রাহেলা জবাব দিলেন না। ইয়াজউদ্দিন সাহেব শান্ত গলায় বললেন, আমি টুনে একজন লােক রেখেছি। সে সবসময় শুভ্রের উপর লক্ষ রাখবে। তােমাকে এই খবরটা জানাতে চাচ্ছিলাম না।
কিন্তু প্রেশার–শাের বেড়ে তােমার যা অবস্থা হয়েছে, আমার মনে হল জানানাে উচিত। | ইয়াজউদ্দিন সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। স্ত্রীর হাত ধরে তাকে নিচে নামালেন। রাহেলা বললেন, মজিদ বলছিল, সুন্দর একটা মেয়ে নাকি শুভ্রের হাত ধরে তাকে তুলে নিয়ে তুলছে।
“ভালই তো। সমস্যার সময়ে বন্ধুর মতাে কাউকে কাছে পাচ্ছে। ‘আমার কেন জানি খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু ঘটবে। ‘ভয়ংকর কিছুটা কী হবে বলে মনে করছ ? ‘ওরা সমুদে নামবে, তারপর চোরাবালিতে আটকে যাবে। ‘ও তো একা যাচ্ছে না। ওর অটি–’জন বন্ধু আছে। একজন চোরাবালিতে
আটকালে অন্যরা টেনে তুলবে।
‘বিপদের সময় কাউকে কাছে পাওয়া যায় না। ‘ঐ মেয়েটিকে পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা। ‘কোন মেয়ে?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১০
ইয়াজউদ্দিন সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, সুন্দরমত মেয়েটি। যে শুভ্রের হাত ধরে তাকে ট্রেনে তুলে নিল। তুমি এখনাে এত অস্থির হয়ে আছি কেন? যাও, নিচে গিয়ে খাবার গরম করতে বল। আমি চিটাগাং টেলিফোন করছি।
‘ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে আমিও কথা বলব। ‘তােমার কথা বলার কোনাে প্রয়ােজন দেখছি না। যা বলার আমি গুছিয়ে বলব।
চশমাটা আছে ওর হ্যান্ডব্যাগের ডান দিকের পকেটে। ডিসপােসেবল রেজার, শেভিং ক্রীম, সাবান, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ সব আছে বাঁ দিকের পকেটে।
‘আমি বলে দেব।” | রাহেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললেন, শুভ্রের জন্যে আমার এই যে ভীতি, তােমার কাছে তা কি অস্বাভাবিক মনে হয়?
ইয়াজউদ্দিন সাহেব বললেন, না। অন্য সবার কাছে মনে হবে তুমি বাড়াবাড়ি করছ। কিন্তু আমার কাছে মনে হবে, না। কারণ অন্যরা জানে না, কিন্তু আমরা। জানি, শুভ্রের চোখের নার্ভ শুকিয়ে আসছে। অতি দ্রুত তার চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।। সে কিছুই দেখবে না।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১০
রাহেলা থমথমে গলায় বললেন, বারবার তুমি এই কথা মনে করিয়ে দাও কেন?
তােমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার জন্যেই করি। বড় ধরনের ক্যালামিটির জন্যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার। মানসিক প্রস্তুতি থাকে না বলেই আমরা কোনাে বিপদের মুখােমুখি দাঁড়াতে পারি না।
‘তুমি পার ? “হ্যা, আমি পারি।
রাহেলার মাথা ঘুরে উঠল। তিনি ক্ষীণ স্বরে বললেন, আমার কেমন জানি লাগছে।
ইয়াজউদ্দিন রাহেলার হাত ধরে ফেললেন। ঠাণ্ডা হাত। সেই হাত থরথর করে কাঁপছে।
রাত বাজে দু‘টার মতাে।
কথা ছিল সারা রাত সবাই জেগে থাকবে। হৈচৈ করতে করতে যাবে। মনে হচ্ছে সবার উৎসাহে ভাটা পড়েছে। বন্দু গোড়া থেকেই মনমরা ছিল। তার মনমরা ভাব রাত একটার দিকে কাটল। সে মােতালেবের কাছ থেকে ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে ফুল ভলমে ক্যাসেট চালু করল। বন্যার রবীন্দ্রসংগীত। তবে ক্যাসেটে দোষ আছে। মনে হচ্ছে বন্যার গলায় ল্যারিনজাইটিস। ভাঙা গলায় গান, –
সখী বয়ে গেল বেলা
শুধু হাসি খেলা আর কি ভাল লাগে? চশমাপরা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলােক হঠাৎ পেছন থেকে উঠে এসে কঠিন গলায় বললেন, আপনি কি গান বন্ধ করবেন ?
বল্ট বলল, কেন বন্ধ করব?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১০
‘বন্ধ করবেন, কারণ, রাত দুটা বাজে। এখন গানের সময় না। এখন ঘুমুবার সময়।
‘আপনার জন্যে ঘুমুবার সময়। আপনি কোলবালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমাদের এখন জেগে থাকার সময়।
চশমাওয়ালা লােক সমর্থনের আশায় চারদিকে তাকাচ্ছে। কাজেই সমর্থন পাবার আগেই বন্দুকে সাপাের্ট দেবার জন্যে মােতালেব বলল, গানের পরেপরেই আছে নৃত্যানুষ্ঠান। আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ। আমাদের দলে কয়েকজন নৃত্যশিল্পী আছেন। নইমা, নাচের জন্যে তৈরি হও।
নইমার জন্যে অত্যন্ত অপমানসূচক কথা। তার বিশাল শরীরের দিকে লক্ষ্য করেই তাকে নৃত্যশিল্পী বলা হচ্ছে। অতিবড় বােকাও এটা বুঝবে। নইমার পাশে নীবা বসেছিল। সে খিলখিল করে হাসতে শুরু করেছে, যেন এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রসিকতাটা সে এইমাত্র শুনল।
চশমাপরা ভদ্রলােক বললেন, আপনারা আমাদের সারা রাত বিরক্ত করবেন, তা তাে হয় না।
Read more