অম্বিকা ভট্টাচার্য মুখ গম্ভীর করে হরিচরণের স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনলেন। কিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, স্বপ্নটা ভালাে না।………………হরিচরণ বললেন, ভালাে না কেন ? ………অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, উঁচু বংশের কেউ যদি দেবদেবী কোলে নেয়া দেখে, তাহলে তার জন্যে উত্তম। সৌভাগ্য এবং রাজানুগ্রহ। নিম্নবংশীয় কেউ দেখলে তার জন্যে দুর্ভাগ্য। সে হবে অপমানিত। রাজরােষের শিকার। তার ভাগ্যে অর্থনাশের যােগও আছে।
বলেন কী!
শাস্ত্রমতে ব্যাখ্যা করলাম। তােমার পছন্দ না হলেও কিছু করার নাই। যাহা সত্য তাহা সত্য। তাছাড়া তুমি দেবগাত্রে রক্তপাত দেখেছ, এর অর্থ আরাে খারাপ।
কী খারাপ?
রক্তপাত হয় এমন কোনাে রােগ–ব্যাধি তােমার হতে পারে। যেমন ধর, যক্ষ্মা। শান্তি সস্থায়নের ব্যবস্থা কর । বিপদনাশিনী পূজার ব্যবস্থা কর ।
অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।
হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, আমি কী অপরাধ করলাম ?
অম্বিকা বললেন, দেবতা শ্রীকৃষ্ণকে কোলে নিয়ে ঘুরেছ, এটাই অপরাধ। অপরাধ দুই প্রকার। জ্ঞান অপরাধ, অজ্ঞান অপরাধ। তুমি করেছ অজ্ঞান অপরাধ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
ও আচ্ছা।
অম্বিকা ভট্টাচার্য উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, পূজা কবে করতে চাও আমাকে জানাবে। যত শীঘ্র হয় তত ভালাে। আগামী বুধবার ভালাে দিন আছে । চাদের নবমী।
হরিচরণ বললেন, পূজা বুধবারেই করবেন। খরচপাতি যেরকম বলবেন সেরকম করব।
ভালাে। ঐদিন তুমি উপবাস করবে। নিরন্তু উপবাস। জলপানও করবে না। সন্ধ্যাবেলা পূজা হবে। পূজার পর উপবাস ভঙ্গ করবে।
হরিচরণ হা–সূচক মাথা নাড়লেন।
বেলা বেড়েছে। সকালে আকাশ মেঘমুক্ত ছিল। এখন মেঘ করতে শুরু করছে। দিঘির পানি এতক্ষণ নীল ছিল, এখন কালচে দেখাচ্ছে। বড় কোনাে মাছ ঘাই দিল। হরিচরণ কৌতূহলী হয়ে তাকালেন। পুকুরে অনেক বড় বড় মাছ আছে। হরিচরণের বর্শি বাইবার শখ আছে। অনেকদিন বর্শি নিয়ে বসা হয় না। আজ কি বসবেন ? মুকুন্দ ঘরেই আছে। তাকে বললেই সে নিমিষের মধ্যে চাড় ফেলার ব্যবস্থা করবে। পিঁপড়ার ডিম এনে দিবে। পিঁপড়ার ডিম বড় মাছের ভালাে আধার ।
হরিচরণের মনে হলাে, হুইল বর্শি নিয়ে বসলেই স্বপ্নটা মাথা থেকে দূর হবে। স্বপ্ন নিয়ে এত অস্থির হবার কিছু নাই। স্বপ্ন অস্থির মস্তিষ্কের ফসল। অস্থিরমতিরাই স্বপ্ন দেখে। আলস্য অস্থিরতা তৈরি করে। বর্শি বাওয়াও এক ধরনের আলস্য, তারপরেও দৃষ্টি কাজে ব্যস্ত থাকে। ফাত্তার দিকে তাকিয়ে থাকাও এক ধরনের কাজ। মুকুন্দকে ডাকতে গিয়ে হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল। চার–পাঁচ বছর বয়সি একটা ছেলে পেয়ারা বাগানে একা হাঁটাহাঁটি করছে। ছেলেটা তার দিকে পেছন ফিরে আছে বলে তিনি তার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
ছেলেটার গাত্রবর্ণ গৌর। খালি গা। পরনে লালরঙের হাফপ্যান্ট। ঘন সবুজের ভেতর তার লালপ্যান্ট ঝকমক করছে। তিনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকেই উঁচু গলায় মুকুন্দকে ডাকলেন। ছেলেটা চট করে তার দিকে তাকাল। তিনি মােহিত হয়ে গেলেন। কী সুন্দর চেহারা! বড় বড় চোখ। চোখভর্তি মায়া। খাড়া নাক। চোখের ঘন পল্লব এতদূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি হাত ইশারায় ছেলেটাকে ডাকলেন। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পায়ে পায়ে আসতে লাগল। তবে পাশে এসে দাঁড়াল না। একটু দূরে জামগাছের নিচে থমকে দাড়াল।
মুকুন্দ তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি মুকুন্দকে বললেন, বর্শি বাইব, ব্যবস্থা কর।
মুকুন্দ বলল, জে আজ্ঞে । এই ছেলেটা কে ? সুলেমানের পুলা। মুসলমান ? জে আজ্ঞে ।
সুলেমানটা কে ? কাঠমিস্ত্রি। আপনের ঘরের দরজা সারাই করল । ছেলেটা তাে দেখতে রাজপুত্রের মতাে!
ছেলে হইছে মায়ের মতাে। মায়ের রূপ দেখার মতাে। বেশি রূপ হইলে যা হয়। জিনে ধরা। জংলায় মংলায় একলা ঘুরে । গীত গায়। আমরার বাগানে। মেলা দিন আসছে।
আমি তাে দেখি নাই। জিনে ধরা মেয়ে। চউক্ষের পলকে সইরা যায় । দেখবেন ক্যামনে।
ঠিক আছে তুমি যাও। পিপড়ার ডিম আর কী কী লাগে ব্যবস্থা কর। পুকুরে চাড় ফেল। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে, মাছ আধার খাবে না। বৃষ্টি হলেই মাছ আধার খাওয়া বন্ধ করে। কী কারণ কে জানে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
মুকুন্দ দ্রুত চলে গেল। হরিচরণ আবার তাকালেন ছেলেটার দিকে । মাটি থেকে কী যেন কুড়িয়ে মুখে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে কালােজাম । কিন্তু জাম এখনাে পাকে নি। গাছের নিচে পাকা জাম পড়ে থাকার কথা না। হরিচরণ এইবার গলা উচিয়ে ছেলেটাকে ডাকলেন, খােকা, এদিকে আস।
ছেলেটা ছােট ছােট পা ফেলে আসছে। দূর থেকে তাকে যতটা সুন্দর মনে হচ্ছিল এখন তার চেয়েও সুন্দর লাগছে। তার কপালের একপাশে কাজলের ফোঁটা। তার মা নজর না লাগার ব্যবস্থা করেছেন। ঠিকই করেছেন। নজর লাগার মতােই ছেলে। বয়স কত হবে ?
কী নাম তােমার ? ছেলে জবাব দিল না। নাম বলবে না ? সে না–সূচক মাথা নাড়ল। কী খাচ্ছ ? ছেলে হা করে তার মুখ দেখাল। মুখের ভেতর জামের লাল একটা বিচি। তিনি বললেন, সন্দেশ খাবে ?
ছেলেটা হা–সূচক মাথা নাড়ল। তিনি ডাকলেন, মুকুন্দ! মুকুন্দ!
মুকুন্দ আশেপাশে নেই। সে পিপড়ার ডিমের সন্ধানে চলে গেছে। পাকা বাড়িতে বৃদ্ধা মায়ালতা থাকেন। হরিচরণের দূরসম্পর্কের বিধবা জেঠি। তিনি কানে শােনেন না। শুনলেও ঘর থেকে বের হবেন না। রান্নার জন্যে একজন
ঠাকুর আছে। সে বাজারে গেছে মাছের সন্ধানে | হরিচরণ বললেন, তুমি এখানে। দাড়িয়ে থাক। কোথাও যাবে না। আমি সন্দেশ নিয়ে আসছি।
