সেইসময়ে ইউরােপের অবস্থাটা একটু দেখি। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে বাইশ বছর বয়সি এক পেটেন্ট অফিসের কেরানি পদার্থবিদ্যার উপর তিন পাতার এক প্রবন্ধ লিখে পাঠিয়েছেন— Annals of Physics–এ। আলাে সম্পর্কে তার নিজের চিন্তাধারা প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছে।
প্রবন্ধটি পড়ার পর জার্নালের সম্পাদক নােবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কস প্ল্যাংক মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারছেন পদার্থবিদ্যার এতদিনকার সব চিন্তাভাবনার অবসান হতে যাচ্ছে। আসছে নতুন চিন্তা। শুদ্ধতম চিন্তা। বাইশ বছর বয়সি পেটেন্ট ক্লার্কের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন।
গ্রামের নাম বান্ধবপুর । পাশের গ্রাম সােনাদিয়া। উত্তরে গারাে পাহাড়। পরিষ্কার কুয়াশামুক্ত দিনে উত্তরের দিগন্তরেখায় নীল গারাে পাহাড় ঝলমল করে। দু’গ্রামের মাঝখানে মাধাই খাল। এই খাল বর্ষাকালে ফুলে ফেঁপে নদী। মাধাই খাল সােহাগগঞ্জ বাজারে এসে পড়েছে বড়গাঙে। বড়গাঙের অবস্থা বর্ষাকালে ভয়াবহ। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না এমন। লঞ্চ–স্টিমার যাতায়াত করে। সােহাগগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ থেকে গােয়ালন্দ হয়ে কোলকাতা।
বান্ধবপুর অতি জঙ্গলা জায়গা। প্রতিটি বসতবাড়ির চারপাশে ঘন বন। এমন ঘন যে দিনমানে সূর্যের আলাে ঢােকে না। শিয়াল বাঘডাশারা মনের আনন্দে ঘােরে। মুরগি চুরিতে এরা বিরাট ওস্তাদ! হঠাৎ হঠাৎ বাঘ দেখা যায়। স্থানীয় ভাষায় এইসব বাঘের নাম আসামি বাঘ। এরা বর্ষার পানির তােড়ে আসামের জঙ্গল থেকে নেমে এসে জঙ্গলে স্থায়ী হয়। গৃহস্থের গরু–ছাগল খেয়ে ফেলে। আসামি বাঘের সন্ধান পাওয়া গেলে নিস্তরঙ্গ বান্ধবপুরে হৈচৈ শুরু হয়। সােনাদিয়া জমিদার বাড়িতে খবর চলে যায়।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
জমিদার বাবু শশাংক পাল হাতির পিঠে চড়ে মাধাই খাল পার হয়ে বান্ধবপুর উপস্থিত হন। তার হাতে দোলা উইনস্টন বন্দুক। বাঘমারার অনেক কায়দাকানুন করা হয়। জঙ্গল ঘেরাও দেয়া হয়। ঢাকঢোল বাজানাে হয়। বাবু শশাংক পাল হাতির পিঠে থেকেই আকাশের দিকে কয়েকবার ফাকা গুলি করেন। বাঘ মারা পড়ে না। অন্য কোনাে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। শশাংক পাল হাতির পিঠে করে ফিরে যান। তাঁকে বড়ই আনন্দিত মনে হয়।
বান্ধবপুর পুরােপুরি হিন্দু ঘাম। সন্ধ্যায় পুরাে অঞ্চলে একসঙ্গে উলুধ্বনি উঠে। শাঁখ বাজানাে হয়। প্রতিটি সম্পন্ন বাড়িতে নিত্যপূজা হয়। দুটা কালীমন্দির আছে। একটার নাম বটকালি মন্দির। গ্রাম থেকে অনেকটা দূরে বটগাছের সঙ্গে লাগানাে। বিশাল বটবৃক্ষ এক মন্দিরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যে গাছটাকেও মন্দিরের অংশ মনে হয়। বিশেষ বিশেষ দিনে আয়ােজন করে বটকালি মন্দিরে কালীপূজা হয়। পূজার শেষে পাঠা বলি ।
বান্ধবপুরে অল্প কয়েকঘর মাত্র মুসলমান। এদের জমিজমা নেই বললেই হয়। বাবুদের বাড়িতে জন খাটে। অনেকেই বাজারে কুলির কাজ করে। কেউ কেউ ঘােড়ার পিঠে মালামাল আনা–নেয়া করে। জুম্মাবারে মাথায় টুপি পরে জুম্মঘরে উপস্থিত হয়। দোয়াকালাম এরা কিছুই জানে না। জানার আগ্রহ বা উপায়ও নেই। তবে শুক্রবারে গম্ভীর মুখে মসজিদে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টা তাদের মাথায় ঢুকে আছে। তারা মাওলানা সাহেবের খুতবা পাঠ অতি আগ্রহের সঙ্গে শােনে। নামাজ শেষে শিন্নির ব্যবস্থা থাকলে অতি আদবের সঙ্গে কলাপাতায় শিন্নি নেয়। বিসমিল্লাহ বলে মুখে দেয়।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
বান্ধবপুরে জুম্মাঘর শাল্লার দশআনি জমিদার নেয়ামত হােসেনের বানিয়ে দেয়া। জুম্মঘরের মাওলানার জন্যে মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিও তিনি ঠিক করেছেন। মাওলানার নাম ইদরিস। বাড়ি ফরিদপুরে। মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিতে তার ভালােই চলে যায়। মুসলমান গৃহস্থ বাড়ি থেকে তাকে ধান দেয়া হয়। যে কোনাে ভালাে রান্না হলে তাকে আগে পাঠানাে হয়। বিয়েশাদি হলে মাওলানার জন্যে বিশেষ বরাদ্দ থাকে— তবন (লুঙ্গি), পাঞ্জাবি, টুপি, ছাতা।
মাওলানা ইদরিসের সর্বমােট নয়টা ছাতা বর্তমানে আছে। প্রায়ই ভাবেন বুধবার হাটে গিয়ে একটা ভালাে ছাতা রেখে বাকিগুলি বিক্রি করে আসবেন। শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয় না। লােকজন তাকে ভালােবেসে ছাতা দিয়েছে, সেই ছাতা কীভাবে বিক্রি করবেন! ইদরিস মাওলানার বয়স ত্রিশ। ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ। সাধারণের চেয়ে লম্বা। মাথায় সবসময় পাগড়ি পরেন বলে আরাে লম্বা লাগে । নিজের ঘরে তিনি লুঙ্গি–গেঞ্জি পরলেও বাইরে লেবাসের পরিবর্তন হয়। চোস্ত পায়জামা, ধবধবে শাদা পাঞ্জাবি, চোখে সুরমা, পাগড়ি এবং দাড়িতে সামান্য আতর। দাড়িতে আতর দেয়া সুন্নত। নবিজি দাড়িতে আতর দিতেন।
জুম্মাঘরের বারান্দায় রাখা বেঞ্চে মাওলানা ইদরিস বসে আছেন। তার সামনে কাঠমিস্ত্রি সুলেমান ছেলেকে নিয়ে বসা। ছেলে বসে থাকতে পারছে না। ছটফট করছে। সুলেমান এক হাতে ছেলেকে শক্ত করে ধরে আছে।
মাওলানা ইদরিস বললেন, ছেলের নাম কী ? সুলেমান বলল, জহির। জহিরের সাথে আর কিছু নাই ? সুলেমান বলল, জে আজ্ঞে, না।‘
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
মাওলানা বললেন, আজ্ঞে বলতেছ কেন ? কথায় কথায় জ্বে আজ্ঞে বলা হিন্দুয়ানি। হিন্দুয়ানি দূর করা লাগবে। বলাে জে–না। ….সুলেমান বলল, জে–না। ………..মাওলানা বললেন, ছেলের নাম রেখেছ জহির। এটা তাে হবে না। জহির আল্লাহপাকের ৯৯ নামের এক নাম। এর অর্থ জাহির হওয়া। আল যাহিরু। নাম বদলাতে হবে। এখন থেকে নাম আব্দুল জহির। এর অর্থ জহিরের গােলাম । অর্থাৎ আল্লাহপাকের গােলাম। বুঝেছ ?
জি বুঝেছি। এখন ছেলেকে একটা তাবিজ দিয়া দেন। অতি দুষ্ট ছেলে । বনে জঙ্গলে ঘুরে। হরিবাবুর দিঘিতে মরতে বসেছিল। হরিবাবু ঝাপ দিয়ে পড়লেন। ছেলেরে বাঁচালেন । উনার জন্যে ছেলের জীবন রক্ষা হয়েছে।
মাওলানা ইদরিস বিরক্ত হয়ে বললেন, হরিবাবু তােমার ছেলেকে বাঁচানাের কে? তাকে বাঁচিয়েছেন আল্লাহপাক। মানুষের জীবনের মালিক উনি ভিন্ন কেউ।………বুঝেছ ? হায়াত, মউত, রেজেক, ধনদৌলত এবং বিবাহ এই পাঁচটা বিষয় আল্লাহপাক নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন। এই বিষয় মনে রাখবা।
সুলেমান হা–সূচক মাথা নাড়ল। মাওলানা বললেন, তাবিজ লিখে রাখব, একসময় এসে নিয়ে যাবে। …….জে আজ্ঞে । আবার জে আজ্ঞে ? অভ্যাস হয়ে গেছে, কী করব? ……..অভ্যাস বদলাতে হবে। ধুতি পরা ছাড়তে হবে। ধুতি হিন্দুর পােশাক। মুসলমানের লেবাস হবে নবিজির লেবাস।
সুলেমান বিড়বিড় করে বলল, এখন আমি যদি পাগড়ি পরে ঘুরি, ললাকে কী বলবে ? ………মাওলানা বললেন, তােমাকে তাে পাগড়ি পরতে বলতেছি না। ধুতি পরতে নিষেধ করতেছি। আর যদি পরতেই হয় লুঙ্গির মতাে পরবা। এতে দোষ খানিকটা কাটা যায় ।
