মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

সেইসময়ে ইউরােপের অবস্থাটা একটু দেখিসুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে বাইশ বছর বয়সি এক পেটেন্ট অফিসের কেরানি পদার্থবিদ্যার উপর তিন পাতার এক প্রবন্ধ লিখে পাঠিয়েছেনAnnals of Physicsআলাে সম্পর্কে তার নিজের চিন্তাধারা প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছে

প্রবন্ধটি পড়ার পর জার্নালের সম্পাদক নােবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কস প্ল্যাংক মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেনতিনি বুঝতে পারছেন পদার্থবিদ্যার এতদিনকার সব চিন্তাভাবনার অবসান হতে যাচ্ছেআসছে নতুন চিন্তাশুদ্ধতম চিন্তাবাইশ বছর বয়সি পেটেন্ট ক্লার্কের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। 

গ্রামের নাম বান্ধবপুর পাশের গ্রাম সােনাদিয়াউত্তরে গারাে পাহাড়পরিষ্কার কুয়াশামুক্ত দিনে উত্তরের দিগন্তরেখায় নীল গারাে পাহাড় ঝলমল করেদুগ্রামের মাঝখানে মাধাই খালএই খাল বর্ষাকালে ফুলে ফেঁপে নদীমাধাই খাল সােহাগগঞ্জ বাজারে এসে পড়েছে বড়গাঙেবড়গাঙের অবস্থা বর্ষাকালে ভয়াবহএপার থেকে ওপার দেখা যায় না এমনলঞ্চস্টিমার যাতায়াত করেসােহাগগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জনারায়ণগঞ্জ থেকে গােয়ালন্দ হয়ে কোলকাতা। 

বান্ধবপুর অতি জঙ্গলা জায়গাপ্রতিটি বসতবাড়ির চারপাশে ঘন বনএমন ঘন যে দিনমানে সূর্যের আলাে ঢােকে নাশিয়াল বাঘডাশারা মনের আনন্দে ঘােরেমুরগি চুরিতে এরা বিরাট ওস্তাদ! হঠাৎ হঠাৎ বাঘ দেখা যায়স্থানীয় ভাষায় এইসব বাঘের নাম আসামি বাঘএরা বর্ষার পানির তােড়ে আসামের জঙ্গল থেকে নেমে এসে জঙ্গলে স্থায়ী হয়গৃহস্থের গরুছাগল খেয়ে ফেলেআসামি বাঘের সন্ধান পাওয়া গেলে নিস্তরঙ্গ বান্ধবপুরে হৈচৈ শুরু হয়সােনাদিয়া জমিদার বাড়িতে খবর চলে যায়

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

জমিদার বাবু শশাংক পাল হাতির পিঠে চড়ে মাধাই খাল পার হয়ে বান্ধবপুর উপস্থিত হনতার হাতে দোলা উইনস্টন বন্দুকবাঘমারার অনেক কায়দাকানুন করা হয়জঙ্গল ঘেরাও দেয়া হয়ঢাকঢোল বাজানাে হয়বাবু শশাংক পাল হাতির পিঠে থেকেই আকাশের দিকে কয়েকবার ফাকা গুলি করেনবাঘ মারা পড়ে নাঅন্য কোনাে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়শশাংক পাল হাতির পিঠে করে ফিরে যানতাঁকে বড়ই আনন্দিত মনে হয়। 

বান্ধবপুর পুরােপুরি হিন্দু ঘামসন্ধ্যায় পুরাে অঞ্চলে একসঙ্গে উলুধ্বনি উঠেশাঁখ বাজানাে হয়প্রতিটি সম্পন্ন বাড়িতে নিত্যপূজা হয়দুটা কালীমন্দির আছেএকটার নাম বটকালি মন্দিরগ্রাম থেকে অনেকটা দূরে বটগাছের সঙ্গে লাগানােবিশাল বটবৃক্ষ এক মন্দিরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যে গাছটাকেও মন্দিরের অংশ মনে হয়বিশেষ বিশেষ দিনে আয়ােজন করে বটকালি মন্দিরে কালীপূজা হয়পূজার শেষে পাঠা বলি । 

বান্ধবপুরে অল্প কয়েকঘর মাত্র মুসলমানএদের জমিজমা নেই বললেই হয়বাবুদের বাড়িতে জন খাটেঅনেকেই বাজারে কুলির কাজ করেকেউ কেউ ঘােড়ার পিঠে মালামাল আনানেয়া করেজুম্মাবারে মাথায় টুপি পরে জুম্মঘরে উপস্থিত হয়দোয়াকালাম এরা কিছুই জানে নাজানার আগ্রহ বা উপায়ও নেইতবে শুক্রবারে গম্ভীর মুখে মসজিদে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টা তাদের মাথায় ঢুকে আছেতারা মাওলানা সাহেবের খুতবা পাঠ অতি আগ্রহের সঙ্গে শােনেনামাজ শেষে শিন্নির ব্যবস্থা থাকলে অতি আদবের সঙ্গে কলাপাতায় শিন্নি নেয়বিসমিল্লাহ বলে মুখে দেয়। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

বান্ধবপুরে জুম্মাঘর শাল্লার দশআনি জমিদার নেয়ামত হােসেনের বানিয়ে দেয়াজুম্মঘরের মাওলানার জন্যে মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিও তিনি ঠিক করেছেনমাওলানার নাম ইদরিসবাড়ি ফরিদপুরেমাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিতে তার ভালােই চলে যায়মুসলমান গৃহস্থ বাড়ি থেকে তাকে ধান দেয়া হয়যে কোনাে ভালাে রান্না হলে তাকে আগে পাঠানাে হয়বিয়েশাদি হলে মাওলানার জন্যে বিশেষ বরাদ্দ থাকেতবন (লুঙ্গি), পাঞ্জাবি, টুপি, ছাতা। 

মাওলানা ইদরিসের সর্বমােট নয়টা ছাতা বর্তমানে আছেপ্রায়ই ভাবেন বুধবার হাটে গিয়ে একটা ভালাে ছাতা রেখে বাকিগুলি বিক্রি করে আসবেনশেষ পর্যন্ত যাওয়া হয় নালােকজন তাকে ভালােবেসে ছাতা দিয়েছে, সেই ছাতা কীভাবে বিক্রি করবেন! ইদরিস মাওলানার বয়স ত্রিশধবধবে ফর্সা গায়ের রঙসাধারণের চেয়ে লম্বামাথায় সবসময় পাগড়ি পরেন বলে আরাে লম্বা লাগে নিজের ঘরে তিনি লুঙ্গিগেঞ্জি পরলেও বাইরে লেবাসের পরিবর্তন হয়চোস্ত পায়জামা, ধবধবে শাদা পাঞ্জাবি, চোখে সুরমা, পাগড়ি এবং দাড়িতে সামান্য আতরদাড়িতে আতর দেয়া সুন্নতনবিজি দাড়িতে আতর দিতেন। 

জুম্মাঘরের বারান্দায় রাখা বেঞ্চে মাওলানা ইদরিস বসে আছেনতার সামনে কাঠমিস্ত্রি সুলেমান ছেলেকে নিয়ে বসাছেলে বসে থাকতে পারছে নাছটফট করছেসুলেমান এক হাতে ছেলেকে শক্ত করে ধরে আছে। 

মাওলানা ইদরিস বললেন, ছেলের নাম কী ? সুলেমান বলল, জহিরজহিরের সাথে আর কিছু নাই ? সুলেমান বলল, জে আজ্ঞে, না‘ 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

মাওলানা বললেন, আজ্ঞে বলতেছ কেন ? কথায় কথায় জ্বে আজ্ঞে বলা হিন্দুয়ানিহিন্দুয়ানি দূর করা লাগবেবলাে জেনা। ….সুলেমান বলল, জেনা। ………..মাওলানা বললেন, ছেলের নাম রেখেছ জহিরএটা তাে হবে নাজহির আল্লাহপাকের ৯৯ নামের এক নামএর অর্থ জাহির হওয়াআল যাহিরুনাম বদলাতে হবেএখন থেকে নাম আব্দুল জহিরএর অর্থ জহিরের গােলাম অর্থাৎ আল্লাহপাকের গােলামবুঝেছ

জি বুঝেছিএখন ছেলেকে একটা তাবিজ দিয়া দেনঅতি দুষ্ট ছেলে বনে জঙ্গলে ঘুরেহরিবাবুর দিঘিতে মরতে বসেছিলহরিবাবু ঝাপ দিয়ে পড়লেনছেলেরে বাঁচালেন উনার জন্যে ছেলের জীবন রক্ষা হয়েছে। 

মাওলানা ইদরিস বিরক্ত হয়ে বললেন, হরিবাবু তােমার ছেলেকে বাঁচানাের কে? তাকে বাঁচিয়েছেন আল্লাহপাকমানুষের জীবনের মালিক উনি ভিন্ন কেউ।………বুঝেছ ? হায়াত, মউত, রেজেক, ধনদৌলত এবং বিবাহ এই পাঁচটা বিষয় আল্লাহপাক নিজের হাতে রেখে দিয়েছেনএই বিষয় মনে রাখবা। 

সুলেমান হাসূচক মাথা নাড়লমাওলানা বললেন, তাবিজ লিখে রাখব, একসময় এসে নিয়ে যাবে। …….জে আজ্ঞে আবার জে আজ্ঞে ? অভ্যাস হয়ে গেছে, কী করব? ……..অভ্যাস বদলাতে হবেধুতি পরা ছাড়তে হবেধুতি হিন্দুর পােশাকমুসলমানের লেবাস হবে নবিজির লেবাস। 

সুলেমান বিড়বিড় করে বলল, এখন আমি যদি পাগড়ি পরে ঘুরি, ললাকে কী বলবে ? ………মাওলানা বললেন, তােমাকে তাে পাগড়ি পরতে বলতেছি নাধুতি পরতে নিষেধ করতেছিআর যদি পরতেই হয় লুঙ্গির মতাে পরবাএতে দোষ খানিকটা কাটা যায়

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *