আমি নিঃশব্দে দোতলায় উঠে এলাম। বাবা বেতের চেয়ারে ঝিম ধরে বসে আছেন। তার গা থেকে হালকা গন্ধ আসছে। অর্থাৎ তিনি আড়াই পেগ থেকে তিন পেগ হুইস্কি খেয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশে মদ্যপান আইন করে নিষিদ্ধ। তবে বিত্তবানদের জুনাে আইনের ফাঁক আছে। বিত্তবানদের জন্যে বাংলাদেশ সরকারের আবগারী ডিপার্টমেন্ট মদ খাওয়ার লাইসেন্স ইস্যু করে। সেখানে লেখা থাকে স্বাস্থ্যগত কারণে তাকে এই পরিমাণ মদ্যপানের অনুমতি দেয়া হলাে। বাবার এই লাইসেন্স আছে। বাবা বললেন, কী দেখলি ?
দেখলাম কেউ নেই। খাটের নিচ, বাথরুম সব দেখেছিস ? ……….হ্যা। …….আমি কিন্তু স্পষ্ট দেখেছি একটা ছেলে বিড়ালের মতাে এদিক ওদিক তাকিয়ে আঁ করে ওর ঘরে ঢুকল। স্ট্রাইপ শার্ট গায়ে।
তুমি তাে মানসিকভাবে উত্তেজিত এই জন্যে এসব দেখেছ। মানসিকভাবে উত্তেজিত হব কী জন্যে ? ………….আজহার চাচা তােমাকে কাফনের কাপড় দিয়েছে এরপর থেকেই তুমি মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছ। তােমার চিন্তা কাজ করছে না। ………….চিন্তা ঠিকই কাজ করছে, আমি শুধু ভাবছি একটা লােক কী করে কাফনের কাপড় উপহার হিসেবে নিয়ে আসে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
উনার কাছে মনে হয়েছে ভালাে উপহার। বাবা যাও তুমি শুয়ে পড়। রাত জাগলে তোমার শরীর খারাপ করে। তুই শুবি না ? আমার সামান্য দেরি হবে। দেরি হবে কেন ? …..রাতে ভাত খাই নি। এখন দেখি প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে। ফ্রীজের ঠাণ্ডা ভাত খাব না। নতুন করে ভাত রাঁধব। তুমি বিড়বিড় করছ কেন ?
কাফনের কাপড়টা দিয়ে গাধাটা আমার মেজাজটা খারাপ করে দিয়েছে। আর তাের মা’র তাে বুদ্ধির কোনাে সীমা নেই! সে কাপড়টা রেখে দিয়েছে ড্রেসিং টেবিলের উপরে, যেন ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে।
এক কাজ করাে কাপড়টা তুমি আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি ওয়ার্ডডােবে রেখে দেব। …..আরে না । তুই বাচ্চা মানুষ। তুই কেন তাের ঘরে কাফনের কাপড় রাখবি! ………বাবা তুমি ব্যাপারটা মাথা থেকে দূর করে ঘুমুতে যাও। রাতে না ঘুমালে তােমার খুবই শরীর খারাপ করে। তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তােমার প্রেসার বেড়েছে। প্রেসার মেপে দেব ?
দরকার নেই। গাধাটা কী করেছে শােন, কাফনের কাপড়ে আতর মাখিয়ে রেখেছে। নাক থেকে আতরের গন্ধটা যাচ্ছে না। সাবান পানি দিয়ে নাক ধুয়েছি, তারপরেও যাচ্ছে না। তুই গন্ধ পাচ্ছিস না ? …….পাচ্ছি না। মানুষের সামান্য সেন্সও থাকবে না ?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
আমার হঠাৎ ইচ্ছা করল বাবাকে একটা বিপদে ফেলতে। কাজটা ঠিক না, অন্যায়। তারপরেও মনে হলাে— আচ্ছা দেখি তাে কী হয়। আমি বললাম, বাবা সরু নদীর ইদ্দিস ভাষা কী ? ……বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম, আজহার চাচাকে তুমি সরু নদীর ইদ্দিস ভাষাটা বলছিলে।
কী বলেছিলাম ? বলেছিলে ছেরাং গা। ছেরাং হচ্ছে সরু, গা হলাে নদী। ঠাট্টা করছিলাম। ইদ্দিস ভাষা আমি জানি না। ………..তুমি ঠাট্টা করে বলছিলে না। খুবই সিরিয়াসভাবে বলছিলে। আজহার চাচা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা বিশ্বাস করেছে। আমি যে এই ছােট্ট মিথ্যাটা বলেছি তার পেছনে ভালাে যুক্তি আছে। যুক্তিটা শুনবি ?
এর পেছনে তােমার কোনাে যুক্তি নেই বাবা। যুক্তিটা তুমি এখন ভেবে ভেবে বের করবে। আমি নিশ্চিত তুমি বেশ ভালাে যুক্তিই বের করবে। যাই হােক তুমি ভেবে চিন্তে ভালাে একটা যুক্তি বের করাে। আমি ভাের বেলা শুনব। এখন দয়া করে ঘুমুতে যাও।
বাবা আমার ওপর বিরক্ত হয়েছেন কি–না ঠিক বোেঝা যাচ্ছে না। তবে তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, আমি লক্ষ করেছি আজহার এলেই তুই খাতির যত্নের একটু বাড়াবাড়ি করিস। এটা করবি না ।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
কেন ? আমি বললাম। বাবা, তুমি কি আজহার চাচাকে ভয় পাও ? বাবা থমথমে গলায় বললেন, ভয় পাবার প্রশ্ন আসছে কেন ? …….আমার মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাও। আজহার চাচা না হয়ে যদি অন্য কেউ তােমাকে কাফনের কাপড় দিত তুমি তাকে কঠিন কিছু কথা শুনিয়ে দিতে।
আমি ভদ্রতা করেছি। ভদ্রতাটাকে তুই ভেবে বসলি ভয়। তােমার মধ্যে দ্রতার বাইরেও কিছু ছিল। ..বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, স্মার্ট হওয়া ভালাে। কিন্তু নিজেকে অতিরিক্ত স্মার্ট ভাবাটা ভালাে না।
আমি স্মার্ট না বাবা। আমি যা করি তা হলাে দুই–এর সঙ্গে দুই যােগ করে চার হয়েছে কি–না দেখি। সবার বেলায় তাই হয়। তােমার বেলায় দুই–এর সঙ্গে দুই যােগ করলে চারের কিছু কম হয়। সেই কমটা কোথায় যায় সেটা বুঝতে পারি না। …………তুই কী বলতে চাচ্ছিস পরিষ্কার করে বল তাে।
আমি শান্তি গলায় বললাম, ভাইয়ার কাছে যে ছেলেটা এসেছে বলে তুমি ভাবছ এই ছেলেটা কে? ……আমি কী করে জানব সে কে? ………..আমার ধারণা তুমি তাকে চেন। তােমার সঙ্গে এই ছেলের কোনাে না কোনােভাবে যােগাযােগ হয়েছে। নয়তাে তুমি ভয়ে এত অস্থির হতে না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবা কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকলেন। আমি রওনা হলাম রান্নাঘরের দিকে। তস্তুরী বেগমকে ডেকে তুলে গরম ভাত রান্না করতে হবে। তস্তুরী বেগমের শাড়ির আঁচলে আলাউদ্দিনের চেরাগের একটা মিনি সাইজ দৈত্য বাস করে বলে আমার ধারণা। এই দৈত্য রান্নাবান্না ছাড়া অন্য কাজ পারে না। যে–কোনাে রান্না এই দৈত্য অতি নিমিষে শেষ করে ফেলতে পারে। আমি আমার নিজের জন্যে রান্না করাচ্ছি না। ভাইয়ার ঘরে যে ছেলেটি বসে আছে সে ক্ষিধেয় কাতর আছে। গরম ভাত তার জন্যে।
অপ্রত্যাশিতভাবে গরম ভাত পেয়ে সে অভিভূত হবে। এই মজার ঘটনাটা সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখবে এবং অনেক লােকের সঙ্গে গল্প করবে। এই ছেলে যদি বিয়ে করে তাহলে বাসর রাতে স্ত্রীর সঙ্গে এই গল্পটিও করবে। তার মেয়ে যখন বড় হবে কোনাে এক রাতে পিতা–কন্যা ভাত খেতে বসে গল্প করার সময় এই গল্প উঠে আসবে। মেয়ের মা বিরক্ত গলায় বলবে– আচ্ছা এই এক গল্প তুমি ক’বার করবে? বন্ধ করাে তাে।
Read more
