মা বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। একজন পুরুষের রাগ করার যতটা অধিকার, একজন মেয়ের কিন্তু ততটা অধিকার নেই। তার মানে ?
মনে কর তাের বাবার হঠাৎ শখ হলাে একটা চা বাগান কিনবে। সে কিনে ফেলল। আমাকে কিছুই বলল না। আমি কিন্তু তাতে রাগ করতে পারব না। সে যদি সেই চা বাগানে তার অফিসের কোনাে মহিলা কর্মচারীকে নিয়ে যায়, সপ্তাহে দু একদিন কাটিয়ে আসে তাতেও কিন্তু আমি রাগ করতে পারব না।
কারণ সে গিয়েছে অফিসের কাজে। তাকে চিঠি লিখতে হবে। দেশের বাইরের যারা চা পাতা কিনবে তাদের সঙ্গে যােগাযােগ করতে হবে। অসংখ্য মানুষকে টেলিফোন করতে হবে। টেলিফোন রিসিভ করতে হবে। …………………বাবা কি চা বাগান কিনেছে না–কি ?
উদাহরণ দিচ্ছিরে মা। উদাহরণ দিয়ে বােঝানাের জন্যে চা বাগানের কথাটা বললাম। তােদের ইউনিভার্সিটির টিচাররা জটিল বিষয় উদাহরণ দিয়ে সহজ করে না ? আমিও করেছি।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
মা হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলে বললেন— উদাহরণ দিয়ে বুঝানাে নিয়ে খুবই অশ্লীল একটা জোক আছে। অশ্লীল হলেও দারুণ হাসির । তাের বিয়ে হােক তারপর বলব। | বিয়ে হােক আর না হোক তোমার মুখ থেকে অশ্লীল রসিকতা শােনার আমার কোনাে ইচ্ছা নেই।
মা আবার শুয়ে পড়লেন। আমি মায়ের গায়ে হাত রেখে বললাম, ঘাই হরিণী কী তুমি জানাে ? | মা হাই তুলতে তুলতে বললেন, জানি। কিন্তু তােকে বলা যাবে না। ঘাই হরিণী ব্যাপারটাও অশ্লীল। মা হয়ে আমি মেয়ের সঙ্গে অশ্লীল কথা বলব ? ভাবিস কি তুই আমাকে? আমি কি জীবনানন্দ দাশ ?
মা হঠাৎ বালিশে মুখ গুজে হাসতে শুরু করলেন। আমি বললাম, হাসছ কেন ? ………হাসি আসছে এই জন্যে হাসছি। কেন হাসি আসছে জানতে পারি ? তুই নাকি একজনের প্রেমে পড়েছিস এই ভেবে হাসি আসছে।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, আমি কারাে প্রেমে পড়ি নি। আর যদি পড়েও থাকি এখানে হাসির কী হলো? …………..কোনাে ছেলের প্রেমে পড়িস নি ? আমাকে যে বলল তােদের একজন টিচারের সঙ্গে তাের প্রেম হয়েছে। সবাই তাকে ‘গরু স্যার‘ ডাকে। হি হি হি। ……………হাসি থামাও তাে মা। এইসব কে বলেছে ? ঐ দিন ফরিদাদের বাসায় গিয়েছিলাম। সে বলল ।
আমি চুপ করে গেলাম। মার অনেক বিচিত্র স্বভাবের একটা হলাে আমার সব বান্ধবীর সঙ্গে তার খুব ভালাে যােগাযােগ। তিনি নিয়মিত তাদের বাসায় যাবেন। সমবয়সীদের মতাে হৈচৈ করবেন এবং ব্যাপারটা আমার কাছ থেকে গােপন রাখবেন।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
মা হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, মৃন্ময়ী তুই তাের ‘গরু স্যারকে একদিন বাসায় নিয়ে আসিস তাে। আমি লন থেকে কাচা ঘাস কেটে রাখব। হি হি হি। …………….মা পাগলের মতাে হাসছেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে মা মানসিকভাবে পুরােপুরি সুস্থ না।
মৃন্ময়ী! বলাে। ……………আমার মনে হচ্ছে তাের বিয়ে হবে আজহার সাহেবের ছেলের সঙ্গে। আমার সিক্সথ সেন্স তাই বলছে। বিয়েটা যেহেতু ঠিক হয়েই আছে কাজেই গরু স্যারের সঙ্গে প্রেমটা না হলেই ভালাে হয়। টিচার মানুষ হাফসােল খাবে। কাজটা ঠিক হবে না।
মা, চুপ করাে তাে! ……………..এই রসিকতা মা প্রায়ই করে। আজহার চাচার ছেলেটাকে নিয়ে রসিকতা। ছেলেটা জড়ভরতের মতাে। মানসিকভাবে হয়তােবা সামান্য অসুস্থ। কোথাও বসে আছে তাে বসেই আছে। কোনাে দিকে তাকিয়ে আছে তাে তাকিয়েই আছে।
ছােটবেলায় আমাদের বাসায় আসত। ঘরের কোনাে অন্ধকার কোণ খুঁজে বসে থাকত। কোনাে প্রশ্ন করলে জবাব দিত না। শুধু যদি মা বলতেন, এই শােন মৃন্ময়ীকে বিয়ে করবি ? ……..সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে নরম গলায় বলত, করব।
মা হেসে ভেঙে পড়তেন। রাগে আমার গা জ্বলে যেত। এখনাে রাগ লাগছে। মানুষের অসুস্থতা নিয়ে রসিকতা করার কোনাে মানে হয় না।
মা বললেন, তাের আজহার চাচার এই ছেলে তাে খারাপ না। স্বামী হিসেবে আদর্শ হবে। যেখানে বসিয়ে রাখবি বসে থাকবে। তাের দিকে প্রেমপূর্ণ নয়নে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। খেতে দিলে খাবে। খেতে না দিলে খাবে না। হি হি হি।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি কঠিন গলায় বললাম, মা প্লিজ হাসবে না। ………মা বললেন, আজহার সাহেবকে তাের বাবা চিনতে পারে নি। আজহার সাহেব কচ্ছপ রাশি। কচ্ছপ রাশির মানুষ একবার কোনাে কিছু কামড়ে ধরলে ধরেই থাকবে। দেখিস সে ঠিকই তাের বাবার কাছে কবরের জায়গা বিক্রি করবে। তাের সঙ্গেও তার ছেলের বিয়ে দিয়ে দিবে।
আমার সঙ্গে কি তিনি তার ছেলের বিয়ে দিতে চাচ্ছেন? অবশ্যই চাচ্ছে। মা আবারও হাসি শুরু করলেন। তিনি কেন হাসছেন কে জানে ?
আমি যে পরিস্থিতিতে পড়েছি— সংবাদপত্রের ভাষায় তাকে বলা হয় বিব্রতকর পরিস্থিতি। যতটুক ব্রিত বােধ করা উচিত তারচেয়ে বেশি বােধ করছি। চেষ্টা করছি আমাকে দেখে যেন আমার মানসিক অবস্থাটা বােঝা না যায়। এই অভিনয়টা আমি ভালাে পারি। তবে সবদিন পারি না। আজ পারছি কিনা বুঝতে পারছি না। …..ঘটনাটা এ রকম – ক্লাস শেষ হয়েছে। আমি গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি। পেছন থেকে কাওসার স্যার ডাকলেন— হ্যালাে মিস।
আমি পেছন ফিরলাম। স্যার বললেন, তুমি কোন দিকে যাচ্ছ ? আমি বললাম, দিক বলতে পারব না। বাসা যে দিকে সে দিকে যাচ্ছি। ……….পথে আমাকে নামিয়ে দিতে পারবে? আমার মােটর সাইকেলের চাকা পাংচার হয়েছে। একটা এক্সট্রা চাকা আছে। চাকা কীভাবে বদলাতে হয় আমি জানি না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি বললাম, আসুন। আপনি কোথায় যাবেন বলুন আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি। ……….আমি কোথাও যাব না। তােমার সঙ্গে গাড়িতে উঠব। হঠাৎ কোথাও নেমে যেতে ইচ্ছা করলে নেমে যাব। আর যদি নেমে যেতে ইচ্ছা না করে তােমার সঙ্গে তােমাদের বাসায় যাব। এক কাপ চা খেয়ে আসব।
স্যারের সঙ্গে কথাবার্তার এই পর্যায়ে হঠাৎ আমার অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। নিঃশ্বাস দ্রুত পড়তে থাকল। যদিও তার কোনােই কারণ নেই। কোনাে অপরিচিত ভদ্রলােক আমার কাছে লিফট চাইছে না। যিনি লিফট চাইছেন তিনি আমার খুবই পরিচিত।
তিনি হয়তাে আজ আবার নতুন ধরনের কোনাে খেলা খেলার চিন্তা করছেন। আবারাে হয়তাে সাইকোলজির কোনাে পরীক্ষা হবে। পরীক্ষার এক পর্যায়ে আমি রেগে যাব এবং আমার নিজেকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে হবে।
Read more
