যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ পর্ব:০৩ হুমায়ূন আহমেদ

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

ওসি সাহেবের এই বিমলানন্দের কারণ হচ্ছে, এর আগে তিনবার আমি থানায় টেলিফোন করে রুবার গৃহত্যাগের খবর দিয়েছি। একটা পরিস্থিতি তৈরি করার জন্যেই এই খবর দেয়া। যাতে পুলিশ যখন রুবার মৃত্যু নিয়ে ফাইন্যাল রিপোর্ট তৈরি করবে, তখন সেই রিপোর্টে উল্লেখ থাকবে–এই মহিলা প্রায়ই রাগারগি করে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন।

প্রথমবার যখন রুবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার খবর দিলাম, তখন ওসি সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, আপনার স্ত্রী চলে গেছেন, চব্বিশ ঘণ্টাও তো হয় নি, চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে মিসিং পারসন হয় না। ধৈর্য ধরুন। আত্মীয়স্বজনের বাসায় খোঁজ করুন। আমি অত্যন্ত অনুগত গলায় বলেছি, জি আচ্ছা।সকালের ভেতর খোঁজ না পেলে থানায় চলে আসবেন।জি আচ্ছা।

আমি সকালবেলায় থানায় চলে গেলাম। ওসি সাহেবকে বললাম, আমার স্ত্রীকে পাওয়া গেছে। ও সকাল আটটার সময় বাসায় এসেছে।ওসি সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন–দেখলেন তো, আমার কথা। ফলে গেল। এও অল্পতে অস্থির হওয়া ঠিক না।আর অস্থির হবো না। আমি আপনার জন্যে সামান্য গিফট এনেছি। আপনি কি নেবেন? ওসি সাহেব বিস্মিত হয়ে বলতেন, কী গিফট?

আমি খবরের কাগজে মোড়া এক কার্টুন বেনসন এন্ড হেজেস এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, আপনাকে গভীর রাতে টেলিফোন করেছি, এই জন্যে… ওসি সাহেব খুশি খুশি গলায় কপট বিরক্তি মিশিয়ে বললেন, পুলিশকে গভীর রাতে বিরক্ত করবেন না তো কাকে বিরক্ত করবেন? এই জাতীয় সমস্যা হলে টেলিফোন করবেন। যত রাতই হোক, করবেন। আমরা পুলিশরা আছি কী জন্যে?

দ্বিতীয় দফায় আমি আবার রুবার গৃহত্যাগের খবর দিলাম এবং যথারীতি পরদিন ভোরে খবর দিলাম যে, আমার স্ত্রী ফিরে এসেছে। এবারো এক কার্টুন সিগারেট নিয়ে গেলাম।ওসি সাহেবের সঙ্গে খাতির হয়ে গেল। ওসি সাহেব ধরে নিলেন, আমি নির্বোধ ধরনের ভালো মানুষ গোছের একজন মানুষ, যাকে তার স্ত্রী তেমন পছন্দ করে না বলে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।এ পর্যন্ত চার কার্টুন বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেট আমি ওসি সাহেবকে দিয়েছি।

এই চার কার্টুন সিগারেটের দাম দুই হাজার পাঁচশ টাকা। এই দুই হাজার পাঁচশ টাকায় আমি এখন যে উপকারটা পাব তার দাম দু লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা।স্ত্রী খুন হলে প্রথম সন্দেহ এসে পড়ে স্বামীর ওপর। থানার ওসি গোড়াতেই ধরে নেন–স্বামী এই খুনটি করেছে। আমার বেলায় এটা হবে না। ওসি রমনা থানা আমাকে খুনী ভেবে নিয়ে তদন্ত শুরু করবেন না। তিনি ধরেই নেবেন আমি সাতেও নেই পাচেও নেই। একজন মানুষ। আমাকে ঝামেলা থেকে রক্ষা করা তখন তার প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়াবে।মিজান সাহেব।জি।চুপ করে আছেন কেন, কথা বলুন, ভাবি কি আবার গৃহত্যাগী?

জি।আপনি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়েছেন–রাত তো মাত্র এগারোটা পঁচিশ। সকাল পর্যন্ত ধৈৰ্য ধরে অপেক্ষা করুন এবং বেনসন এন্ড হেজেসের কার্টুন নিয়ে আমার এখানে চলে আসুন। ভাবির গৃহত্যাগ মানে তো আমার লাভ–হা-হা-হা।আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো শব্দ করলাম। ওসি সাহেব বললেন, কী হলো?

আমি বললাম, কিছু না। মনটা খুব খারাপ।আমার একটা উপদেশ শুনুন ভাই সাহেব, স্ত্রীকে কম ভালোবাসবেন। স্ত্রীকে যত কম ভালোবাসবেন ততই কম যন্ত্রণা পোহাতে হবে। ভালোবেসেছেন কি মরেছেন। সম্রাট শাহজাহানের দিকে তাকিয়ে দেখুন, স্ত্রীকে ভালোবেসে কী বিপদে পড়েছে! সব টাকা পয়সা খরচ করে তাজমহল বানাতে হলো–হা-হা-হা। আপনার যা নেচার আমার তো মনে হয় আপনিও তাজমহল-টহল কিছু বানাবেন। মিজান সাহেব!

জি।আজ। আপনাকে অন্যদিনের চেয়েও মনমরা মনে হচ্ছে। ব্যাপার কী বলুন তো? ঝগড়া কি চূড়ান্ত রকমের হয়েছে না-কি? জি-না। আজ ওর কাছে লেখা একটা চিঠি হঠাৎ ড্রয়ারে পেয়ে মনটা খারাপ হয়েছে।চিঠি? কার চিঠি? বাদ দিন।না, না। বাদ দেব কেন? আপনি আমার বন্ধু মানুষ। আপনার একটা সমস্যা হলে আমি দেখব না? কী পেয়েছেন বলুন। প্রেমপত্র? হুঁ।কে লিখেছে?

বাদ দিন।নামটা বলুন। খোঁজ নেব। স্ট্রেইট লাইন বানিয়ে ছেড়ে দেব।ওর নাম মনসুর। আমার ধারণা, রুবা এখন ওর বাসাতেই আছে। চক্ষুলজ্জায় পড়ে খোঁজ নিতে পারছি না।আপনাকে কোনো খোঁজ নিতে হবে না। আপনি ডেলিকেট অবস্থায় পড়েছেন সেটা বুঝতে পারছি। খোঁজ-খবর আমিই করব। টেলিফোন নাম্বার আছে ঐ লোকের? থাকলে দিন। এক্ষুণি পাত্তা লাগাচ্ছি। তারপরেই আমি আপনাকে জানাব। মন খারাপ করবেন। না ভাই। বি হ্যাপি। লাইফে এরকম হয়।

আমি মনসুরের টেলিফোন নাম্বার দিয়ে দিলাম। এখন বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করছি। মনটা হালকা লাগছে। আমার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমি এখন যা করব তা হলো… পানির পিপাসা হচ্ছে। তীব্ৰ পানির পিপাসা। পোলাও খাবার জন্যে এটা হচ্ছে। পানির পিপাসার একটা ব্যাপার হচ্ছে এটা আস্তে আস্তে হয় না। হঠাৎ পিপাসা শুরু হয়। আমি ফ্রিজ খুলে পরপর দু গ্লাস পানি খেলাম। বাথরুম সেরে রাখার জন্যে বাথরুমে ঢুকলাম। দুগ্নাস পানি খেয়েছি, বাথরুম তো পাবেই।

বাথরুমের দরজা বন্ধ করা মাত্ৰই হঠাৎ মনে হলো— এখন যদি দরজা আর খুলতে না পারি তাহলে কী হবে? এরকম একটা গল্প কোথায় যেন পড়েছিলাম— বন্ধু একা থাকে, তাকে সে খুন করল। খুনের পর পর তার খুব পিপাসা পেয়ে গেল। সে পুরো এক জগ পানি খেয়ে ফেলল। পানি খাওয়ার পর পর ঢুকাল বাথরুমে। দরজা বন্ধ করে বাথরুম সারল, তারপর আর বাথরুমের দরজা খুলতে পারে না। ছিটিকিনি শক্ত হয়ে এঁটে গেছে।

প্রাণপণ শক্তি দিয়েও সে কিছুই করতে পারছে না। পরদিন পুলিশ এসে দরজা খুলে তাকে বের করল। অতিপ্রাকৃত কোনো ব্যাপার এর মধ্যে ছিল না, পুরো ব্যাপারটাই ছিল সাধারণ একটা ব্যাপার। খুনীর শরীর দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। মাংসপেশি হয়েছিল শিথিল। শিথিল মাংসপেশি নিয়ে সে ছিটিকিনি খুলতে পারছিল না। যতই সময় যাচ্ছিল ততই তার শরীর আরো দুর্বল হয়ে পড়ছিল। এর বেশি কিছু না।

আরেকটা গল্প শুনেছিলাম।–এক লোক গরু বিক্রি করে ফিরছে। পথে এশার নামাজের সময় হলো। সে নামাজ পড়তে ঢুকল এক গ্রামের মসজিদে। তাকে অনুসরণ করছিল এক চোর। সেও সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে ঢুকল। মুসল্পীরা নামাজ শেষ করে চলে গেছেন। সে একা একাই নামায়ে দাঁড়াল। তখন চোরটা তাকে জাপ্টে ধরল। টাকা নেবার জন্যে। দুজনে ধস্তাধস্তি হচ্ছে–চোরটা এক পর্যায়ে ছুরি বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। চোরটা গরু বিক্রির টাকাটা নিয়ে নিল।

তারপরেই হলো সমস্যা। চোর সারা ছোটাছুটি করছে। দরজা খুঁজে পাচ্ছে না। ব্যাকুল হয়ে সে ঘুরছে আর চেঁচাচ্ছে–দরজা কই? দরজা কই? পুরো সাইকোলজিক্যাল একটা ব্যাপার। এর মধ্যে অতিপ্রাকৃত কিছু নেই। ভূমিকম্পের সময়ও এরকম হয়। আতঙ্কগ্ৰস্ত মানুষ ঘরের ভেতর ছোটাছুটি করে দরজা খুঁজে পায় না। আগুন লাগলেও এমন হয়। আমার মেজো মামার বাড়িতে একবার আগুন লাগল। ঘুম ভেঙেই তিনি দেখেন–দাউ দাউ করছে আগুন। তিনি ছোটাছুটি করতে লাগলেন এবং চেঁচাতে লাগলেন, দরজা পাইতেছি না! দরজা!

আমি বাথরুম সারলাম। চোখে-মুখে খানিকটা পানি দিলাম। ছিটিকিনি খুলতে আমার বেগ পেতে হলো না। বাথরুমের বাইরে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আর তখন শোবার ঘরে ধাপ করে শব্দ হলো।এর মানে কী? কানে ভুল শুনছি। ধাপ করে শব্দ হবার কী আছে? চেয়ার টানার শব্দ হচ্ছে। কে যেন চেয়ার টানছে। মেঝের উপর চেয়ার টানার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ। কে চেয়ার টানবে?

আমি শোবার ঘরে শুয়ে পড়লাম। কোনো দুর্বলতাকে প্রশয় দেয়া যাবে না। ভয় পাওয়া যাবে না। কিছুতেই না। ভয় এমন বস্তু যে, একবার ভয় পেলেই তা ফুলে-ফোঁপে বাড়তে থাকে।আমি শোবার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিফোন বেজে উঠল। আমি রিসিভার কানে তুলে বললাম, হ্যালো।ওসি রমনা থানা বলছি।স্নামালিকুম ভাই।ওয়ালাইকুম সালাম–মিজান সাহেব, আমি ঐ মনসুরকে টেলিফোন করেছিলাম।

আপনার স্ত্রী ওখানে নেই। কনফার্ম। পুলিশের টেলিফোন পেয়ে সে ভ্যাবাচক খেয়ে গেছে। সে বলেছে আপনার স্ত্রী তার কাছে যান নি, তবে তিনি টেলিফোন করেছিলেন।কী বললেন? টেলিফোন করেছিল? জি। রাত নটার দিকে টেলিফোন করেছিল। আপনার নাকি তাকে নিয়ে কোনো বিয়েতে যাবার কথা। আপনি তাকে ফেলে চলে গেছেন, এই নিয়ে দুঃখ করছিলেন।ও।

কাজেই আপনি কোনো রকম দুঃশ্চিন্তা করবেন না। আর শুনুন ভাই, আমি ঐ মনসুর ব্যাটাকে আন্ডার অবজারভেশন রাখব। লাইফ হেল কবে দিব। কোনো চিন্তা করবেন না।… তার কথা শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই আমি খাটের দিকে তোকালাম। আমি এটা কী দেখছি? রুবা শুয়ে নেই। সে বসে আছে। কুকুর। যেমন থাবা গেড়ে বসে সেও ঠিক সে-রকম থাবা গেড়ে বসে আছে।

তবে তাকিয়ে আছে খোলা দরজার দিকে। আমার দিকে না। ব্যাপারটা এতই অস্বাভাবিক যে কিছুক্ষণ আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হলো না। আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম। এক সময় দৃশ্যের অস্বাভাবিকতা আমোব মাথায় ঢুকাল। ঝন ঝন একটা শব্দ হলো–দেখি টেলিফোন রিসিভার আমার হাত থেকে পড়ে গেছে।

টেলিফোন রিসিভার থেকে শব্দ আসছে–হ্যালো। হ্যালো। হ্যালো। ক্ষীণ আওয়াজ যেন অনেক দূর থেকে কেউ ডাকছে। আমি টেলিফোনের কানেকশন খুলে ফেললাম। টেলিফোন কানেকশন খুলতে যতটা সময় লাগানো উচিত তারচেয়েও বেশি সময় লাগালাম। যেন টেলিফোন কানেকশন খোলা এই মুহুর্তে সবচে জরুরি কাজ। এটাই একমাত্র সত্য আর সব মিথ্যা।কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলে কেমন হয়? চোখ রেস্ট পাক। রেক্ট পেলে সব স্বাভাবিক হবে।

তখন দেখা যাবে কেউ কুকুরের মতো থাবা গেড়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বসে নেই। সবই ভ্ৰান্তি। কিন্তু চোখ বন্ধ করার মতো সাহসও পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে, একবার যদি চোখ বন্ধ করি তাহলে আর চোখ খুলতে পারব না। কিংবা খুললেও সেই চোখে কিছুই দেখব না। এসব হচ্ছে দুর্বল মনের কল্পনা। দুর্বল মনের কোনো কল্পনাকে প্রশ্ৰয় দেয়া ঠিক হবে না। এখন মন শক্ত করতে হবে। অনেক কাজ বাকি আছে। আসল কাজই বাকি। এতক্ষণ যা করেছি। সব নকল কাজ।

ডেডবডি সরাতে হবে। দ্রুত সরাতে হবে। এমনভাবে সরাতে হবে যেন কেউ এর কোনো খোঁজ না পায়। ডেডবডি পাওয়া না গেলে খুনের মামলা দাঁড় হয় না। খুন হয়েছে কি-না তা জানার প্রথম শর্ত হলো ডেডবডি। সুরতহাল হবে। ডাক্তাররা বলবেন, খুন। তবেই না মামলা চালু হবে।ডেডবডি সামলানোর প্রচলিত যে কটি পদ্ধতি আছে তার সব কটিতে গণ্ডগোল আছে। একটাও ফুল প্রািফ নয়।

লোকজন কী করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেয়? দুদিন না যেতেই বস্তা ভেসে উঠে। উৎসাহী লোকজন ছুটে আসে। বস্তা খোলা হয়। পত্রিকায় রিপোর্টের পর রিপোর্ট বের হতে থাকে। আরেকটা পদ্ধতি হচ্ছে, মাটি খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়া। পদ্ধতিটা খারাপ না, তবে এর জন্যে গর্ত গভীর হতে হবে। মাটি চাপা। দেবার এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে, যা অসম্ভব কঠিন কাজ।

আমার পদ্ধতি ভিন্ন। সহজভাবে পদ্ধতিটা হলো–ডিসপারসান পদ্ধতি। টুকরো টুকরো করে বড় একটা অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া। যত ক্ষুদ্র টুকরা হবে এবং যত বেশি ছড়ানো যাবে তত দ্রুত হত্যার প্রধান আলামত মৃতদেহ উবে যাবে। কোনো টুকবা কুকুরে খাবে, কোনোটা খাবে কাক। আমি ঠিক করেছি–ডেডবডি বাথরুমে নিয়ে… ..ছোট ছোট পিস করা হবে… ..থাক, এখন এসব চিন্তা করে লাভ নেই। আপাতত কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকি। তারপর চোখ খুলিব এবং দেখব রুবা বসে নেই। আগে যেভাবে বিছানায় ছিল এখন সেভাবে বিছানাতেই আছে।

আমি চোখ বন্ধ করলাম এবং মনে মনে বলতে থাকলাম–ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ান, ওয়ান থাউজেন্ড টু, ওয়ান থাউজেন্ড খ্রি…। কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে আছি সেই আন্দাজ পাওয়ার জন্যই বলা। ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ান বলতে এক সেকেন্ড সময় লাগে।ওয়ান থাউজেন্ড থাটি পর্যন্ত আমি চোখ বন্ধ করে আছি। অর্থাৎ প্ৰায় ৩০ সেকেন্ড চোখ বন্ধ। অনেকখানি সময়। চোখ খুললাম।রুবা বসে আছে। তবে এখন সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে পলকহীন চোখে। ঈষৎ হং করে আছে। জিভ দেখা যাচ্ছে। জিহবার রঙ এখনো গাঢ় কালো।

যে বসে আছে সে রুবা নয়। She is dead… Dead and gone… অন্য কেউ। আমি টেলিফোনের কাছে রাখা চেয়ারে বসে পড়লাম, আর তখনই রুবা স্পষ্ট করে বলল, পানি খাব।সে কি সত্যি কথা বলছে, না। আমি ভুল শুনছি? অডিটরী হেলুসিনেশন। আমার মাথা বোধহয় জট পাকিয়ে গেছে। সে আবারো বলল, পানি খাব।আমি লক্ষ করলাম, কথাগুলি বলার সময় তার ঠোঁট নড়ল না, জিহবা, নড়ল না। গলার স্বর রুবার মতোই, তবে অস্পষ্ট, জড়ানো।আমি বললাম, পানি খাবে?

হুঁ, তিয়াশ হয়েছে।রুবাই কথা বলছে। তিয়াশ শব্দটা রুবার শব্দ। এটা রুবা বলে। আমি কী করব? পানি এনে দেব? আমার পক্ষে এমন হাস্যকর কিছু করা কি সম্ভব? আমি পানি এনে দিচ্ছি একটা মৃতদেহকে। আমি নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, রুবা! তুমি বেঁচে নেই। তুমি মারা গেছ। You are dead. Dead like a stone<strong>.</strong> পানি খাব।তুমি আমার কথা বুঝতে পারছি? আমি তোমাকে মেরে ফেলেছি।

ও।তুমি শুয়েছিলে। আমি একটা বালিশ এনে তোমার মুখের ওপর চেপে ধরেছি।ও।তুমি যে মাবা গেছ তা কি বুঝতে পারছি? পানি।পানি আমি তোমাকে এনে দেব। তুমি ভেব না। আমি তোমাকে দেখে আতঙ্কে অস্থির হয়েছি। আমার ভয় খুব কম। অন্য যে কেউ এই অবস্থায় এটফেল করে মরে যেত। আমি মবি নি এবং আমি কথা বলছি তোমার সঙ্গে। আমি কি বলছি বুঝতে পারছি? বুঝতে পারলে মাথা নাড়াও।

রুবা মাথা নাড়ল না। যেভাবে বসেছিল। সেভাবেই বসে রইল।আমি খাবার ঘরে ঢুকলাম। প্রথমে বের করলাম ব্ৰান্ডিব বোতল। পুরো কাপ। ভর্তি করে ব্ৰান্ডি ঢালিলাম। ব্ৰান্ডির জন্য আলাদা গ্রাস আছে। গ্লাস বের করতে ইচ্ছা করছে না। অতি দ্রুত স্নায়ুর উপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দিতে হবে। তখন শরীর ঠিক হবে। সব ফিরে যাবে আগের জায়গায়। ব্যাক টু দি প্যাভিলিসন।

কাপের ওপর পিপড়া ভাসছে। ভাসুক। পিপড়া খাওয়া ভালো। পিপড়া খেলে সাঁতার শেখা যায়। আচ্ছা, আমি কি সাঁতার জানি? সাঁতার জানি কি জানি না। অনেক ভেবেও মনে করতে পারলাম না। তার মানে আমার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। মুখ ভর্তি ব্ৰান্ডি নিয়ে গিলে ফেললাম। জিহবা, নাড়ি-চুড়ি জ্বলতে লাগল। জুলুক। জ্বলে ছাই হয়ে যাক।এই, এই! রুবা ডাকছে। পানি খেতে চায়। তাকে পানি খেতে দেব, না এক কাপ ব্ৰান্ডি দেব?

কেউ পানি চাইলে নিষেধ করতে নেই। কেউ পানি চাইলে তাকে পানি দিতে হয়, পানি না দিলে রোজ হাশরের ময়দানে যখন তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাবে তখন পানি পাওয়া যাবে না। এই কথা বলতেন। আমার মা। কোনো ভিখিরি পানি চাইলে আমার মা অতি ব্যস্ত হয়ে বলতেন–মিজান, ও মিজান! বাপধন, পানি দিয়ে আয়। টিনের মধ্যে টেস্ট বিস্কুট আছে। বিস্কুট দিয়ে পানি দে।

ভিখিরিদের পানি খাওয়ানোর জন্যে আমাদের একটা বড় এলুমিনিয়ামের গ্লাস ছিল। মাসের প্রথমেই বড় একটা টিন ভর্তি টেস্ট বিসকিট কিনে রাখা হতো। অন্য বিসকিটগুলো নরম হয়ে যায়। টেষ্ট বিসকিট কখনো নরম হয় না, যতই দিন যায় ততই শক্ত হতে থাকে–শক্ত হতে হতে এক সময় লোহার মতো শক্ত হয়ে যায়।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *