আমার খুব অসুবিধা হল নাএখন আমি মূল ঘটনায় চলে আসব, তার আগে আপনি কি চা খাবেন

বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)

জ্বিনাখান একটু চা, ভালাে লাগবে‘ 

আমার মনে হল ভদ্রলােকের নিজেরই চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছেআমি বললাম, ঠিক আছে, বানানএকটু ঠাণ্ডাঠাণ্ডা লাগছে অবশ্যি। 

ভিতরে গিয়ে বসবেন? জ্বিনা, এখানেই ভালাে লাগছে। 

চা শেষ করার পর দ্বিতীয় দফায় গল্প শুরু হলএইখানে আমি একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করলামআমার কাছে মনে হল ভদ্রলােকের গলার স্বর পাল্টে গেছেআগে যেস্বরে কথা বলছিলেন, এখন সেই স্বরে বলছেন নাএকটা পরিবর্তন হয়েছেআমার মনের ভুল হতে পারেঅনেক সময় পরিবেশের কারণে সবকিছু অন্য রকম মনে হয়। 

সুধাকান্তবাবু বলতে শুরু করলেন— 

গত বৎসরের কথাকার্তিক মাসআমি বাড়িতে ফিরছিরাত প্রায় দশটা কিংবা তার চেয়ে বেশিও হতে পারেআমার ঘড়ি নেই, সময়ের হিসাব ঠিক থাকে 

বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)

আমি সুধাকান্তবাবুকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার স্কুল তাে নিশ্চয়ই চারটাপাঁচটার দিকে ছুটি হয়এত রাতে ফিরছিলেন কেন

সুধাকান্তবাবু নিচু গলায় বললেন, রােজই এই সময়ে বাড়ি ফিরিসকালসকাল বাড়ি ফেরার কোনাে উৎসাহ বােধ করি না। পাবলিক লাইব্রেরি আছেঐখানে পত্রিকাটত্রিকা পড়ি, গল্পের বই পড়ি। 

বলুন তারপর কী হলতারিখটা হচ্ছে বারই কার্তিক, সােমবারআমি মানুষ হিসাবে বেশ সাহসীরাতবিরাতে একাএকা ঘােরাফেরা করিরাতে রাস্তায় নেমেই আমার ভয়ভয় করতে লাগলকী জন্যে ভয় করছে সেটাও বুঝলাম না

 

Read more

বৃহন্নলা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *