‘শেষ হয়ে গেল মানে ? ‘ও নেই। আবার হাউ হাউ কান্না। ‘কি বলছেন আপনি ?
একটু আগে, ঠিক পাঁচটা বাজতে পনের মিনিটে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।
কান্না আরও সােচ্চার হল।
এবং তার পরেই সেটাকে গিলতে চেষ্টা করলেন ভদ্রলােক।
‘সেকি! আপনি ডাক্তারকে বলেছেন? মাথা নেড়ে না বললেন সতীশবাবু, বললেই তাে মর্গে নিয়ে যাবে। কত বছর ওর পাশে দু মিনিটও একা চুপচাপ বসিনি। তাই ভাবছিলাম বসে থাকি। যেন ও ঘুমাচ্ছে আর আমি পাশে বসে আছি। এখন আমি কি করব ম্যাডাম ? কামায় শব্দগুলাে জড়িয়ে গিয়ে যেন দলা পাকিয়ে গেল ।
দীপাবলী দূরে দাঁড়ানাে একটি নার্সকে ডাকল, ‘শুনুন, ওঁর স্ত্রীকে একটু দেখুন। ‘কোণের বেডটা তাে ? নার্স দেখতে চলে গেল। তারপরেই ফিরে এল দ্রুত, ছুটে গেল খবর দিতে।
দীপাবলী বলল, “আমি তাড়াতাড়ি ফিরে যাচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না। সবাই খবর পেয়ে যাতে আজকের লাস্ট বাস ধরে আসে তার ব্যবস্থা করছি।
রিকশায় বসে সে দৃশ্যটা ভাবতেই শিউরে উঠল।
সারাজীবন যাকে সময় দিতে পারেননি কিংবা দেবার কথা মনে হয়নি তার পাশে কি ভাবে বসেছিলেন সতীশবাবু ?
অপরাধবােধ না প্রেম, কি বলা যায় একে ?
এস ডি ওর অফিসে ফিরে যাওয়ার কথা আর মনে আসেনি। সােজা বাস স্ট্যান্ডে চলে এসেছিল রিলা নিয়ে। জানলার ধারে জায়গাও পেয়েছিল। বাস ছাড়তে ছাড়তেই অন্ধকার উঠে এল পৃথিবীর তলা থেকে উঠে আকাশ উতে চাইল।
সাতকাহন পর্ব-(১৮)
এখন ওই তপ্ত অন্ধকার, বাসের বুড়িয়ে চলা, যাত্রীদের কথাবাত কিই যেন
করছিল না দীপাবলীকে।
সেই দৃশ্যটি দেখার পর থেকেই বুকের ভেতর যেন হাজারমনি পাথর, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সমস্ত শিরায় শিরায় ঝিমুনি।
এও কি সম্ভব ?
সতীশবাবুর মুখ বারংবার মনে পড়ছিল। মৃত স্ত্রীর পাশে পাথরের মত বসে থাকা সতীশবাবু। কোন আন্দোলন নেই। একটি মানুষ কখন পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছেন, হয়তাে তিনি যাওয়ার মুহূর্তেও সাক্ষী ছিলেন কিন্তু তারপরও দীর্ঘ সময় সেই মানুষটির পাশে স্থির হয়ে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। শুধুই কি দিচ্ছিলেন ?
সতীশবাবু স্ত্রীর জীবদ্দশায় যা পাননি তাই কি পেতে চাইছিলেন। আর একেও কি ভালবাসা বলে ? দীপাবলী চোখ খুলে অন্ধকার দেখল। চলন্ত বাসে অন্ধকারও কি দুলে দুলে ছােটে ? আর তখনই রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ল। বাঙালির সব শেষ আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ। একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের বেঁচে থাকা এবং না থাকার সময়ে সমস্ত অনুভূতি এবং স্মৃতির কথা তিনি ঈশ্বরের চেয়েও আন্তরিক হয়ে বলে গেছেন। সত্যি, কি আশায় বসেছিলেন সতীশবাবু ? সে কি শুধুই দুঃখের খাস ? না, দুখের আশ ?
আর ওই চোখের জল কি সুখের সন্ধান ? সবই ঠিক কিন্তু তারপরও, ‘তবুও কী নাই ? বাঙালির গীতা উপনিষদ তার নিজস্ব ভাষায় লেখা নয়। কিন্তু বাঙালির গীতবিতান আছে। একটি মানুষের যা সমস্ত জীবনের আশ্রয় । যেখানে দেবতা মানুষ আর প্রকৃতি একাকার হয়ে পরস্পরের বন্ধু হয়ে যায়। বুকের মধ্যে এত চাপ, দীপাবলী ছটফট করছিল বাড়িতে ফিরতে। কলকাতা থেকে কর্মস্থলে ঘােরাব সময় সে কিছু বই সঙ্গে রাখতে পেরেছে, গীতবিতান তাে অবশ্যই। ‘ বাস থেকে নেমে সে বুঝতে পারল মনের চাপ শরীরকেও আক্রমণ করেছে। হাঁটতেই যেন কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু খবরটা দেওয়া দরকার। প্রৌঢ় মানুষটি মৃত স্ত্রীকে আঁকড়ে বেশীক্ষণ বসে থাকতে পারেন না।
সাতকাহন পর্ব-(১৮)
ব্লক অফিস তৈরী হবার সময় সরকারি জমিতে কিছু বাড়ি ঘর তৈরী হয়েছিল। পরবর্তীকালে কর্মচারীরা সেগুলােই বাড়িয়ে নিয়েছেন। যদিও বদলির চাকরি তাহলেও একবার এখানে এলে সচরাচর ওই স্তরের কর্মচারীদের আর সরানাে হয় না। এদিকটায় কখনও আসেনি সে, আসা হয়নি এই পর্যন্ত ।
খবর দেওয়ামাত্র শশাকের ঢল নামল। সবাই ওই মুহূর্তে শহরে যেতে চান। শেষ বাসের দেরি আছে শহরে ফিরে যাওয়ার। দীপাবলী আর দাঁড়াল না । ফিরে আসার পথে অন্ধকার মাঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সে হঠাৎ। চারপাশে কোথাও এক ফোঁটা আলাে দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার যেন সমস্ত বিশ্বচরাচর গ্রাস করে নিয়েছে শুধু আকাশ ছাড়া। মুখ তুলল সে।
যখন সতীশবাবু স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তখন তাে কেউ সঙ্গে যায়নি। যেন সেটা স্বামীর কর্তব্য ছিল। এখন কেন সবাই ব্যস্ত সহযােগী হতে ? শুধু শরীরে প্রাণ নেই বলে ? প্রাণহীন শরীর কি কারাে নিজস্ব আত্মীয় নয় ? চোখ মেললাে সে আকাশে। আর হঠাৎই তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে একটি লাইন যেন নিঃশ্বাসের মত ধাকা দিতে লাগল বুকের ঘরের দেওয়ালে, “দেখাে আমার হৃদয়তলে সারারাতের আসন মেলা।
সাতকাহন পর্ব-(১৮)
মুখ নামাল দীপাবলী। এমন একটা লাইন কেন মনে এল ?
সে দ্রুত হাঁটতে লাগল। ধীরে ধীরে তিরির জ্বালানাে হ্যারিকেন চোখে এল। সে সিড়িতে পা রাখতেই দরজা খুলে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে এল তিরি, ‘তুমি চলে যাওয়ার পরে দাদাবাবু আর আসেনি।দীপাবলী এক মুহূর্ত শক্ত হল, নিচু গলায় বলল, “আসেনি !
না। সারা দিন নিশ্চয়ই না খেয়ে আছে। তিরি যেন খুবই চিন্তিত। দীপবলী আর পারছিল না। বাইরের ঘরের চেয়ারে বসে বলল, আমায় এক কাপ চা করে দে তিরি।।
তিরি তবু দাঁড়িয়ে রইল। বলল, একটু খোজ করবে না ? ‘আঃ। তােকে যা বলছি তাই কর।’ স্পষ্টতই বিরক্তি বােঝাল সে। তিনি চলে গেল ভেতরে। গুম হয়ে বসে রইল দীপাবলী। এই ঘরের এক কোণে শমিতের আনা জিনিসপত্র পড়ে বয়েছে। কিন্তু এরকম পাণ্ডববর্জিত জায়গায় সে যাবেই বা কোথায় ? নাকি সত্যিই ফিরে গেল কলকাতায় ? হয়তাে সারাদিন রােদে ঘুরে সহ্য করতে পারেনি, পড়ে আছে কোথাও অসুস্থ হয়ে। এলােমেলাে নানান চিন্তা মাথায় জট পাকালাে। দীপাবলী বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিত। সতীশবাবুর ভাবনার পাশে শমিতের তৈরী করা সমস্যা যেন একই মাত্রায় উঠে এল।
সাতকাহন পর্ব-(১৮)
শমিত যদি চলে যায় ? একটা খেলা খেলে যাওয়ার জন্যেই : কি এই আসা ? ও কিছু চায়নি, দ্বিধাও দেখায়নি কিন্তু একটু আগে মাঠের মাঝখানে মনে আসা লাইনটাকে যেন সত্যি করে দিল, নীরব চোখে সন্ধ্যালােকে খেয়াল নিয়ে করলে খেলা । এবং এই কথাগুলাে তাে পৃথিবীর জন্মের মত সত্যি, দেখা হল, হয়নি চেনা-প্রণ ছিল, শুধালে না। এই অবধি মনে হতেই অদ্ভুত শান্তি পেল দীপাবলী।
সে শমিতের কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল। মনের আকাঙক্ষাকে হেলায় সরিয়ে দিয়ে শমিত যেন তাকে বাঁচিয়ে গেছে । তিরি চা করে আনল। চুমুক দিতেই গাড়ির আওয়াজ কানে এল। অন্ধকার কাটতে কাটতে হেডলাইট দুটো ছুটে আসছে এদিকে ক্রমশ সেটা শব্দ করে থেমে গেল। চায়ের কপ নামিয়ে রাখল সে কিন্তু উঠে দাঁড়াল না।
দরজা খােলা। বাইরে গাড়ির আলাে দেখা যাচ্ছে । ড্রাইভার গাড়ি থামাবার পরেও হেডলাইট অফ করেনি । সেই আলােয় একটি মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
দরজার সামনে এসে কপালে হাত ছুঁইয়ে নমস্কার করল লােকটা, ‘মেমসাহেব!
লােকটাকে চিনতে পারল না দীপাবলী । সে চুপচাপ বসে রইল ।। লােকটা বলল, “বাবু জিপ পাঠিয়ে দিয়েছেন। ‘কোন বাবু ? ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল সে ।। ‘অর্জুনবাবু। লাস্ট বাস খারাপ হয়ে গিয়েছে। আপনাদের শহরে যাওয়ার কথা ছিল, তাই জিপ পাঠিয়ে দিয়েছেন। লােকটি খুব বিনীত ভঙ্গীতে বলল।
এবার দীপাবলী উঠে দাঁড়াল, তােমার সাহেবকে কে খবরটা দিল ? ‘বাড়িতে ফেরার সময় রাস্তায় বাবুদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ‘তা আমার এখানে কেন গাড়ি নিয়ে এসেছেন। ‘বাবু যে আপনার কাছেই নিয়ে আসতে বললেন। ‘তােমার বাবুকে বলবে আমার গাড়ির দরকার নেই। যাও।
সাতকাহন পর্ব-(১৮)
লােকটা এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিল গাড়ির দিকে। এটা অর্জন নায়েকের আর একটা চালাকি। ঘুষ দিয়ে হাতে রাখতে চাইছে। কিন্তু সেই সঙ্গে ওর মনে হল, শহরে সতীশবাবু একা রয়েছেন। বাস যদি আজ রাত্রে না যায় তাহলে এখান থেকে কেউ সাহায্য করতে যেতে পারবে না। সে তড়িঘড়ি দরজার বাইরে নেমে এল, এই যে, শুনুন।
লােকটা ঘুরে দাঁড়াল। দীপাবলী বলল, “আমাদের অফিসের লােকজন কি এখনও বড় .. রাস্তায় অপেক্ষা করছে? আপনি জানেন ?
“আজ্ঞে হ্যাঁ।’ লােকটি মাথা নাড়ল। ‘তাহলে ওঁদের কাছে গাড়ি নিয়ে যান। ওরা যদি শহরে যেতে চান, মানে যে ক’জন আপনাদের জিপে যেতে পারেন, নিয়ে গেলে ভাল হয়। ‘ঠিক আছে মেমসাহেব। লােকটি আবার মাথা নেড়ে জিপে উঠে বসে ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল অন্ধকার কাটতে কাটতে।
দরজা বন্ধ করল দীপাবলী। সােজা শশাওয়ার ঘরে এসে খাটে শরীর এলিয়ে দিল। এবং তখনই তার মনােরমার কথা মনে এল। এইভাবে বাইরের জামাকাপড়ে বিছানায় শুলে তিনি নিশ্চয়ই কুরুক্ষেত্র করতেন। একসময় ব্যাপারটা মানত সে, বাধ্য হয়েই মানত । এখন তাে
সব ছন্নছাড়া। কোন কিছুই আর বেশীদিন আঁকড়ে ধরা যাচ্ছে না।
Read more
