মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

সন্ধ্যা মিলাতে না মিলাতেই বৃষ্টি শুরু হলােবৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাসহরিচরণ পাকা দালানের একপাশে বেতের ইজিচেয়ারে আধশােয়া হয়ে বৃষ্টি দেখছেনতামাক খেতে ইচ্ছা করছে, তামাক সাজাবার কেউ নেইতামাক নিজেকেই সাজাতে হবেঘর অন্ধকারসন্ধ্যার বাতি জ্বালানাে প্রয়ােজনকোথায় হারিকেন কোথায় কেরােসিন তিনি কিছুই জানেন না। 

বাড়ির পেছনে ছপছপ শব্দ হচ্ছেভূতপ্রেত কিনা কে বলবে! ভূত প্রেতরা শূন্যৰাড়ির দখল নিয়ে নেয়এমন জনশ্রুতি আছেহাসনাহেনার ঝােপের কাছে সরসর শব্দ হচ্ছেসাপ বের হয়েছে নাকি ? শূন্যবাড়িতে ভূত প্রেতের সঙ্গে সাপও ঢােকেবাড়ি পুরােপুরি জনশূন্য হলে আসে বাদুড়তারা মহানন্দে বাড়ির কড়ি বর্গা ধরে মাথা ঝুলিয়ে দুলতে থাকেযে বাড়িতে সাপ বাদুর সহবাস করে সেই বাড়ির মেঝে ফুড়ে অশ্বথ গাছের চারা বের হয়বাড়িও তখন হয় পতিত । মানুষের যেমন প্রাণ আছে, বসতবাড়িরও আছেপতিতবাড়ি হলাে প্রাণশূন্য বাড়ি। 

ঢং করে কাঁসার পাত্র রাখার শব্দ হলােহরিচরণ চোখ বন্ধ করে ছিলেনচোখ মেলে চমৎকৃত হলেনজহিরের মা ঘােমটা দিয়ে সামনে দাড়িয়েবৃষ্টিতে সে পুরােপুরি ভিজে গেছেসে এখনাে দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টিতেইবৃষ্টিতে ভিজে মনে হয় মজা পাচ্ছেজুলেখা কাঁসার থালাভর্তি করে খাবার এনেছেচিড়া, নারিকেল কোড়া, এক গ্লাস দুধ এবং দুটা কলাহরিচরণ বললেন, মাগাে আজ আমি কিছু খাব নাউপাস দিব

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ 

জুলেখা স্পষ্ট গলায় বলল, আপনি না খেলে আমিও খাব নাআমি এইখানেবৃষ্টির মধ্যে দাঁড়ায়ে থাকব। 

হরিচরণ হাত বাড়িয়ে দুধের গ্লাস নিলেনজুলেখা বলল, ঘর অন্ধকার বাতি দিতে হবেহারিকেন কোন ঘরে ? হরিচরণ বললেন, কিছুই তাে জানি নাআপনার সঙ্গে কি কেউ নাই

আপনি চিন্তা করবেন নাআমি আপনার সব কাজকর্ম কইরা দিব। প্রয়ােজন নাইতুমি মেয়েমানুষ এখানে যদি আসাে, লােকে নানান কথা বলবে। আপনি আমারে মা ডেকেছেনমা ছেলের কাছে আসবে, এতে দোষ নাই তােমার ছেলে কোথায়

ছেলে বাপের সাথে বিরামদি হাটে গেছেরবারের জুতা কিনবে। জুলেখা অন্ধকার ঘরে হারিকেন খুঁজছেএক ঘর থেকে আরেক ঘর যাচ্ছে এমনভাবে যাচ্ছে যেন এটা তার নিজের বাড়িঘর মেয়েটা আবার গুনগুন করে গানও করছে— 

কে বা রান্ধে কে বা বাড়ে কে বা বসে খায়কাহার সঙ্গে শুইয়া থাকলে কে বা নিদ্রা যায় ? ..মনায় রান্ধে তনায় বাড়ে আতস বসে খায়সাধুর সঙ্গে শুইয়া থাকলে সুখে নিদ্রা যায় কী মিষ্টি মেয়েটার গলা! যেন সােনালি বর্ণের কাঁচা মধু ঝরে ঝরে পড়ছে| বৃষ্টি থেমে গেছেশত শত জোনাকি বের হয়েছেঝাক বেঁধে উড়ছেশিউলি গাছ জোনাকিতে ঢেকে গেছেতারা একসঙ্গে জ্বলছে, একসঙ্গে নিভছেকী মধুর দৃশ্য! হরিচরণের হঠাৎ তার মেয়ের কথা মনে পড়লমেয়েটা বেঁচে থাকলে কত বড় হতে ? সে দেখতে কেমন হতাে ? চেহারা মনে পড়ছে না

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল ছিল এটা মনে পড়ছেকোঁকড়া চুল অলক্ষণ। কারণ দেবী অলক্ষীর মাথায় চুল ছিল কোকড়াতিনি স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে অনেকবার বলেছেনশৈশবের কোকড়া চুল বয়সকালে থাকে নামেয়েটা জীবিত থাকলে এতদিনে নিশ্চয়ই বিয়ে হয়ে যেত বাবার দুঃসংবাদ শুনে সে কি ছুটে আসত ? নাকি তার শ্বশুরবাড়ির লােকজন তাকে আটকে দিত ? শাস্ত্র বিধান কী বলে ? পতিত পিতার সন্তানরাও কি পতিত

বাবা! আমি যাইহরিচরণ চমকে উঠলেনকিছুক্ষণের জন্যে হলেও তার মনে ভ্রান্তি তৈরি হয়েছিলমনে হয়েছিল শিউলি কথা বলছে। দাড়িয়ে আছে জুলেখাতার মুখ হাসি হাসিসে হারিকেন খুঁজে পেয়েছেতিনটা ঘরে হারিকেন জ্বলছেশুধু বারান্দায় আলাে দেয়া হয় নিহরিচরণ বললেন, গান কোথায় শিখেছ মা

জুলেখা লজ্জিত গলায় বলল, বাপজানের কাছেআমার বাপজান বাউলউনি মালজোড়া গান করেন। মালজোড়া গান কী ? ….প্রশ্নউত্তর এক বাউল প্রশ্ন করে আরেকজন উত্তর দেয় মালজোড়া গানে আমার বাপজানের সাথে কেউ পারত না। 

উনি কি মারা গেছেন ? …….জে নাবাড়ি থাইকা পালায়া কোথায় জানি গেছে, আর আসে নাইদশ বছর হইছেমনে হয় বিয়াশাদি কইরা নয়া সংসার পাতছে। …….জুলেখা খিলখিল করে হাসছে যেন বাবার নতুন সংসার পাতা আনন্দময় কোনাে ঘটনা। 

হরিচরণ বললেন, মাগাে! তােমার কণ্ঠস্বর অতি মনােহরএকদিন এসে আমারে গান শুনাবে। ….জুলেখা নিচু হয়ে হরিচরণকে কদমবুসি করল। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

সময় ১৯০৫তখন ময়মনসিংহ জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট খাজা সলিমুল্লাহ (ঢাকার নবাব)ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনের অধীনভারতবর্ষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তখন লর্ড কার্জতিনি বঙ্গভঙ্গের ঘােষণা দিয়েছেনবঙ্গভঙ্গ অনুযায়ী আসাম, ঢাকা, চট্টগ্রাম রাজশাহী নিয়ে হবে পূর্ববঙ্গঢাকা হবে রাজধানী, চট্টগ্রাম বিকল্প রাজধানীঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়ভারতবর্ষের হিন্দু সমাজ ফুঁসে উঠেবাংলা ভাগ করা যাবে না। 

ঢাকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবেএটিও হিন্দুসমাজ নিতে পারছিল নাপূর্ব বাংলা চাষার দেশ, তারা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী করবে? ….হিন্দুমুসলমান বিরােধ তখন বাড়ছেসেই বিরােধ মেটাবার জন্যে অনেকেই এগিয়ে আসছেন। সেই অনেকের মধ্যে একজন হলেন ঠাকুরবাড়ির এক কবি, নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরতিনি রাখিবন্ধন অনুষ্ঠান করলেন

সবাই সবার হাতে রাখি বেঁধে দেবেকারাে মধ্যে কোনাে হিংসাদ্বেষ থাকবে না। রাশিয়ায় তখন জারতন্ত্রশেষ জার নিকোলাই আছেন মমতায়তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছেলেনিন জার্মানিতেতিনি তখনাে রাশিয়ায় পৌঁছেন নিম্যাক্সিম গাের্কি নামের এক মহান লেখক একটা উপন্যাসে হাত দিয়েছেনউপন্যাসের নাম মা। 

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *