হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৬

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৬

আমি শান্তস্বরে বললাম, মা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন বাবা ?

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এই প্রশ্নের জবাব আমি দেব না । তোকেই খুঁজে বের করতে হবে । শুধু হৃদয় বড় হলেই হবে না, তোকে বুদ্ধিমানও হতে হবে । তোর জ্ঞান এবং বুদ্ধি হবে প্রেরিত পুরুষদের মতো । শুধু একটা জিনিস মনে রাখবি, আমি যা করেছি । তোর জন্যেই করেছি । আচ্ছা আয়, এখন তোকে আকাশের তারার নাম শেখাই । একবার কালপুরুষের নাম বলেছিলাম না ? বল দেখি কোনটা কালপুরুষ ? এত দেরি করলে তো হবে না । তাড়াতাড়ি বল । খুব তাড়াতাড়ি । কুইক ।

আমি ছাদ থেকে নিচে নামলাম ।

একধরনের গাঢ় বিষাদ বোধ করছি । এই ধরনের বিষাদ হঠাৎ হঠাৎ আমাকে আত্রূমন করে, এবং প্রায় সময়ই তা দীর্ঘস্থায়ী হয় । মহাপুরুষদের কি এমন হয় ?

তারাও কি মাঝে মাঝে বিষাদগ্রস্ত হন ? হয়তো হন, হয়তো হন না । কোনো একজন মহাপুরুষের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতাম । আমাদের কথাবার্তা তখন কেমন হতো ? মনে মনে আমি কথোপকথনের মহড়া দিলাম । দৃশ্যটা এরকম – বিশাল বটবৃক্ষের নিচে মহাপুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি শীর্ণকায় কিন্ত্ত তাকে বটবৃক্ষের চেয়েও বিশাল দেখাচ্ছে । তার গায়ে শাদা চাদর । সেই চাদরে তার মাথা ঢাকা । ছায়াময়  বৃক্ষতল । তার মুখে দেখা যাচ্ছে না কিন্ত্ত কোনো এক অদ্ভুত কারণে তার জ্বলজ্বলে চোখের কালো মণে দৃশ্যমান । মহাপুরুষের কন্ঠস্বর শিশুর কন্ঠস্বরের মতো কিন্ত্ত খুব মন দিয়ে শুনলে সেই কন্ঠস্বরে একজন মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের শ্লেষজড়িত উচ্চারণের মিল খুঁজে পাওয়া যায় । আমাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো । এই কথোপকথনের সময় তিনি একবারও আমার ‍দিকে তাকালেন না । অথচ মনে হলো তাকিয়ে আছেন ।

ময়ূরাক্ষী খন্ড- ২৬

মহাপুরুষ :বৎস, তুমি কী জানতে চাও?

আমি       : অনেক কিছু জানতে চাই । আপনি কি সব পশ্নের উওর জানেন ?

মহাপুরুষ : আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর জানি না । কিন্ত্ত প্রশ্ন শুনতে ভালোবাসি ।তুমি প্রশ্ন কর ।

আমি      : বিষাদ কী ?

মহাপুরুষ : আমি জানি না ।

আমি       : আপনি কি কখনো বিষাদগ্রস্ত হন ?

মহাপুরুষ  : বিষাদ কী তা-ই আমি জানি না । কাজেই বিষাদগ্রস্ত হই কি হই না তা কী করে বলি ? তুমি আরো প্রশ্ন কর । তোমার প্রশ্ন শুনে বড়ই আনন্দ বোধ হচ্ছে ।

আমি       :   আনন্দ কী ?

মহাপুরুষ  : বৎস আনন্দ কী তা আমি জানি না ।

আমি        : আপনি জানেন এমন কিছু কি আছে ?

মহাপুরুষ   : না । আমি কিছুই জানি না । বৎস, তুমি প্রশ্ন কর ।

আমি         : আমার প্রশ্ন করার কিছুই নেই । আপনি বিদেয় হোন ।

মহাপুরুষ    : চলে যেতে বলছ ?

আমি          : হ্যাঁ ।

মহাপুরুষ     : তাতে লাভ হবে না বৎস । তুমি বোধহয় জানো না, আমাদের মানঅপমান বোধ নেই ।

কথোপকথন আরো চালানোর ইচ্ছা ছিল । চালানো গেল না । ফুপু এসে বললেন, এই, তুই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছিস কেন ?

আমি বললাম, কথা বলছি ।

কার সঙ্গে বলছিস ?

মহাপুরুষের সঙ্গে ।

ফুপু অসম্ভব বিরক্ত হয়ে বললেন, তুই সবসময় এমন রহস্য করিস কেন ? তুই আমাকে পেয়েছিস কী ? আমাকেও কি বাদলের মতো পাগল ভাবিস? তুই কি ভাবিস বাদলের মতো আমিও তোর প্রতিটি কথা বিশ্বাস করব ? আমি মধুর ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলাম । ফুপু আমার সেই হাসি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বললেন, তুই একটা বিয়ে কর । বিয়ে করলে সব রোগ সেরে যাবে ।

বিয়ে করা ঠিক হবে না ফুপু ।

ঠিক হবে না কেন ?

যেসব রোগের কথা তুমি বলছ সেইসব রোগ কখনো সারাতে নেই । যে-কারণে মহাপুরুষেরা বিয়ে করেন না । আজীবন  চিরকুমার থাকেন । বিয়ে করার পর যারা মহাপুরুষ হন তারা স্ত্রী-সংসার ছেড়ে চলে যান ।

 

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৭

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *