মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

সুলেমানের স্ত্রী জুলেখা আয়ােজন করে পায়ে আলতা দিচ্ছেসে বসেছে বেতের মােড়ায়তার পা জলচৌকিতে রাখাপাটকাঠির মাথা কলমের নিচের মতাে কেটে তুলি বানানাে হয়েছেজহির মুগ্ধ চোখে মার পায়ের শিল্পকর্ম দেখছেএকটু দূরে ছােট ধামাভর্তি মুড়ি এবং খেজুর গুড় নিয়ে বসেছে সুলেমানসে তিন দিন হলাে ফিরেছেস্ত্রীর জন্যে কচুয়া রঙের একটা শাড়ি এনেছে

এই বিষয়ে স্ত্রীর কোনাে উৎসাহ নেই দেখে আহত হয়েছেজুলেখা সেই শাড়ির ভাজ এখনাে খুলে নিনতুন শাড়ি পেয়ে কদমবুসি করা প্রয়ােজন, তাও করে নিতার পুত্র জহির মুড়ি খাওয়া বাদ দিয়ে মায়ের সাজ দেখছে, এতেও সুলেমান মহা বিরক্তআজ জুম্মাবার জুম্মাবারে এত সাজসজ্জা কী

সুলেমান জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, পুলা, মুড়ি খাইয়া যাজহির মাদিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল, নাজুলেখা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, পাও আলতা দিতে ইচ্ছা করে

জহির সঙ্গে সঙ্গে হাসূচক মাথা নাড়লতার ছােট্ট পা জলচৌকিতে তুলে দিলজুলেখা ছেলের পায়ে লাল টুকটুকে একটা মাছ এঁকে দিলজহিরের মুখভর্তি হাসি। 

রাগে সুলেমানের শরীর জ্বলে যাচ্ছেছেলেকে নিয়ে সে জুম্মার নামাজ পড়তে যাবে, এর মধ্যে পায়ে আলতা! তার উচিত ছেলের গালে শক্ত করে একটা চড় দেয়াএটা সে করতে পারছে নাজহিরের শরীর ভালাে নাকালরাতেও জ্বর ছিল এখনাে হয়তাে আছে । 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

সুলেমান বলল, সক্কালবেলা আলতা নিয়া বসলাকাজটা উচিত হয়েছে ? ……..জুলেখা বলল, সক্কালে আলতা দেওয়া যাবে না এমন কথা কি হাদিস কোরানে আছে ? ………এইটা কেমন কথা? তােমার উপরে কি জিন ভূতের আছর হইছে ? জিন ভূতের আছর হইলে মেয়েছেলে স্বামীর মুখের উপরে ফড়ফড় করেজঙ্গলায় ঘুরেসময় অসময়ে গীত ধরে। 

জুলেখা জবাব না দিয়ে ছেলের অন্যপায়ে আরেকটা মাছ আঁকছেসুলেমান বলল, পুরুষ মাইনষের পাও আলতা দিছ ? ………..জুলেখা বলল, জহির পুলাপানপুলাপানের পায়ে আলতা দিলে দোষ হয় । 

এই কথা কোন বুজুর্গ আলেম তােমারে বলেছে? জুলেখা জবাব দিল নাস্বামীর বেশিরভাগ প্রশ্নেরই সে জবাব দেয় না। …….সুলেমান বলল, জহিররে নিয়া জুম্মার নামাজ পড়তে যাবতখন যদি পাও রঙ থাকে— ..জুলেখা ফিক করে হেসে ফেলল সুলেমান বলল, হাসলা যে ? কী কারণে হাসলা ? জুলেখা বলল, কী কারণে হাসছি আপনেরে বলব না। 

জুলেখা হাসছে কারণ সে তার স্বামীকে ভালাে ফাঁকি দিয়েছেতাকে না জানিয়ে লেখাপড়া শিখে ফেলেছেযেকোনাে লেখা সে এখন পড়তে পারে। …….সুলেমান বলল, তুই অবশ্যি বলবিতুই তােকারি কইরেন না। ……….সুলেমান কঠিন গলায় বলল, আগে বল তুই হাসলি কী জন্যে ? হাসির কথা কী হইছে

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

জুলেখা কিছুই বলল না, নিজের মনে পায়ে আলতা দিতে লাগলসুলেমান মুড়ি খাওয়া বন্ধ করে উঠে এলােপ্রথমে ভেবেছিল স্ত্রীর গালে কষে থাপ্পড় দিবেবেয়াদব স্ত্রীকে শাসন করার অধিকার সব স্বামীর আছেমাওলানা সাহেব 

বলেছেন আল্লাহপাক পুরুষ মানুষরে এই অধিকার দিয়েছেনকারণ পুরুষের অবস্থান নারীর উপরেতবে শাসনের সময় খেয়াল রাখতে হবে স্ত্রীর মুখমণ্ডলে যেন মায়ের চিহ্ন না থাকেসুলেমান থাপ্পড় উঠিয়ে এগিয়ে এলেও শেষ মুহুর্তে নিজেকে সামলালথাপ্পড় দেবার বদলে আলতার শিশি উঠানে ছুড়ে ফেলে দিল । 

জুলেখার একপায়ে আলতা দেয়া হয়েছেঅন্য পা খালিআবার কবে আলতা কেনা হবে, কবে পায়ে দেয়া হবে কে জানে! বেদেবহর নৌকা করেএখনাে আসে নিতারা চলে এলে সমস্যা নেই। গাইন বেটিরা ঝুড়ি ভর্তি করে কাচের চুড়ি, আলতা, গন্ধতেল নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরবে | বাহারি জিনিস বেচবেএকইসঙ্গে কাইক্যা মাছের কাটা দিয়ে শরীরের বদ রক্ত দূর করবেগাইনবেটিদের কাছ থেকে শখের জিনিসপত্র কেনার জন্যে এবং বদ রক্ত বের করার জন্যে সব মেয়েই টাকাপয়সা জমিয়ে রাখেজুলেখারও জমা টাকা আছে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

সুলেমান বলল, ঝিম ধইরা বইসা থাকবা নাছেলের পাওয়ের আলতা ঘইসা তােলআইজ জুম্মাবার নামাজে যাবছেলেরে ঘাটে নিয়ে যাওরিঠা গাছের পাতা দিয়া ডলা দাও| জুলেখা ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ছেলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালছেলের দুই পায়ে দুই মাছকী সুন্দরই না দেখাচ্ছে মাছ দুটা! এই সুন্দর দুটা মাছ তুলে ফেলতে হবে ? কাজটা বড়ই কঠিনসুন্দর নষ্ট করা যায় নাসুন্দর নষ্ট করলে পাপ হয়এই কথা তার বাপজান তাকে বলেছিলেন। 

পুকুরঘাটে পা ডুবিয়ে জহির বসেছেজুলেখা তার সামনেজুলেখার হাতে গায়ে মাখা গন্ধ সাবানএই সাবান গত বছর গাইনবেটিদের কাছ থেকে কেনা, গােপন জায়গায় লুকিয়ে রাখাসুলেমান এত দামের সাবান দেখতে পেলে রাগবে । 

জহির বলল, মা গীত করকোন গীত ? পাও ধুয়ানি গীতজুলেখা সঙ্গে সঙ্গে গাইল— ……সােনার পায়ে সােনার মাছ …….ঝিলমিল ঝিলমিল করে এই মাছেরে দিয়ে আসব। …………………দক্ষিণ সায়রে । 

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *