মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

আমি নিঃশব্দে দোতলায় উঠে এলামবাবা বেতের চেয়ারে ঝিম ধরে বসে আছেন। তার গা থেকে হালকা গন্ধ আসছেঅর্থাৎ তিনি আড়াই পেগ থেকে তিন পেগ হুইস্কি খেয়ে ফেলেছেনবাংলাদেশে মদ্যপান আইন করে নিষিদ্ধতবে বিত্তবানদের জুনাে আইনের ফাঁক আছেবিত্তবানদের জন্যে বাংলাদেশ সরকারের আবগারী ডিপার্টমেন্ট মদ খাওয়ার লাইসেন্স ইস্যু করেসেখানে লেখা থাকে স্বাস্থ্যগত কারণে তাকে এই পরিমাণ মদ্যপানের অনুমতি দেয়া হলােবাবার এই লাইসেন্স আছেবাবা বললেন, কী দেখলি

দেখলাম কেউ নেইখাটের নিচ, বাথরুম সব দেখেছিস ? ……….হ্যা। …….আমি কিন্তু স্পষ্ট দেখেছি একটা ছেলে বিড়ালের মতাে এদিক ওদিক তাকিয়ে আঁ করে ওর ঘরে ঢুকলস্ট্রাইপ শার্ট গায়ে। 

তুমি তাে মানসিকভাবে উত্তেজিত এই জন্যে এসব দেখেছ। মানসিকভাবে উত্তেজিত হব কী জন্যে ? ………….আজহার চাচা তােমাকে কাফনের কাপড় দিয়েছে এরপর থেকেই তুমি মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছতােমার চিন্তা কাজ করছে না। ………….চিন্তা ঠিকই কাজ করছে, আমি শুধু ভাবছি একটা লােক কী করে কাফনের কাপড় উপহার হিসেবে নিয়ে আসে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

উনার কাছে মনে হয়েছে ভালাে উপহারবাবা যাও তুমি শুয়ে পড়রাত জাগলে তোমার শরীর খারাপ করে। তুই শুবি না ? আমার সামান্য দেরি হবেদেরি হবে কেন ? …..রাতে ভাত খাই নিএখন দেখি প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছেফ্রীজের ঠাণ্ডা ভাত খাব নানতুন করে ভাত রাঁধবতুমি বিড়বিড় করছ কেন

কাফনের কাপড়টা দিয়ে গাধাটা আমার মেজাজটা খারাপ করে দিয়েছেআর তাের মাতাে বুদ্ধির কোনাে সীমা নেই! সে কাপড়টা রেখে দিয়েছে ড্রেসিং টেবিলের উপরে, যেন ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে। 

এক কাজ করাে কাপড়টা তুমি আমার কাছে দিয়ে দাওআমি ওয়ার্ডডােবে রেখে দেব। …..আরে না তুই বাচ্চা মানুষতুই কেন তাের ঘরে কাফনের কাপড় রাখবি! ………বাবা তুমি ব্যাপারটা মাথা থেকে দূর করে ঘুমুতে যাওরাতে না ঘুমালে তােমার খুবই শরীর খারাপ করেতােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তােমার প্রেসার বেড়েছেপ্রেসার মেপে দেব

দরকার নেইগাধাটা কী করেছে শােন, কাফনের কাপড়ে আতর মাখিয়ে রেখেছেনাক থেকে আতরের গন্ধটা যাচ্ছে নাসাবান পানি দিয়ে নাক ধুয়েছি, তারপরেও যাচ্ছে নাতুই গন্ধ পাচ্ছিস না ? …….পাচ্ছি নামানুষের সামান্য সেন্সও থাকবে না

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার হঠাৎ ইচ্ছা করল বাবাকে একটা বিপদে ফেলতেকাজটা ঠিক না, অন্যায়তারপরেও মনে হলােআচ্ছা দেখি তাে কী হয়আমি বললাম, বাবা সরু নদীর ইদ্দিস ভাষা কী ? ……বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেনআমি বললাম, আজহার চাচাকে তুমি সরু নদীর ইদ্দিস ভাষাটা বলছিলে। 

কী বলেছিলাম ? বলেছিলে ছেরাং গাছেরাং হচ্ছে সরু, গা হলাে নদীঠাট্টা করছিলামইদ্দিস ভাষা আমি জানি না। ………..তুমি ঠাট্টা করে বলছিলে নাখুবই সিরিয়াসভাবে বলছিলেআজহার চাচা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা বিশ্বাস করেছে। আমি যে এই ছােট্ট মিথ্যাটা বলেছি তার পেছনে ভালাে যুক্তি আছেযুক্তিটা শুনবি

এর পেছনে তােমার কোনাে যুক্তি নেই বাবাযুক্তিটা তুমি এখন ভেবে ভেবে বের করবেআমি নিশ্চিত তুমি বেশ ভালাে যুক্তিই বের করবেযাই হােক তুমি ভেবে চিন্তে ভালাে একটা যুক্তি বের করাে। আমি ভাের বেলা শুনবএখন দয়া করে ঘুমুতে যাও। 

বাবা আমার ওপর বিরক্ত হয়েছেন কিনা ঠিক বোেঝা যাচ্ছে নাতবে তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, আমি লক্ষ করেছি আজহার এলেই তুই খাতির যত্নের একটু বাড়াবাড়ি করিসএটা করবি না । 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

কেন ? আমি বললামবাবা, তুমি কি আজহার চাচাকে ভয় পাও ? বাবা থমথমে গলায় বললেন, ভয় পাবার প্রশ্ন আসছে কেন ? …….আমার মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাওআজহার চাচা না হয়ে যদি অন্য কেউ তােমাকে কাফনের কাপড় দিত তুমি তাকে কঠিন কিছু কথা শুনিয়ে দিতে। 

আমি ভদ্রতা করেছিভদ্রতাটাকে তুই ভেবে বসলি ভয়তােমার মধ্যে দ্রতার বাইরেও কিছু ছিল। ..বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, স্মার্ট হওয়া ভালােকিন্তু নিজেকে অতিরিক্ত স্মার্ট ভাবাটা ভালাে না। 

আমি স্মার্ট না বাবাআমি যা করি তা হলাে দুইএর সঙ্গে দুই যােগ করে চার হয়েছে কিনা দেখিসবার বেলায় তাই হয়তােমার বেলায় দুইএর সঙ্গে দুই যােগ করলে চারের কিছু কম হয়সেই কমটা কোথায় যায় সেটা বুঝতে পারি না। …………তুই কী বলতে চাচ্ছিস পরিষ্কার করে বল তাে। 

আমি শান্তি গলায় বললাম, ভাইয়ার কাছে যে ছেলেটা এসেছে বলে তুমি ভাবছ এই ছেলেটা কে? ……আমি কী করে জানব সে কে? ………..আমার ধারণা তুমি তাকে চেনতােমার সঙ্গে এই ছেলের কোনাে না কোনােভাবে যােগাযােগ হয়েছেনয়তাে তুমি ভয়ে এত অস্থির হতে না। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

বাবা কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকলেনআমি রওনা হলাম রান্নাঘরের দিকেতস্তুরী বেগমকে ডেকে তুলে গরম ভাত রান্না করতে হবেতস্তুরী বেগমের শাড়ির আঁচলে আলাউদ্দিনের চেরাগের একটা মিনি সাইজ দৈত্য বাস করে বলে আমার ধারণাএই দৈত্য রান্নাবান্না ছাড়া অন্য কাজ পারে নাযেকোনাে রান্না এই দৈত্য অতি নিমিষে শেষ করে ফেলতে পারেআমি আমার নিজের জন্যে রান্না করাচ্ছি নাভাইয়ার ঘরে যে ছেলেটি বসে আছে সে ক্ষিধেয় কাতর আছেগরম ভাত তার জন্যে।

অপ্রত্যাশিতভাবে গরম ভাত পেয়ে সে অভিভূত হবে। এই মজার ঘটনাটা সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখবে এবং অনেক লােকের সঙ্গে গল্প করবেএই ছেলে যদি বিয়ে করে তাহলে বাসর রাতে স্ত্রীর সঙ্গে এই গল্পটিও করবেতার মেয়ে যখন বড় হবে কোনাে এক রাতে পিতাকন্যা ভাত খেতে বসে গল্প করার সময় এই গল্প উঠে আসবেমেয়ের মা বিরক্ত গলায় বলবেআচ্ছা এই এক গল্প তুমি বার করবে? বন্ধ করাে তাে

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *