হরিচরণ বললেন, ধনু নামের মানুষজন কি থাপড়াইতে ওস্তাদ ? ধনু জিব কাটল। মুরুব্বি মানুষের সামনে বেআদবি কথা বলা হয়েছে। তাকে আরাে সাবধান হতে হবে। সে এখন বিশিষ্টজন। বিশিষ্টজনরা কথাবার্তা বলবে সাবধানে। হিসাব করে। একটা কথার আগে দশটা হিসাব।
বান্ধবপুরের আরেক বিশিষ্টজন মনিশংকর দেওয়ান। থাকেন কোলকাতায়। কাপড়ের ব্যবসা করেন। দুর্গাপূজা উপলক্ষে গ্রামে ফিরেন। বিরাট আয়ােজনে
দুর্গাপূজা হয়। প্রতিবছরই তিনি পূজা উপলক্ষে কিছু না কিছু মজার আয়ােজন করেন। কখনাে যাত্রা, কখনাে ঘেটু গান, ম্যাজিক শাে, সাহেববাড়ির বাজনা । শােনা যাচ্ছে, এ বছর তিনি বাইজি নাচাবেন। দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজা গ্রহণের জন্যে কার্তিকও আসেন। কার্তিক আবার বারবনিতাদের গান–বাজনার ভক্ত। তাঁর অবসর সময় কাটে স্বর্গের নটিদের নৃত্যগীতাদি শুনে। দেবী দুর্গার সঙ্গে মায়ের বাড়ি বেড়াতে এসে নিরামিষ সময় কাটানাে তার পছন্দ না। পূজার উদ্যোক্তারা তাঁর আনন্দ বিনােদনের ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা নেন।
দুর্গাপূজার শুরুতে হরিচরণের কাছে এসে উপস্থিত হলেন শশী ভট্টাচার্য। থলেথলে পূজারি বামুন না। মােটামুটি ফিটফাট যুবা পুরুষ। বালক বালক চেহারা, মাথাভর্তি চুল । হালকা পাতলা শরীর। গায়ের বর্ণ গৌর। গায়ে হলুদ রঙের আলপাকার কোট। পায়ে চকচকে বার্নিশ করা জুতা। থিয়েটারের নায়কের পার্ট তাকে যে–কোনাে সময় দেয়া যায় ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
শশী ভট্টাচার্য বললেন, আমি ব্রাহ্মণ বিধায় আপনাকে প্রণাম করতে পারছি। আপনি প্রণম্য ব্যক্তি। ……….হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনার পরিচয় ?
আমার নাম শশী ভট্টাচার্য। পিতা এককড়ি ভট্টাচার্য, মাতার নাম যশােদা। তারা বিত্তবান মানুষ। আমি তাদের একমাত্র সন্তান। তারা সম্প্রতি আমাকে ত্যাগ করেছেন বিধায় আমি দেশে বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে এখানে উপস্থিত হয়েছি। এক দু’দিন থেকে চলে যাব যদি অনুমতি দেন। ……..আমি অনুমতি দেবার কে ?
আপনার আশ্রয়ে থাকব বলেই অনুমতি প্রয়ােজন। গাছতলায় তাে থাকতে পারি না। মাথার উপর চাল প্রয়ােজন। ……হরিচরণ বললেন, আমি জাতিচ্যুত মানুষ। একজন ব্রাহ্মণ সন্তান আমার সঙ্গে থাকতে পারেন না। ……..শশী ভট্টাচার্য বললেন, সেটাও কথা । হরিচরণ বললেন, আমি অন্যকোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেই ?
তাহলে খুবই ভালাে হয়। আমি নির্জনে থাকতে পছন্দ করি। জলের কাছাকাছি হলে ভালাে হয়। কলিকাতায় আমাদের বসতবাড়ি গঙ্গার উপরে। জল দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে। …..হরিচরণ বললেন, মাধাই খালের কাছে আমার টিনের ছােট্ট ঘর আছে, সেখানে থাকতে পারেন। একজন পাচকের ব্যবস্থা করে দিব।
শশী ভট্টাচার্য বললেন, পাচক ফাচক লাগবে না। আমি নিজেই রাঁধব। ভালাে কথা, আমি অন্যের সাহায্য বা ভিক্ষা গ্রহণ করি না। এই যে কয়েকদিন থাকব তার বিনিময়ে আপনার জন্যে কী করতে পারি ? ……..হরিচরণ বললেন, কিছুই করার প্রয়ােজন নেই। আপনি অতিথি। অতিথি হলেন নারায়ণ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
সব অতিথি নারায়ণ না। কিছু অতিথি বিভীষণ। যাই হােক, আমি কর্মী মানুষ। আপনার হয়ে কাজকর্ম করে দিতে আমার কোনােই অসুবিধা নেই। শুনেছি আপনি জমিদারি কিনেছেন। আমি জমিদারির কাগজপত্র দেখে দিতে পারি। খাজনা আদায় বিলি ব্যবস্থা এইসবও করতে পারি।
আপনার পিতার কি জমিদারি আছে ? ……….ছিল। এখন নাই। এখন তারা ধর্মকর্ম নিয়ে থাকেন। তারা থাকেন ধর্মকর্ম নিয়ে, আমি থাকি বাদ্যবাজনা নিয়ে। এই নিয়েই তাঁদের সঙ্গে আমার বিরােধ। ……আপনি বাদ্যবাজনা করেন ? হু, ব্যাঞ্জো বাজাই। আপনার ঐ বাক্সে কি কলের গান? …….ঠিক ধরেছেন। কলের গান। হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির পঞ্চাশটার মতাে থাল আমার কাছে আছে।
যন্ত্রটার নাম শুনেছি, কোনােদিন দেখি নাই। আপনার কি বাদ্যবাজনার শখ আছে ? হরিচরণ বললেন, শখ নাই। জমিদার মানুষদের শখ থাকে। আপনে কেমন জমিদার ? হরিচরণ হাসিমুখে বললেন, আমি খারাপ জমিদার। ………..আপনার অনেক সুখ্যাতি শুনেছি। আশা করি আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় শুভ হবে।
বাবা–মা ছেড়ে চলে আসা এই আলাভােলা ছেলেটাকে হরিচরণের অত্যন্ত পছন্দ হলাে। তাঁর বারবারই মনে হলাে, এই ছেলেটা যদি এখানে স্থায়ী হয়ে যেত! একটা স্কুল শুরু করা তাঁর অনেকদিনের বাসনা। ছেলেটাকে দিয়ে স্কুলের কাজ ধরা যায়। জমিদারি কাজেও মনে হয় এই ছেলে দক্ষ হবে। সমস্যা একটাই, কিছু মানুষ থাকে কলমিশাকধর্মী। শিকড়বিহীন। কলমিশাক জলে ভাসে বলে শিকড় বসাতে পারে না। জলের উপর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। এই ছেলেটাও মনে হচ্ছে জলেভাসা ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
শশী ভট্টাচার্য নিজেকে কর্মী মানুষ বলে পরিচয় দিয়েছিল। বাস্তবেও সেরকম দেখা গেল। অতি অল্প সময়ে হরিচরণের টিনের ঘর ভেঙে মাধাই খালের আরাে কাছে নিয়ে গেল। এত কাছে যে বাড়ির বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসলে পা খালের পানি স্পর্শ করে। ঝােপঝাড় কেটে নয়াবসতি। কাঠের কাজ করে দিচ্ছে মিস্ত্রি সুলেমান। করাত দিয়ে কাঠ কাটতে কাটতে সে অবাক হয়ে নতুন মানুষটাকে দেখছে। নতুন মানুষটা হাত–পা নেড়ে বিড়বিড় করে কী বলে এটা তার জানার শখ। তার ধারণা যাত্রা থিয়েটারের কোন পার্ট।
শশী ভট্টাচার্য হাত–পা নেড়ে যা করে তার নাম কবিতা আবৃত্তি । গানবাজনা ছাড়াও তার কবিতা লেখার বাতিক আছে। তার লেখা কবিতা ‘উপসনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ……..সুলেমান কাজ বন্ধ করে হা করে তাকিয়ে আছে। শশী ভট্টাচার্য একটা জবাগাছের দিকে তর্জনী উঠিয়ে বলছে
সেই তুমি মুক্ত আজি জয়ধ্বনি উঠে বাজি অমরাবতীর সভাতলে, ছন্দে ছন্দে কানপাতি উর্বশী নাচিছে মাতি মহেন্দ্রের লুব্ধ আঁখিজলে। …………………………..পূজার ঢাকের বাদ্য বাজতে শুরু করেছে।
তাক দুমদুম তাক দুমদুম শব্দে বান্ধবপুর মুখরিত। আনন্দের ছোঁয়া লেগেছে মুসলমানদের মধ্যেও। ছেলেপুলেরা মহানন্দে পূজাবাড়ির উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কিছু মনে করছে না। বয়স্ক মুসলমানরা আসছে। আজ তাদেরও কেউ কিছু বলছে না।
