হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৭

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৭

যেমন বুদ্ধদেব । ফুপু হতচকিতগলায় বললেন, তুই আমাকে আপনি না বলে তুমি তুমি করে বলছিস কেন ?

আমি তো সবসময় তাই বলি । সে কী আমার তো ধারণা ছিল আপনি করে বলিস ।

জিনা ফুপু, আপনি ভুল করেছেন । আমার খুব প্রিয়জনদের আমি তুমি করে বলি । আপনি যদিও খুব কঠিন প্রকৃতির মহিলা, তবু আপনি আমার প্রিয়জন । সেই কারণে আপনাকে আমি তুমি করে বলি ।

এই তো এখন আপনি করে বলছিস ।

ফুপু খুবই বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন । মানুষকে বিভ্রান্ত করতে আমার খুব ভালো লাগে । সম্ভবত আমি মহাপুরুষদের পর্যায় পৌছে যাচ্ছি । মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারছি । রূপার সঙ্গে আমার পরিচয়ের সূত্রও হচ্ছে বিভ্রান্তি । তাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করতে পেরেছিলাম । তার সঙ্গে ‍প্রথম পরিচয় হয় শীতকালে ।

পৌষ মাস কিংবা মাঘ মাস ।

কিংবা অন্যকোনো মাসও হতে পারে, তবে শীতকাল এইটুকু মনে আছে কারণ আমার গায়ে ছিল গেরুয়া রঙের চাদর । রূপার গায়ে হালকা লাল কার্ডিগান । প্রথমে অবশ্যি কার্ডিগানের দিকে আমার চোখ পড়ল না । আমার চোখ পড়ল তার মাথায় জড়ানো স্কার্ফের দিকে। স্কার্ফের রঙ গাঢ় সোনালি ! কাপড়ে সোনালি এবং রূপালি এই দুটি রঙ সচরাচর চোখে পড়ে না হয়তো এই দুটি রঙ কাগজে খুব ভালো ধরে, কাপড়ে ধরে না । সোনালি রঙের স্কার্ফ মাথায় জড়ানো বলে দূর থেকে তার চুলগুলি মনে হচ্ছিল সোনালি । দেখলাম, সে আমার ‍দিকে এগিয়ে আসছে । আমি বসে আছি ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির বারান্দায় । বসেছি ছায়ার দিকে । শীতকালে সবাই রোদে বসতে ভালোবাসে । আমিও বাসি, তবু ছায়াময় কোণ বেছে নিয়েছি, কারণ ঐ দিকটায় ভিড় কম ।

ময়ূরাক্ষী খন্ড- ২৭

আমি লক্ষ্য করছি রূপা আসছে । আমি তাকে চিনি, তার নাম জানি, সে যে ধবধবে শাদা গাড়িটাতে করে আসে তার নম্বর জানি, ঢাকা ভ-৮৭৮২ । শুধু আমি একা নই আমাদের ক্লাসের সব ছেলেরাই জানে । সবাই কোনো-না-কোনো ছলে রূপার সঙ্গে কথা বলছে, অনেকেই তার বাসায় গেছে । অতি উৎসাহী কেউ কেউ তার জন্যে নোট এবং বইপত্র জোগাড় করেছে । রূপার জন্মদিনে সব ছেলেরা মিলে একটা জলরঙ ছবি উপহার দিল । ছবিটার নাম বর্ষা । ছবির বিষয়বস্ত্ত হচ্ছে- একটি মেয়ে কদম গাছের একটি নিচু ডালে হাত দিয়ে মেঘমেদুর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ।

চমৎকার ছবি !

ছবিটা পাওয়া গিয়েছিল বিনা পয়সায়, তবে বাধাতে খরচ হলো পাচশ টাকা । সেই টাকা আমরা সবাই চাঁদা তুলে দিলাম ।

রূপা হচ্ছে সেই ধরনের মেয়ে ‍যার জন্যে চাঁদা তুলে কিছু- একটা করতে কারোর আপত্তি থাকে না । ছেলেরা গভীর আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে এদের সঙ্গে মেশে এবং জানে এই জাতীয় মেয়েদের সঙ্গে তারা কখনোই খুব ঘনিষ্ঠ হতে পারবে না । এরা যথাসময়ে বাবা-মার পছন্দ করা একটি ছেলেকে বিয়ে করবে । যে ছেলে সাধারণত থাকে বিদেশে ।

রূপা আমার সামনে এসে দাঁড়াল । মাথার স্কার্ফ খুলে ফেলে বলল, কেমন আছ ? রূপাকে যেমন সবাই তুমি করে বলে রূপাও তেমনি সবাইকে তুমি করে বলে । তার সঙ্গ দীর্ঘ দু-বছরে আমার কোনো কথা হয়নি । আজ হচ্ছে ।আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম । আন্তরিক সুরে বললাম, ভালো আছি । আপনি কেমন আছেন ?রূপা বিভ্রান্ত হয়ে গেল ।

ময়ূরাক্ষী খন্ড- ২৭

আমি আপনি করে বলব তা সে আশা করেনি । তাকে অপ্রস্ত্তত এবং লজ্জিত মনে হলো । সে এখন কী করে তাই আমার দেখার ইচ্ছা । তুমি করেই চালিয়ে যায়, না আপনি ব্যবহার করে । বাংলাভাষাটা বড়ই  গোলমেলে । মাঝে মাঝেই তরুণ-তরুণীদের বিভ্রান্ত করে । রূপা নিজেকে সামলে নিল । সহজ গলায় বলল, আপনি আপনি করছেন কেন ? আমাকে অস্বস্তিতে ফেলবার জন্যে ? আমি এত সহজে অস্বস্তিতে পড়ি না ।

আমি বললাম, বস রূপা ।

রূপা বসতে বসতে বলল, অনেকদিন থেকেই আপনার সঙ্গে আমার কথা বলার ইচ্ছা ।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৮

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *