মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

মা শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলেনআমি বললাম, হাসির কিছু হয় নি মাসে সত্যি কথা বলেছেলুকায় নিকেউ সত্যি কথা বললে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা যায় না মা চোখ বড় বড় করে বললেন, তুই রেগে যাচ্ছিস কেন ? এখনাে তাে ছেলেটার তাের সঙ্গে বিয়ের দলিল রেজেস্ট্রি হয় নিআগে হােক, তারপর রাগ করিস। 

আমি বললাম, এইসব কী বলছ তুমি ? ………..মা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, তাের সঙ্গে ঠাট্টা করলামঠাট্টাও করতে পারব না ? …………এই ঠাট্টাটা আমার ভালাে লাগছে না। ……..ঠাট্টা তাে করাই হয় ভালাে না লাগার জন্যেঠাট্টা শুনে তুই যদি মজা পাস তাহলে তাে আর এটা ঠাট্টা থাকে না। সেটা হয়ে যায় রসিকতা। 

ঠিক আছে মা ঠাট্টা করাে। ……..মা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তুই কিন্তু LSD ট্যাবলেট আমাকেও দিবিআমি খেয়ে দেখব রঙের ব্যাপারটা কীআয় আমরা মা মেয়ে দুজন এক সঙ্গে খাই। …আমি মার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলামমা বললেন, টেলিফোনের প্যারালাল কানেকশন তােতুই যখন কারাে সঙ্গে কথা বলিস তখন মাঝে মাঝে আমি শুনি

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ

যেন টেলিফোনে লুকিয়ে কথা শােনা কোনাে ব্যাপার নাএমন ভঙ্গিতে মা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেনপ্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকে বললেন, তােকে তাে আসল কথাই বলা হয় নিনকল কথা নিয়ে ছােটাছুটি করছিতাের আজহার চাচা তার ছেলের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে এসেছেনতাের বাবাকে বললেনখুব খুশিতার হাসি শুনতে পাচ্ছিলি না ? তাের জন্যে বিশাল এক গিফট প্যাকেট এনেছেনএখন খুলবি না পরে খুলবি

আমি মার দিকে তাকিয়ে আছিমা গ্রিন টির মগে চুমুক দিচ্ছেনতাকে দেখে মনে হচ্ছে চাটা খেয়ে তিনি খুব তৃপ্তি পাচ্ছেন। ……গাড়ি বারান্দার সিঁড়িতে, যেখানে দারােয়ান এবং মালীরা সাধারণত বসে থাকে ভাইয়া সেখানে বসে আছেতার মুখ বিষন্নদেখেই মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছেশরীর কি খারাপ করেছে? ভাইয়া এমন মানুষ যে শরীর ভয়ঙ্কর খারাপ করলেও কাউকে কিছু জানাবে নাহয়তাে তার কাছে শারীরিক কষ্ট অরুচিকর ব্যাপারযা অন্যদের কাছ থেকে গােপন রাখতে হয়। 

ভাইয়া বাড়িতে থাকতে আসার দিন পনের পরের কথাবাবা এক সকালবেলা গাড়ি বের করে আমাকে বললেন টগরকে ডেকে নিয়ে আয়তেওকে কিছু জামাকাপড় কিনে দেবওতাে ফকির মিসকিনের কাপড় চোপড় নিয়ে এসেছেমৃন্ময়ী, তুইও চল আমাদের সঙ্গেআমি ভাইয়াকে নিয়ে গাড়িতে উঠলামড্রাইভার ঘটাং করে গাড়ির দরজা বন্ধ করলভাইয়া গাড়ির দরজায় হাত রেখেছিল, তার হাতের তিনটা আঙ্গুল থেতলে গেলসে অস্পষ্ট গলায় শুধু বললউফ

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ

বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, কী হয়েছে ? ভাইয়া বলল, কিছু হয় নাই। …………বাবা বললেন, দরজায় হাত রেখে বসেছিলে কেন ? গাড়িতে চড়ারও কিছু নিয়ম কানুন আছেলাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেই হয় নাব্যথা পেয়েছ

ভাইয়া চাপা গলায় বলল, নাবাবা বললেন, ড্রাইভার চালাও, বনানী মার্কেটের দিকে যাও। …….আমি বললাম, নাআগে কোনাে ডাক্তারের কাছে চলে ভাইয়া খুবই ব্যথা পেয়েছে, রক্ত পড়ছেরক্তে তার সার্ট মাখামাখি হয়ে গেছে। 

আমরা একটা ক্লিনিকে গেলামক্লিনিকের ডাক্তার সাহেব বললেন, কী সর্বনাশ! এই ছেলের তাে একটা আঙ্গুল ভেঙে গেছেতাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান, কিংবা পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। …বাবা বিরক্ত মুখে বললেন, একটা আঙ্গুল ভেঙে গেছে তারপরেও কোনাে শব্দ করে নাইতত ডেনজারাস ছেলেএকে তাে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখা দরকার। 

টগর নামের অতি শান্ত অতি নম্র কিশােরটি একটি ডেনজারাস ছেলেএইচিন্তাটা বাবা মাথা থেকে কখনাে দূর করতে পারেন নিদূর কোনােদিন হবে বলেও আমার মনে হয় নামানুষের প্রথম ধারণা সব সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়ভাইয়াকে রকম অসহায় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে আমার খুবই মায়া লাগলএইখানে একটা ভুল কথা বললাম ভাইয়াকে দেখলেই আমার মায়া লাগেতাকে অসহায় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখলেও মায়া লাগে, আবার সহায় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখলেও মায়া লাগেআমি বললাম, শরীর খারাপ নাকি

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃ তাের সঙ্গে জরুরি কথা আছেএইখানে বলবে না ঘরে যেতে হবে ? ঘরে আয়। ……..কথা যা বলার এক মিনিটের মধ্যে বলে শেষ করতে হবেআমার আজও ক্লাসে দেরি হয়ে গেছে। ………তাহলে এখানেই বলিবলাে। 

ভাইয়া ইতস্তত করতে লাগলআমি খুবই অবাকএমন কী কথা যা আমাকে বলতে ভাইয়ার ইতস্তত করতে হচ্ছেআমি ধমকের মতাে বললাম, বলাে তাে কী বলবে। 

আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবি ? ………..আমি হ্যান্ডব্যাগ খুলতে খুলতে বললাম, অবশ্যই পারববলাে কত লাগবেপাঁচ টাকায় হবে ? …………পাঁচ টাকায় হবে নাঅনেক বেশি টাকা লাগবেকারাে কাছ থেকেজোগাড় করে দিতে পারবি

অবশ্যই পারববাবার কাছ থেকে এনে দেবটাকাটা যে আমার দরকার এটা জানলে বাবা দেবেন না বাবাকে বলব নাএখন দয়া করে বলল কত টাকা? ষাট হাজার টাকাআমি অবাক হয়ে বললাম, ষাট হাজার টাকা! এত টাকা । 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ

ভাইয়া নিচু গলায় বলল, হা বিকাল চারটার আগে টাকাটা লাগবেমৃ পারবি ? ……..পারার তাে কোনাে কারণ দেখি না। …….বিকাল চারটার আগে টাকাটা দরকার। ……..আমার মনে আছেআমি কি জানতে পারি বিকাল চারটার আগে এতগুলি টাকা কেন দরকার

ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললপরে বলি ? এখন বলতে ইচ্ছা করছে না। …বলতে ইচ্ছা না করলে তােমাকে কখনাে বলতে হবে নাথ্যাংকু । 

 

 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *