ছেলেটা হা–সূচক মাথা নাড়ল। হরিচরণের প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে ছেলেটাকে কোলে নিতে। কোলে নেবার জন্যে সময়টা ভালাে। আশেপাশে কেউ নেই । কেউ দেখে ফেলবে না। তিনি এক মুসলমান কাঠমিস্ত্রির ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন— এই দৃশ্য হাস্যকর। ধর্মেও নিশ্চয়ই বাধা আছে। যবনপুত্র অস্পৃশ্য হবার কথা। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। শূদ্রের নিচে যবনের অবস্থান ।
হরিচরণ সন্দেশ এবং এক গ্লাস পানি হাতে ফিরলেন। ছেলেটা যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা সেখানে নেই। জামতলাতেও নেই । পেয়ারা বাগানেও নেই। দিঘির পানিতে ডুবে যায় নি তাে ? তার বুক ধ্বক করে উঠল। তিনি দিঘির দিকে তাকালেন। দিঘির জল শান্ত। সবুজ শ্যাওলার যে চাদর দিঘি জুড়ে ছড়িয়ে আছে সে চাদরে কোনাে ভাঙচুর নেই।
ছেলেটার নাম জানা থাকলে তাকে নাম ধরে ডাকা যেত। তিনি নাম জানেন।এই কাজটা ভুল হয়েছে। দু’টা পিঁপড়া যখন মুখােমুখি হয় তখন তারা কিছুক্ষণ আলাপ আলােচনা করে। বেশিরভাগ সময়ই মানুষরা এই কাজ করে।
একজন আরেকজনকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তিনি পেয়ারা বাগানের দিকে গেলেন। পেয়ারা বাগানের পরই ঘন বেতঝােপ। ছেলেটা বেতঝােপের ওপাশে যায় নি তাে ? সেখানেও তাকে পাওয়া গেল না। আকাশের মেঘ ঘন হয়েছে। যে–কোনাে মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। হরিচরণ ঘাটের কাছে ফিরে গেলেন। তাঁর হাতে সন্দেশ। সন্দেশ থেকে অতি মিষ্টি গন্ধ আসছে। দারুচিনির গন্ধ না–কি ? সন্দেশে গরম মসল্লা দেয়া নিষেধ। দেবীর ভােগে সন্দেশ দেয়া হয়। সেই সন্দেশ বিশুদ্ধ হতে হয়। এলাচ দারুচিনি দিয়ে বিশুদ্ধতা নষ্ট করা যায় না। তাহলে গন্ধটা কিসের? দুধের গন্ধ ? ঘন দুধের কি আলাদা গন্ধ আছে ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আষাঢ় মাসের বড় বড় ফোটার বৃষ্টি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে ভিজিয়ে দেবে। দৌড়ে ঘরে যেতে ইচ্ছা করছে না। তিনি বৃষ্টিতে ভিজছেন। এই বয়সে বৃষ্টিতে ভেজার ফল শুভ হবে না। তারপরেও তিনি ঘাট ছাড়তে পারলেন না। তার কাছে মনে হলাে, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবেন
ছেলেটা ভিজতে ভিজতে আসছে। মুকুন্দ কলাপাতার ঠোঙ্গায় পিঁপড়ার ডিম নিয়ে এসেছে। সে অবাক হয়ে বলল, বিষ্টিত ভিজেন ? অসুখ বাধাইবেন। ঘরে যান।
হরিচরণ বললেন, যাব একটু পরে। তুমি সন্দেশ দু’টা ঐ ছেলেটারে দিয়া আস।
কোন ছেলে ? কাঠমিস্ত্রির ছেলে। আজ আর বর্শি নিয়ে বসব না ।
মুকুন্দ অনিচ্ছার সঙ্গে যাচ্ছে। ভিজতে ভিজতে যাচ্ছে। তার এক হাতে পিঁপড়ার ডিম অন্য হাতে সন্দেশ। মাছ ও মানুষের খাদ্য। হরিচরণ হঠাৎ ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন, ডিমগুলির জন্যে তার খারাপ লাগছে। এই ডিম থেকে আর কোনােদিন পিপড়ার জন্ম হবে না। তারা পৃথিবীর অতি আশ্চর্য রূপ–রস–গন্ধের কিছুই জানবে না। বড়ই আফসােসের কথা। তিনি কি মুকুন্দকে বলবেন। ডিমগুলি যেখান থেকে এনেছে সেখানে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে? হয়তাে এখনাে সময় আছে। জায়গামতাে পৌছে দিলে কিছু ডিম থেকে পিপড়া জন্মাবে। মুকুন্দ অনেকদূর চলে গেছে, এখন ডাকলে সে শুনতে পাবে না। তবু তিনি ডাকলেন, মুকুন্দ! মুকুন্দ!
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
মুকুন্দ শুনতে পেল না। কিন্তু কেউ একজন হাসল। হরিচরণ চমকে হাসির শব্দ যেদিক থেকে আসছে সেদিকে তাকালেন। কী আশ্চর্য, লাল প্যান্ট পরা ছেলেটা। সে দিঘির অন্যপ্রান্তে। পাড় বেয়ে পানির দিকে নামছে। বৃষ্টির পানিতে দিঘির পাড় পিচ্ছিল হয়ে আছে। ছেলেটা কি একটা দুর্ঘটনা ঘটাবে ? পা পিছলে পানিতে পড়ে যাবে ? তিনি ডাকলেন, এই, এই উঠে আস। উঠে আস বললাম। এই ছেলে, এই!
ছেলেটা তাঁকে দেখল। কিন্তু তার দৃষ্টি দিঘির সবুজ পানিতে। তার হাতে কাদামাখা পেয়ারা। সে পেয়ারা পানিতে ধুবে। তিনি উঁচু গলায় আবারাে ডাকলেন, এই ছেলে— এই । তখনি ঝপ করে শব্দ হলাে। কিছুক্ষণ ছেলেটির হাত পানির উপর দেখা গেল। তারপরেই সেই হাত তলিয়ে গেল । হরিচরণ পুকুরে ঝাপ দিলেন।
হরিচরণ কীভাবে দিঘির অন্যপ্রান্তে পৌছলেন, কীভাবে ছেলেটাকে পানি থেকে তুললেন তা তিনি জানেন না। শুধু এইটুকু জানেন পানি থেকে তােলার পর দেখা গেল, ছেলেটার ডানহাত অনেকখানি কেটেছে। সেখান থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। স্বপ্নে শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে এইভাবেই রক্ত পড়ছিল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ও বাবু! বেঁচে আছিস তো! বলেই পুকুরপাড়ে জ্ঞান হারালেন।
তাঁর জ্ঞান ফিরল নিজের খাটে গভীর রাতে। তার চারপাশে মানুষজন ভিড় করেছে। নেত্রকোনা সদর থেকে এলএমএফ ডাক্তার সতীশ বাবু এসেছেন।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি বুকে স্টেথিসকোপ ধরে আছেন। পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধা মায়ালতার কান্না শােনা যাচ্ছে। বৃদ্ধা কারণে অকারণে কাঁদে। হরিচরণ বললেন, ছেলেটা কি বেঁচে আছে ?
মুকুন্দ বলল, বেঁচে আছে। ছেলেটার নাম কী ? জহির। জহির তাহলে বেঁচে গেছে ? জে আজ্ঞে ।
হরিচরণ বললেন, ঠাকুরঘরের তালা খােল। ঘরে বাতি দাও। ঠাকুরঘরে যাব।
মুকুন্দ বিনীতভাবে বলল, সকালে যান। এখন শুয়ে থাকেন। আপনার শরীর অত্যধিক খারাপ।
ঠাকুরঘরের তালা খােল ।
গভীর রাতে ঠাকুরঘরের দরজা খােলা হলাে। প্রদীপ জ্বালানাে হলাে। ছােট্ট ঘর। শ্বেতপাথরের জলচৌকিতে কষ্টিপাথরের রাধা–কৃষ্ণ কৃষ্ণ বাঁশি ধরে আছেন। তাঁর কাঁধে মাথা রেখে লীলাময় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রী রাধিকা।
হরিচরণ পদ্মাসন হয়ে বসলেন। মুকুন্দকে বললেন, ছেলেটাকে নিয়ে আস, আমি একটু দেখব।
ঠাকুরঘরে নিয়ে আসব ? কী বলেন এইসব! হ্যা, ঠাকুরঘরে নিয়ে আস। সে আমার কোলে বসবে। মুসলমান ছেলে তাে! হােক মুসলমান ছেলে।
জহিরের মা জহিরকে কোলে নিয়ে এসেছে। সে তার সবুজ শাড়ি দিয়ে ছেলেকে ঢেকে রেখেছে। তার চোখে উদ্বেগ। বাড়িতে এত লােকজন দেখে হকচকিয়ে গেছে। হরিচরণ উঠানের জলচৌকিতে বসেছেন। তার নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। শরীর ঘামছে। তিনি জহিরের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাগাে! আপনার ছেলে কি ভালাে আছে ?
জহিরের মা জবাব না দিয়ে ছেলেকে আরাে ভালাে করে শাড়ি দিয়ে ঢাকল । হরিচরণ বললেন, আমার এখানে ডাক্তার আছে। ছেলেকে দেন, ডাক্তার দেখুক।
আমার ছেলে ভালাে আছে ।
