হ্যা। আমি দশ ডলার বাজি রাখতে পারি আপনি কবি কিটসের প্রণয়িনীর নাম জানেন ।
আনিস অবাক হলাে। মেয়েটির মুখ হাসি হাসি কিন্তু ঝগড়া বাধানাের একটা সূক্ষ্ম চেষ্টা আছে। সফিক তার গাড়ি নিয়ে এখনাে ব্যস্ত।

তার ধারণা ঝামেলাটা আসলে ট্রান্সমিশনে নয় কারবুরেটরে, আর খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেই সে ঠিক করে ফেলতে পারবে।
আনিস একটি সিগারেট ধরিয়ে মৃদু স্বরে বললাে, কবি কিটসের প্রণয়িনীর নাম জানা অত্যাবশ্যকীয় বিষয় নয়।
আইনস্টাইনের কয় স্ত্রী সেটা জানা বােধহয় অত্যাবশ্যকীয় ?
তা নয়। এইসব হচ্ছে বিলাস। সফিকের গাড়ি একটি ছােট গর্জন করে আবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সে হাসি মুখে বললাে, দেখলেন তাে আনিস ভাই প্রায় কায়দা করে ফেলেছি। আর দশ মিনিট।
আনিস সে কথার জবাব দিল না। রুনকি মাথার স্কার্ফ শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে মৃদু স্বরে বললাে, আমি তর্ক করে আপনাকে রাগিয়ে দিতে চাই না। তাহলে মা খুব রাগ করবেন। মাকে আমি রাগাতে চাই না। তাঁর কিছুদিন আগেই নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়েছিল। আরেকবার হলে খুব মুশকিল হবে।
সফিকের গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে। বিকট শব্দ আসছে সেখান থেকে।
সফিক কোমরে হাত দিয়ে গাড়িকে উদ্দেশ করে ছােটখাটো বক্তৃতা দিয়ে ফেললাে— শালা তুমি মানুষ চেন নাই। কত ধানে কত চাল বুঝ নাই। শালা এক চড় দিয়ে তােমার দাঁত খুলে ফেলবাে...।
রুনকি খিলখিল করে হেসে ফেললাে।
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
ফাইভ হানড্রেড লেভেলের একটি ক্লাস ছিল সাড়ে দশটায়। আনিস ক্লাসে ঢুকে দেখলাে চেয়ারম্যান ডঃ হিল্ডারবেন্ট পেছনের দিকে বসে আছে। হিল্ডারবেন্ট একা নয় অরগেনিক কেমিস্ট্রির ডঃ বায়ারও কফির পেয়ালা হাতে বসে আছেন। হিল্ডারবেন্ট বললাে, আমরা তােমার ক্লাসে বসতে পারি তাে ?
আনিস বললাে, নিশ্চয়ই।
কোনাে প্রশ্ন ঐশ্ন আবার জিজ্ঞেস করাে না হা হা হা। আনিস অস্বস্তি বােধ করতে লাগলাে। হঠাৎ করে তার ক্লাসে এসে বসার কারণ বােঝা যাচ্ছে না। তবে এরা তাকে পছন্দ করছে না এটুকু পরিষ্কার বােঝা যায়। পছন্দ না হবার কারণ তার জানা নেই। কোনাে কারণ থাকার কথাও নয়।।
আনিস বক্তৃতা শুরু করল। ডঃ বায়ার কিছু শুনেছে বলে মনে হলাে না। কিন্তু গলায় ফিসফিস করে কী যেন বলছে হিল্ডারবেন্টকে। একবার দুজনেই সশব্দে হেসে উঠলাে। হিল্ডারবেন্ট আনিসের দিকে তাকিয়ে বললাে, সরি আনিস। তুমি চালিয়ে যাও। আনিস যেতে পারলাে না। ডঃ বায়ার হঠাৎ করে বললেন, তােমার ইংরেজি কথা আমি ঠিক ধরতে পারছি না আনিস। তুমি কি আরেকটু স্লো যাবে ?
সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ
তুমি তাে নিজেই কথা বলছাে বায়ার। আমি নিজে স্লো বললেও কিছু আসবে যাবে না। দু‘একটি ছেলে হেসে উঠল। হিল্ডারবেন্ট বললাে, চালিয়ে যাও। তুমি চালিয়ে যাও।
আনিস দশ মিনিট আগে ক্লাস শেষ করে দিল। হিল্ডারবেন্ট উঠতে যাচ্ছিল, আনিস বললাে, তােমার সঙ্গে আমার কথা আছে হিল্ডারবেন্ট।
বল।। আজকে হঠাৎ আমার ক্লাসে এসে বসলে কেন ? পলিমার রিওলজিতে তােমার কোনাে উৎসাহ আছে বলে তাে শুনি নি।
হিল্ডারবেন্ট খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাে, আমরা বসেছি একটা জিনিস দেখতে। তােমার সম্পর্কে ভীনের অফিসে একটা রিপাের্ট হয়েছে। বলা হয়েছে তােমার উচ্চারণ কেউ বুঝতে পারছে না। রিপাের্ট কি ছাত্ররা করেছে ?
তা জানি না। তুমি ডীনকে জিজ্ঞেস করতে পার। আমি অবশ্যি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তােমার কথা বুঝতে পারার কোনাে কারণ নেই।
ধন্যবাদ।
আনিস কফি খেতে গেল মেমােরিয়াল ইউনিয়নে। ডঃ এন্ডারসন খাতাপত্র নিয়ে একটি টেবিল দখল করে বসেছিল। আনিসকে দেখেই গম্ভীর মুখে বললাে, তােমাদের বাংলাদেশের স্টল দেখে আসলাম।
কী দেখে আসলে ?
লাইব্রেরিতে আন্তর্জাতিক একটা মেলা হচ্ছে। সেখানে তােমাদেরও একটা স্টল দেখলাম।
আনিসের মনে হল ডঃ এন্ডারসন যেন হাসি গােপন করবার চেষ্টা করলাে। তুমি কফি শেষ করেই যাও। স্টলের ব্যাপারটি মিথ্যা নয়।
একটি প্রকাণ্ড টেবিল নিয়ে সফিক বসে আছে। সফিকের গায়ে একটি হাতা কাটা স্যান্ডাে গেঞ্জি এবং পরনে সবুজ রঙের একটি লুঙ্গি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পােশাক। টেবিলে একটি ময়লা পাঁচ টাকার নােট, দুটি দশ পয়সা। আরেক পাশে একটি বড় ফুলস্কেপ কাগজে মার্কার দিয়ে অ আ লেখা, আনিস স্তম্ভিত।
Read more