মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

ছেলের মায়ের জন্যে কি একটা তাবিজ দিবেন? তার কী সমস্যা ? জঙ্গলে ঘুরেনিজের মনে গীত গায়নামাজ রােজা কি করে ? রােজা করেনামাজের ঠিক নাই।………নামাজ ছাড়া রােজা আর নৌকা ছাড়া মাঝি একই বিষয় তারে নামাজ পড়তে বলবা। 

জি বলবসুন্দরী মেয়েছেলে, তার উপরে জিনের নজর পড়ছে কিনা এইটা নিয়া আমি চিন্তিত। জিনের নজর পড়া বিচিত্র নাতাবিজ লেইখা দিব, চিন্তা করবা না। 

সুলেমান উঠে দাঁড়ালযাবার সময় বেঞ্চে একটা একআনি রাখলএমনভাবে রাখল যেন মাওলানার চোখে না পড়েমাওলানা সাহেবকে দেখিয়ে নজরানা দেয়া বেয়াদবি, আবার কোনাে নজরানা না দিয়ে চলে আসাও বেয়াদবি। 

মাওলানা ইদরিস সুলেমান চলে যাওয়ার পরেও দীর্ঘ সময় বসে রইলেনতার ডানপাশে জুম্মাঘরনিজের একটা জায়গাঅতি আপনতাকালেই শান্তি শান্তি লাগেজুম্মাঘরের অবস্থা ভালাে নাটিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়েএকটা দরজা উইপােকা পুরােপুরি খেয়ে ফেলেছেবাঁশের দরমা দিয়ে ভাঙা দরজা বন্ধ করতে হয়মিম্বার ভেঙে গেছেখুতবা আগে মিম্বারে দাঁড়িয়ে পড়তেন, এখন মেঝেতে দাঁড়িয়ে পড়েনঅথচ রসুলে করিম মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা পাঠ করতেন। মুসুল্লিদের অজুর ব্যবস্থা নাইমসজিদের পাশে ডােবার মতাে আছে, ডােবায় পাট পচানাে হয়, সেখানে অজু করা সম্ভব নাসবচেভালাে হতাে একটা চাপকলের ব্যবস্থা করলেকে ব্যবস্থা করবে ?

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

মাওলানা ইদরিস দশআনির জমিদার নেয়ামত হােসেনের কাছে গিয়েছিলেননেয়ামত হােসেন রাগী গলায় বললেন, মসজিদ করে দিয়েছি, বাকি দেখভাল আপনারা করবেনচাঁদা তুলে করবেনআমি টাকার গাছ লাগাই নাইপ্রয়ােজন হলেই গাছ ঝাড়া দিব আর টুপটুপাইয়া টাকা পড়বেচান্দা তুলেন, চান্দা| চাঁদা দেয়ার কোনাে মানুষ নাইএটা বলার আগেই নেয়ামত হােসেন উঠে পড়লেনসন্ধ্যার পর তিনি বেশিক্ষণ বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন না

সম্প্রতি তিনি লখনৌ থেকে পেয়ারীবালা নামের এক বাইজি এনেছেনসন্ধ্যা থেকে নিশি রাত পর্যন্ত তার সঙ্গে সময় কাটানএটা নিয়ে কেউ কিছু মনে করে জমিদার শ্রেণীর মানুষদের বিলাস ক্রটির মধ্যে পড়ে নাতারা আমােদ ফুর্তি করবে না তাে কে করবে

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, মাওলানা ইদরিস বদনায় রাখা পানি দিয়ে অজু করে আযান দিলেনকিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন কেউ আসে কিনাকেউ এলাে না তিনি মােমবাতি জ্বালিয়ে একাই নামাজ পড়লেনসালাম ফেরাবার সময় বাতাসে মােমবাতি নিভে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলতার বুক ধ্বক করে উঠলনির্জন মসজিদে জিন নামাজ পড়তে আসেইমাম নামাজ পড়াতে ভুল করলে তারা বড় বিরক্ত হয়চড়থাপ্পড় মারে জিনের চেয়েও বেশি ভয় ইবলিশ শয়তানকেমসজিদের আশেপাশেই এদের চলাচল বেশিমুসল্লিরা নামাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার পথে তারা পিছু নেয়ভয় দেখায়, ক্ষতি করতে চেষ্টা করে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি কয়েকবার ইবলিশ শয়তানের হাতে পড়েছেনপ্রতিবারই আয়াতুল কুরসি পড়ে উদ্ধার পেয়েছেনসর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে গত মাসেএশার নামাজ শেষ করে হারিকেন হাতে বাড়ি ফিরছেন ফকফকা চাঁদের আলােডিসট্রিক্ট বাের্ডের রাস্তায় উঠতে যাবেন, হঠাৎ তার চারদিকে ঢিল পড়তে লাগলতিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেনতার ডানদিকে বিশাল বিশাল শিমুল গাছবাতাস নেই কিছু নেই, হঠাৎ শুধু একটা শিমুল গাছের ডাল নড়তে লাগল

তিনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে একমনে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলেনআয়াতুল কুরসি একবার শেষ করেন, দু’হাতে শব্দ করে তালি দেনআবার পড়েন আবার তালি দেনআয়াতুল কুরসির মরতবা হলাে, এই দোয়া পড়ে হাততালি দিলে যতদূর হাততালির শব্দ যায় ততদূর পর্যন্ত খারাপ জিন থাকতে পারে নাআয়াতুল কুরসির এত বড় ফজিলতের কারণ, এই আয়াতে আল্লাহপাকের এমন সব গুণের বর্ণনা আছে যা মানুষের বােধের অগম্য। 

তিনবার আয়াতুল কুরসি পাঠ করে মাওলানা চোখ মেললেনপরিস্থিতি স্বাভাবিকশিমুল গাছের পাতা নড়ছে নাকটু একটা গন্ধ চারদিকে ছড়ানােনাক জ্বালা করে এমন গন্ধ। 

মাগরেবের নামাজ থেকে এশার নামাজের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান অল্পঘণ্টাখানিকএই এক ঘণ্টার জন্যে বাড়ি যাওয়া অর্থহীনমাওলানা মসজিদেই থাকেনতার ভয় ভয় লাগেবনের মাঝখানে মসজিদসন্ধ্যার পর থেকে বনের ভেতর নানান ধরনের শব্দ উঠে কোনােটা পাখির শব্দ, কোনােটা জন্তু জানােয়ারের, আবার কিছু কিছু শব্দ আছে সম্পূর্ণ অন্যরকমহুম হুম করে এক ধরনের শব্দ মাঝে মাঝে আসেএই শব্দের সঙ্গে কোনাে শব্দের মিল নেইশব্দ শুনলেই শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসেভয় কাটানাের জন্যে মাওলানা কোরান পাঠ করেন

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি ইদানীং শুরু করেছেন কোরান মজিদ মুখস্থ করাএকটা বয়সের পর মুখস্থশক্তি কমে যায়একই জিনিস বারবার পড়ার পরেও মনে থাকে নাএই সমস্যা তার হচ্ছেতিনি হাল ছাড়ছেন নাকিছুই বলা যায় না, আল্লাহপাক অনুগ্রহ করতেও পারেনদেখা যাবে তিনি কোরানে হাফেজ হয়েছেনসহজ ব্যাপার নাআল্লাহর কথা শরীরে ধারণ করা বিরাট বিষয়সাধারণ মানুষের শরীর কবর দেয়ার পর পঁচে গলে যায়কোরানে হাফেজের শরীর পঁচে না। 

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *