মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

অম্বিকা ভট্টাচার্য মুখ গম্ভীর করে হরিচরণের স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনলেনকিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, স্বপ্নটা ভালাে না।………………হরিচরণ বললেন, ভালাে না কেন ? ………অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, উঁচু বংশের কেউ যদি দেবদেবী কোলে নেয়া দেখে, তাহলে তার জন্যে উত্তমসৌভাগ্য এবং রাজানুগ্রহনিম্নবংশীয় কেউ দেখলে তার জন্যে দুর্ভাগ্যসে হবে অপমানিতরাজরােষের শিকারতার ভাগ্যে অর্থনাশের যােগও আছে। 

বলেন কী

শাস্ত্রমতে ব্যাখ্যা করলামতােমার পছন্দ না হলেও কিছু করার নাইযাহা সত্য তাহা সত্যতাছাড়া তুমি দেবগাত্রে রক্তপাত দেখেছ, এর অর্থ আরাে খারাপ। 

কী খারাপ

রক্তপাত হয় এমন কোনাে রােগব্যাধি তােমার হতে পারেযেমন ধর, যক্ষ্মাশান্তি সস্থায়নের ব্যবস্থা কর বিপদনাশিনী পূজার ব্যবস্থা কর । 

অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। 

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, আমি কী অপরাধ করলাম

অম্বিকা বললেন, দেবতা শ্রীকৃষ্ণকে কোলে নিয়ে ঘুরেছ, এটাই অপরাধঅপরাধ দুই প্রকারজ্ঞান অপরাধ, অজ্ঞান অপরাধতুমি করেছ অজ্ঞান অপরাধ। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

আচ্ছা। 

অম্বিকা ভট্টাচার্য উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, পূজা কবে করতে চাও আমাকে জানাবেযত শীঘ্র হয় তত ভালােআগামী বুধবার ভালাে দিন আছে চাদের নবমী। 

হরিচরণ বললেন, পূজা বুধবারেই করবেনখরচপাতি যেরকম বলবেন সেরকম করব। 

ভালােঐদিন তুমি উপবাস করবেনিরন্তু উপবাসজলপানও করবে নাসন্ধ্যাবেলা পূজা হবেপূজার পর উপবাস ভঙ্গ করবে। 

হরিচরণ হাসূচক মাথা নাড়লেন। 

বেলা বেড়েছেসকালে আকাশ মেঘমুক্ত ছিল। এখন মেঘ করতে শুরু করছেদিঘির পানি এতক্ষণ নীল ছিল, এখন কালচে দেখাচ্ছেবড় কোনাে মাছ ঘাই দিলহরিচরণ কৌতূহলী হয়ে তাকালেনপুকুরে অনেক বড় বড় মাছ আছেহরিচরণের বর্শি বাইবার শখ আছেঅনেকদিন বর্শি নিয়ে বসা হয় নাআজ কি বসবেন ? মুকুন্দ ঘরেই আছেতাকে বললেই সে নিমিষের মধ্যে চাড় ফেলার ব্যবস্থা করবেপিঁপড়ার ডিম এনে দিবেপিঁপড়ার ডিম বড় মাছের ভালাে আধার

হরিচরণের মনে হলাে, হুইল বর্শি নিয়ে বসলেই স্বপ্নটা মাথা থেকে দূর হবেস্বপ্ন নিয়ে এত অস্থির হবার কিছু নাইস্বপ্ন অস্থির মস্তিষ্কের ফসলঅস্থিরমতিরাই স্বপ্ন দেখেআলস্য অস্থিরতা তৈরি করেবর্শি বাওয়াও এক ধরনের আলস্য, তারপরেও দৃষ্টি কাজে ব্যস্ত থাকেফাত্তার দিকে তাকিয়ে থাকাও এক ধরনের কাজমুকুন্দকে ডাকতে গিয়ে হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেলচারপাঁচ বছর বয়সি একটা ছেলে পেয়ারা বাগানে একা হাঁটাহাঁটি করছেছেলেটা তার দিকে পেছন ফিরে আছে বলে তিনি তার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ 

ছেলেটার গাত্রবর্ণ গৌরখালি গাপরনে লালরঙের হাফপ্যান্টঘন সবুজের ভেতর তার লালপ্যান্ট ঝকমক করছে। তিনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকেই উঁচু গলায় মুকুন্দকে ডাকলেনছেলেটা চট করে তার দিকে তাকালতিনি মােহিত হয়ে গেলেনকী সুন্দর চেহারা! বড় বড় চোখচোখভর্তি মায়াখাড়া নাকচোখের ঘন পল্লব এতদূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেতিনি হাত ইশারায় ছেলেটাকে ডাকলেনসে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পায়ে পায়ে আসতে লাগলতবে পাশে এসে দাঁড়াল নাএকটু দূরে জামগাছের নিচে থমকে দাড়াল। 

মুকুন্দ তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেতিনি মুকুন্দকে বললেন, বর্শি বাইব, ব্যবস্থা কর। 

মুকুন্দ বলল, জে আজ্ঞে এই ছেলেটা কে ? সুলেমানের পুলামুসলমান ? জে আজ্ঞে । 

সুলেমানটা কে ? কাঠমিস্ত্রিআপনের ঘরের দরজা সারাই করল ছেলেটা তাে দেখতে রাজপুত্রের মতাে

ছেলে হইছে মায়ের মতােমায়ের রূপ দেখার মতােবেশি রূপ হইলে যা হয়জিনে ধরাজংলায় মংলায় একলা ঘুরে গীত গায়আমরার বাগানেমেলা দিন আসছে। 

আমি তাে দেখি নাইজিনে ধরা মেয়েচউক্ষের পলকে সইরা যায় দেখবেন ক্যামনে। 

ঠিক আছে তুমি যাওপিপড়ার ডিম আর কী কী লাগে ব্যবস্থা করপুকুরে চাড় ফেলসারারাত বৃষ্টি হয়েছে, মাছ আধার খাবে নাবৃষ্টি হলেই মাছ আধার খাওয়া বন্ধ করেকী কারণ কে জানে

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ 

মুকুন্দ দ্রুত চলে গেলহরিচরণ আবার তাকালেন ছেলেটার দিকে মাটি থেকে কী যেন কুড়িয়ে মুখে দিচ্ছেমনে হচ্ছে কালােজাম কিন্তু জাম এখনাে পাকে নিগাছের নিচে পাকা জাম পড়ে থাকার কথা নাহরিচরণ এইবার গলা উচিয়ে ছেলেটাকে ডাকলেন, খােকা, এদিকে আস। 

ছেলেটা ছােট ছােট পা ফেলে আসছেদূর থেকে তাকে যতটা সুন্দর মনে হচ্ছিল এখন তার চেয়েও সুন্দর লাগছেতার কপালের একপাশে কাজলের ফোঁটাতার মা নজর না লাগার ব্যবস্থা করেছেনঠিকই করেছেননজর লাগার মতােই ছেলেবয়স কত হবে ? 

কী নাম তােমার ? ছেলে জবাব দিল নানাম বলবে না ? সে নাসূচক মাথা নাড়লকী খাচ্ছ ? ছেলে হা করে তার মুখ দেখালমুখের ভেতর জামের লাল একটা বিচিতিনি বললেন, সন্দেশ খাবে

ছেলেটা হাসূচক মাথা নাড়লতিনি ডাকলেন, মুকুন্দ! মুকুন্দ

মুকুন্দ আশেপাশে নেইসে পিপড়ার ডিমের সন্ধানে চলে গেছেপাকা বাড়িতে বৃদ্ধা মায়ালতা থাকেনহরিচরণের দূরসম্পর্কের বিধবা জেঠিতিনি কানে শােনেন নাশুনলেও ঘর থেকে বের হবেন নারান্নার জন্যে একজন 

ঠাকুর আছেসে বাজারে গেছে মাছের সন্ধানে | হরিচরণ বললেন, তুমি এখানেদাড়িয়ে থাককোথাও যাবে নাআমি সন্দেশ নিয়ে আসছি। 

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *