বিজ্ঞানের উপরও কিছু প্রশ্ন থাকবে। যুগটাই বিজ্ঞানের। সেই বিজ্ঞানের উপর প্রশ্ন না থাকলে হবে কীভাবে?
পেনিসিলিন কে আবিষ্কার করেন ? ফাউন্টেন পেন এবং বল পয়েন্টের মধ্যে তফাৎ কী ? লুই পাস্তুর কোন দেশের নাগরিক? কিছু থাকবে পলিটিক্যাল প্রশ্ন। কোন্ড ওয়ার কী ? তৃতীয় বিশ্ব মানে কী ? ইটালীর প্রেসিডেন্টের নাম কী ? বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘােষণা কে দিয়েছিলেন?
এটা একটা ট্রিকি প্রশ্ন। বাের্ডের চেয়ারম্যান আওয়ামীপন্থী না বিএনপি পন্থী তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আওয়ামীপন্থী হলে সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলতে হবে— জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বিএনপি-পন্থী হলে বলতে হবে মেজর জিয়া। | বাের্ডে একজন ডাক্তারও নিশ্চয়ই থাকবেন। ডাক্তার পেট টিপেটুপে দেখবেন ‘মাল’ ঠিক আছে কি–না। পেট কেটে দেখতে চাইলেও অনেকে হয়ত আপত্তি করবে না। কাস্টমার জিনিস কিনবে না দেখে কেন কিনবে? দেখে শুনে কিনবে। সাইজ পছন্দ করবে, রঙ পছন্দ করবে।
করে দেবার জন্যে মনু মিয়ার ঠাণ্ডা পানি বিষয়ক অপরাধ প্রায় ক্ষমা করে দিল।
অতি বিস্ময়কর ব্যাপার হল মােবারক দেখল ইন্টারেস্টেড পার্টিতে ঘর ভর্তি না। সে একা। যে ঘরে তাকে বসানাে হয়েছে সেই ঘরও হলঘর না। ছােট ঘর। তবে বসার ঘর। সােফা আছে, মেঝেতে কার্পেট আছে, দেয়ালে পেইনটিং আছে। বড়লােকদের বসার ঘর একটা থাকে না। কয়েকটা থাকে। তাদের কাছে নানান ধরনের লােক আসে। সবাইকে এক জায়গায় বসানাে হয়
অবস্থা বুঝে বসার ব্যবস্থা হয়।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২
ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে মােবারকের কথা হয়েছে। টেলিফোনে তাকে যেমন গম্ভীর এবং রাগী মনে হয়েছিল বাস্তবে তাকে মিনমিনেটাইপ মনে হল। চেহারা, চলাফেরা এবং কথাবার্তায় লজ্জিত ভঙ্গি। একটু তােতলামী আছে। মনে হয় টেলিফোন হাতে পেলে উনি বদলে যান। বন্দুক হাতে পেলে মানুষ যেমন বদলে যায়, উনিও বােধহয় টেলিফোন হাতে পেলে বদলান। ম্যানেজার সাহেবের নাম জগলু। নাম বগলু হলে ভাল হত। লম্বা বলে তার মধ্যে বগা বগা ভাব আছে। জগলু সাহেবের সঙ্গে মােবারকের কিছু কথা হল।
আপনি মােবারক সাহেব । জ্বি স্যার। আপনি কী করেন । কিছু করি না।
একেবারেই কিছু করেন না তা কী করে হয় ? আগে কী করতেন? শিক্ষকতা করতাম।
কথাটা পুরােপুরি ভুল না। এনজিও-ওয়ালাদের এক স্কুলে মােবারক সর্বমােট এগারাে দিন পড়িয়েছে। বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র। গােটা বিশেক থুড়থুড়াে বুড়ো–বুড়ি বই–খাতা নিয়ে বসা। তাদেরকে কিছুক্ষণ স্বরে অ, স্বরে আ
নাে। বুড়ােবুড়িরা যে শিক্ষার মহান আলােয় আলােকিত হতে এসেছে তা ওনা। চুলে ভর্তি হওয়ার সুবাদে তাদের নাম রেজিস্ট্রি হয়েছে। সবাই একটা করে হাতা পেয়েছে। ছাতায় এনজিও’র নাম। ছাতা ছাড়া মাঝে মধ্যে টুকটাক উপহারের ব্যবস্থা আছে। অক্ষরজ্ঞান শেষ হলে সবাই শাড়ি লুঙ্গি পাবে এরকম গুজব শােনা যাচ্ছে। এগারাে দিন পড়ানাের পর মােবারক ঈ‘ পর্যন্ত আগালে। কিন্তু দেখা গেল ছাত্রছাত্রীরা শুরুর স্বরে ‘অ’ ভুলে গেছে। মােবারক এগারাে দিনের দিন এনজিও–ওয়ালাদের তিনটা ছাতা নিয়ে সড়ে পড়লাে।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২
মেস থেকে বেরুবার মুখে মনু মিয়ার সঙ্গে দেখা। কোকের বােতল ভর্তি গরম চা নিয়ে কোনাে বাের্ডারের ঘরে যাচ্ছে। হারামজাদার সাহস কত বড় তার দিকে তাকিয়ে দাত বের করে আছে। মনে হয় হাসছে। হারামজাদাটাকে লাথি দিয়ে কোকের বােতলসহ মেঝেতে ফেলে দেয়া উচিত। মােবারক তা করল না। শুভ কাজে যাচ্ছে, এ সময় মারামারি করা ঠিক না। গলা নামিয়ে বলল, সামনের দরজা দিয়া যাইয়েন না। বাবু আছে।
বাবু মানে পরিমল সাহা। মেসের মালিকের শালা। এবং মেসের ম্যানেজার। মােবারকের ছয়মাসের মেস ভাড়া বাকি। পরিমল বাবু তাকে দেখলে বাঘের মত ঝাপ দিয়ে পড়বেন। এই সুযােগ তাকে দেয়া ঠিক হবে । মােবারক পেছন দরজা দিয়ে বের হল এবং তাকে যথা সময়ে সাবধান।
কাজেই সে শিক্ষকতা করেছে এটা বলা ভুল হয় নি। যে একদিন পড়িয়েছে সে শিক্ষক। সারা জীবনই শিক্ষক। আবার যে একদিন চুরি করেছে সে কিন্তু সারাজীবনই চোর না। তাহলে পৃথিবীর সব মানুষই চোর হত ।
আপনি তাহলে শিক্ষকতা করতেন? জি স্যার। এখন কিছু করেন না ? করলে কি কিডনী বিক্রি করতে আসতাম?
তা ঠিক। আপনি বসুন। চা-টা খান। স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। সামান্য দেরি হবে।
কিডনী কার জন্যে দরকার ?
স্যারের জন্যে। উনার দু’টা কিডনী নন ফাংশানাল হয়ে গেছে। ডায়ালাইসিস করে করে এতদিন চলেছে, এখন ডাক্তাররা কিডনী ট্রান্সপ্লান্টের কথা বলছেন। আত্মীয়-স্বজনরা অনেকেই ডােনেট করতে রাজি। কিন্তু স্যার তা চান না।
মােবারক হাসি মুখে বলল, আমরা থাকতে আত্মীয়-স্বজনরা কেন কষ্ট করবে। আমরা আছি কী জন্যে ?
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২
ম্যানেজার সাহেব কিছুক্ষণ সরু চোখে তাকিয়ে থেকে আগের মত মিনমিনে গলায় বললেন, আপনি অপেক্ষা করুন। আমি যথাসময়ে ডেকে নিয়ে যাব।
মােবারক বিনীত গলায় বলল, জ্বি আচ্ছা স্যার। একটা কথা শুধু জিজ্ঞেস করি, এই ঘরে কি সিগারেট খাওয়া যায় ?
হা খাওয়া যায়। ঐ যে এসট্রে। স্যার অনেক ধন্যবাদ।
মােবারক সিগারেট ধরালাে। বড় সাহেবের কাছে যাবার আগে হাত-মুখ ধুতে হবে। মুখ কুলকুচা করতে হবে। অসুস্থ মানুষরা দূর থেকে সিগারেটের গন্ধ পায়। তাদের মেজাজ খারাপ হয়। বড় সাহেবের মেজাজ খারাপ করা একেবারেই ঠিক হবে না।
মােবারক যে চেয়ারে বসেছে তার দু‘টা চেয়ারের পরের চেয়ারেই সুন্দর একটা উলের চাদর পড়ে আছে। চাদরের ওপর মারলবােররা সিগারেটের একটা প্যাকেট। মনে হছে তার মত কেউ একজন এখানে বসেছিল। সে-ও
কিডনী বেচতে এসেছে। বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছে। তবে যে এমন দামি চাদর গায়ে দেয় এবং মারলবােররা সিগারেট খায় সে কিডনী বেচবে কেন ? তার উচিত দু’একটা কিডনী কিনে ফ্রীজে রেখে দেয়া। প্রয়ােজনে ব্যবহার করবে। প্রয়ােজন না হলে কালােবাজারে বেচে দেবে।
ব্যস্ত ভঙ্গিতে এক দ্রলােক ঢুকলেন। রাজপুত্র রাজপুত্র চেহারা। হাতে তলােয়ারের বদলে লম্বা স্কেল। কমপ্লিট স্যুট পরা। গলায় লাল টাই! জুতাজোড়াও সম্ভবত নতুন– হাঁটলেই মুড়ি খাওয়ার মত মচমচ শব্দ হচ্ছে । ভদ্রলােক ঘরে ঢুকেই মােবারককে বললেন, আচ্ছা আনিস সাহেব কি চলে গেছেন।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২
মােবারক বিনীত ভঙ্গিতে বলল, জ্বি স্যার চলে গেলেন।
যদিও আনিস সাহেব কে মােবারক কিছুই জানে না। এ বাড়ির একজনকেই সে চেনে। ম্যানেজার জগলু।
কখন গেছেন বলতে পারেন ।
এগজাক্ট টাইম বলতে পারব না। দশ এগারাে মিনিট হবে। কমও হতে পারে।
আনিস সাহেবের সঙ্গে কি কোনাে ফাইলপত্র ছিল ? স্যার আমি লক্ষ করিনি। আপনার অবশ্য লক্ষ করার কথাও না। থ্যাংকস এনিওয়ে।
ভদ্রলােক যেমন ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঢুকেছিলেন তারচেয়েও ব্যস্ততার সঙ্গে চলে গেলেন। মিথ্যা কথাগুলি বলার জন্যে মােবারক তেমন দুশ্চিন্তা করছে না। এই নিয়ে পরে যদি প্রশ্ন করা হয় সে বলবে, সে আসলে বুঝতে পারে নি। সে ভেবেছে ভদ্রলােক ম্যানেজার সাহেবের কথা জানতে চেয়েছেন। ম্যানেজার জগলু সাহেব এই ঘরে কিছুক্ষণ ছিলেন, তারপর চলে গেছেন। এই অংশতাে মিথ্যা না। পুরােপুরি সত্যি কথা বলা ঠিক না। সােনার মধ্যে যেমন খাদ মিশাতে হয়। সত্যি কথার মধ্যেও সামান্য মিথ্যা মিশাতে হয়।
মােবারক চেয়ার বদলে পাশের চেয়ারে গেল। এই চেয়ার থেকে হাত বাড়িয়ে মারলবােরাের প্যাকেটটা নেয়া যায়। প্যাকেট খুলে দেখা যেতে পারে মােট কটা সিগারেট আছে। প্যাকেট ভর্তি থাকলে কিছু করার নেই। আধাআধি থাকলে একটা সিগারেট খাওয়া যেতে পারে। সিগারেটের মালিক যদি চলেও আসে তাকে বলা যাবে, ভাই একটা সিগারেট নিয়েছি। কিছু মনে করবেন না।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২
তেরটা সিগারেট আছে। মােবারক একটা সিগারেট ধরালাে। ম্যানেজার চায়ের কথা বলে গিয়েছিলেন। সেই চা এখনাে আসে নি। বিদেশী সিগারেট চায়ের সঙ্গে খেতে পারলে আরাম হত। উপায় কী? মােবারক হাত বাড়িয়ে উলের শালটা পরীক্ষা করল। হাত দিলেই বােঝা যায় দামি জিনিস। এক চাদরে মাঘ মাসের শীত পার করে দেয়া যাবে। শালের নিচে গেঞ্জি বা শার্ট কিছু না থাকলেও সমস্যা হবে না। শালের মালিককে পেলে জিজ্ঞেস করা যেত শালটার দাম কত।
মােবারক সাহেব।
ম্যানেজার জগলু এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। এই মিনমিনে লােক হাঁটেও বিড়ালের মত। টেলিফোনে হাঁটার ব্যবস্থা থাকলে বুট পরে ধপ ধপ শব্দ করে হাঁটতাে।
আসুন স্যারের সঙ্গে কথা বলবেন।
মােবারক ভেবেছিল স্যার এক বিরাট পালংকে শুয়ে আছেন। তাকে ঘিরে সেবা করার লােকজন। পাশের টেবিল ভর্তি ফলমুল। দু’জন নার্স এবং একজন ডাক্তার একটু দূরে শুকনাে মুখে হাঁটাহাঁটি করছে। স্যার ঠিকমত নিঃশ্বাসও নিতে পারছেন না। কাতলা মাছ পুকুর থেকে তােলার পর যেভাবে থেমে থেমে দম নেয় সেভাবে দম নিচ্ছেন। এই সময়ে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী কপালে ভেজা রুমাল ঘসে দিচ্ছেন।
দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি। অফিস ঘরের মত ঘর। স্যার বসে আছেন চেয়ারে। তার সামনে প্রচুর ফাইলপত্র। তিনি ফাইলপত্রে সিগনেচার করছেন। তার ঠোটে জ্বলন্ত সিগারেট। তিনি সিগারেট হাতে নিয়ে টানছেন না। ঠোটে রেখেই টানছেন। ঠোটে রেখেই অদ্ভুত কায়দায়, একটু মাথা ঝুঁকিয়ে ছাই ফেলছেন। কায়দাটা ইন্টারেস্টিং। শিখে রাখতে হবে। তাহলে সিগারেট খাবার সময় দু’টা হাত খালি রাখা যায়। স্যারের গায়ে সিল্কের শার্ট। সুন্দর মেরুন রঙ। তবে তিনি লুঙ্গি পরে আছেন। প্রিয়তমা পত্নীর মুখ বিষাদময়।
Read more