সুধাকান্তবাবু বললেন, ঐ মেয়েটার কথা শুনবেন?
‘হ্যা, শােনা যেতে পারে। তবে আমি নিজে অবিশ্বাসী ধরনের মানুষ, কাজেই গল্পের মাঝখানে যদি হেসে ফেলি কিছু মনে করবেন না।
এই গল্পটা কাউকে বলতে ভালাে লাগে না। অবশ্যি অনেককে বলেছি। এখানকার সবাই জানে।
‘আপনার গল্প এখানকার সবাই বিশ্বাস করেছে?
সুধাকান্তবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, আমি যদি এখানকার কাউকে একটা মিথ্যা কথাও বলি, এরা বিশ্বাস করবে। এরা আমাকে সাধুবাবা বলে ডাকে। আমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে কোনাে মিথ্যা কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। আমি থাকি একা–একা। আমার প্রয়ােজনও সামান্য। মানুষ মিথ্যা কথা বলে প্রয়ােজন এবং স্বার্থের কারণে। আমার সেই সমস্যা নেই। এইসব থাক, আমি বরং গল্পটা বলি।
‘বলুন।
‘ভেতরে গিয়ে বসবেন? এখানে মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা লাগছে। অগ্রহায়ণ মাসে হিম পড়ে।
‘আমার অসুবিধা হচ্ছে না, এখানেই বরং ভালাে লাগছে। গ্রামে তেমন আসা হয়। না। আপনি শুরু করুন।
সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করতে গিয়েও শুরু করলেন না। হঠাৎ যেন একটু অন্য রকম হয়ে গেলেন। যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু দেখতে চেষ্টা করছেন। খসখস শব্দ হল। নতুন কাপড় পরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, সে–রকম। তার প্রায় সঙ্গে–সঙ্গেই কাঁচের চুড়ির টুংটুং শব্দের মতাে শব্দ। আমি বললাম, কী ব্যাপার বলুন তাে?”
বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)
সুধাকান্তবাবু ফ্যাকাসে মুখে হাসলেন। আমি বললাম, ‘কিসের শব্দ হল?
তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘ও কিছু না, আপনি গল্প শুনুন। আজ ঘুমিয়ে কাজ নেই, আসুন গল্প করে রাত পার করে দিই। গা–ছমছমে পরিবেশ। বাড়ির লাগােয়া ঝাঁকড়া কামিনী গাছ থেকে কামিনী ফুলের নেশা–ধরান গন্ধ আসছে। কুয়ার আশেপাশে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে–নিভছে। উঠোনের চুলা থেকে ভেসে আসছে পােড়া কাঠের গন্ধ। আকাশ–ভরা নক্ষত্রবীথি।
সুধাকান্তবাবু গল্প শুরু করলেন।
‘যুবক বয়স থেকেই আমাকে সবাই ডাকত সাধুবাবা। .
” ‘যদিও ঠিক সাধু বলতে যা বােঝায় আমি তা নই। তবে প্রকৃতিটা একটু ভিন্ন ছিল। সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে–দূরে রাখার স্বভাব আমার ছিল। শুশান, কবরস্থান এইসব আমাকে ছােটবেলা থেকেই আকর্ষণ করত। অল্প বয়স থেকেই শুশান এবং কবরস্থানের আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। আমার বাবা শ্যামাকান্ত ভৌমিক তখন জীবিত। আমার মতিগতি দেখে অল্প বয়সেই আমার বিবাহ ঠিক করলেন। পাশের গ্রামের মেয়ে। ভবানী মিত্র মহাশয়ের প্রথমা কন্যা আরতি। খুবই রূপবতী মেয়ে। গ্রামাঞ্চলে এ–রকম মেয়ে সচরাচর দেখা যায় না। আমি বিবাহ করতে রাজি হলাম। কথাবার্তা পাকাপাকি হয়ে যাবার পর একটা দুর্ঘটনায় মেয়েটা মারা যায়।
‘কী দুর্ঘটনা?
‘সাপের কামড়। আমাদের এই অঞ্চলে সাপের উপদ্রব আছে। বিশেষ করে কেউটে সাপ।
তারপর কী হল বলুন।
‘মেয়েটির মৃত্যুতে খুব শােক পেলাম। প্রায় মাথাখারাপের মতাে হয়ে গেল। কিছুই ভালাে লাগে না। রাতবিরাতে শ্মশানে গিয়ে বসে থাকি। সমাজ–সংসার কিছুতেই মন বসে না। গভীর বৈরাগ্য। কিছু দিন সাধু–সন্ন্যাসীর খোঁজ করলাম। ইচ্ছা ছিল উপযুক্ত গুরুর সন্ধান পেলে মন্ত্র নেব। তেমন কাউকে পেলাম না।
বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)
‘আমার বাবা অন্যত্র আমার বিবাহের চেষ্টা করলেন। আমি রাজি হলাম না। বাবাকে বুঝিয়ে বললাম যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা না যে আমি সংসারের বন্ধনে আটকা পড়ি। পরিবারের অন্যরাও চেষ্টা করলেন আমি সম্মত হলাম না। এ–সব আমার প্রথম যৌবনের কথা। না–বললে আপনি গল্পটা ঠিক বুঝতে পারবেন না। আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন ?
আমি বললাম, না, বিরক্ত হব কেন?‘
সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘প্রথম যৌবনের কথা সবাই খুব আগ্রহ করে বলে। আমি বলতে পারি না।
‘আপনি তত ভালােই বলছেন। থামবেন না বলতে থাকুন।
সুধাকান্তবাবু আবার শুরু করলেন
এরপর অনেক বছর কাটল। শুশানে–শুশানে ঘুরতাম বলেই বােধহয় ঈশ্বর আমার ঘরটাকেই শুশান করে দিলেন। পুরােপুরি একা হয়ে গেলাম। মানুষ যে–কোনাে পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়। আমিও মানিয়ে নিলাম। আমার প্রকৃতির মধ্যে একধরনের একাকীত্ব ছিল, কাজেই আমার খুব অসুবিধা হল না। এখন আমি মূল ঘটনায় চলে আসব, তার আগে আপনি কি চা খাবেন?
বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)
‘জ্বি–না।‘ ‘খান একটু চা, ভালাে লাগবে।‘
আমার মনে হল ভদ্রলােকের নিজেরই চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, বানান। একটু ঠাণ্ডা–ঠাণ্ডা লাগছে অবশ্যি।
ভিতরে গিয়ে বসবেন? ‘জ্বি–না, এখানেই ভালাে লাগছে।
চা শেষ করার পর দ্বিতীয় দফায় গল্প শুরু হল। এইখানে আমি একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করলাম। আমার কাছে মনে হল ভদ্রলােকের গলার স্বর পাল্টে গেছে। আগে যে–স্বরে কথা বলছিলেন, এখন সেই স্বরে বলছেন না। একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমার মনের ভুল হতে পারে। অনেক সময় পরিবেশের কারণে সবকিছু অন্য রকম মনে হয়।
সুধাকান্তবাবু বলতে শুরু করলেন—
‘গত বৎসরের কথা। কার্তিক মাস। আমি বাড়িতে ফিরছি। রাত প্রায় দশটা কিংবা তার চেয়ে বেশিও হতে পারে। আমার ঘড়ি নেই, সময়ের হিসাব ঠিক থাকে
বৃহন্নলা-পর্ব-(৪)
আমি সুধাকান্তবাবুকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার স্কুল তাে নিশ্চয়ই চারটা–পাঁচটার দিকে ছুটি হয়। এত রাতে ফিরছিলেন কেন?
সুধাকান্তবাবু নিচু গলায় বললেন, ‘রােজই এই সময়ে বাড়ি ফিরি। সকাল–সকাল বাড়ি ফেরার কোনাে উৎসাহ বােধ করি না। পাবলিক লাইব্রেরি আছে। ঐখানে পত্রিকাটত্রিকা পড়ি, গল্পের বই পড়ি।
‘বলুন তারপর কী হল। ‘তারিখটা হচ্ছে বারই কার্তিক, সােমবার। আমি মানুষ হিসাবে বেশ সাহসী। রাতবিরাতে একা–একা ঘােরাফেরা করি। ঐ রাতে রাস্তায় নেমেই আমার ভয়ভয় করতে লাগল। কী জন্যে ভয় করছে সেটাও বুঝলাম না।
Read more