রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১২)

তার পাশের সীটের ভদ্রলােককে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দুটা সীট দখল করে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়েছেদূর থেকে দেখলেই বােঝা যায় সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্নঅথচ কথা ছিল সারা রাত কেউ ঘুমুবে না

রূপালী দ্বীপজরীর মনে হল শেষটায় দেখা যাবে শুধু সেই জেগে আছে, আর সবাই ঘুমেকামরায় গাড়িভরা ঘুম, রজনী নিঝুম। 

রাত কত হয়েছে? জরীর হাতে ঘড়ি ছিলএখন ঘড়ি নেইকোথাও খুলেটুলে পড়ে গেছেভালই হয়েছেঘড়িটা মানুষের দেয়াদামি ঘড়িলােকটা কৃপণ নাসে তার স্ত্রীকে দামিদামি জিনিসপত্র দিয়েই সাজিয়েছেপরনের শাড়িটাও দামিকত দাম জরী জানে নালােকটার বােন এই শাড়ি তাকে পরাতে পরাতে বলেছিল, বেস্ট কোয়ালিটি, বালুচরি কাতান| সেই বেস্ট কোয়ালিটি বালুচরি কাতান ভিজে এখন গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছেজরীর এখন নিজেকে অশুচি লাগছেমনে হচ্ছে, লােকটা যেন তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। 

একজন সাধারণ মেয়ের জীবনেও কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটেজরী কি নিজেই ভেবেছিল সে এমন একটা কাণ্ড করতে পারবে? বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসবে

যদি পালাতে না পারত তা হলে কী হত? তা হলে এই রাতটা হত তাদের বাসররাত। লােকটা তার শরীর নিয়ে কিছুক্ষণ ছানাছানি করে সিগারেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তআর সে সারা রাত জেগে বৃষ্টি দেখতআচ্ছা, ঢাকায় কি এখন বৃষ্টি হচ্ছে

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১২

লােকটা কী করছে? ঘুমুতে নিশ্চয়ই পারছে নাকিংবা কে জানে মদফদ খেয়ে হয়তাে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছেতবে সেই ঘুম নিশ্চয়ই সুখের ঘুম নানিশ্চয়ই ঘুমের মধ্যে তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে| শুভ্র লক্ষ করল, ভেজা শাড়ির এক অংশ চাদরের মতাে গায়ে জড়িয়ে জরী হনহন করে যাচ্ছেতার একবার ইচ্ছা হল জরীকে ডাকেকিন্তু জরীর হাঁটার মধ্যে এমন এক আত্মমগ্ন ভঙ্গি যে, মনে হয় ডাকলেও সে থামবে নাএকটা স্যুটকেসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জরীর পড়ে যার মতাে হলসে নিজেকে সামলেনিয়ে হাসলকার দিকে তাকিয়ে হাসল

শুভ্রর হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেটআজ এক রাতের মধ্যে অনেকগুলি সিগারেট খাওয়া হয়েছেবমিবমি লাগছে, বুক জ্বালা করছে এবং মাথা কেমন হালকা লাগছেএই হালকা বােধ হওয়াটাই কি সিগারেটের নেশা? গাজা খেলে লজ্জা বাড়ে, ভাংএর সরবত খেলে কী হয় এখনাে জানা হয়নি। 

স্যার, একটু শুনবেন ? শুভ্র চমকে উঠে বলল, আমাকে বলছেন? জ্বি, আপনাকেই বলছি। 

অপরিচিত একজন মানুষলম্বা, রােগামাথায় চুলের বংশও নেইপরনে সাফারিমেয়েলি গলার স্বরচোখে সােনালি ফ্রেমের চশমাএই লােককে আগে কখনো দেখেছে বলে শুভ্র মনে করতে পারল না। 

আমি কি আপনাকে চিনি ? জ্বি না স্যারআপনি আমাকে চেনেন ? জ্বি স্যার, চিনিআপনার বাবা ইয়াজউদ্দিন সাহেব আমাকে পাঠিয়েছেনবুঝতে পারছি নাতিনি আপনাকে হঠাৎ করে কীভাবে পাঠাবেন ? আপনার দেখাশােনা করার জন্যে আমি ঢাকা থেকেই গাড়িতে উঠেছি। 

শুভ্র শুকনাে গলায় বলল, আচ্ছাতা হলে আপনি ঠিকমতই দেখাশােনা করে যাচ্ছেন? বাবাকে খবর পাঠাচ্ছেন কীভাবে, ওয়্যারলেসে

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১২

স্যার, আপনি শুধু শুধু আমার উপর রাগ করছেন। 

আমি আপনার উপর রাগ করছি না, রাগ করছি বাবার উপরআমি কল্পনাও করিনি বাবা একজন স্পাই পাঠাবেন। 

স্যার, আপনি ভুল করছেনআমি স্পাই না, আপনার যাতে কোনাে অসুবিধা হয় সেজন্যই আমি যাচ্ছিআমাকে বলা হয়েছে, বড় রকমের কোনাে সমস্যায় পড়লেই শুধু আপনাকে আমার পরিচয় দিতে। 

শুভ্র মন খারাপ করা গলায় বলল, আমি কি বড় রকমের কোনাে সমস্যায় পড়েছি

জি স্যার, পড়েছেনআমি তাে কোনাে সমস্যা দেখছি নাআপনার ঘুমের অসুবিধা হচ্ছে” 

আমার ঘুমের অসুবিধা একটা বড় ধরনের সমস্যাআপনি আমার ঘুমের ব্যবস্থা করেছেন

জ্বিতিনটা এয়ার কন্ডিশন্ড কোচ আপনার নামে রিজার্ভ করা আছেখালি যাচ্ছেআপনারা ঘুমাতে পারেন। 

আমি তার কোনাে প্রয়ােজন দেখছি না| সারা রাত জেগে থেকে পরদিন জার্নি করলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন স্যারঅপনার শরীর তাে ভাল না। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১২

যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি আপনি নিশ্চয়ই ডাক্তারের ব্যবস্থাও করে ফেলবেনকাজেই আমি কোনাে সমস্যা দেখছি না। 

আপনি স্যার শুধু শুধু আমার উপর রাগ করছেনআমি হুকুমের চাকর| আমি আপনার উপর রাগ করছি নাতবে আবার যদি কখনাে আপনাকে আমার পেছনে ঘুরঘুর করতে দেখি তা হলে রাগ করবখুব রাগ করব

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *