মা গলার আওয়াজ নামিয়ে ফিসফিস পর্যায়ে নিয়ে এসে বললেন, তােকে টেলিফোন করার সময় মজার একটা কাণ্ড হয়েছে। তাের বাবা হঠাৎ ঘরে ঢুকেছে। কিছুক্ষণ ভুরু টুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেছে। এতে মজার কী হলাে?
ওমা মজার না! তাের বাবা ভাবছে— গভীর রাতে হাসিহাসি মুখে কার সঙ্গে কথা ? রহস্যটা কী ? তাের বাবার মনে একটা কিন্তু তৈরি হয়েছে।
বাবার মনে এত সহজে কিন্তু তৈরি হয় না। বাবা এত রাত পর্যন্ত জেগে আছে কেন?
কয়েক রাত ধরেই তাে এই অবস্থা। ঘুমাচ্ছে না, জেগে থাকছে। একটু পরপর বিছানা থেকে উঠে পানি খায়। কিছুক্ষণ বই পড়ার চেষ্টা করে, কিছুক্ষণ লেখার টেবিলে বসে হিসাব নিকাশ করে। বাকি সময়টা বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে।
কী ব্যাপার, তুমি কিছু জিজ্ঞেস করাে নি ? | না আমি কোনাে প্রশ্ন করলেই তাে তাের বাবা রেগে যায়। কী দরকার তাকে রাগিয়ে! মৃ তাের সিডি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার দে। টেলিফোনে শুনছি তাে আওয়াজটা রিয়েল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই ঝড় হচ্ছে। একটু আগে যে মট করে শব্দ হলাে সেটা কি গাছ ভাঙার শব্দ ? টেলিফোনে না শুনে সিডি প্লেয়ারের সামনে বসে যখন শুনব তখন আর রিয়েল মনে হবে না। এটা নিয়ে তাের সঙ্গে বাজি ধরতে পারি।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৬)
মা শােনাে, টেলিফোন কানের কাছে ধরে ধরে কান ব্যথা করছে। তুমি আসতে চাইলে আস— একটাই শর্ত আমাকে বিরক্ত করতে পারবে না। | আমি টেলিফোন নামিয়ে রেখে হতাশ নিঃশ্বাস ফেললাম। আজ রাতের কাজের এখানেই ইতি। মা আমার ঘরে এসে সুবােধ বালিকার মতাে ঘুমিয়ে পড়বেন— তা কখনাে হবে না। তার প্রধান চেষ্টাই থাকবে আমার সঙ্গে গল্প করা। সেইসব গল্পেরও কোনাে আগা মাথা নেই। এক জায়গা থেকে আরেক
জায়গায় গল্পগুলি লাফিয়ে যাবে । ইদানীং গল্পের নতুন এক প্রশাখা যুক্ত হয়েছে। প্যাকেজ নাটক বানায় এমন একজন মা–কে বলেছে তার নাটকে বড় খালার ভূমিকায় অভিনয় করতে। ভদ্রলােক নাটকের স্ক্রীপ্টও মা–কে দিয়েছেন। মা’র সব গল্প এখন বড় খালার চরিত্রে গিয়ে পড়ছে।
কিছু কিছু মানুষের মনে হয় মনের বয়স বাড়ে না। কিশােরী অবস্থায় মার মন যেমন ছিল— এখনাে সে রকমই আছে। শরীর বুড়িয়ে যাচ্ছে। চামড়ায় ভাজ পড়ছে, চোখের নিচ ঝুলে পড়ছে। মাথার চুল পাকতে শুরু করছে। মা নানান রকম ক্রিম ঘষাঘষি শুরু করেছেন। ভিটামিন E ক্রিম। জয়পুরের মাটি দিয়ে মাড ট্রিটমেন্ট। চন্দন বাটার প্রলেপ। জিনিসগুলাে যে একেবারেই কাজ করছে।
— তা না। মাঝে মাঝে মা‘র বয়স খুবই কম মনে হয়। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী, কিংবা ইউনিভার্সিটিতে সদ্য ভর্তি হয়েছে এ রকম মনে হয়। তবে ব্যাপারটা খুবই অল্প সময়ের জন্যে ঘটে। আমার ধারণা এটা প্রকৃতির একটা খেলা। প্রকৃতি মাঝে মাঝে বয়স্ক মানুষের চেহারা থেকে বয়সের সব চিহ্ন সরিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে তারুণ্য দিয়ে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে। বিভ্রম তৈরির খেলা প্রকৃতির খুবই প্রিয় খেলা।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৬)
মার এর মধ্যে চলে আসার কথা। তিনি আসছেন না। হয়তাে মত বদলেছেন। টেলিফোন রিসিভার হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি হাতের রং মুছে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বারান্দার শেষ মাথায় বেতের চেয়ারে পা তুলে বাবা বসে আছেন। তাকে আসবাবপত্রের মতাে মনে হচ্ছে। কাওসার স্যার ক্লাসে বলেছেন— চোখ খােলা রাখবে। যা দেখবে চোখ খােলা রেখে দেখবে। তাহলে বুঝবে ফার্নিচারকে মাঝে মাঝে জীবন্ত মনে হবে। আবার কিছু কিছু মানুষকে ফার্নিচার মনে হবে।
স্যারের অনেক কথাই ঠিক না। তবে একটা কথা একশ’ অগ ঠিক।
মানুষ নিজেকে ‘Conditioned করে নিতে পছন্দ করে। বারান্দার শেষ মাথায় তিনটা বেতের চেয়ার আছে। বাবা বসে আছেন মাঝেরটায়। এই চেয়ার ছাড়া তাকে কখনাে অন্য চেয়ারে আমি বসতে দেখি নি। আমি এগিয়ে গেলাম। বাবা আমাকে দেখে নড়েচড়ে বসলেন। তিনি মনে হলাে আমাকে আসতে দেখে খুশি হয়েছেন। অদ্রিার রােগী যখন রাত জাগে তখন যে–কোনাে জাগ্রত মানুষকে দেখে খুশি হয়।
আমি হালকা গলায় বললাম, বাবা, তােমার খবর কী ? কোনাে খবর নেই ।
ঘুম আসছে না ?
কেন ঘুম আসছে না?
জানি না কেন আসছে না। ঘুমের অষুধ খেয়েছ ?
পাঁচ মিলিগ্রাম ডরমিকাম খেয়েছি। কিছুক্ষণের জন্যে ঝিমঝিম ভাব এসেছিল কেটে গেছে।
কোনাে বিশেষ কিছু নিয়ে তুমি কি টেনশন করছ ?
ব্যবসা ভালাে চলছে? ভালাে চলছে না, তবে টেনশান করার মতােও কিছু না। বসব তােমার পাশে ? বােস।
তাহলে একটা কাজ করাে বাবা তুমি মাঝখানের চেয়ারটা ছেড়ে অন্য যে–কোনাে চেয়ারে বস। মাঝখানের চেয়ারটা আমাকে ছেড়ে দাও।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৬)
বাবা কোনাে প্রশ্ন করলেন না। মাঝের চেয়ারটা ছেড়ে দিলেন। আমি বসতে বসতে বললাম, আজহার চাচার আনা কাফনের কাপড়টা কি তােমার মধ্যে কোনাে সমস্যা তৈরি করেছে ?
আমার নিজের কিন্তু ধারণা করেছে। তােমার ঘুম না হওয়া রােগ শুরু হয়েছে এর পরই। এক কাজ করাে— কোনাে ভিখিরিকে কাপড়টা দিয়ে দাও। কাফনের কাপড় এটা বলে দিতে হবে না বলাে যে পায়জামা পাঞ্জাবি বানানাের জন্যে কাপড়। আজহার চাচার আনা এই বিশেষ বস্তুটা তুমি কেন সিরিয়াসলি নিচ্ছ ?
বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, আজহার একটা গাধা। আমি কোন দুঃখে তার কথা সিরিয়াসলি নেব ? গাধাটা গতকাল দুপুরে আমার অফিসে এসেছিল। কী বলতে এসেছিল জানিস ? সে বনানী গােরস্তানে তার এবং তার স্ত্রীর কবরের জন্যে জায়গা কিনেছে। দুই লাখ টাকা লেগেছে। মহাআনন্দে এই খবর দিতে এসেছে। যেন রাজ্য জয় করেছে।
আমি বললাম, তাঁর কাছে এই খবরটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই তিনি এসেছেন। সবাই পৃথিবীটাকে দেখবে তার নিজের মতাে করে। সেই দেখা ভুলও হতে পারে
আবার শুদ্ধও হতে পারে। তােমার বন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে তােমার রাগ করা সাজে না। উনি গােরস্তানে জায়গা কিনছেন তাতে তুমি কেন রাগবে ?
বাবা থমথমে গলায় বললেন, আমি রাগব কারণ গাধাটা আমার জন্যেও জায়গা কিনতে চায়। আমার কাছে এসেছিল এই জন্যে। জায়গার নাকি খুব টানাটানি। এখন না কিনলে পরে আর পাওয়া যাবে না।
আজিমপুর গোরস্তানে যে অবস্থা হয়েছে। এখন আর জায়গা বিক্রি হচ্ছে না। ব্যাক ডাের দিয়ে জায়গা কেনাও বন্ধ। কিনলে এখনি কিনতে হবে।
তুমি কী বললে ?
আমি বলেছি— কবরের জন্যে জায়গা কেনা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার কবর কোথায় হবে সেটাও ঠিক করা হয় নি। দেশের বাড়িতে হতে পারে। আমি খুব কঠিন গলায় আজহারকে বলেছি আমার কবরের জায়গা নিয়ে সে যেন মাথা না ঘামায়।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৬)
উনি মাথা ঘামালে ঘামাক। তুমি মাথা ঘামিও না। তুমি তােমার মতাে থাকে।
তাই তাে আছি।
তা নেই। তুমি খুবই আপসেট হয়ে পড়েছ। এখন দয়া করে ডাউনসেট হওঁ।
ডাউনসেটটা কী ?
Read more
