রম্য কথা-পর্ব-(১২)-আনিসুল হক

রম্য কথা

 কিন্তু এই সরকার কোনাে বিপ্লবী সরকার নয়। রাজনৈতিক সংগঠন তার পেছনে দাঁড়িয়ে নেই। ‘৭০ সালে সমুদ্র সমান যে জনসমর্থন আওয়ামী লীগের ছিল, ‘৭৪-এ তা শুকিয়ে খাল-পুকুরের তলানিতে ঠেকেছিল। মানুষের আঁতে ঘা লাগলে মুখ ফিরিয়ে নিতে তার দুদণ্ড সময় লাগে না। জিনিসের দাম না কমলে, কাজের সুযােগ 

বাড়লে শুধু সংস্কারবিরােধী দূর্নীতিবাজদের শাস্তি পেতে দেখলে জনগণ বুঝ মানবে । এই দেশের মানুষ খুব সহজেই সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারায়। খুব অল্প সময়ে এই দেশের মানুষের মােহভঙ্গ ঘটে এবং তারা সরকারবিরােধী হয়ে ওঠে । 

সুতরাং জিনিসপাতির দাম কমাতে হবে। মানুষকে কাজের সুযােগ করে দিতে হবে। অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে হবে। কাজের, সৃষ্টির, এগিয়ে যাওয়ার একটা কর্মযজ্ঞ তৈরি হতে হবে। সেটা কী করে সম্ভব? 

কী করে সম্ভব নয়, সেটা আগে বলে নিই। এটা বলার জন্যই আকবর আলি খানের এই প্রবন্ধের প্রসঙ্গ পাড়া। 

তিনি লিখেছেন, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে যখন সামরিক শাসন জারি হয় তখন সামরিক শাসকরা শহরাঞ্চলের নাগরিকদের খুশি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ওই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের শহরগুলিতে একটি বড় সমস্যা ছিল খাঁটি দুধের অভাব। দুধে পানি মেশানাে হতাে। অর্থনৈতিক দিক থেকে দুধে পানি মেশানাের কারণ হলাে এই যে, খাঁটি দুধের দাম দেবার মুরােদ বেশির ভাগ ক্রেতারই নেই। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে দুধের উৎপাদন ছিল সীমিত। দুধের সরবরাহ না বাড়লে দুধের দাম বা দুধে ভেজাল কোনােটিই কমবে না, কাজেই এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমাধান হলাে দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি। এ ধরনের সমাধানে সময় লাগবে, আরও লাগবে অর্থ।

রম্য কথা-পর্ব-(১২)

সামরিক শাসকরা তাই অর্থনৈতিক সমাধান উপেক্ষা করে এর রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করে। সামরিক শাসনের আগে দুধে ভেজাল দিলে বিচারক তার ইচ্ছামতাে নগণ্য জরিমানা করত। সামরিক শাসকরা মনে করল জরিমানা বাড়ালেই ভেজাল দেওয়া কমে যাবে। তাই ১৯৫৯ সালে খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার সর্বনিম্ন জরিমানা ১৫০ টাকাতে নির্ধারণ করা হয়। ১৯৫৯ সালে ১৫০ টাকা আজকের কয়েক হাজার টাকার সমান।

ষাটের দশকে এই আইন প্রয়ােগ করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। এ আইনের অধীনে একটি মফস্বল শহরে প্রায় শ খানেক আসামিকে আমি দেড় শ টাকা হারে জরিমানা করি। এরপর আমি আশা করেছিলাম যে, দুধে পানি মেশানাে কমে যাবে। বাজার থেকে খবর নিয়ে জানা গেল, এসব শাস্তির পর দুধে পানি মেশানাে বেড়ে গেছে। এর কারণ হলাে, আদালত কর্তৃক ভেজালের জন্য উঁচু হারে জরিমানা আরােপের ফলে বাজারে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।

তারা দুধ ব্যবসায়ীদের হুমকি দিতে থাকে যে তাদের ঘুষ না দিলে তারা আদালতে মামলা ঠুকে দেবে এবং আদালতে গেলেই নতুন হাকিম দুধওয়ালাদের জরিমানা করবে। স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের ঘুষ দেওয়ার ক্ষতি পােষানাের জন্য দুধে পানি মেশানাে আরও বেড়ে গেল। বিচারক হিসাবে আমি স্বচক্ষে দেখতে পেলাম যে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে তুলেছি। 

রম্য কথা-পর্ব-(১২)

তাহলে সমস্যার সমাধান কী? 

আমি অর্থনীতিবিদ নই। এই বিষয়ে নিজের কোনাে মত আমি দেব না। আকবর আলি খান সাহেবের মত আমি তুলে ধরছি। অবাস্তব আইন বাতিল করতে হবে। 

সাথে সাথে সরকারের কর্মকর্তাদের ঐচ্ছিক ক্ষমতা হ্রাস করতে হবে। যতদিন পারমিট ও লাইসেন্স থাকবে, ততদিন দুর্নীতিও থাকবে।…কোনাে জিনিসের সরবরাহ কম হলে তার দাম বাড়বে। নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে বাজার যথাযথ মূল্যে যে কোনাে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করবে। বাজারকে অস্বীকার করলে সমস্যার সমাধান হবে , শুধুই দুর্নীতি বাড়বে।’…’দুর্নীতি দূর করতে প্রয়ােজন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। তবু দুর্নীতি নির্মূল করা সহজ হবে না। দীর্ঘস্থায়ী এ প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে সরকারের আয়তন হ্রাস। 

মনে হতে পারে, যেন এই সরকারের কাজকর্ম দেখে লেখক এসব কথা লিখেছেন। সরকারের কর্মকর্তাদের ঐচ্ছিক ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে এখন সীমাহীন অথবা সীমানা-অচিহ্নিত। 

 নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বাজারের আগুনে ঘি ঢালাই হয়। বিডিআরের একটা বাজারে কিছু জিনিস ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করলে সদিচ্ছা প্রকাশিত হয় বটে, বাস্তবে তা মরুভূমিতে এক ফোঁটা পানি ঢালার মতাে। আর যৌথ বাহিনী মধ্যস্বত্বভােগীদের উচ্ছেদ করলে কেবল বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিই লজ্জিত হয়। সমাজে প্রত্যেকেরই অর্থনৈতিক ভূমিকা আছে। ক্ষেতের ফসল কিনে এনে যারা গ্রামের হাটে বিক্রি করে, তারাও একটা ভূমিকা পালন করে, আবার সেখান থেকে যে ফড়েরা জিনিস কিনে গঞ্জের হাটে বেচে, তারও একটা ভূমিকা আছে। তার পেশাও একটা পেশা, তার পেটও পেট। ব্যবসা বাণিজ্য মানেই তাে তাই। 

রম্য কথা-পর্ব-(১২)

সরকার ক্ষমতা নিয়েই অবৈধ হাটবাজার উচ্ছেদ করেছে, গুদামে হানা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা ভীত, তারা এলসি খুলতে ভয় পায়, পাছে তাদের কোনাে ক্ষতি হয়ে যায়। যৌথ বাহিনীর লােকজন স্থানীয় পর্যায়ে বা জাতীয় পর্যায়ে মন্দ্র-মিনিস্টার প্রমুখ যতই ব্যবসায়ীদের ডেকে কম মুনাফা করার জন্য নসিহত করবেন, ততই জিনিসের দাম বাড়বে। 

আকবর আলি খান অর্থনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা যে ব্যর্থ হয় তা দেখিয়েছেন। সেই সুর ধরেই বলা যায়, অর্থনৈতিক সমস্যার কোনাে পুলিশি সমাধানও নেই। 

দরকার অভয়ের পরিবেশ তৈরি করা। দরকার স্বাধীনতা, দরকার বাধামুক্ত পরিবেশ। ড. ইউনূসের ভাষায় বলতে হয়, পথের বাধা সরিয়ে নিন, মানুষকে এগােতে দিন। গণতন্ত্রের ১৫ বছরে এত লুটপাট, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি সত্ত্বেও নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকে দেশ যে এগােতে পেরেছিল, তার একটা কারণ গণতন্ত্র নিজে, সরকারকে পাশ কাটিয়ে মানুষ তার সমস্ত সৃজনশীলতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।

প্রথম আলাের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রতি শনিবারে খবর বেরুত-ভুট্টা চাষ করে লাখপতি। এখন এই খবর দেওয়ার আগে কৃষক ভাববে, কোনাে বিপদে পড়ব না তাে, থানা শহরে গিয়ে দেখা করার সমন আসবে না তাে! 

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষ তার সমস্ত সৃজনশীলতা নিয়ে নির্ভীক চিত্তে, বাধাহীন এগিয়ে যেতে পারবে-এই পরিবেশ তৈরি করা এই সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। 

আর এই চ্যালেঞ্জের ওপর নির্ভর করছে সরকারের জনপ্রিয়তার পারদ। জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই, বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু সরকারের পক্ষে তা কি বলা সম্ভব? 

রম্য কথা-পর্ব-(১২)

২৪ জুলাই ২০০৭ 

পাখিটা মরিল… আজ ২২ শ্রাবণ (এই লেখা যেদিন লিখতে বসেছি)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দিনে মারা গেছেন। প্রয়াণ-মহাপ্রয়াণ বললে কেমন যেন দূর-দর লাগে। রবীন্দ্রনাথ যে মানুষই ছিলেন, খুব বড় মানুষ, একেবারে অতুল রকম বড়, তাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু মানুষই ছিলেন। আর ছিলেন কবি, প্রেমিক। আর ছিলেন আমাদেরই লােক। কাজেই তিনি যখন মারা যান, মরেই গেছেন; সেটাকে প্রয়াণ-ট্রয়াণ না বললেও চলে। তাকে পুজোটুজো না করে তার লেখা পড়লেই বােধ হয় ভদ্রলােকের প্রতি ন্যায়বিচার করা |কবি যে মানুষই ছিলেন, সেটাও তিনি মজা করে লিখে গেছেন কবি’ কবিতায় 

কাব্য পড়ে যেমন ভাব। কবি তেমন নয় গাে । আঁধার করে রাখে নি মুখ, দিবারাত্র ভাঙছে না বুক, গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব হাস্যমুখেই বয় গাে। ভালােবাসে ভদ্রসভায় ভদ্রপােশাক পরতে অঙ্গে, ভালােবাসে ফুল মুখে কইতে কথা লােকের সঙ্গে। 

সামনে যখন অন্ন থাকে থাকে না সে অন্যমনে, সঙ্গীদলের সাড়া পেলে রয় না বসে ঘরের কোণে। 

কাব্য যেমন কবি যেন তেমন নাহি হয় গাে। বুদ্ধি যেন একটু থাকে, স্নানাহারের নিয়ম রাখে, সহজ লােকের মতােই যেন সরল গদ্য কয় গাে। 

আজকে তাহলে রবীন্দ্রনাথই পড়ি। তােতাকাহিনীর গল্পটা কি শােনাব? একটু সংক্ষিপ্তভাবে? খানিকটা নিজের ভাষায়, খানিকটা ‘গুরুদেবের। 

এক যে ছিল পাখি। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত কায়দাকানুন কাকে বলে। 

রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তাে কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লােকসান ঘটায়। 

মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’ 

শিক্ষা দেওয়ার ভার পড়ল রাজার ভাগ্নেদের ওপর। পণ্ডিতেরা বললেন, খড়কুটোর বাসায় থাকে ওরা, সেখানে বেশি বিদ্যা ধরে না। কাজেই ভালাে করে খাঁচা বানিয়ে দেওয়া দরকার। পণ্ডিতেরা দক্ষিণা পেয়ে খুশি হয়ে বাড়ি ফিরলেন। আজকের দিনেও যেমন ফেরেন আর কি! 

রম্য কথা-পর্ব-(১২)

বড় খাঁচা বানানাে হলাে সােনা দিয়ে। বড় বড় বই অর্ডার দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হলাে নগদ টাকার বিনিময়ে। বলদ বােঝাই করে লিপিকার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। তাদের অর্থকষ্ট রইল না। 

খাচার দেখভাল ঘষামাজার জন্যও অনেক লােক লাগল। তাদের পেছনেও কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচ করা হলাে। তারা আর তাদের মামাতাে-ফুপাতাে ভাইয়েরা সবারই কপাল ফিরল। 

তবু লােকজন, আজকের দিনে সংবাদপত্র যেমনটা করে আর কি, নিন্দা করতে লাগল-পাখিটার শিক্ষা হচ্ছে না মােটেও। 

রাজা পরিদর্শনে এলেন। চারদিকে বিপুল বাদ্যবাজনা। তার মধ্যে পাখির মুখে বই ছিড়ে ছিড়ে পােরা হচ্ছে। রাজা বললেন, শব্দ তাে কম নয়। ভাগ্নে বলল, পেছনে অর্থও কম নাই। 

দেখেশুনে রাজা খুশি। বললেন, নিন্দুকদের (আজকের দিনে সংবাদপত্রের) কান মলে দাও । 

পাখিটা সােনার খাচা ঠোটে কেটে পালাতে চাইল তবু । তখন আরও আরও টাকা খরচ করে বানানাে হলাে লােহার শেকল। 

রাজার সম্বন্ধীরা বলতে লাগলেন, এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই । 

পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, আরেক হাতে সড়কি নিয়ে এমন কাণ্ড করতে লাগলেন, যাকে বলে শিক্ষা। 

কামারের পসার বাড়ল, তার গিন্নির গায়ে উঠল সােনার গয়না। আর কোতােয়াল? রাজা তার হুঁশিয়ারি দেখে তাকে দিলেন শিরােপা। 

কিন্তু ‘পাখিটা মরিল। 

কোনকালে কখন, কেউ ঠাওর করতে পারেনি। নিন্দুকেরা (সংবাদপত্রই হবে) বলল, পাখি মরেছে। রাজা বললেন, ভাগ্নে এ কী কথা শুনি। ভাগ্নে বলল, মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হয়েছে। রাজা শুধাইলেন, “ও কি আর লাফায়? ভাগ্নে কহিল, “আরে রাম!” ‘আর কি ওড়ে? 

না। ‘আর কি গান গায়? 

না। রাজা বলিলেন, ‘পাখিটাকে আনাে দেখি। 

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতােয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘােড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, করিল না। কেবল তাহার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনাে পাতা খসখস্ গজগজ করিতে লাগিল। 

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণ হাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল । 

৭ আগস্ট ২০০৭

 

Read more

রম্য কথা-পর্ব-(শেষ)-আনিসুল হক

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *