লীলাবতী পর্ব – ০৬ হুমায়ূন আহমেদ

লীলাবতী

লীলা শহরবাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল। মাঝপথ থেকে ফিরে এলো। অবাক হয়ে মূল বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল। শূন্য বাড়ি লোকজনে ভরতি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কোনো একটা ঘটনা ঘটেছে। সবার চোখে-মুখে সংশয়। বাড়ির খুঁটি ধরে তরুণী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটিকে দেখেই মনে হচ্ছে সে খুব ভয় পাচ্ছে। লীলাকে ঢুকতে দেখে মেয়েটি চোখ তুলে লীলার দিকে তাকাল। লীলা সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে বলল, বাহ, সুন্দর তো মেয়েটি!

সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ির উঠানে বিচারসভা বসেছে। লোকমান কিছুক্ষণ আগে কুদ্দুস মিয়া এবং তার মেয়ে পরীবানুকে নিয়ে এসেছে। সিদ্দিকুর রহমানের বড় ছেলে মাসুদ তাদের সঙ্গে এসেছে। আশপাশের কৌতূহলী কিছু লোকজন চলে এসেছে। মসজিদের ইমাম সাহেব এসেছেন। ফুটফুটে দুটি মেয়ের একটিকে দেখা যাচ্ছে। সে খুঁটির আড়ালে দাঁড়িয়ে। এই মেয়েটির মনে হয় লজ্জা বেশি।

সিদ্দিকুর রহমান তাঁর আগের জায়গাতেই আছেন। ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাকে সামান্য বিরক্ত মনে হচ্ছে। লীলা তার বাবার পাশে দাঁড়াল। সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন— যাও, ভেতরে যাও। এইখানে দাড়ানোর দরকার নাই।লীলা দাঁড়িয়েই রইল, নড়ল না।

সিদ্দিকুর রহমান হাত-ইশারায় মাসুদকে ডাকলেন। মাসুদ সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো। ভয়ে তার শরীর কাঁপছে। ফর্স মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে তার বাবার দিকে তাকাচ্ছে না। সে তাকাচ্ছে লীলার দিকে। এই মেয়েটিকে সে চিনতে পারছে না। অপরিচিত একটি তরুণী মেয়ের সামনে তাকে কী শাস্তি দেয়া হবে কে জানে!, তার চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছা করছে। কাঁদতে পারছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। লীলা ছেলেটাকে চেনে না, আগে কখনো দেখে নি।

তারপরেও সে স্পষ্ট বুঝল, এই ছেলেটা সম্পর্কে তার ভাই। তাদের দুজনের মা ভিন্ন হলেও তারা ভাইবোন। ছেলেটার ভীতমুখ দেখে লীলার মায়া লাগছে। বেচারা এত ভয় পাচ্ছে কেন? ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধ কি সে করেছে? নিতান্তই বালক চেহারার একজন ভয়ঙ্কর কী করতে পারে? এর বয়স কত হতে পারে ষোল সতেরো না-কি আঠারো? সিদ্দিকুর রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি নাকি ইদানিং গান-বাজনা শিখছ?

এই প্রশ্ন করতে করতে তিনি আধশোয়া অবস্থা থেকে বসা অবস্থায় চলে এলেন। তার গলার আওয়াজ শান্ত। যেন তিনি তার ছেলের সঙ্গে গল্পগুজব করছেন। পড়াশোনার খবর যেভাবে নিতে হয় সেভাবেই গান-বাজনার খবর নিচ্ছেন।কথার জবাব দাও না কেন? গান-বাজনা নাকি শিখছ? জি।গান দু’একটা শিখেছ? জি না।তাহলে কি বাদ্য-বাজনায় আছ? জি।কী শিখছ? তবলা? ছেলেপুলে বখাটে হয়ে গেলে প্রথম শিখে তবলা। তবলা শিখেছ? জি।কতটুকু শিখেছি?

মাসুদ জবাব দিল না। সিদ্দিকুর রহমান লোকমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, দৌড় দিয়া যাও, কুদ্দুসের বাড়ি থেকে তবলা আর বাঁয়া নিয়ে আসো। আমার পুত্ৰ তবলা কেমন শিখেছে তার পরীক্ষা হবে। এত কষ্ট করে একটা বিদ্যা শিখেছে। দেখি সেই বিদ্যার কী অবস্থা! লীলার হাসি পাচ্ছে। শুরুতে তার বাবার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল— ভয়ঙ্কর কোনো বিচার হবে। এখন সে-রকম মনে হচ্ছে না।

মনে হচ্ছে পুরো বিচার ব্যবস্থার মধ্যে হালকা মজা আছে। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, একজন আবার সত্যি সত্যি দৌড়ে তবলা আনতে গেছে। সবচে ভালো হয় ছেলেটা যদি চমৎকার তবলা বাজিয়ে সবাইকে হতভম্ব করে দেয়। সেটা মনে হয় বেচারা পারবে না। কারণ সে থারথার করে কাঁপছে। এত ভয় পাচ্ছে কেন? লীলার ইচ্ছা করছে ছেলেটাকে সে বলে— এত ভয় পােচ্ছ কেন? উনি তোমার সঙ্গে মজা করছেন। তোমাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করার চেষ্টা করছেন। হাসি-তামাশা গায়ে না। মাখলেই হয়।সিদ্দিকুর রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় ডাকলেন, মাসুদ! মাসুদ ক্ষীণস্বরে বলল, জি?

তবলা এমন কঠিন বিদ্যা যে এটা শেখার জন্যে মানুষের বাড়িতে রাত কাটাতে হয় এটা জানতাম না। তুমি কি সারারাত তবলা বাজাও, নাকি তবলা শেখার পাশে পাশে কুদ্দুসের মেয়েটার সাথে তবলা বিষয়ে কথা বলে? কুদ্দুসের মেয়ে যেহেতু গান-বাজনার মধ্যে আছে সেও নিশ্চয়ই তবলা বিষয়ে জানে। এই মেয়ে, তুমি জানো না? পরীবানু কিছু বলল না। খুঁটির আড়ালে চলে গেল।তোমার নাম কী?

পরীবানু জবাব দিল না। পরীবানুর বাবা কুদ্দুস ভীত গলায় বলল, জনাব, আমার মেয়ের নাম পরীবানু।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মেয়ে যেমন সুন্দর, নামও সুন্দর। এই মাসুদ, পরীবানু সুন্দর মেয়ে না? মাসুদ পুরোপুরি পাংশুবৰ্ণ হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর কিছু যে আসছে। সে বুঝতে পারছে। কতটা ভয়ঙ্কর সে-সম্পর্কে তার ধারণা নেই।

সিদ্দিকুর রহমান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, মাসুদ যাও, পরীবানুর পায়ে কদমবুসি করে বলো— তুমি আমার মা। এটা বলতে দোষের কিছু নাই। মেয়েছেলে মায়ের জাত। বয়সে ছোট মেয়েকেও মা ডাকা যায়। যাও, দেরি করবা না। দেরি আমার ভালো লাগে না। পরীবানু এখন থেকে তোমার মা।

লীলার কাছে মনে হচ্ছে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা এখন আর হাসিতামাশা রসিকতার পর্যায়ে নেই। বাড়াবাড়ি ভালো জিনিস না। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাসুদ পরীবানুর কাছে এসে বসে পড়ল। হাত দিয়ে পা স্পর্শ করল না, তবে মুখ বিড়বিড় করে বলল, আপনি আমার মা।পরীবানু কাঁদছে। কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে না, তবে শরীর কাপা দেখে বোঝা যাচ্ছে।

সিদ্দিকুর রহমান বললেন, শাস্তি সামান্য বাকি আছে। আমার এই ছেলে লজার মাথা খেয়েছে। তার এখন লাজলজা নাই। যে-মেয়ের সঙ্গে ভাব ভালোবাসার চেষ্টা করেছে তারেই মা ডাকতেছে। সুলেমান, এখন আমার বেহায়া ছেলেরে কানো ধরে সারা গ্রামে একটা চক্কর দেবার ব্যবস্থা করো। ন্যাংটা করে চক্কর দেয়াবে। গায়ে যেন একটা সুতাও না থাকে। লজ্জা যখন নষ্ট হয়েছে পুরোপুরি নষ্ট হোক। দেরি করবা না, এরে ন্যাংটা করো। এইখানেই করো।

মেয়েরা উপস্থিত আছে তাতে কোনো অসুবিধা নাই। মেয়েদের মধ্যে একজন এখন সম্পর্কে তার মা হয়, মার সামনে পুত্র নগ্ন হতে পারে। এতে লজ্জা নাই।লীলা অবাক হয়ে দেখল, সত্যি সত্যি সুলেমান নামের লোকটা মাসুদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যে-ভঙ্গিতে এগোচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে নগ্ন করার কাজটা সে করবে। লীলা সুলেমানের দিকে এক পা এগিয়ে কঠিন গলায় বলল, সুলেমান শুনুন, খবরদার! যথেষ্ট হয়েছে।

সুলেমান থমকে দাঁড়াল। হতভম্ব হয়ে তাকাল। একবার লীলার দিকে আরেকবার সিদ্দিক সাহেবের দিকে। সিদ্দিক সাহেব এখন সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করছেন। বাতাসের কারণে সিগারেট ধরানো যাচ্ছে না। দেয়াশলাই বারবার নিভে যাচ্ছে। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে আশেপাশে কী ঘটছে না-ঘটছে তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।

মাসুদ মেঝেতে বসেছিল। লীলা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। লীলা হাত বাড়িয়ে বলল, আসো আমার সঙ্গে। মাসুদ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। লীলা হাত ধরে তাকে নিয়ে বাগানের দিকে রওনা হলো। মাসুদ এখন কাঁদতে শুরু করেছে। শব্দ করেই কাঁদছে।সিদ্দিক সাহেবের সিগারেট শেষ পর্যন্ত ধরেছে। তিনি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন– এ আমার বড় মেয়ে।

আমার বড় মেয়ের কথার উপরে আর কোনো কথা নাই। আজ থেকে তার কথাই খাবাড়ির শেষ কথা। তোমরা ভিড় করে থাকবে না। যাও, যে যার কাজে যাও।অতি দ্রুত লোকজন সরে গেল। সিদ্দিকুর রহমান আবারো ইজিচেয়ারে শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করে বললেন— সুলেমান, আমার বড় মেয়েকে কেমন দেখিলা? বাপকা বেটি না?

জি, বাপকা বেটি।মাসুদরে আমি ন্যাংটা করে শাস্তি দিতাম না। এই শাস্তি দেয়া যায় না। তারপরেও এরকম একটা শাস্তির কথা কেন বললাম জানো? জি না।আমার বড় মেয়ে কী করে সেটা দেখার জন্যে। যেরকম করবে ভেবেছিলাম সে-রকম করেছে। মাশাল্লাহ! মেয়েটা হয়েছে অবিকল তার মার মতো। যেরকম চেহারা, সেরকম স্বভাবচরিত্র।সিদ্দিকুর রহমানের চোখে দ্বিতীয়বার পানি এসেছে। তার বড় ভালো লাগছে।সুলেমান! জি? আবার জিজ্ঞেস করতেছি, ভেবেচিন্তে বলো। এই মেয়ে বাপকা বেটি না?

জি, বাপকা বেটি।একটা মজার কথা বলি শোনো— আমার দাদাজান একবার সন্ধ্যাকালে করলেন কী, লম্বা একটা বাঁশের মাথায় একটা হারিকেন ঝুলায়ে বাশটা বাড়ির উঠানে পুতে দিলেন। সবাই জিজ্ঞেস করল, ব্যাপার কী? দাদাজান বললেন, একটা ঘটনায় আমার মনে খুব আনন্দ হয়েছে। এইজন্যে কাজটা করলাম। সবাই জানতে চাইল, ঘটনা কী?

দাদাজান বললেন— ঘটনা। কী আমি বলব না। আমার মনের আনন্দটা সবাই দ্যাখা। আনন্দের পেছনে ঘটনা জানার দরকার নাই। দাদাজানের মতো আজ আমার মনেও আনন্দ হয়েছে। বাশের আগায় একটা হারিকেন আজকেও ঝুলাও।সুলেমান বলল, জি আচ্ছা।কেউ যদি জানতে চায় ঘটনা কী— কিছু বলব না। সব ঘটনা সবার জানার দরকার নাই। সকখঘটনা শুধু আল্লাহপাকই জানবেন। আর কেউ না।

জি আচ্ছা।রাতে বড়খানার ব্যবস্থা করো। মাংস রান্নার জন্যে ফজলুরে খবর দিয়া আনো।জি আচ্ছা। পশ্চিমের পুকুরে জাল ফেলব? হুঁ, ফেলো। জাল টানার সময় আমার মেয়েরে নিয়া যাবে। সে দেখে মজা পেতে পারে।জি আচ্ছা।আজি দুপুরে আমি কিছু খাব না। উপবাসে যাব। রাতে বড় মেয়ের সাথে খানা খাব।জি আচ্ছা। উনার থাকার ব্যবস্থা কোনখানে করব?

লীলা থাকবে পুরনো বাড়িতে। শহরবাড়িতে না। আমার ঘরের উত্তরের ঘরটা তারে দেও। ঘরের তালা খুলার ব্যবস্থা করো।জি আচ্ছা।রাত আটটা বাজে।এশার নামাজ শেষ করে সিদ্দিকুর রহমান পুরনো বাড়ির বারান্দায় চাদর গায়ে বসে আছেন। তার বসার জন্যে উঠানে পাটি পাতা হয়েছে। পাটির উপর সতরঞ্জি বিছানো। বাড়ির উঠানে মাংসের বিখ্যাত কারিগর ফজলু মিয়া মাটির বড় হাঁড়িতে খাসির মাংস বসিয়েছে।

শুধুমাত্র পিয়াজের রসে মাংস দমে সিদ্ধ করা হচ্ছে। কাজটা জটিল। আগুনের আঁচ বেশি হতে পারবে না। আবার কমও হতে পারবে না। হাঁড়ির মুখের ঢাকনা আটা দিয়ে আটকানো। ফজলুর দৃষ্টি আটার দিকে— ফুটো হয়ে বাষ্প বের হয়ে যাচ্ছে কি-না।মাছ রান্না হচ্ছে ভেতর বাড়িতে। পশ্চিম পুকুর থেকে ছটা বড় মাছ ধরা হয়েছে। একটা কাতল, ওজন আঠারো সের। আরেকটা নানিদ মাছের ওজন সাত সের। এত বড় আকৃতির নানিদ মাছ।

সচরাচর পাওয়া যায় না। লীলার ভাগ্যে এত বড় নানিদ ধরা পড়েছে। এটা একটা সৌভাগ্যের লক্ষণ। কারো নাম করে পুকুরে জাল ফেললে কী মাছ ধরা পড়ে তা দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা হয়ে যায়। একবার ময়মনসিংহের ডিসি সাহেব এসেছিলেন, তার নামে জাল ফেলার পর কয়েকটা গজার মাছ ছাড়া কিছু উঠে নি।ভেতরবাড়ি থেকে লীলা বের হয়েছে। সে উঠানে নেমে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল বাঁশবাগানের দিকে। বাঁশবাগানে লণ্ঠন ঝুলানো হয়েছে। সে লণ্ঠন থেকে চোখ নামিয়ে তাকাল বাবার দিকে।

সিদ্দিকুর রহমান জানতেন তাঁর মেয়ে এই কাজ করবে। চোখে যেন চোখ না পড়ে সে-জন্যেই তিনি আগে থেকেই অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন। তবে মেয়ে কী করছে না করছে তা তিনি লক্ষ রাখছেন। মানুষ অন্যদিকে তাকিয়েও আশেপাশের কিছু দৃশ্য দেখতে পারে। লীলা ফজলু মিয়ার কাছে গেল। ফজলু মিয়া ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। এখন আবার লীলা তাকাচ্ছে বাঁশবনের দিকে। লণ্ঠনের ব্যাপারটা মনে হয়।

মেয়ের মাথা থেকে যাচ্ছে না। মেয়ে এখন এগিয়ে আসছে তার দিকে। এখন মেয়ের দিকে তাকানো উচিত। লীলা বলল, বসি আপনার পাশে? সিদ্দিকুর রহমান হাতের ইশারায় লীলার বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। এই মেয়ে কত সহজেই না তার সঙ্গে কথা বলছে! সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তোমার থাকার ঘর পছন্দ হয়েছে?

লীলা কিছু বলল না। ঘর তার পছন্দ হয় নি। অন্ধকার ঘর, ছোট জানালা। বিশাল ঘরের প্রায় পুরোটা জুড়েই গাবদা এক খাট। শহরবাড়ি নামের বাংলোর ঘরগুলি অনেক সুন্দর। সেখানে থাকতে পারলে হতো। কিন্তু তাকে বলা হয়েছে এই ঘরে থাকতে।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তুমি যে ঘরে থাকবে সেই ঘরে তোমার মা থাকতেন।লীলা বিস্মিত হয়ে বলল, সত্যি?

হ্যাঁ। তোমার মা চলে যাবার পর আমি এই ঘর তালাবন্ধ করে দেই। আজ তোমার জন্যে তালা খোলা হয়েছে।এই গাবদা খাট মার পছন্দ ছিল? হুঁ। এই খাটের একটা নাম আছে— ময়ূরখাট। আমার দাদা খান বাহাদুর হামিদুর রহমান সাহেব তার স্ত্রীর জন্যে বানিয়েছিলেন। তবে তিনি এই খাট কখনো ব্যবহার করেন নাই।কেন করেন নাই?

সেটা জানি না। মানুষ সব জানতে চায়। কিন্তু জানতে পারে না। আমরা অল্পই জানি। কিন্তু ভাব করি অনেক জানি।লীলা বাবার কথায় সামান্য চমকালো। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তুমি এখন নিজের কথা বলো। তোমার বিষয়ে জানতে ইচ্ছা করছে। কী জানতে চান? পড়াশোনা কতদূর করেছ? বিএ অনার্স পরীক্ষা দিয়েছি। সামনের মাসে রেজাল্ট হবে।বলে কি! পরীক্ষা কেমন হয়েছে? ভালো হয়েছে।পড়াশোনা কোথায় করেছ?

ঢাকায়। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছি ইডেন কলেজ থেকে। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটি।তুমি পড়াশোনায় কেমন? ভালো। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ছেলেমেয়ে সবার মধ্যে থার্ড হয়েছিলাম।সিদ্দিক সাহেব তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে আনন্দের চেয়েও যেটা বেশি তার নাম বিস্ময়।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, হঠাৎ যে আমাকে দেখতে আসছ— এর পিছনে কি কোনো কারণ আছে?

কোনো কারণ নাই।সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন, সামান্য যে পশু সেও কারণ ছাড়া কিছু করে না। মানুষ তো কখনোই করে না। তবে সব কারণ মানুষ নিজে জানে না। অন্য একজন জানে।অন্য একজনটা কে? আল্লাহপাক। মা, তুমি কি নামাজ পড়ো? মাঝে মাঝে পড়ি।কোরআন মজিদ পড়তে পারো? পারি।

তোমার নাম যে লীলাবতী রাখা হয়েছে, কেন রাখা হয়েছে সেই কারণ কি জানো?জানি না, আমি শুধু জানি মা সবাইকে বলে রেখেছিল তাঁর যদি মেয়ে হয় তার নাম যেন লীলাবতী রাখা হয়।ছেলে হলে কী নাম রাখা হবে বলে নাই? না। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি— বাঁশগাছের মাথায় হারিকেন ঝুলছে কেন?

সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আমার মনে খুব আনন্দ হয়েছে এটা জানানোর জন্যে বাঁশগাছের আগায় হারিকেন। আনন্দ পেলে মানুষ তার আনন্দের খবর সবাইকে জানাতে চেষ্টা করে। মানুষ দুঃখ পেলে কিংবা কষ্ট পেলে তার খবর কিন্তু জানাতে চায় না। গোপন করে রাখে। মানুষ ছাড়া অন্যসব পশুপ্রাণীজগতের নিয়ম কিন্তু ভিন্ন। পশু বা পক্ষীজগতের নিয়ম হলো, দুঃখ-কষ্ট চিৎকার চেঁচামেচি করে সবাইকে জানাও। আনন্দের খবর গোপন রাখো।

লীলা হেসে ফেলল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মা, তুমি হাসো কেন? আপনার কথা শুনে হাসি।আমার কথা শুনে কেন হাসলে? লীলা বলল, কী জন্যে হেসেছি তার কারণ আমি জানি না। অন্য একজন হয়তো জানেন। কিন্তু তিনি তো কিছু বলেন না।সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। লীলা তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। কেউ চোখের পাতা ফেলছে না। মনে হয়। একজন অন্যজনকে বোঝার চেষ্টা করছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *