আমি গাড়িতে উঠেই মােবাইল ফোনে বাবাকে টেলিফোন করলাম। ষাট হাজার টাকা বাবার জন্যে কোনাে ঘটনাই না। বাবা টেলিফোন ধরলেন। কিছুটা অবাক হয়েই বললেন, মা ব্যাপার কী ? কোনাে ব্যাপার না বাবা, আমার কিছু টাকা দরকার। কখন দরকার ?
আমি ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরব একটার সময়। তখনই দরকার। তুমি কাউকে দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিও। ……….তেমন প্রয়ােজন মনে করলে আমি রহমতকে দিয়ে তাের ইউনিভার্সিটিতেও পাঠাতে পারি। ………….ইউনিভার্সিটিতে পাঠাতে হবে না। বাড়িতে পাঠাও। এমাউন্ট বল। এমাউন্টটা বেশি। আমার দরকার ষাট হাজার টাকা। Sixty thousand. হঠাৎ এত টাকা। কী জন্যে দরকার বল তাে?
সেটা এখন বলতে পারব না। ষাট হাজার টাকা তােমার জন্যে দেয়া কি কোনাে সমস্যা ? ..সমস্যা না । বাবা টাকাটা অবশ্যই দেড়টার মধ্যেই পাঠাবে। আমার দরকার চারটার আগে। তারপরেও কিছু সময় হাতে থাকা ভালাে। ……..বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মৃ টাকাটা তাের দরকার না। অন্য কারাের দরকার। আমার ধারণা তোর কাছে টাকাটা চেয়েছে টগর। ধারণা কি
আমি বললাম, টাকাটা আমি তােমার কাছে চাচ্ছি। এটাই মূল বিষয়। …….বাবা শান্ত গলায় বললেন, এটা অবশ্যই মূল বিষয় না। তুই আমাকে খােলাখুলি বল টাকাটা কি টগরের দরকার ? ……..হ্যা। ………কী জন্যে দরকার ? বাবা আমি জানি না। আমাকে ভাইয়া বলে নি। ঠিক আছে আমি টেলিফোন করে টগরের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছি।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
তুমি অবশ্যই ভাইয়াকে টেলিফোন করবে না। ব্যাপারটা সে তােমাকে জানাতে চাচ্ছে না। ……..কেন জানাতে চাচ্ছে না ? সে তােমাকে ভয় পায়। পুরাে ব্যাপারটায় ফিসি কিছু আছে। ফিসি কোনাে ব্যাপারই আমার পছন্দ । মৃন্ময়ী মা শােন, এই টাকাটা আমি দেব না।
আমি খুবই বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি দেবে না! …….বাবা শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, না। টগরকে আমার কাছে আসতে হবে। ওকে এক্সপ্লেইন করতে হবে। ………না দিলে দিও না, কিন্তু ভাইয়াকে এ বিষয়ে দয়া করে কিছু জিজ্ঞেস করবে না।
আচ্ছা। জিজ্ঞেস করব না। বাবা টেলিফোন রেখে দিলেন। ………..আমি একটা ধাক্কার মতো খেলাম। বাবা অতি বুদ্ধিমান একজন মানুষ। বুদ্ধিমান মানুষ কখনাে তার প্রিয়জনদের সঙ্গে এমন রূঢ় আচরণ করে না। আমি একটা ছােট্ট ভুল করেছি। আমার বলা উচিত ছিল টাকাটা আমার নিজের ব্যক্তিগত কোনাে কারণে দরকার। কারণটা এখন ব্যাখ্যা করতে পারছি না। পরে ব্যাখ্যা করব। মিথ্যা বলা হতাে। আমি নিজে মিথ্যা বলার জন্যে নিজের কাছে ছােট হয়ে থাকতাম। কিন্তু বেচারা ভাইয়া উদ্ধার পেত। সে নিশ্চয়ই বড় ধরনের কোনাে সমস্যায় পড়েছে।
মােবাইল ফোন বাজছে। বাবা টেলিফোন করেছেন। ফোন সেটে তাঁর নাম্বার ভাসছে। প্রচণ্ড রাগ লাগছে। টেলিফোন ধরতে ইচ্ছা করছে না। এই অদ্রতাটা করা কি ঠিক হবে ? হয়তাে বাবা টেলিফোন করেছেন সরি বলার জন্যে। হয়তাে তিনি মত বদলেছেন। রহমত চাচাকে টাকা দিয়ে পাঠাচ্ছেন।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
মানুষের ভেতর সব সময় জোয়ার ভাটার খেলা চলে। এই রাগ এই ভালােবাসা। এই মেঘ এই রৌদ্র। ….মৃন্ময়ী। হ্যা বাবা। তুই কি এখনাে পথে ? হা জামে আটকে পড়েছি। ক্লাসের দেরি হয়ে গেল না? রােজই হচ্ছে। তুমি কী বলার জন্যে টেলিফোন করেছ সেটা বলে ফেল।
মৃন্ময়ী শােন, তুই মনে হয় আমার ওপর রাগ করেছিস। পুরাে ব্যাপারটা তােকে ঠাণ্ডা মাথায় দেখতে হবে। ……বাবা আমার মাথা এখন মােটেই ঠাণ্ডা না, কাজেই ঠাণ্ডা মাথায় আমি কিছুই চিন্তা করতে পারছি না। পরে তােমার সঙ্গে এই নিয়ে আলােচনা করি ?
আলােচনার কিছু নেই। আমার যা বলার আমি এখনি বলে শেষ করব। আমার ধারণা আমার কথা শােনার পর কথার পেছনের লজিক তুই ধরতে পারবি। জগতটা আবেগের না মা। জগতটা লজিকের। পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে কোনাে আবেগে ঘুরছে না। লজিকে ঘুরছে। | এই লজিক সৃষ্টির পেছনে কিন্তু কাজ করেছে আবেগ। | সেটা তাে আমরা জানি না। লজিকটা আমরা জানি। যা জানি কথা হবে তার ভিত্তিতে। …….বেশ বলাে তােমার লজিক।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবা শান্ত গলায় বললেন, টগর হলাে এমন এক ছেলে যার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। ডিগ্রি পরীক্ষা দু‘বার দিয়েছে। এই তার যােগ্যতা। প্রতি মাসে আমার কাছ থেকে যে টাকাটা হাত খরচ হিসেবে পায়— এটাই তার বর্তমানের রােজগার এবং হয়তােবা ভবিষ্যতের রােজগার। এই পর্যন্ত যা বলেছি ঠিক আছে ?
হ্যা ঠিক আছে। …তার কিছু বন্ধু বান্ধব আছে যারা ছায়া জগতের বাসিন্দা। দু‘ একজনের পেছনে পুলিশ ঘুরছে। যা বলছি ঠিক আছে মা? ……হ্যা ঠিক আছে।
এখন টগর নামের অপদার্থ ছেলেটার হঠাৎ ষাট হাজার টাকার দরকার পড়ে গেল। বাবা হিসেবে আমি প্রথম যে চিন্তাটা করব তা হলাে সে বড় কোনাে ঝামেলায় জড়িয়েছে। টাকা দিয়ে ঝামেলা মেটানাে যায় না। টাকায় ঝামেলা। বাড়ে। টাকাটা না দিয়ে আমার উচিত খোঁজখবর করা ঘটনা কী? ………তােমার টাকা দিতে হবে না। তােমার প্রতি আমার একটাই অনুরােধ তুমি এই নিয়ে কোনাে খোঁজখবর করবে না। ভাইয়াকে কিছু জিজ্ঞেস করবে ।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
তাের অনুরােধ রাখব। এবং আশা করব তুইও আমার কথা রাখবি। তােমার কী কথা? টগরের টাকাটা অন্য কোনাে সাের্স থেকে জোগাড় করার চেষ্টা করবি না। আমার আর কোনাে সোের্স নেই। তুই বুদ্ধিমতী মেয়ে। সাের্স বের করা তাের জন্যে কোনাে সমস্যা না। থ্যাংক য়ু ফর দি কমপ্লিমেন্ট। বাবা টেলিফোন রাখি ? ……………………..টেলিফোন রাখার আগে তুই কি স্বীকার করবি আমি যে কথাগুলি বলছি তার পেছনে যুক্তি আছে ? …………………..হা স্বীকার করছি। বাবা টেলিফোন রেখে দিলেন।
Read more