রজনী পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

রজনী পর্ব:০৪

বাড়িতে অপেক্ষা করাও যন্ত্ৰণা। বসার ঘরটা খুপরির মতো ছোট। ভাদ্র মাসের অসহ্য গরম। ঘরের আধখানা জুড়ে এক চৌকি। সেই চৌকিতে আশ্রয় নিয়েছেন লোমশ শরীরের এক ভদ্রলোক। ঘুমিয়ে পড়েছেন কি না। বোঝা যাচ্ছে না। নাকের ডাক শোনা যাচ্ছে। আবার এদিকে দেখি হাত পাখাও চলছে। ভদ্রলোকের পাশে এশার সবচে ছোট বোনটি। তার মাথার নিচে বালিশ নেই। কাঁথা খুঁজে বালিশের মতো করে দেওয়া। মেয়েটি গরমে ঘুমুতে পারছে না। মাঝে-মাঝে উঠে বসছে।রাত এগারটায় এশার বাবা একটা ভেজা গামছা গায়ে জড়িয়ে বসার ঘরে ঢুকে বললেন, তুমি চলে যাও, আজ বোধহয় ও আসবে না।

আসবে না তো যাবে কোথায়?…….মীরপুরে ওর খালার বাড়ি। মনে হচ্ছে, ওখানেই থেকে যাবে। মাঝে-মাঝে রাত বেশি হলে থেকে যায়।খবর দেয় না? কীভাবে দেবে, ও বাড়িতে কি টেলিফোন আছে? আপনার চিন্তা হচ্ছে না? ভদ্রলোক এমনভাবে তাকালেন যেন আমার বেয়াদবিতে স্তম্ভিত হয়েছেন। তিনি কী বলবেন মনে-মনে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। খুব রেগে গেলে মানুষ মজার-মজার সব কথা বলে। অবশ্যি ভদ্রলোক মজার কিছু বললেন না। বড় রকমের একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, বাড়ি চলে যাও, নয়ত বাস পাবে না। লাস্ট বাস সাড়ে এগারটায়।

বাস সত্যি-সত্যি পেলাম না। তিন মাইলের মতো হেঁটে একটা রিকশা জোগাড় করতে হল। রিকশায় ওঠামাত্র রিকশাওয়ালা যে কথা বলল, তার সারমর্ম হচ্ছেকলেজ গার্ল লাগবে কি না। তার সন্ধানে প্রচুর কলেজ গার্ল আছে। ভালো ফ্যামিলির মেয়ে। অভাবে পড়ে এই লাইনে এসেছে।আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। রিকশাওয়ালা আমার জন্যে কলেজ গার্ল জোগাড় করে ফেলেছে এই জন্যে নয়। এরা একটা চক্রের সঙ্গে আছে। এদের হাতে যেমন কলেজ গার্ল আছে, তেমনি গুণ্ডাপাণ্ডাও আছে। পেটে ছুরি বসিয়ে আমাকে নর্দমায় ফেলে দেওয়া এদের কাছে ছেলেখেলা। আমি রিকশাওয়ালাকে খুশি রাখবার জন্যেই সরাসরি না বললাম না।

বললাম, খরচপাতি কীরকম লাগবে?…….রেইট হইল গিয়া আফনের ঘন্টা হিসাবে। পঞ্চাশ আছে, যাইট আছে, আবার ধরেন গিয়া এক শ আছে। যেমুন জিনিস তেমুন দাম।আরে সর্বনাশ, আমার কাছে আছেই মাত্র দশ টাকা। আরেক দিন আসা যাবে।বাস স্ট্যান্ডের বগলে দোকানে আমার নাম কইয়েন, তাইলে খবর পাইবেন।কি নাম তোমার? বদিউল।ঠিক আছে বদিউল, তোমাকে খুঁজে বের করব। দুএকদিনের মধ্যেই আসব। তবে খরচপাতি অনেক বেশি।সেইটা আমি দেখমু। খরচপাতির জইন্যে চিন্তা করবেন না।আমি প্রতিজ্ঞা করলাম যাত্রাবাড়ির দিকে আর আসছি না।

বদিউল নামের রিকশাওয়ালা আমাকে চিনে ফেলতে পারে। চিনে ফেললে হয়তো চেপে ধরবে। ঘন্টা হিসেবে এক জন কলেজ গার্ল জুটিয়ে দেবে। সেই কলেজ গার্ল নিয়ে আমি করব কী? যাব কোথায়? ঢাকা শহর গিজগিজ করছে মানুষে। একটা গর্ত খুড়লে সেই গর্ত দেখার জন্যে হাজার-হাজার মানুষ জমে যায়। একটা মাইক ফিট করে হ্যালো ওয়ান টু থ্রি বললে চার-পাঁচ হাজার লোক দাঁড়িয়ে যায়। এখানে নিরিবিলি কোথায় যে কলেজ গার্লের সঙ্গে দুএকটা মিষ্টি কথা বলব? এশার সঙ্গে তিন বছর ধরে আমার পরিচয়, এখনো একটু নিরিবিলি পাই নি যে, হাত ধরে গাঢ়স্বরে দুএকটা কথা বলব কিংবা ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যাব। ভালবাসার মেয়েকে চুমু খেতে কেমন লাগে কে জানে? আমার এই রিকশা নিশ্চয়ই যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত যাবে না। তবু একবার জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।

আমি বললাম, এই, যাত্রাবাড়ি যাবে? না।না কেন? যাত্রাবাড়িতে অসুবিধা কি?……….যামু না—যামু না। ব্যাস ফুরাইল।এত সহজে ফুরালে তো হবে না। কেন তুমি যাবে না সেটা বল।রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে আমার দিকে তাকাল। লোকটা বয়সে সম্ভবত আমার বাবার কাছাকাছি। তাকাচ্ছেও আমার বাবার মতো করে, যেন আমার আচরণে মৰ্মাহত। আমাকে নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছে না। রাগে যে সে কাঁপছে তা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। এক জন মানুষকে রাগিয়ে-রাগিয়ে ব্ৰেকিং পয়েন্টে নিয়ে যাওয়ার একটা আলাদা মজা আছে। আমি অনেকটা সময় নিয়ে সিগারেট ধরালাম।

কায়দা করে ধোঁয়া ছাড়লাম এবং বরফ-শীতল গলায় বললাম, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছ কেন? বল, তুমি কেন যাবে না?…………রিকশা বদলির টাইম হইছে।ও, এই ব্যাপার। আমি ভাবলাম আমাকে বোধহয় তোমার পছন্দ হচ্ছে না, এই জন্যে যেতে চাচ্ছ না। আচ্ছা এখন বল রিকশা বদলির কথাটা তুমি আগে কেন বললে না।কি কইলেন? রিকশা বদলির টাইম হয়েছে এই কথাটা তুমি আগে কেন বললে না। আগে বলতে কি অসুবিধা ছিল? এমুন করতাছেন ক্যান ভাইজান? আমি আপনেরে কী করছি? লোকটির গলা শুনে মনে হল সে এক্ষনি কেটে ফেলবে। এই শ্রেণীর লোকরা ব্ৰেকিং পয়েন্টে এসে রুখে দাঁড়ায়। এর বেলায় অন্যরকম হচ্ছে। এ কেঁদে ফেলতে যাচ্ছে। শহরের খাঁটি রিকশাওয়ালা সে এখনো হয়ে ওঠে নি। হয়তো কিছুদিন আগেও পান্তাভাত খেয়ে সূর্য ওঠার আগে জমি চাষ করতে যেত। এর গায়ে এখনো শস্যের গন্ধ লেগে আছে। আমি রিকশা থেকে নেমে পকেটে হাত দিলাম। তাপ্পি মারা নোট, না তাকে আমি চকচকে নোটই দেব। যা ন্যায্য ভাড়া, তার সঙ্গে বকশিশ হিসেবে দুটি টাকা ধরে দেব।

রিকশাওয়ালা ভাড়া নিল না। পকেট থেকে হাত বের করবার আগেই সে দ্রুত প্যাডেল চাপতে শুরু করল। একবার পিছনে ফিরল না। এ্যাই এ্যাই করে দু বার তাকে আমি ডাকলাম। সে আমাকে পুরোপরি উপেক্ষা করে বিপজ্জনকভাবে একটা বেবি ট্যাক্সিকে ওভারটেক করল। এই রিকশাওয়ালাটা অভিমানী। কে জানে। হয়তো ইতিমধ্যে তার চোখে পানি এসে গেছে।এই রিকশাওয়ালার সঙ্গে নিশ্চয়ই আরো অনেকবার আমার দেখা হবে কিন্তু তাকে চিনতে পারব না। আমরা রিকশাওয়ালার চেহারা কখনো ভালো করে দেখি না। তাদের পেছনটাই দেখি।এক জন রিকশাওয়ালা ভাড়া না নিয়ে চলে গিয়েছে এটা এমন কোন বড় ব্যাপার নয়। অনেক রিকশাওয়ালা আমাকে ঠকিয়েছে। ভাংতি হিসেবে অচল নোট দিয়েছে। জোর করে বেশি আদায় করেছে। এক জন তো দল পাকিয়ে আমাকে মারতে পর্যন্ত এসেছিল। সেইভাবে হিসেব করলে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু হচ্ছে না।

এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে ঢাকা শহরে আমার যাবার কোনো জায়গা নেই। বাবার ইউরিন-ভর্তি শিশি পকেটে নিয়ে আমি ঢাকার রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াব। এই বোধহয় আমার নিয়তি। বাবার পেচ্ছাবের শিশি পকেটে আছে বলেই কি এরকম হচ্ছে? অসম্ভব নয়। সব জিনিসেরই কিছু-না-কিছু আছর আছে। There are many things in heaven and earth….. স্বয়ং শেক্সপিয়ারের কথা। শিশিটা পকেট থেকে ফেলে দিলে কেমন হয়? এটা তো এমন মহামূল্যবান কিছু নয়। কালও জোগাড় করা যেতে পারে। এবং সেটাই বোধহয় ভালো হবে। ফ্রেশ জিনিস নিয়ে ডাক্তারের কাছে পৌঁছে দেব। এমিতেই তো এই বস্তু অনেকক্ষণ পকেটে আছে, বাসি হয়ে যাবার কথা। তবে কে জানে মলমূত্র হয়তো যত বাসি হয় ততই ফ্রেশ হয়।

আমি শিশিটা নর্দমায় ফেলে দিলাম। আশ্চর্য কাণ্ড ফেলে দেবার পরপর মনে হল আমি একটা অন্যায় করেছি। বেচারা বাবা হয়তো অপেক্ষা করে থাকবে।অল্প সময়ের মধ্যেই অপরাধবোেধ আমাকে কাবু করে ফেলল। এর হাত থেকে বাঁচবার একমাত্র উপায় হচ্ছে কোনো-একটা কাজ করা। অন্ধকে হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়া জাতীয় কিছু। কিংবা মার কথামতো নাখালপাড়া চলে যাওয়া। বাবার কাজটি করতে না-পারার অপরাধ মোচন হবে মার কাজটি নিখুঁতভাবে যদি করা যায়।নাখালপাড়া যাওয়াটা কোনো সমস্যা নয়। গুলিস্তানে গেলেই টেম্পো পাওয়া যাবে। চমৎকার জিনিস। আধুনিক ঢাকার যানবাহনের জগতে বিপ্লব। একের মধ্যে কুড়ি। ইদানীং আবার মহিলারা উঠতে শুরু করেছেন। আগে উঠত মাতারিশ্রেণীর মহিলা। ওদের দেশে-দেখে ভরসা পেয়ে আধুনিকারা উঠতে শুরু করেছেন।

এমিতে তাঁদের গায়ের সঙ্গে একটু ছোঁয়া লাগলেই ছাৎ করে ওঠেন। টেম্পোতে অন্য ব্যাপার। গায়ের সঙ্গে গা লেপ্টে থাকে, তবু আধুনিকারা শব্দ করেন না। চোখে চোখ পড়লে বড় বোনসুলত হাসি দেন। মেয়ে যাত্রী যেভাবে বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে মহিলা টেম্পো চালু হবে। এরশাদ সাহেবের মহিলাবিষয়ক কোনো মন্ত্রী এসে শুভ উদ্বোধন করবেন। গলা কাঁপিয়ে একটি ভাষণ দেবেন—এ দেশের নির্যাতিত অবহেলিত নারীজাতির জন্যে আজ একটি ঐতিহাসিক দিন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটির কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মহিলাদের স্বাধিকার অর্জনের একটি ধাপ হচ্ছে এই মহিলা টেম্পো।

আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জনগণের চোখের মণি আলহাজ্জ হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ মহিলাদের জন্যে যা করেছেন, তা অতীতে কেউ করেন নি, ভবিষ্যতেও কেউ করবে না। এই যে কুৎসিত যৌতুক প্রথা……মহিলা বিষয়ক মন্ত্রীর ভাষণ সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে আমি একটি টেম্পোতে উঠে পড়লাম। টেম্পো ছাড়বার সঙ্গে-সঙ্গে রাজনীতি শুরু হয়ে গেল। দেখা গেল প্রাণপ্রিয় নেতার দিন যে শেষ, এই বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। একজন খবর দিল লন্ডনে একটি হোটেল কেনা হয়েছে। নেতা দেশ ছেড়ে দিয়ে সরাসরি হোটেলের ম্যানেজারি শুরু করবেন। সেই হোেটলে উন্নতমানের বাংলাদেশি খাবার সরবরাহ করা হবে।ঘড়িতে বাজছে বারটা দশ। অনু আপার বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে বারটা বেজে যাবে। এটা বেশ ভালোই হল। দুলাভাই নামক প্রাণীটির সঙ্গে দেখা হবে না। তিনি থাকবেন অফিসে। দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা হবে না, এই আনন্দেই টেম্পোযাত্রার কষ্ট সহ্য করা যায়।

আমার দুলাভাই লোকটি অতি ভদ্র। তাঁর আচার-ব্যবহার সবই মোলায়েম। তাঁর সবকিছুই সূক্ষ্ম রুচিবোধ সূক্ষ্ম, বুদ্ধি সূক্ষ্ম, চিন্তা-ভাবনা সূক্ষ্ম এমনকি তার গোঁফ জোড়াটাও সূক্ষ্ম। জোৎস্না দেখবার জন্যে তিনি ছাদে বসে থাকেন। মাসে এক বার গ্রুপ থিয়েটারের নাটক দেখেন। গ্ৰন্থমেলা থেকে কবিতার বই ছাড়া কিছু কেনেন না। বাসায় রবীন্দ্রনাথের বিরাট ছবি। ২৫শে বৈশাখ এবং ২২শে শ্রাবণ এই দুদিন রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মালা দেয়া হয়।দুলাভাইয়ের তুলনায় অনু আপার সব কিছুই স্থূল ধরনের। বুদ্ধি স্থূল। আচারআচরণও সেই রকম। শরীরও মোটা। অবশ্য মোটাটা ইদানীং হয়েছে। আগে ছিল ছিপছিপে ধরনের। বুদ্ধির অভাব অনু আপা রূপ দিয়ে বহুগুণে পুষিয়ে দিয়েছিল।

কাটাকাটা চোখ-মুখ। বইপত্রে কাঁচাহলুদ বর্ণের যে-সব নায়িকাদের কথা থাকে, তাদের সবার চেয়েই অনু আপা সুন্দর। সুন্দরী মেয়েদের বোকা-বোকা কথাও শুনতে ভালো লাগে, এটা বোধহয় সত্যি। অনু আপার মুগ্ধ ভক্ত প্রচুর জুটে গেল। বিরাট যন্ত্রণা! অনু আপা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে গেছে। তাকে নকল সাপ্লাই দেবার জন্যে সঙ্গে গেল এ পাড়ার ছসাত জন ভক্তের একটা জঙ্গীদল। কোন খাতা কার কাছে যাবে, সেই খবরও এক জন নিয়ে এল। এত করেও লাভ হল না। অনু আপা ম্যাট্রিক পাশ করতে পারল না।তাতে অসুবিধা তেমন হল না।

বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে লোকজন আসতেই লাগল। প্রায় বিকেলেই দেখা যেত বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে। সেই গাড়ি থেকে মোটা ধরনের গয়নায় মোড়া মহিলারা বের হচ্ছেন। তাঁদের সবার মুখে তেলতেলে একটা ভাব। বাংলাদেশে রূপবতী মেয়েদের যে আকাল যাচ্ছে, তা এই প্রথম আমরা বুঝলাম। প্রফেসর, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্মি অফিসার। কত রকম ঝোলাঝুলি, ধরাধরি। বিশ্রী ব্যাপার।বাবা খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন। অহঙ্কারী-অহঙ্কারী একটা ভাব চলে এল তাঁর মধ্যে। এ রকম রূপবতী একটি কন্যাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন—অহঙ্কার হবারই কথা। তাঁর কথাবার্তার ধরন পর্যন্ত বদলে গেল। পাত্রপক্ষের লোকজনদের সঙ্গে কথা বলবার সময় তাঁর গলার স্বর কেমন সরু হয়ে যেতে শুরু করল।

আপনাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে ভালো কথা। শুনে সুখী হলাম। আমাদের তো ছেলে পছন্দের একটা ব্যাপার আছে। বংশ দেখতে হবে, আচার-ব্যবহার দেখতে হবে। একটা মেয়েকে জন্মের মতো দিয়ে দেবনা দেখেশুনে দেই কীভাবে? বাবার দেখাশোনা এবং বাছাবাছি চলতেই লাগল। কাউকে পছন্দ হয়, কথাবার্তা প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে আসে তখন বাবা বললেন, উঁহু, বংশে গণ্ডগোল আছে। সব কিছুর রুট হচ্ছে বংশ। ঐ জায়গায় গণ্ডগোল থাকলে সবই গণ্ডগোল।আমরা দিন কাটাচ্ছি আতঙ্কের মধ্যে। গুজব রটে গেছে কে নাকি অ্যাসিডের বোতল নিয়ে ঘুরছে। সুযোগমত অনু আপার মুখে ঢালবে। সুযোগ পাচ্ছে না। অনু আপার বন্দিজীবন কাটছে। ঘর থেকে বেরুনো বন্ধ। জানালার পাশে যাওয়া বন্ধ। বারান্দায় দাঁড়ানো বন্ধ। বেচার শুধু কাঁদে আর হয়তো মনে-মনে ভাবে-একটা বিয়ে হোক, ঝামেলা শেষ হোক।

আমার প্রতিভাবান বাবা অনেক দেখেশুনে যে চিজটিকে বের করলেন, তার নাম ইসমাইল হোসেন। শ্রাবণ মাসে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের সাত দিন পর অনু আপা ফিরাযাত্রায় এল। মা জিজ্ঞেস করলেন, বর কেমন রে? অনু আপা মুখ শুকনো করে বলল, ভালোই। কিন্তু মারধোর করে। মা আকাশ থেকে পড়লেন, মারধোর করে মানে কী সর্বনাশের কথা! মারধোর করবে কেন? জানি না মা বাবা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, বেকুব মেয়ে, কী বুঝতে কী বুঝেছে। গায়ে ধাক্কাটাক্কা লেগেছে বোধহয়।অনু আপা ঠিকই বুঝেছিল।

লোকটা অসুস্থ নির্বিকার মারধোর করে। অথচ কথা বলবার সময় কী মিষ্টি-মিষ্টি কথা! হারামজাদা ছোটলোক।কেমন আছিসরে আপা? অনু আপা বলল, আমি ভালো আছি, তোর কী হয়েছে? এরকম লাগছে কেন তোকে?কী রকম লাগছে? অসুখ অসুখ লাগছে।আমার শরীর ঠিকই আছে। বাবার অবস্থা কাহিল।সে কী! কী হয়েছে? ভয়াবহ কাশি। শতিনেক টাকা থাকলে দে। চলে যাব। সময় নেই।দিচ্ছি, তুই বোস।আমি অনু আপার বসার ঘরে বসে রইলাম। অনু আপা অদৃশ্য। এদের বাড়িটা এজমালি।

তিন ভাই এবং দুববানের মধ্যে ভাগ হয়ে অনু আপাদের ভাগে দুতলার একটা বড় ঘর, একতলার দুখানা ছোট ঘর এবং দুতলার বারান্দার খানিকটা অংশ পড়েছে। দুতলার বড় ঘরটা দুভাগ করে বসার এবং শোবার ঘর করা হয়েছে। বারান্দায় রান্নার ব্যবস্থা। বিয়ের আগে বলা হয়েছিল সমস্ত বাড়িটাই আমার দুলাভাইয়ের। বাবাকে তারা বাড়ি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখিয়েছে। বাবা আবেগ আল্পত কণ্ঠে আমাদের এসে বলেছেন, রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি! বিরাট খানদানী ব্যাপার।

অনুর কপাল ফিরে গেল।এই নে বীরু, খা।অনু আপা প্লেটে করে দুখানা ভাজা ইলিশমাছের ডিম নিয়ে এল।গরম-গরম ভেজেছি, খেয়ে ফে। টপ করে মুখে ফেলে দে।টপ করে ফেলা যাবে না, আগুন-গরম। চামুচ আন, ধীরে সুস্থে খাই।অনু আপা প্লেট নামাবার সঙ্গে-সঙ্গে অন্য হাতে অতি দ্রুত আমার পকেটে টাকা। চালান করে দিল। এর মানে দুলাভাই বাড়িতেই উপস্থিত।দুলাভাই বাসায়? হুঁ। অফিসে যায় নি। বীরু, ময়না ভাই, তুই ওকে রাগিয়ে দিস না।

আরে পাগল, আমি রাগাব কেন?………তুই ইচ্ছা করে ওকে রাগাস, পরে খুব যন্ত্ৰণা করে।যন্ত্ৰণা করলে তুমিও যন্ত্রণা করবে। তোমাকে একটা চড় দিলে তুমি একটা চড। লাগাবে। সে যদি বাঁ পায়ে লাথি বসায় তুমি বসাবে ডান পায়ে। ফ্রিস্টাইল পদ্ধতি।আস্তে কথা বলতো।আমি উঠি আপা, অনেক কাজ।ওর সঙ্গে দেখা না করে চলে যাবি কী যে অদ্ভুত কথাবার্তা তুই বলিস ও রাগ করবে না।

ঠিক আছে, বসছি। পাঠাও দুলাভাইকে। তোমার পুত্র কোথায়।শাশুড়ির কাছে আছে। নিয়ে আসব? কোনো দরকার নেই। শিশু জিনিসটাই আমার অসহ্য।দুলাভাই হাসিমুখে ঢুকলেন। দু-এক দিনের মধ্যে চুল কাটিয়েছেন বলে মনে হল। দেখাচ্ছে অবিকল বানরের মত। যতই দিন যাচ্ছে লোটার চেহারা ততই কুৎসিত হচ্ছে।

রহস্যটা কী, কে জানে।বড় শ্যালক, খবর কি?……..খবর ভালোই।শ্বশুরসাহেবের অসুখ শুনলাম। সিরিয়াস নাকি? না, সিরিয়াস কিছু না। আপনাকে এমন অদ্ভূত লাগছে কেন দুলাভাই? চুল কেটেছেন নাকি? হুঁ। বেশি ছোট করে ফেলেছে। খুব খারাপ লাগছে? লাগছে। বদরের মতো দেখাচ্ছে। দিন সাতেক ঘর থেকে বেরুবেন না। ঘরেই থাকুন। ঘরে বসে কাটলা খান।কথাগুলো মুখ ফসকেই বলে ফেললাম। দুলাভাই সামনে থাকলে আমার নিজের উপর কোনো কন্ট্রোল থাকে না। কঠিন-কঠিন কথা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বলতে থাকি। আজকের ঠাট্টাটা মনে হচ্ছে একটু কড়া হয়ে গেছে।

দুলাভাইয়ের মুখ থমথমে। ভাস্যিস অনু আপা সামনে নেই। থাকলে সে কী করত কে জানে। হয়তো কেঁদে-টেদে ফেলত। তবে দুলাভাই ব্যাপারটা ভালোই হজম করলেন। স্বাভাবিকভাবেই বললেন, অসুখের খবর দেবার জন্যে এসেছ, না অন্য কোনো উদ্দেশ্য? আরেকটা উদ্দেশ্যও আছে। আপনার কাছে কিছু টাকা হবে দুলাভাই? কিছু মানে কত? এই ধরুন হাজার পাঁচ।মাথা খারাপ হয়েছে? দশ-বিশ হলে দিতে পারি।বেশ, তাই না হয় দিন।দুলাভাই বিরস মুখে একটি কুড়ি টাকার নোট বের করলেন। আমি বললাম, উঠি দুলাভাই?……………।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *