শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ০২ হুমায়ূন আহমেদ

শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ০২

হাঁটা দেখে বুঝছি। দেখ না কেমন থেমে থেমে আসছে। মতলব ভাল হলে থেমে থেমে আসত না।আজকাল তুই ডিটেকটিভ গল্প-উপন্যাস বেশি পড়ছিস। ডিটেকটিভ বই বেশি পড়লে আশেপাশের সবাইকে চোর বা ডাকাত মনে হয়। ভূতের বই বেশি পড়লে প্রতিটি অন্ধকার কোণে একটা করে ভূত আছে বলে মনে হয়।লোকটা আমাদের দেখতে পেয়েছে আপা।

স্টেশন ঘরে হারিকেনের আলো আছে। দেখতে না পাওয়ার কোন কারণ নেই।দেখ আপা, লোকটা আগের বিড়ি ফেলে দিয়ে নতুন করে বিড়ি ধরিয়েছে। বলেছিলাম না–দুষ্টলোক।দুষ্টলোক-টোক না, চেইন স্মোকার। এ কেহ দিন বাঁচবে না।বাঁচবে না কেন? চেইন স্মোকাররা বেশি দিন বাঁচে না। ওদের আর্টারিতে চর্বি জমে আর্টারি সরু হয়ে যায়। তারপর হয় হার্ট এ্যাটাক…। আর্টারি কি জানিস তো?

জানি। রক্তবাহী শিরা।ভয়ে নীতুর বুক কাঁপছে, কারণ লোকটার মুখ এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। টিকিট ঘরের ফুটো দিয়ে সে তাকাচ্ছে। লোকটার ঠোঁটে গোঁফ নেই। সে আসলে ভুল দেখেছে। বিশ্রী গোলাকার একটা মুখ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে লম্বা চুল। লোকটা সর্দি-বসা গলায় বলল, মাস্টার সাহেব কই? নীতু বলল, মাস্টার সাহেব কোথায় আমরা জানি না। আপনি কে? আপনারা কে?

আমরা কে তা দিয়ে আপনার কোন দরকার নেই।যাবেন কোথায়? তা দিয়েও আপনার দরকার নেই।আমার নাম মতি। মাস্টার সাব আমারে চিনে।উনি চিনলে উনার সংগে কথা বলবেন, এখন দয়া করে আমাদের বিরক্ত করবেন না।নীতুর টকটক করে কথা বলা শুনে শাহানা মনে মনে হাসছে। ভয়ে এই মেয়ে মরে যাচ্ছে অথচ কেমন কথা শুনাচ্ছে। নীতুর কথায় লোকটি হকচকিয়ে গেছে–বোঝাই যাচ্ছে। সে কথা বন্ধ করলেও সরে গেল না। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

নীতু বলল, জানালার সামনে বাতাস বন্ধ করে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। সরে দাঁড়ান। আমাদের অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে।লোকটা তৎক্ষণাৎ সরে দাঁড়াল। তবে তাকিয়ে রইল শাহানার দিকে।নীতু ফিস ফিস করে বলল, আপা দেখ, লোকটা আরেকটা বিড়ি ধরিয়েছে। আপা দেখ, কি ভাবে সে তোমাকে দেখছে। চোখে পলক ফেলছে না।রূপবতী একজন তরুণী গ্রামের স্টেশন ঘরে বসে আছে। তাকে তো অবাক হয়ে দেখারই কথা।

আপা সে এখন যাচ্ছে।গুড।বদমাশ সঙ্গী-সাথীদের খবর দিয়ে আনবে না তো? দেখো আপা, কি বিশ্রীভাবে লোকটা যাচ্ছে।লোকটা সাধারণ মানুষের মতই যাচ্ছে–তুই ভয়ে আধমরা হয়ে আছিস বলে সাধারণ হাঁটাই তোর কাছে ভয়ংকর হাঁটা বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া ভাললোকের হাঁটা এবং মন্দলোকের হাঁটাতে কোন বেশ-কম নই। ভাল-মন্দ মানুষের মনে, হাঁটায় নয়।

কি লম্বা চুল দেখ না। লম্বা চুলের মানুষ ভাল হয় না।রবীন্দ্রনাথেরও লম্বা চুল ছিল। উনি কি মন্দ? তুমি সবসময় স্কুল টিচারের মত কথা বল–আমার ভাল লাগে না আপা। যাদের জ্ঞান কম তারাই সব সময় জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলে।জ্ঞানীরা কথা বলে না? না, ভরা কলসির শব্দ হয় না।জ্ঞানী যদি কোন কথাই না বলে তাহলে আমরা বুঝব কি করে সে জ্ঞানী? তার যে জ্ঞান আছে–সেটা বুঝানোর জন্যে তো তাকে কথা বলতে হবে।

ভরা কলসির শব্দ হয় না–এটাও তো তুই ঠিক বললি না। ভরা কলসিরও শব্দ হয়, তবে অন্য। রকম শব্দ। বুঝতে পারছিস? পারছি। তুমি নিজেকে কি মনে কর আপা? ভরা কলসি? শাহানা জবাব দিল না। হাসল। নীতুকে রাগিয়ে দিয়ে সে এখন খুব মজা পাচ্ছে। খুব রেগে গেলে নীতু হাত-পা ছুঁড়ে কাদতে শুরু করে, সেই দৃশ্য খুব মজার। নীতুর চোখ-মুখ যেমন দেখাচ্ছে মনে হয় হাত-পা ছুঁড়ে কান্না শুরুর বেশি বাকি নেই।

আপা! হুঁ।লোকটা কিন্তু চলে যায়নি–ঐ দেখ দাঁড়িয়ে আছে।থাকুক দাঁড়িয়ে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ভেতর যাবে কি ভাবে? ভয় লাগছে তো আপা।গুন গুন করে গান গায় গান গাইলে ভয় কাটে।সব সময় ঠাট্টা কর কেন? আচ্ছা আর ঠাট্টা করব না।আপা, লোকটা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার কি বিশ্রী চেষ্টা করছিল লক্ষ করেছ? না। আমি তোর মত ডিটেকটিভের চোখে সব লক্ষ্য করি না।আপা, কোন লোকের কথা শুনে কি বলা যায় সে কি করে তার পড়াশোনা কতদূর?

না, বলা যায় না। আমাদের মেডিক্যাল কলেজে সার্জারির একজন প্রফেসর ছিলেন–খাস নেত্রকোনার গ্রাম্য ভাষায় কথা বলো মুখ ভর্তি করে পান খান। পানের কস গড়িয়ে গড়িয়ে তার শার্টে পড়ে।ছিঃ! তুই ছিঃ বললে হবে কি, উনি পৃথিবীর সেরা সার্জনদের একজন। চোখ বেঁধে দিলেও তিনি নিখুঁত অপারেশন করতে পারেন।তিনি কি চোখ বেঁধে কখনও অপারেশন করেছেন?

না।আপা, দেখ ঐ লোকটা নাক ঝাড়ছে।নাকে সর্দি জমেছে নাক ঝাড়ছে–এটা তো নীতু দেখার মত দৃশ্য না।আমার গা ঘিন ঘিন করছে আপা।তুই ঐ লোকটার দিকে তাকাবি না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাক।নীতু অন্যদিকে তাকাল না। লোকটির দিকেই তাকিয়ে রইল। তার গা আসলেই ঘিন ঘিন করছে। নানান কারণেই করছে। পা ধোয়া হলেও তার ধারণা পা থেকে গোবরের গন্ধ পুরোপুরি যায়নি। বাড়িতে পৌঁছেই সাবান মেখে গোসল করতে হবে।

পা আলাদা করে স্যাভলন দিয়ে ধুতে হবে। কে জানে দাদার বাড়িতে স্যাভলন আছে। কি-না। সঙ্গে করে স্যাভলনের একটা বড় বোতল নিয়ে আসা দরকার ছিল।আপা! হুঁ।দাদাজানের বাড়িতে কি স্যাভলন আছে? নীতু! তুই মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করিস। হঠাৎ করে স্যালনের কথা এল কেন? তাছাড়া দাদাজানের বাড়িতে স্যাভলন আছে কিনা আমি জানব কি ভাবে?

লোকটা আরেকটা বিড়ি খাচ্ছে আপা। এখন চলে যাচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যে নেমে গেল–ওর তো বিড়ি ভিজে নিভে যাবে।নিভে গেলে আবার ধরাবে। পকেটে নিশ্চয়ই দেয়াশলাই আছে।দেয়াশলাইও তো ভিজে যাবে।প্লীজ নীতু, তুই আর একটা কথাও বলবি না। তোর কথা শুনে এখন আমার মাথা ধরে যাচ্ছে।আপা লোকটা কিন্তু ভয়ংকর। ওর চোখের মধ্যে খুনী খুনী ভাব।চুপ নীতু, আর একটা কথা না।

নীতুর পর্যবেক্ষণশক্তি এবং অনুমানশক্তি দুই-ই বেশ ভাল। তবে মতির ক্ষেত্রে তার এই ক্ষমতা কাজ করেনি। মতি ভয়ংকরদের কেউ না, অতি সাধারণদের একজন। সুখানপুকুরে তার একটা গানের দল আছে। সে গানের দলের অধিকারী। লম্বা চুলের এই হল ইতিহাস। গানের দলের অধিকারীর কদমছাঁট চুলে মানায় না। মাথায় উকুন হলেও চুল লম্বা করতে হয়। নীতুর কাছে মতির চেহারা কুৎসিত এবং ভয়ংকর মনে হলেও–তার চেহারা ভাল।

লম্বা চুলে তাকে ঋষি ঋষি মনে হয়। সে কথাবার্তাও ঋষির মত বলার চেষ্টা করে। মতি লম্বা রোগা একজন মানুষ। টকটকে ফর্সা রঙ তবে এখন রোদে পুড়ে তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে।মতি স্টেশন মাস্টারের খোঁজ করছিল, কারণ মাস্টার সাহেব তার কাছে সতেরো টাকা পান। অনেকদিন থেকেই পান। মতি টাকাটা দিতে পারছে না। টাকা দিতে পারছে না বলেই পাওনাদারকে এড়িয়ে চলবে, মতি সেই মানুষ না।

ঠাকরোকোনা স্টেশনের আশেপাশে কোথাও এলেই সে স্টেশন মাস্টারের খোঁজ করে যায়। সতেরো টাকার কথা তার মনে আছে, এই সংবাদ এক ফাঁকে দেয়। টাকাপয়সার কারণে মানুষে মানুষে সম্পর্ক নষ্ট হয়। তার ক্ষেত্রে এটা সে হতে দিতে রাজি না।স্টেশনঘরে মেয়ে দুটিকে দেখে মতির বিস্ময়ের সীমা রইল না। আকাশের পরীরাও এত সুন্দর হয় না। পরী সুন্দর হয় এটা অবশ্য কথার কথা। পরীরা মোটেই সুন্দর হয় না। মতি নিজে পরী দেখেনি, তবে মতির ওস্তাদ শেলবরস খা পরী দেখেছেন।

শেষ বয়সে একটা পরীকে তিনি নিকাহ করেছিলেন। মাঝরাতে মাঝরাতে সেই পরী আসত। শেলবরস তাঁর সঙ্গে রং-ঢং করে শেষরাতে চলে যেত। শেলবরস খাঁ নিজের মুখে বলেছেন–পরী দেখতে সুন্দর না। এরার মুখ ছোট ছোট। ইঁদুরের দাতের মত ধারালো দাঁত। গায়ে মাছের গন্ধের মত গন্ধ! আর এরা বড় ত্যক্ত করে।মতি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে জগলুর চায়ের স্টলে গিয়ে বসল।

জগলু বিরক্ত চোখে তাকাল। মতির মনটা খারাপ হয়ে গেল–কাস্টমার এসেছে, কোথায় খাতিরযত্ন করে বসাবে তা না, এমন ভাব করছে যেন… মতি বলল, জগলু ভাই আছেন কেমন, ভাল? জগলু হাই তুলল। জবাব দিল না।দেখি চা দেন। বাদলা যেমন নামছে চা ছাড়া গতি নাই।জগলু নিঃশব্দে গ্লাসে লিকার ঢালছে। তার মুখের বিরক্তি আরো বেড়েছে। বিরক্তির কারণ হচ্ছে–সে মোটামুটি নিশ্চিত মতির কাছে পয়সা নেই।

দীর্ঘদিন চায়ের স্টল চালাবার পর তার এই বোধ হয়েছে—কার কাছে পয়সা আছে, কার কাছে নেই তা সে আগেভাগে বলতে পারে। বিনা পয়সার খরিদ্দার দোকানে ঢুকেই রাজ্যের গল্প শুরু করে। জগলুকে জগলু না ডেকে ডাকে জগলু ভাই। চা মুখে দিয়েই বলে ফাসক্লাস চা হইছে জগলু ভাই। মতিও তাই করবে।মতি চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির নিশ্চয় ফলে বলল, চা জবর হইছে জগলু ভাই। তারপর কন দেখি, আপনেরার খবর কন।খবর নাই।মাস্টার সাবের খুঁজে গিয়া এক ঘটনার মধ্যে পড়লাম… দেখি পরীর মত দুই মেয়ে…

জগলু মতির কথা থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, চা শেষ কর মতি–দোকান বন্ধ করব।চা তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার জিনিশ না। আরাম করে খেতে হয়। জগলুর দোকানে চা-টা বানায় ভাল। আফিং-টাফিং দেয় কি না কে জানে। আরেক কাপ খেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু মতির হাতে আসলেই পয়সা নেই। বাকিতে একবার চা খাওয়া যায়, পরপর দুবার খাওয়া যায় না।চা আরেক কাপ খাওন লাগব জগলু ভাই–সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজছি–শরীর মইজ্যা গেছে।

চায়ের দাম কিন্তু বাড়ছে–এক টেকা কাপ। দুই কাপ দুই টেকা।কন কি? কুড়ি টেকা সের চিনি–পনেরো টেকা গুড়। আমার হাত বান্দা।আচ্ছা দেন, উপায় কি? জগলুর মুখের বিরক্তি ভাব এখন কিছুটা দূর হয়েছে। কথা শুনে মনে হচ্ছে–মতির হাতে পয়সা আছে। চায়ের দাম দেবে। তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করা যেতে পারে।স্টেশন ঘরে কি দেখলা বললা না?

পরীর মত দুই মেয়ে। যেমন সুন্দর চেহারা তেমন সুন্দর কথা।বিষয় কি? জানি না। জিজ্ঞাস করলাম, কিছু বলে না। এরা হইল শহরের মেয়ে, আর আমার হইল আউলা বাউলা চেহারা। চেহারা দেইখ্যাই ভয় পাইছে। মেয়ে দুইটার, পরিচয় জাননের ইচ্ছা ছিল।পরিচয় জাইন্যা হইব কি? তবু পরিচয় জানার ইচ্ছা হয়। দুইটা পিঁপড়া যখন সামনাসামনি দেখা হয়–তারা থামে। সালাম দেয়, কোলাকুলি করে, একজন আরেকজনের খোঁজখবর নেয়, আর আমরা হলাম মানুষ…।

মতি সুযোগ পেয়েই ঋষির মত এক বাণী দিয়ে ফেলল। পিঁপড়াদের জীবনচর্যা বিষয়ক এই বাণী সে প্রায়ই দেয়। জগলুর উপর এই বাণী তেমনি প্রভাব ফেলল না।সে হাই তুলল।মনসুর আলি সাহেব হন হন করে আসছেন। তিনি পয়েন্টসম্যান বদরুলকে খুঁজে পেয়েছেন। বদরুল তাঁর মাথার উপর ছাতা ধরে আছে। মনসুর আলির হাতে। ছোট একটা এলুমিনিয়ামের কেতলি।

অন্য হাতে দুটা চায়ের কাপ। মনসুর আলির চোখে সমস্যা আছে–কাছাকাছি কেউ দাঁড়িয়ে থাকলেও চিনতে পারেন না। আজ মতিকে দূর থেকে চিনে ফেললেন–খুশি খুশি গলায় বললেন, কে, মতি না? মতি হাসিমুখে বলল, স্যারের শরীর কেমন? শরীর ভাল। তুই এখানে করছিস কি?

চা খাই।চা পরে খাবি–তুই আমার একটা কাজ করে দে। বিরাট ঝামেলায় পড়েছি। ইরতাজুদ্দিন সাহেবের দুই নাতনী এসে উপস্থিত। স্টেশন ঘরে বসে আছে। ওদের। সুখানপুকুর নিয়ে যাবি। পারবি না? অবশ্যই পারব।নৌকা জোগাড় কর। ভাল ইঞ্জিনের নৌকা। নিচে বিছানা দিতে হবে। পারবি না? মানুষ পারে না এমন কাজ দুনিয়াতে আল্লাহপাক দেয় নাই। হযরত আদমকে পয়দা করার পর আল্লাহপাক বললেন–ওহে আদম…

বড় বড় কথা বলার কোন দরকার নাই–তুই যা, নৌকা জোগাড় কর। আর শোন–তোর বেশি কথা বলার অভ্যাস। বেশি কথা বলবি না।জ্বে আচ্ছা।জ্বে আচ্ছা না–কোন কথাই বলবি না।জে আচ্ছা, বলব না–তবে ইরতাজ সাহেবের যখন নাতনী তখন তো। আমরার গ্রামেরই মেয়ে…।খবর্দার। গ্রামের মেয়ে আবার কি?

মনসুর আলিকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি এখন পুরোপুরি দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হয়েছেন। ঘাম দিয়ে জ্বর সেরে রোগি বিছানায় উঠে বসেছে। মনসুর আলি জগলুর দিকে তাকিয়ে বললেন–মতির চায়ের পয়সা আমি দেব। ওর কত হয়েছে? দুই কাপ চা খাইছে। দুই টাকা। মনসুর আলি আনন্দিত গলায় বললেন–তুই তাহলে নৌকার খোঁজে চলে যা। নৌকা পেলে আমাদের খবর দিবি।জ্বে আচ্ছা।মতি মাথা চুলকে বলল, আফনের টাকাটার একটা ব্যবস্থা স্যার করতেছি। সতেরো টাকা পাওনা ছিল, স্যারের বোধ হয় ইয়াদ আছে।

আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে।মনসুর আলি কেতলিতে করে নিজের বাড়ি থেকে চা বানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। গলুর দোকানে কেতলি গরম করলেন। এক পোয়া জিলাপি কিনলেন–মেয়ে দুটির নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে–এমন জংলী জায়গা… কিছু পাওয়ার উপায় নেই।মতি! জ্বি স্যার।কথা কম বলবি–এরা শহরের বড়ঘরের মেয়ে। চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। কথা শুনলে বিরক্ত হয়–কি দরকার বিরক্ত করার।

বিরক্ত করব না।নৌকায় উঠেই ফট করে গানে টান দিবি না। এরা শহর-বন্দরে থাকে, গ্রাম্য গান শুনলে বিরক্ত হবে। কোন গান না।জি আচ্ছা।মনসুর আলি আবার তৃপ্তির হাসি হাসলেন। মতিকে পেয়ে তার সত্যি ভাল লাগছে।নীতু উৎসাহের সঙ্গে বলল, আপা, স্টেশন মাস্টার সাহেব আসছেন।তুই তো বিড়াল হয়ে যাচ্ছিস রে নীতু। অন্ধকারে সব দেখতে পাস। আমি তো কিছু দেখি না। উনি কি খালি হাতে আসছেন, না চা নিয়ে আসছেন?

চা নিয়ে আসছেন, হাতে কেতলি আছে।চা-টা গরম, না ঠাণ্ডা? সেটা বুঝব কি করে? চা গরম হলে কেতলির মুখ দিয়ে ধোয়া বেরুবে। ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছিস না হই তো মনে হয় আলোর চেয়ে অন্ধকারেই ভাল দেখিস…। বৃষ্টি কমে এসেছিল, আবার প্রবলবেগে শুরু হল। হারিকেনে সম্ভবত তেল নেই–উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তেল ভরা থাকলে এত সুন্দর করে জ্বলত না।মনসুর আলি বললেন, আম্মারা, চা খান। চিন্তার আর কিছু নাই। সব ব্যবস্থা হয়েছে।শাহানা বলল, কি ব্যবস্থা হয়েছে?

ব্যবস্থা তেমন কিছু হয়নি, শুধু মতিকে পাওয়া গেছে। মতি সব ব্যবস্থা করে ফেলবে। মনসুর আলি এই ভরসাতেই বলেছেন সব ব্যবস্থা হয়েছে।নীতু বলল, আমরা যাব কি ভাবে? হেঁটে? জ্বি না আম্মা, নৌকায় যাবেন।নৌকায় কতক্ষণ লাগবে? নৌকায় কতক্ষণ লাগবে সেই সম্পর্কেও তাঁর কোন ধারণা নেই। নৌকায় করে তিনি কখনো সুখানপুকুর যাননি। নৌকায় যেমন যাননি–হেঁটেও যাননি। যাবার প্রয়োজন পড়েনি। তবে এবার যাবেন।

মেয়ে দুটি থাকতে থাকতে যাবেন। ইরতাজুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসবেন। এদের একটা-দুটা কথায় অনেক কিছু উলটপালট হয়। তিনি সাত বছর এই জঙ্গলে পড়ে আছেন। তার জুনিয়ররা প্রমোশন নিয়ে ভাল ভাল স্টেশন পেয়েছে। তার কিছু হয়নি। মাঝে মাঝে তার সন্দেহ হয় রেলওয়ের খাতায় তার নাম আছে কি-না। ইরতাজুদ্দিন সাহেবকে দিয়ে একটা কথা রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যানের কানে তুলতে পারলে–

আম্মারা, জিলাপি খান। সন্ধ্যার সময় ভাজে। কারিগর ভাল–।নীতু বলল–যে জিলাপি ভাজে তাকে কি কারিগর বলে? ভাল ভাজলে কারিগর বলে।নীতু জিলাপি এক টুকরা মুখে দিল। ন্যাতন্যাতে জিলাপি–টক টক লাগছে–একবার মুখে দিয়ে ফেলে দেয়াও যায় না–অভদ্রতা হয়। ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন তার দিকে। শাহানা সহজভাবে বলল, মুখে জিলাপি দিয়ে বসে আছিস কেন? ভাল না লাগলে ফেলে দে। নীতু তৎক্ষণাৎ জানালার কাছে চলে গেল। জিলাপি ফেলে দিলে এখন আর অভদ্রতা হবে না। সে নিজ থেকে ফেলেনি–অন?

পায়ের কাছে প্রকাণ্ড জানালা।শহরের গ্রীলদেয়া জানালা না, খোলামেলা জানালা। এত প্রকাণ্ড জানালা যে মনে হয় আকাশটা জানালা গলে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। ঘন নীল আকাশ, যেন কিছুক্ষণ আগে গাদাখানিক নীল রঙ আকাশে লাগানো হয়েছে। রঙ এখনও শুকায়নি। টাটকা রঙের গন্ধ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।

নীতুর ঘুম ভেঙেছে অনেকক্ষণ হল। সে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। নৌকায় ঘুমিয়ে পড়ার পর থেকে তার আর কিছু মনে নেই। কখন সে পৌঁছল, কে তাকে এনে বিশাল এই বিছানায় শুইয়ে দিল কিচ্ছু মনে আসছে না। এই তার সমস্যা–একবার ঘুমিয়ে পড়লে আর ঘুম ভাঙতে চায় না। এখন ঘুম ভেঙেছে কিন্তু বিছানা থেকে নামতে ইচ্ছা করছে না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক দেখছে।

বিছানায় পাশাপাশি দুটা বালিশ। আপা আজ রাতে তার সঙ্গে ঘুমিয়েছে–এটা জেনে ভাল লাগছে। রাতে ঘুম ভেঙে সে যদি দেখত এতবড় বিছানায় একা শুয়ে। আছে–অপরিচিত ঘর, চারদিকে সব অপরিচিত আসবাবপত্র, তাহলে ভয়েই মরে যেত।পুরানো দিনের আসবাবপত্র সব এমন গাবদা ধরনের হয় কেন? খাট এত উঁচু যে গড়িয়ে পড়লে মাথা ফেটে ঘিলু বের হয়ে যাবে। নীতুর আবার খাট থেকে গড়িয়ে পড়ার অভ্যাস আছে।

ভাগ্যিস সে দেয়ালের দিকে শুয়েছিল। ন্যাপথলিনের কড়া গন্ধে গা কেমন কেমন করছে। পুরানো দিনের মানুষরা এত ন্যাপথলিন পছন্দ করে কেন? ওদের গা থেকেও ন্যাপথলিনের গন্ধ বের হয়।আকাশের দিকে তাকিয়ে নীতু আঁচ করতে চেষ্টা করল কটা বাজে। সূর্য দেখা যাচ্ছে না–নীল আকাশ আর নীল আকাশে ধবধবে শাদা মেঘ। এমন শাদা মেঘ শুধু শরৎকালেই দেখা যায়।

শ্রাবণ মাসের মেঘে কালো রঙ মাখানো থাকে। আল্লাহর স্টকে বোধহয় কালো রঙ শেষ হয়ে গেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে কটা বাজছে নীতু বুঝতে পারছে না। বারান্দায় থপ থপ শব্দ হচ্ছে–মনে হয় চারপায়ে একটা প্রকাণ্ড ভালুক যেন হাঁটছে। ঘরে এসে যে দাঁড়াল সে ভালুকের মতই। এ বাড়ির প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড আসবাবের মতই প্রকাণ্ড একটা মানুষ–যার মাথার চুল শাদা। মনে হচ্ছে শাদা রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে তিনি শাদা একটা লুঙ্গি পরেছেন। খালি গা—গা ভর্তি ভালুকের পশমের মত শাদা লোম।ভালুকটা মেঘের মত গর্জনে বলল, কি রে, এখনও ঘুমুচ্ছিস?

নীতু কিছু বলল না, চোখ পিট পিট করতে লাগল। ভালুকটা বলল, আরো ঘুমুবি? নাকি নাশতা-পানি করবি? তোর জন্যে আমিও না খেয়ে আছি। আমাকে চিনতে পারছিস? চেনার কথা না–একবারই শুধু দেখেছিস তোর যখন তিন বছর বয়স। এখন বয়স কত?

বার।হুঁ, ন বছর আগের ঘটনা। মনে থাকার কথা না। তুই এত রোগা কেন? নিজে নিজে খাট থেকে নামতে পারবি না-কি কোলে করে নামিয়ে দেব? নীতু চট করে নেমে পড়ল। ভালুক টাইপ মানুষ হয়ত সত্যি সত্যি কোলে করে নামাতে আসবে।কোন ক্লাসে পড়িস? ক্লাস সেভেন।রোল নাম্বার কত? পঁচিশ।

রোল পঁচিশ! তুই তো দেখি গাধা টাইপ মেয়ে। পড়াশোনা করিস না? করি।পড়াশোনা করলে রোল পঁচিশ কি করে হয়? বল দেখি তিন উনিশে কত? ফিফটি সেভেন।হয়েছে। এখন হাত-মুখ ধুয়ে খেতে আয়–সব গরম আছে… চালের আটার রুটি আর ঝাল ঝাল ভুনা মুরগি। দুপুরে খাবি পাংগাস মাছ। খাস তো? শহরের মানুষ মাছ খাওয়া ভুলে গেছে… নীতু বলল, বাথরুম কোন দিকে?

দূর আছে। শোবার ঘরের ভেতরে টাট্টিখানা এইসব নোংরামি শহরে চলে, এখানে চলে না–আয় আমার সঙ্গে–কই, কদমবুসি করেই রওনা হয়ে গেলি–মুরুব্বীদের সালামের ট্রেনিং বাবা-মা দেন না?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *