মাতাল হাওয়া পর্ব:০৯ হুমায়ূন আহমেদ

মাতাল হাওয়া

পূর্বপাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানো? জানি না স্যার। সবাই জানে, তুমি কেন জানবা না। তুমি দেখি ছাগলের ছাগল।গভর্নর মোনায়েম খান সাহেবের কথায় যিনি মাথা নিচু করলেন তিনি পূর্বপাকিস্তানের একজন বুদ্ধিজীবী। সম্মানিত মানুষ। অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। সঙ্গত কারণেই তার নাম উল্লেখ করা হলো না। এই অধ্যাপক মোনায়েম খানের মাসিক বেতার ভাষণ মাঝে মাঝে লিখে দেন। এ মাসের বেতার ভাষণ লিখে এনেছেন। মোনায়েম খান এখনো তা পড়েননি। দেশের বড় সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসেছেন।

মোনায়েম খান অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেশের বড় সমস্যা হলো মালাউন সমস্যা। হিটলার যেমন ইহুদির গুষ্টিনাশ করেছিল, আমরাও যদি সেরকম মালাউনের গুষ্টিনাশ করতে পারতাম তাহলে শান্তির একটা দেশ পাওয়া যেত। ঠিক বলেছি কি না বলো? ঠিক বলেছেন।গ্যাসের কোনো টোটকা তোমার জানা আছে?

কিসের টোটকা বুঝলাম না! মন দিয়ে না শুনলে কীভাবে বুঝবে? তোমার মন অন্যত্র পড়ে আছে। গ্যাসের টোটকা চিকিৎসা আছে কি না বলো। আমার পেটে গ্যাস হচ্ছে। বেশি করে পানি খান স্যার।মোনায়েম খান পানি দিতে বললেন। সাধারণ পানির সঙ্গে এক দুই ফোটা জমজমের পানি মিশিয়ে খাওয়া তাঁর অনেক দিনের অভ্যাস।

গ্যাসের সমস্যাটা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। শশী-ক্ষিরা এই জাতীয় ফল তার পেটে কখনো সহ্য হয় না। গভর্নর হাউসের বাগানের এক কোনায় মালি কিছু সবজির আবাদ করেছে। এর মধ্যে আছে শশা, কাকরুল, বরবটি তিনি কচি শশা ঝুলতে দেখে লোভে পড়ে তিন-চারটা খেয়ে ফেলেছেন। পাঁচ কোষ কাঁঠাল খেয়েছেন। এই দুইয়ে মিলে পেটে কঠিন গ্যাস তৈরি হয়েছে।

মোনায়েম খান দুই গ্লাস পানি খেয়ে বললেন, বিশিষ্ট মানুষের গ্যাসের সমস্যা—কঠিন সমস্যা। সাধারণ মানুষের জন্যে এটা কিছু না। বিশিষ্ট মানুষের জন্যে বিশিষ্ট সমস্যা। ধরো তোমার পেটভর্তি গ্যাস। ক্লাসে গিয়েছ। ছাত্র পড়াচ্ছ। হঠাৎ ‘পাদ মারলা। কিছু ছাত্র হাসল। ঘটনা এইখানেই শেষ। আমার কথা চিন্তা করো। আজ রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাইস এডমিরাল এ আর খানের সঙ্গে আমার ডিনার। সেখানে যদি হঠাৎ পাদ দেই, বিষয়টা কী রকম হবে? স্যার, বক্তৃতাটা পড়ে দেখবেন ঠিক হয়েছে কি না?

সবুর করো। এত ব্যস্ত কেন? তুমি যে বক্তৃতা লিখে নিয়ে এসেছ, তার পাখা নাই যে উড়াল দিয়ে চলে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে, সেগুলা সারব। তারপর বক্তৃতা।তিনি সেক্রেটারিকে বললেন, ডিআইজি সাহেবকে টেলিফোনে ধরো। পাঁচ মিনিট সময়, এর মধ্যে লাইন লাগিয়ে দিবে।সেক্রেটারি তিন মিনিটের মাথায় লাইন লাগিয়ে দিলেন।স্যার মালিকুম।

স্লমালিকুম বলবেন না। স্লা আর শালার মধ্যে তফাত কিছু নাই। পরিষ্কার করে বলবেন আসসালামু আলায়কুম।জি স্যার। এখন থেকে তাই বলব।ময়মনসিংহ থানার ওসির নাম কী? একটু জেনে তারপর বলি।জেনে বলতে হবে না। তার নাম আখলাকুর রহমান। তাকে বদলি করে দেন দুর্গম কোনো জায়গায়। রামু, নাইক্ষংছড়ি আর কী সব আছে না।বদলি করে দেব?

অবশ্যই। তবে আপনার কাজ সহজ করে দিচ্ছি—বদলির অর্ডার যাবে। তিন দিনের মাথায় অর্ডার ক্যানসেল হবে। সে যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে।বিষয়টা স্যার বুঝতে পারছি না।কিছু বোঝার কি প্রয়োজন আছে? অর্ডার পেয়েছেন অর্ডার পালন করবেন। এর জন্যে কি আপনার আইজির পারমিশন লাগবে? জি-না।গুড। আপনাকে অত্যন্ত স্নেহ করি, এটা কি জানেন?

জেনে ভালো লাগল স্যার।আমি খবর পেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক গোপনে মদ্যপান করে। তার তালিকা প্রস্তুত করে আমাকে দিবেন।জি স্যার।আচ্ছা বিদায়।খোদা হাফেজ স্যার।খোদা হাফেজ আবার কী? বলেন আল্লাহ হাফেজ।স্যার সরি। আল্লাহ হাফেজ।ইসলাম বিষয়টা মাথার মধ্যে রাখবেন এবং কথায় কথায় বলবেন, আল্লাহু আকবর। এতে দিলে সাহস হবে। আপনারা পুলিশ অফিসার। আপনাদের সাহসের দরকার।

মোনায়েম খান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। সাহসের তারই প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ভাইস এডমিরাল এ আর খানের সঙ্গে রাতে খানা খেতে হবে ভেবে এখনই যেন শরীর কেমন করছে। সে আবার শরাব খায়। পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেললে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করবে। মান্যগণ্য করে কিছু বলবে না। আর আগের বার তার পিঠে থাবা দিয়ে বাংলায় বলেছে-গভর্নর! তুমি দুষ্ট আছ!

অল্প বাংলা শেখার এই ফুল। দুষ্ট হবে পলাপান। তার মতো বয়স্ক একজন মানুষকে দুষ্ট বলা আদবের বরখেলাফ। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে ইংরেজিতে। এটা একটা বিরাট সমস্যা। কথার পিঠে ইংরেজিতে কথা বলা মানে মুসিবত।মোনায়েম খান অধ্যাপকের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, দেখি কী লিখেছ। না থাক, দেখব না। তুমি পড়ে শোনাও। দেশবাসী ভাই ও বোনেরা বাদ দিয়ে পড়ো।অধ্যাপক পড়া শুরু করলেন—’পূর্বপাকিস্তানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুষ্কৃতিকারীরা ঘাঁটি পেতেছে।

মোনায়েম খান বিরক্ত মুখে বললেন, তোমাকে কতবার বলেছি কঠিন শব্দ ব্যবহার করবে না। তোমার বন্ধ্র ফন্দ্র কয়টা লোকে বুঝবে? ডিকশনারি হাতে নিয়ে কেউ বক্তৃতা শোনে না! লেখো—‘দেশের আনাচে-কানাচে দুষ্কৃতিকারী। তাদের একটাই পরিকল্পনা, ইংরেজিতে যাকে বলে Master Plan. দেশকে ইভিয়ার হাতে বিক্রি করা।’ লিখেছ?

একটু আস্তে আস্তে বললে লিখতে পারি।আমি মূলটা বলি, তুমি গুছিয়ে লেখো। মূল হলো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। মামলার বিচারের জন্যে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল বসেছে। ট্রাইব্যুনালের প্রধান সাবেক বিচারপতি জনাব এম এ রহমান। সঙ্গে থাকবেন বিচারপতি জনাব মুজিবুর রহমান খান এবং বিচারপতি জনাব মকসুমুল হাকিম। এই ট্রাইব্যুনাল কুর্মিটোলা সেনানিবাসে আটক শেখ মুজিবসহ ৩৫ জন দেশদ্রোহীর বিচার করবে। এই ট্রাইব্যুনালের রায় মাথা পেতে নিতে হবে। রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না।

সবশেষে লিখবে পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনতা এই নগ্ন দেশদ্রোহিতার বিচার চায়। আল্লাহু আকবার। পাকিস্তান পায়েন্দাবাদ। শুরু করবে আয়ুব খানের উন্নয়নের দশক দিয়ে। বলবে, জাতি এই মহামানবের অবদান কখনো ভুলবে না।

মোনায়েম খান বেল টিপে তার সেক্রেটারিকে ডেকে বললেন, তথ্য সচিবকে জানাও যে আমি তার উপর কিঞ্চিৎ নাখোশ। ঢাকা টেলিভিশন উন্নয়নের দশক ঠিকমতো প্রচার করছে না। এখন তথ্য সচিব কে? বাঙালি না?

জি-মা সার। উনি মুলতানের।তাহলে থাক, কিছু বলার প্রকার নাই।মোনায়েম খান পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিলেন। সেখানে চুনি পাথরের একটা তসবি আছে। ছোট ছোট দানা। মন অস্থির হলে তিনি গোপনে তসবি জপ করেন। এতে মন শান্ত হয়। আজ তার মন নানান কারণে অস্থির। তিনি চোখ বন্ধ করে পড়ছেন—ইয়ামুকাদ্দেমু। ইয়া মুকাদ্দেমু। হে অগ্রসরকারী। হে অগ্রসরকারী।

অধ্যাপক পাশের ঘরে চলে গেছেন। বক্তৃতা লিখবেন। মোনায়েম খান একা আছেন। দু’বার তসবি টানা শেষ হলো। মোনায়েম খানের অস্থিরতা কমল না, বরং বাড়ল। কিছুদিন নির্জনে থাকতে পারলে ভালো হতো। এক ফাঁকে উমরা হজ্ব করে আসবেন কি না ভাবলেন। এখানেও জটিলতা।

আয়ুব খানের কাছে উমরা হজ্বের বিষয়টা তুলেছিলেন। আয়ুব খান বলেছেন, বেশির ভাগ মানুষ পাপ কাটানোর জন্যে হজ্বে যায়। আপনি সুফি মানুষ। আপনার হজ্বের প্রয়োজন কী। মমানায়েম খান সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন, তা ঠিক, তা ঠিক।আয়ুব খান বললেন, দেশসেবা হজ্বের মতোই।তা ঠিক। তা ঠিক।এখন আপনার প্রধান কাজ ছাত্র ঠান্ডা রাখা। ছাত্ররা ঠান্ডা আছে না?

মোনায়েম খান বললেন, অবশ্যই ঠান্ডা। গাঙের পানির মতো ঠান্ডা। cold like river water. ছাত্রদের জন্যে আমি অনেক কিছু করেছি। ভবিষ্যতে আরও করার ইচ্ছা আছে। সিনেমার টিকেটের দাম অর্ধেক করে দিয়েছি।মোনায়েম খান বললেন, সিনেমা পুরোপুরি ফ্রি করে দিলে কেমন হয়? দিনরাত সিনেমা দেখবে, হাঙ্গামার কথা মনে থাকবে না।

এটা ঠিক হবে না। লোকে অন্য অর্থ করবে। আমি ছাত্রদের জন্যে ট্রেন ভাড়া, বাস ভাড়া সব অর্ধেক করেছি, সেই সঙ্গে সিনেমাও হাফ করেছি। তুমি যা করবে তা হচ্ছে ছাত্রদলগুলি যেন একদল আরেকদলের সঙ্গে লেগে থাকে, সেই ব্যবস্থা। নিজেরা নিজেরা কাটাকাটি করতে থাকুক।

অবশ্যই। ব্যবস্থা করা আছে। সব দলেরই উপরের দিকে কিছু নেতা আমাদের পে লিস্টে আছে।পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্বপাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রীতি আরও বৃদ্ধি করতে হবে। Student exchang প্রোগ্রাম আরও জোরদার করতে হবে। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ইন্টার মারেজ হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দুই অংশের দুশ ছেলেমেয়ের বিয়ে হলো। গভর্নর ভবনে সংবর্ধনা। প্রস্তাবটা কেমন?

এরচেয়ে ভালো প্রস্তাব হতে পারে না। এই দু’শ ছেলেমেয়ের মধ্যে আমার দূরসম্পর্কের ভাইস্তি থাকবে, তার নাম নাদিয়া। M.Sc. পড়ছে। অত্যন্ত ভালো মেয়ে। Inter province marriage-এর বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখবে। উন্নয়নের দর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে দিবে। যখন কোনো ঝামেলা হয়, তখন জনগণের দৃষ্টি ফেরাতে হয়। এই ঘটনায় দৃষ্টি ফিরবে। বুঝেছ?

ইয়েস স্যার।পশ্চিম পাকিস্তানের যুবকরা বাঙালি মেয়েদের বিষয়ে আগ্রহী। বিয়েতে সমস্যা হবার কথা না। তবে পূর্বপাকিস্তানের কিছু ফকির মিসকিন পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু ফকির মিসকিনকে বিয়ে করে লোক হাসাক তা আমি চাই না।স্যার, আমি তো আমার ভাইস্তির কথা বলেছি, এরকম আরও জোগাড় হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।মোনায়েম খান গভীর চিন্তা থেকে জেগে উঠলেন। আবার তাঁর হাত চলে গেল পাঞ্জাবির পকেটে।তিনি তসবি টানতে টানতে বললেন, বান্দরের বাচ্চা কী লিখেছে দেখছ?

অধ্যাপক চিন্তিত মুখে তাকালেন। বান্দরের বাচ্চা বিষয়টা ধরতে পারলেন না।মোনায়েম খা বললেন, ইত্তেফাকে কী লিখেছ দেখো নাই? লিখেছে ১৯৬৫৬৬ সালে পূর্বপাকিস্তানে আমদানি করা হয়েছে ৫২ কোটি টাকার পণ্য আর পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৬ কোটি টাকার পণ্য। জনতা ক্ষেপাতে চায়। গাধা সাংবাদিক বুঝে না একটা যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধটা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্বপাকিস্তানে না। ওদের পণ্য বেশি লাগবে।

অধ্যাপক বললেন, কথা সত্য।মোনায়েম খান বললেন, কথা সত্য হলে এই বিষয়ে লেখালেখি করো। মুখে বড় বড় কথা বললে তো হবে না। মোনায়েম খান বিরক্ত মুখে চোখ বন্ধ করলেন। হঠাৎ প্রবল ঘুমে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। এই ব্যাপারটা তার ঘনঘন ঘটছে। অসময়ে ঘুম পাচ্ছে।

হঠাৎ আমার নামে রসায়ন বিভাগের ঠিকানায় একটা বিয়ারিং চিঠি এসেছে। টিকিট ছাড়া চিঠি। পিয়নের কাছ থেকে চিঠি নিতে হলে দু’আনা দিতে হবে। দু’আনায় দুই কাপ চা পাওয়া যায়। আমি নিজে এক কাপ খেতে পারি। একজন বন্ধুকেও খাওয়াতে পারি। কী করব বুঝতে পারছি না। বাসার চিঠি না। বাসার চিঠি বাবার আরদালি আনা-নেওয়া করে।

কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি কেউ টিকিট ছাড়া পাঠাবে না। পিয়নকে ফিরিয়েই দিচ্ছিলাম। কী মনে করে দু’আনা গচ্চা দিয়ে খাম নিলাম। খুলে দেখি নাদিয়া পাঠিয়েছে। সে লিখেছে (সম্বোধনহীন চিঠি)– প্রথমেই বলি বিয়ারিং চিঠি কেন পাঠিয়েছি। বিয়ারিং চিঠি কখনো মিস হয় না। রেজিস্ট্রি চিঠিও প্রায়ই হারায়। পোস্টাপিস থেকে খুলে দেখে ভেতরে টাকা আছে কি না। বিয়ারিং চিঠি কেউ খোলে না।

এখন সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে কথা বলব। আমরা ক্লাসের মেয়েরা নিজেরা তুমি তুমি করে বলি। ছেলেরাও নিজেদের মধ্যে তুমি তুমি করে বলে। অথচ একটা ছেলে যখন একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে তখন আপনি। ব্যাপারটা কি যথেষ্টই হাস্যকর না? এখন থেকে আমি তোমাকে তুমি করে বলব। তুমিও অবশ্যই আমাকে তুমি বলবে।

আমি এই চিঠিটা তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্যে লিখছি। তুমি আমার হাতের ছাপ দেখে খুব গুছিয়ে অনেক কিছু লিখেছ। তুমি লিখেছ—আমার হাত বিজ্ঞানীর হাত।আমি মাদাম কুরির মতো বড় বিজ্ঞানী হব।মাদাম কুরী হওয়ার আমার কোনো শখ নেই। আমি পার্ল এস বাকের মতো লেখিকা হতে চাই।

আমি প্রথম যে উপন্যাসটা লিখব তার নাম ‘হাজেরা বিবির উপাখ্যান’। হাজেরা বিবি হচ্ছেন আমার দাদি।উপন্যাসের প্রথম লাইনটাও ঠিক করা—আজ হাজেরা বিবির বিয়ের দিন।’ এই লাইনটা আমি অবশ্যি পার্ল এস বাকের কাছ থেকে চুরি করেছি। উনার লেখা গুড আর্থ উপন্যাসের প্রথম লাইন হচ্ছে—আজ ওয়াং লাং-এর বিয়ের দিন।

আমি অবশ্যি আমাকে নিয়েও একটা উপন্যাস লিখতে পারি। সেটাও খারাপ হবে না। নিজেকে নিয়ে যদি লেখি তার প্রথম লাইনও হবে–“আজ তেজল্লীর বিয়ের দিন। তোজল্লী আমার আরেকটি নাম। এই নামে শুধু দাদি আমাকে ডাকেন।তুমি আমার হাতের ছাপ দেখে লিখেছ—আপনার বিয়ে নিয়ে আপনি যতটা ঝামেলা হবে বলে আশা করছেন তত ঝামেলা হবে না। আপনি আপনার পছন্দের কাউকে বিয়ে করবেন, তবে আপনি বিয়ের পরপর দেশ ত্যাগ করবেন। কখনো দেশে ফিরবেন না।

আমার বিয়ে নিয়ে নানান ঝামেলা কিন্তু হচ্ছে। হঠাৎ একদিন শুনলাম, আমার বিয়ে হবে পশ্চিম পাকিস্তানের এক নওজোয়ানের সঙ্গে। এতে পূর্বপাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তানের সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। ইত্যাদি। আমি তখন বাবাকে গিয়ে বললাম, পিতাজি হামনে মাগরেবি পাকিস্তানকা নওজোয়ান শাদি নাহি করুন্সি।বাবা আমার বেয়াদবি দেখে হতভম্ব হলেন। তার মেয়ে উর্দু কথা বলে তার সঙ্গে ফাজলামি করবে এটা তিনি নিতেই পারলেন না। আমি কিন্তু মোটেই ফাজলামি করছিলাম না।

আমি দাদিজানকে ঘটনা বললাম। দাদিজান বললেন, আমারে একটা হাছুন দে। হাছুন দিয়া পিটায়া তোর বাপের মাথা খাইকা পশ্চিম পাকিস্তান বাইর করতেছি।ওই সমস্যার সমাধান হলেও নতুন সমস্যায় আছি। বাবা এখন যে ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছেন সে একজন খুনি। নিজের মামাকে গুলি করে খুন করেছে। এই খুনি কিন্তু দেখতে রাজপুত্রের মতো। মাইকেল এঞ্জেলে তাকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে পাথর কেটে মূর্তি বানানো শুরু করতেন।

দেখলে কত লম্বা চিঠি লিখছি! রাত জেগে চিঠি লিখতে আমার খুব ভালো লাগে। তুমি জানিয়েছ আমার হাতে সুলেমানস রিং আছে। যাদের হাতে এই চিহ্ন থাকে, তারা আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন হয়।আমার কোনোই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নেই। ভয় পাওয়ার ক্ষমতা আছে। দিঘির জলে নিজের ছায়া দেখে এমনই ভয় পেয়েছিলাম। কয়েক ঘণ্টা অচেতন ছিলাম। এখন ভালো। বাবা বলছেন, শরীর পুরোপুরি সারলে ঢাকায় যেতে পারব, কিন্তু দিঘির ঘাটে কখনোই যেতে পারব না।

তবে আমি নিয়মিতই দিঘির ঘাটে যাচ্ছি। মা আমার জন্যে তার দেশের বাড়ি থেকে বারো বছর বয়েসী একটি মেয়ে আনিয়ে দিয়েছেন। মেয়েটার নাম বিছুন (অর্থাৎ পাখা)। আমি তার নাম বদলে রেখেছি পদ্ম। কারণ সে পদ্মের মতোই সুন্দর। মেয়েটার ডিউটি হচ্ছে, সে এক সেকেন্ডের জন্যেও আমাকে চোখের আড়াল করতে পারবে না।

তা সে করছে না। সে আমার সঙ্গে ছায়ার চেয়েও ঘনিষ্ঠভাবে আছে। অন্ধকারে মানুষের ছায়া থাকে না। সে অন্ধকারেও থাকে এবং টকটক করে সারাক্ষণ কথা বলে। তার প্রধান আগ্রহ শিল্লুকে। রোজ আমাকে চার-পাঁচটা শিল্লুক ধরবে। উদ্ভট উদ্ভট সব শিল্লুক। যেমন— কৈলাটির নানি হাত দিয়া ধরলে পানি।এই শিল্লুকের অর্থ হলো, আকাশ থেকে পড়া শিল। শিল হাত দিয়ে ধরলে পানি হয়ে যায়। এখন তুমি বলো কৈলাটির নানির সঙ্গে শিলের কী সম্পর্ক?

তোমাকে দীর্ঘ চিঠি লিখলাম। আমার মন বলছে, তুমি এই চিঠি তোমার সব বন্ধুদের পড়াবে এবং বলবে, নাদিয়া নামের একটি মেয়ে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এই কাজটি করো না। আমি প্রেমেপড়াটাইপ না। ভালো থেকো।তোজল্লী, নাদিয়া, দিয়া

পুনশ্চ : পদ্ম মেয়েটিকে নিয়ে যা লিখলাম সবই মিথী। পদ্ম নামে কেউ নেই। আমি যে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলা শিখে গেছি তা প্রমাণ করার জন্যেই পদ্ম। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করে ফেলেছ পদ্ম বলে একজন আছে।মোটামুটি অপরিচিত কোনো তরুণীর কাছ থেকে পাওয়া আমার জীবনের দীর্ঘতম পত্র। প্রথমেই ইচ্ছা হলো, কেমিস্ট্রির সব ছাত্রছাত্রীকে একত্র করে চিঠিটা পড়ে শোনাই।

অনেক কষ্টে এই লোভ সামলালাম। বিকালে কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ছিল। ক্লাস বাদ দিয়ে চলে গেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। গুড আর্থ আগেই পড়া ছিল। মনে হলো আমার এই বই আরেকবার পড়া উচিত।রাত আটটা পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা। আটটা পার করে হলে ফিরলাম। হলে তখন ভয়ঙ্কর অবস্থা। তিনটা ডেডবডি গেস্টরুমের সামনে পড়ে আছে। রক্তে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।

ডেডবডিগুলি কার? এখানে কেন? ঘটনা কী? কিছুই জানি না। ডেডবড়ি মানেই কান্নার শব্দ, আতরের গন্ধ। এখানে তার কিছুই নেই। হলের কর্মকর্তা প্রভোস্ট হাউজ টিউটর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। দারোয়ানদের শুকনো মুখে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। হলের ভেতরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া কিছুই হচ্ছে না।ডাইনিং হল খোলা আছে। ক্ষুধার্ত ছাত্ররা রাতের খাবার খেতে যাচ্ছে। আমিও খেতে গেলাম। ইমপ্রুভড ডায়েট ছিল। পোলাও-মাংস-দৈ।

খাওয়া শেষ করে হলের স্টোর থেকে দশ পয়সা দিয়ে একটা ক্যাপসর্টেন সিগারেট কিনে লম্বা টান দিলাম। জীবনের প্রথম সিগারেট। যেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি, সেখান থেকে তিনটা ডেডবড়ি দেখা যাচ্ছে। আমি বিকারশূন্য অবস্থায় সিগারেট টানছি। যেন আশেপাশের জগতের সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। আমি সিস্টেমের ভেতরের কেউ না। আমি সিস্টেমের বাইরের একজন।তার পরদিন দুপুরে আরেকটি ঘটনা ঘটল মহসিন হলের পাশেই জিন্নাহ হল।

জিন্নাহ হলের পাঁচতলায় একজন এনএসএফ নেতার ঘরে সতেরো-আঠারো বছরের এক তরুণী। এক পর্যায়ে এই তরুণী নিজেকে বাঁচানোর জন্যে পাঁচতলার জানালা থেকে লাফ দিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল। কাকতালীয়ভাবে এই মেয়েটির নামও নাদিয়া। অনেকের সঙ্গে আমিও মেয়েটিকে দেখতে গেলাম। মধ্যবিত্ত ঘরের মায়া মায়া চেহারার এক তরুণী। চোখে কাজল দেওয়া। তার গায়ে গাঢ় নীল রঙের শাড়ি। নীল শাড়ির ওপর রক্ত ভেসে উঠছে। সালভাদর দালিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সৌন্দর্য কী?’

তিনি বলেছিলেন, সৌন্দর্য হচ্ছে রঙের সঙ্গে রঙের খেলা।যে ছাত্রের ঘর থেকে লাফিয়ে পড়ে মেয়েটি মারা গেল, তার কিছুই হলো না। সে বহাল তবিয়তে বাস করতে লাগল। তার একটা ভারী মোটর সাইকেল ছিল। সে বিকট শব্দে মোটর সাইকেলে করে ঘুরতে লাগল।

মহসিন হলের ক্যান্টিনে সে কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেতে বসেছে। আমি তাদের পাশের টেবিলে আছি। তাদের আলোচনা শুনছি। আলোচনার বিষয়বস্তু রাশিয়ান ছবি ‘Baliad of a Soulder’। মোটরসাইকেলওয়ালা নাকি এই ছবি পাঁচবার দেখেছে। এবং প্রতিবারই কেঁদেছে।পাঠ্যবই পড়তে কারোরই ভালো লাগার কথা না। শুকনা বই থেকে বিদ্যা আহরণ।

সন্ধ্যার পর দরজা লাগিয়ে এই কাজটি নিয়মিত করি। আমাকে খুব ভালো রেজাল্ট করে পাশ করতে হবে। বাবার স্বপ্ন CSP অফিসার হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। শুনেছি cSP-দের ইংরেজির ভালো দখল থাকতে হয়। হলের রিডিংরুমে পত্রিকা আসে। প্রায়ই গম্ভীর মুখে Observer পত্রিকার এডিটরিয়েল পড়ি। ইংরেজি শেখার জন্যে না-কি এডিটরিয়েলের বিকল্প নেই। ইংরেজি গল্পউপন্যাসও পড়ি। পড়ার আনন্দের জন্যে পড় না, ইংরেজি শেখার জন্যে পড়া।

দেশ যখন সংঘাতের দিকে যাচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ বোনা হচ্ছে, তখন আমি চোখ বন্ধ করে পাকিস্তানের অফিসার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।নাদিয়া লেখিকা হতে চায় এই বিষয়টা আমাকে অবাক করেছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর এইসব হওয়া যায়। লেখক কি হওয়া যায়? লেখক হওয়ার সুযোগ থাকলে ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার ব্যবস্থা থাকত। আগ্রহীরা ঔপন্যাসিক হবার ক্লাসে অনার্স নিত।

নাদিয়ার চিঠি কি কোনোভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছিল? মনে হয় করেছে। এক হরতালের দিনে আমি দরজা বন্ধ করে একটা ছোটগল্প লিখে ফেললাম। নাম ‘গন্ধ। লেখা শেষ করে নিজে পড়লাম। আমার পাশের রুমে থাকতেন ফিজিক্সের ছাত্র আনিস সাবেত। তাকে পড়তে দিলাম। তিনি বললেন, গল্পের নাম ‘গন্ধ না দিয়ে দুর্গন্ধ দিলে ভালো হতো। গল্প থেকে দুর্গন্ধ আসছে।গল্প ছিড়ে কুটিকুটি করে কেমিস্ট্রিতে মন দিলাম।বাইরে অশান্ত নগরী। মিটিং, মিছিল, হরতাল। আমার জীবন তরঙ্গহীন। ক্লাস থাকলে ক্লাসে যাই। ক্লাস না থাকলে দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকি।

নিউ মার্কেটের ভেতর একটা চায়ের দোকান আছে, নাম “লিবার্টি কাফে’। এই কাফেতে চা ছাড়াও মহার্ঘ পানীয় কফি পাওয়া যায়। চায়ের দাম দুআনা, কফি আট আনা। আমার খুব যখন মেজাজ খারাপ থাকে, তখন লিবার্টি কাফেতে কফি খেতে যাই। একটা বইয়ে পড়েছি কফি এবং চকলেট মেজাজ ঠিক করে একদিন লিবার্টি কাফেতে কফি খেতে গেছি। কেবিন থেকে একজন কেউ ডাকল, হুমায়ূন, চলে আসেন।

তাকিয়ে দেখি মনিরুজ্জামান ভাই। NSF-এর পাতিনেতা। সঙ্গে অনেকে আছেন। দোলনকে চিনলাম। ভয়ে বুক কেঁপে গেল। কেবিনে যাওয়ার অর্থই হয় না। না গিয়েও উপায় নেই।আমি কেবিনে ঢুকলাম। মনির ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। স্ট্যান্ড করা। হিপনোটিজম জানে। ম্যাজিক জানে।দোলন বিরক্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, কাটলেট খাবেন? আমি বললাম, না।অন্য কিছু খাবেন? না।

দোলন আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মন দিলেন। আলোচনার বিষয় NSF দুই ভাগে ভাগ হয়ে ভালো হয়েছে। ভাগাভাগি আরও আগে হওয়াই উচিত ছিল।NSF দুই ভাগে ভাগ হয়েছে এই তথ্য আমি জানতাম না। লিবার্টি কাফেতে ঢোকার কারণে জানলাম NSF-এর এক ভাগ আয়ুবপন্থী এবং পুরোপুরি পাকিস্তানপন্থী। তাদের প্রধান জমির আলী। দ্বিতীয় ভাগের প্রধান দোলন। তারা মোনায়েম-বিরোধী।

এই সময় আমার এক বন্ধু জনৈকা তরুণীর প্রেমে পড়ল। তরুণীর নাম রূপা। বন্ধুর প্রেমপত্র লিখে দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব পড়ল আমার হাতে। রূপার চিঠি সে আমাকে এনে দেয়। আমি আগ্রহ নিয়ে পড়ি। উত্তর লিখতে বসি। চিঠি চালাচালি চলতে থাকে। রূপা আমাকে চেনে না। আমিও তাকে চিনি না। গভীর আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে তাকে চিঠি লিখে যাই। মাতাল সময়ে লেখা প্রেমপত্রগুলিই হয়তোবা আমার প্রথম সাহিত্যকর্ম।

আমার বন্ধুর সঙ্গে রূপা মেয়েটির বিয়ে হয়নি। আমার বন্ধু তার পরিচিত এক আত্মীয়াকে বিয়ে করে শ্বশুরের পয়সায় ইংল্যান্ড চলে গেল। তার বিয়ের দাওয়াতে কুমিল্লা গিয়েছিলাম। বিয়ের আসরে বন্ধুপত্নীকে দেখে ধাক্কার মতো খেলাম। অতি স্বাস্থ্যবতী কন্যা। মাথা শরীরের তুলনায় ছোট। মেয়েটিকে অত্যন্ত আনন্দিত মনে হলো। সে সারাক্ষণই হাসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটির সারাক্ষণ হাসির কারণ বের করলাম। তাঁর দাত মুখের বাইরে। ঠোট দিয়েও সেই দাত ঢেকে রাখা যায় না।

রূপাকে আমি দেখি নি। তার ছবি দেখেছি। কী মিষ্টি কী শান্ত চেহারা! পটে আঁকা ছবি। রূপা যেন হারিয়ে না যায় তার জন্যেই হিমুর বান্ধবী হিসেবে আমি তাকে নিয়ে আসি। হিমুকে নিয়ে লেখা প্রতিটি উপন্যাসে রূপা আছে।আমরা কাউকেই হারাতে চাই না, কিন্তু সবাইকেই হারাতে হয়।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *