মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

হরিচরণ বললেন, ধনু নামের মানুষজন কি থাপড়াইতে ওস্তাদ ? ধনু জিব কাটলমুরুব্বি মানুষের সামনে বেআদবি কথা বলা হয়েছেতাকে আরাে সাবধান হতে হবেসে এখন বিশিষ্টজনবিশিষ্টজনরা কথাবার্তা বলবে সাবধানেহিসাব করেএকটা কথার আগে দশটা হিসাব। 

বান্ধবপুরের আরেক বিশিষ্টজন মনিশংকর দেওয়ানথাকেন কোলকাতায়কাপড়ের ব্যবসা করেনদুর্গাপূজা উপলক্ষে গ্রামে ফিরেনবিরাট আয়ােজনে 

দুর্গাপূজা হয়প্রতিবছরই তিনি পূজা উপলক্ষে কিছু না কিছু মজার আয়ােজন করেনকখনাে যাত্রা, কখনাে ঘেটু গান, ম্যাজিক শাে, সাহেববাড়ির বাজনা শােনা যাচ্ছে, বছর তিনি বাইজি নাচাবেনদেবী দুর্গার সঙ্গে পূজা গ্রহণের জন্যে কার্তিকও আসেনকার্তিক আবার বারবনিতাদের গানবাজনার ভক্ততাঁর অবসর সময় কাটে স্বর্গের নটিদের নৃত্যগীতাদি শুনেদেবী দুর্গার সঙ্গে মায়ের বাড়ি বেড়াতে এসে নিরামিষ সময় কাটানাে তার পছন্দ নাপূজার উদ্যোক্তারা তাঁর আনন্দ বিনােদনের ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা নেন। 

দুর্গাপূজার শুরুতে হরিচরণের কাছে এসে উপস্থিত হলেন শশী ভট্টাচার্যথলেথলে পূজারি বামুন নামােটামুটি ফিটফাট যুবা পুরুষবালক বালক চেহারা, মাথাভর্তি চুল । হালকা পাতলা শরীরগায়ের বর্ণ গৌরগায়ে হলুদ রঙের আলপাকার কোটপায়ে চকচকে বার্নিশ করা জুতাথিয়েটারের নায়কের পার্ট তাকে যেকোনাে সময় দেয়া যায় । 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

শশী ভট্টাচার্য বললেন, আমি ব্রাহ্মণ বিধায় আপনাকে প্রণাম করতে পারছিআপনি প্রণম্য ব্যক্তি। ……….হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনার পরিচয়

আমার নাম শশী ভট্টাচার্য। পিতা এককড়ি ভট্টাচার্য, মাতার নাম যশােদাতারা বিত্তবান মানুষআমি তাদের একমাত্র সন্তানতারা সম্প্রতি আমাকে ত্যাগ করেছেন বিধায় আমি দেশে বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে এখানে উপস্থিত হয়েছিএক দু’দিন থেকে চলে যাব যদি অনুমতি দেন। ……..আমি অনুমতি দেবার কে

আপনার আশ্রয়ে থাকব বলেই অনুমতি প্রয়ােজনগাছতলায় তাে থাকতে পারি নামাথার উপর চাল প্রয়ােজন। ……হরিচরণ বললেন, আমি জাতিচ্যুত মানুষএকজন ব্রাহ্মণ সন্তান আমার সঙ্গে থাকতে পারেন না। ……..শশী ভট্টাচার্য বললেন, সেটাও কথা হরিচরণ বললেন, আমি অন্যকোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেই

তাহলে খুবই ভালাে হয়আমি নির্জনে থাকতে পছন্দ করিজলের কাছাকাছি হলে ভালাে হয়কলিকাতায় আমাদের বসতবাড়ি গঙ্গার উপরেজল দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে। …..হরিচরণ বললেন, মাধাই খালের কাছে আমার টিনের ছােট্ট ঘর আছে, সেখানে থাকতে পারেনএকজন পাচকের ব্যবস্থা করে দিব। 

শশী ভট্টাচার্য বললেন, পাচক ফাচক লাগবে নাআমি নিজেই রাঁধবভালাে কথা, আমি অন্যের সাহায্য বা ভিক্ষা গ্রহণ করি নাএই যে কয়েকদিন থাকব তার বিনিময়ে আপনার জন্যে কী করতে পারি ? ……..হরিচরণ বললেন, কিছুই করার প্রয়ােজন নেইআপনি অতিথিঅতিথি হলেন নারায়ণ। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

সব অতিথি নারায়ণ নাকিছু অতিথি বিভীষণযাই হােক, আমি কর্মী মানুষআপনার হয়ে কাজকর্ম করে দিতে আমার কোনােই অসুবিধা নেইশুনেছি আপনি জমিদারি কিনেছেনআমি জমিদারির কাগজপত্র দেখে দিতে পারিখাজনা আদায় বিলি ব্যবস্থা এইসবও করতে পারি। 

আপনার পিতার কি জমিদারি আছে ? ……….ছিলএখন নাইএখন তারা ধর্মকর্ম নিয়ে থাকেনতারা থাকেন ধর্মকর্ম নিয়ে, আমি থাকি বাদ্যবাজনা নিয়েএই নিয়েই তাঁদের সঙ্গে আমার বিরােধ। ……আপনি বাদ্যবাজনা করেন ? হু, ব্যাঞ্জো বাজাইআপনার বাক্সে কি কলের গান? …….ঠিক ধরেছেনকলের গানহিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির পঞ্চাশটার মতাে থাল আমার কাছে আছে। 

যন্ত্রটার নাম শুনেছি, কোনােদিন দেখি নাইআপনার কি বাদ্যবাজনার শখ আছে ? হরিচরণ বললেন, শখ নাইজমিদার মানুষদের শখ থাকেআপনে কেমন জমিদার ? হরিচরণ হাসিমুখে বললেন, আমি খারাপ জমিদার। ………..আপনার অনেক সুখ্যাতি শুনেছিআশা করি আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় শুভ হবে। 

বাবামা ছেড়ে চলে আসা এই আলাভােলা ছেলেটাকে হরিচরণের অত্যন্ত পছন্দ হলােতাঁর বারবারই মনে হলাে, এই ছেলেটা যদি এখানে স্থায়ী হয়ে যেত! একটা স্কুল শুরু করা তাঁর অনেকদিনের বাসনাছেলেটাকে দিয়ে স্কুলের কাজ ধরা যায়জমিদারি কাজেও মনে হয় এই ছেলে দক্ষ হবেসমস্যা একটাই, কিছু মানুষ থাকে কলমিশাকধর্মীশিকড়বিহীনকলমিশাক জলে ভাসে বলে শিকড় বসাতে পারে নাজলের উপর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়এই ছেলেটাও মনে হচ্ছে জলেভাসা । 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

শশী ভট্টাচার্য নিজেকে কর্মী মানুষ বলে পরিচয় দিয়েছিলবাস্তবেও সেরকম দেখা গেলঅতি অল্প সময়ে হরিচরণের টিনের ঘর ভেঙে মাধাই খালের আরাে কাছে নিয়ে গেলএত কাছে যে বাড়ির বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসলে পা খালের পানি স্পর্শ করেঝােপঝাড় কেটে নয়াবসতিকাঠের কাজ করে দিচ্ছে মিস্ত্রি সুলেমানকরাত দিয়ে কাঠ কাটতে কাটতে সে অবাক হয়ে নতুন মানুষটাকে দেখছেনতুন মানুষটা হাতপা নেড়ে বিড়বিড় করে কী বলে এটা তার জানার শখতার ধারণা যাত্রা থিয়েটারের কোন পার্ট। 

শশী ভট্টাচার্য হাতপা নেড়ে যা করে তার নাম কবিতা আবৃত্তি গানবাজনা ছাড়াও তার কবিতা লেখার বাতিক আছেতার লেখা কবিতা উপসনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ……..সুলেমান কাজ বন্ধ করে হা করে তাকিয়ে আছেশশী ভট্টাচার্য একটা জবাগাছের দিকে তর্জনী উঠিয়ে বলছে 

সেই তুমি মুক্ত আজি জয়ধ্বনি উঠে বাজি অমরাবতীর সভাতলে, ছন্দে ছন্দে কানপাতি উর্বশী নাচিছে মাতি মহেন্দ্রের লুব্ধ আঁখিজলে। …………………………..পূজার ঢাকের বাদ্য বাজতে শুরু করেছে। 

তাক দুমদুম তাক দুমদুম শব্দে বান্ধবপুর মুখরিতআনন্দের ছোঁয়া লেগেছে মুসলমানদের মধ্যেওছেলেপুলেরা মহানন্দে পূজাবাড়ির উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছেকেউ কিছু মনে করছে নাবয়স্ক মুসলমানরা আসছেআজ তাদেরও কেউ কিছু বলছে না

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *