তার পাশের সীটের ভদ্রলােককে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দুটা সীট দখল করে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়েছে। দূর থেকে দেখলেই বােঝা যায় সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অথচ কথা ছিল সারা রাত কেউ ঘুমুবে না।
জরীর মনে হল – শেষটায় দেখা যাবে শুধু সেই জেগে আছে, আর সবাই ঘুমে। কামরায় গাড়িভরা ঘুম, রজনী নিঝুম।
রাত কত হয়েছে? জরীর হাতে ঘড়ি ছিল। এখন ঘড়ি নেই। কোথাও খুলে–টুলে পড়ে গেছে। ভালই হয়েছে। ঘড়িটা ঐ মানুষের দেয়া। দামি ঘড়ি। লােকটা কৃপণ না। সে তার স্ত্রীকে দামি–দামি জিনিসপত্র দিয়েই সাজিয়েছে। পরনের শাড়িটাও দামি। কত দাম জরী জানে না। লােকটার বােন এই শাড়ি তাকে পরাতে পরাতে বলেছিল, বেস্ট কোয়ালিটি, বালুচরি কাতান। | সেই বেস্ট কোয়ালিটি বালুচরি কাতান ভিজে এখন গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। জরীর এখন নিজেকে অশুচি লাগছে। মনে হচ্ছে, ঐ লােকটা যেন তাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
একজন সাধারণ মেয়ের জীবনেও কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। জরী কি নিজেই ভেবেছিল সে এমন একটা কাণ্ড করতে পারবে? বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসবে?
যদি পালাতে না পারত তা হলে কী হত? তা হলে এই রাতটা হত তাদের বাসররাত। লােকটা তার শরীর নিয়ে কিছুক্ষণ ছানাছানি করে সিগারেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। আর সে সারা রাত জেগে বৃষ্টি দেখত। আচ্ছা, ঢাকায় কি এখন বৃষ্টি হচ্ছে?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১২
ঐ লােকটা কী করছে? ঘুমুতে নিশ্চয়ই পারছে না। কিংবা কে জানে মদ–ফদ খেয়ে হয়তাে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। তবে সেই ঘুম নিশ্চয়ই সুখের ঘুম না। নিশ্চয়ই ঘুমের মধ্যে তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। | শুভ্র লক্ষ করল, ভেজা শাড়ির এক অংশ চাদরের মতাে গায়ে জড়িয়ে জরী হনহন করে যাচ্ছে। তার একবার ইচ্ছা হল জরীকে ডাকে। কিন্তু জরীর হাঁটার মধ্যে এমন এক আত্মমগ্ন ভঙ্গি যে, মনে হয় ডাকলেও সে থামবে না। একটা স্যুটকেসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জরীর পড়ে যার মতাে হল। সে নিজেকে সামলে। নিয়ে হাসল। কার দিকে তাকিয়ে হাসল?
শুভ্রর হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। আজ এক রাতের মধ্যে অনেকগুলি সিগারেট খাওয়া হয়েছে। বমি–বমি লাগছে, বুক জ্বালা করছে এবং মাথা কেমন হালকা লাগছে।। এই হালকা বােধ হওয়াটাই কি সিগারেটের নেশা? গাজা খেলে লজ্জা বাড়ে, ভাং–এর সরবত খেলে কী হয় এখনাে জানা হয়নি।
‘স্যার, একটু শুনবেন ? শুভ্র চমকে উঠে বলল, আমাকে বলছেন? “জ্বি, আপনাকেই বলছি।
অপরিচিত একজন মানুষ। লম্বা, রােগা। মাথায় চুলের বংশও নেই। পরনে সাফারি। মেয়েলি গলার স্বর। চোখে সােনালি ফ্রেমের চশমা। এই লােককে আগে কখনো দেখেছে বলে শুভ্র মনে করতে পারল না।
‘আমি কি আপনাকে চিনি ? “জ্বি না স্যার। ‘আপনি আমাকে চেনেন ? ‘জ্বি স্যার, চিনি। আপনার বাবা ইয়াজউদ্দিন সাহেব আমাকে পাঠিয়েছেন। ‘বুঝতে পারছি না। তিনি আপনাকে হঠাৎ করে কীভাবে পাঠাবেন ? ‘আপনার দেখাশােনা করার জন্যে আমি ঢাকা থেকেই গাড়িতে উঠেছি।
শুভ্র শুকনাে গলায় বলল, ও আচ্ছা। তা হলে আপনি ঠিকমতই দেখাশােনা করে যাচ্ছেন? বাবাকে খবর পাঠাচ্ছেন কীভাবে, ওয়্যারলেসে?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১২
“স্যার, আপনি শুধু শুধু আমার উপর রাগ করছেন।
‘আমি আপনার উপর রাগ করছি না, রাগ করছি বাবার উপর। আমি কল্পনাও করিনি বাবা একজন স্পাই পাঠাবেন।।
‘স্যার, আপনি ভুল করছেন। আমি স্পাই না, আপনার যাতে কোনাে অসুবিধা হয় সেজন্যই আমি যাচ্ছি। আমাকে বলা হয়েছে, বড় রকমের কোনাে সমস্যায় পড়লেই শুধু আপনাকে আমার পরিচয় দিতে।
শুভ্র মন খারাপ করা গলায় বলল, আমি কি বড় রকমের কোনাে সমস্যায় পড়েছি ?
‘জি স্যার, পড়েছেন। ‘আমি তাে কোনাে সমস্যা দেখছি না। ‘আপনার ঘুমের অসুবিধা হচ্ছে।”
‘আমার ঘুমের অসুবিধা একটা বড় ধরনের সমস্যা। আপনি আমার ঘুমের ব্যবস্থা করেছেন?
‘জ্বি। তিনটা এয়ার কন্ডিশন্ড কোচ আপনার নামে রিজার্ভ করা আছে। খালি যাচ্ছে। আপনারা ঘুমাতে পারেন।
‘আমি তার কোনাে প্রয়ােজন দেখছি না। | ‘সারা রাত জেগে থেকে পরদিন জার্নি করলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন স্যার। অপনার শরীর তাে ভাল না।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১২
‘যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি আপনি নিশ্চয়ই ডাক্তারের ব্যবস্থাও করে ফেলবেন। কাজেই আমি কোনাে সমস্যা দেখছি না।
‘আপনি স্যার শুধু শুধু আমার উপর রাগ করছেন। আমি হুকুমের চাকর। | ‘আমি আপনার উপর রাগ করছি না। তবে আবার যদি কখনাে আপনাকে আমার পেছনে ঘুরঘুর করতে দেখি তা হলে রাগ করব। খুব রাগ করব।
Read more