হযবরল (২য় পর্ব) – সুকুমার রায়

হযবরল (২য় পর্ব)

বুড়ো গম্ভীরভাবে খানিকক্ষণ দাড়ি হাতড়াল, তার পর মাথা নেড়ে বলল, “বুধোটার যেমন বুদ্ধি! ত্রৈরাশিক দিতে বলব কেন? ভগ্নাংশটা খারাপ হল কিসে? না হে কাক্কেশ্বর, তুমি ভগ্নাংশই দাও।”কাক বলল, “তা হলে আড়াই সেরের গোটা সের দুটো বাদ গেলে রইল ভগ্নাংশ আধ সের, তোমার হিসেব হল আধ সের।

আধ সের হিসেবের দাম পড়ে- খাঁটি হলে দুটাকা চোদ্দোআনা, আর জল মেশানো থাকলে ছয় পয়সা।”বুড়ো বলল, “আমি যখন কাঁদছিলাম, তখন তিন ফোঁটা জল হিসেবের মধ্যে পড়েছিল। এই নাও তোমার শ্লেট, আর এই নাও পয়সা ছটা।”পয়সা পেয়ে কাকের মহাফুর্তি! সে `টাক্-ডুমাডুম্ টাক্-ডুমাডুম্’ বলে শ্লেট বাজিয়ে নাচতে লাগল।

বুড়ো অমনি আবার তেড়ে উঠল, “ফের টাক-টাক বলছিস্? দাঁড়া। ওরে বুধো বুধো রে! শিগ্গির আয়। আবার টাক বলছে।” বলতে-না-বলতেই গাছের ফোকর থেকে মস্ত একটা পোঁটলা মতন কি যেন হুড়্মুড়্ করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। চেয়ে দেখলাম, একটা বুড়ো লোক একটা প্রকাণ্ড বোঁচকার নীচে চাপা পড়ে ব্যস্ত হয়ে হাত-পা ছুঁড়ছে! বুড়োটা দেখতে অবিকল এই হুঁকোওয়ালা বুড়োর মতো।

হুঁকোওয়ালা কোথায় তাকে টেনে তুলবে না সে নিজেই পোঁটলার উপর চড়ে বসে, “ওঠ্ বলছি, শিগ্গির ওঠ্” বলে ধাঁই-ধাঁই করে তাকে হুঁকো দিয়ে মারতে লাগল।কাক আমার দিকে চোখ মট্কিয়ে বলল, “ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না? উধোর বোঝা বুধোর ঘাড়ে। এর বোঝা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে, এখন ও আর বোঝা ছাড়তে চাইবে কেন? এই নিয়ে রোজ মারামারি হয়।”

এই কথা বলতে-বলতেই চেয়ে দেখি, বুধো তার পোঁটলাসুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েই সে পোঁটলা উঁচিয়ে দাঁত কড়্মড়্ করে বলল, “তবে রে ইস্টুপিড্ উধো!” উধোও আস্তিন গুটিয়ে হুঁকো বাগিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, “তবে রে লক্ষ্মীছাড়া বুধো!”কাক বলল, “লেগে যা, লেগে যা- নারদ-নারদ!” অমনি ঝটাপট্, খটাখট্, দমাদম্, ধপাধপ্! মুহূর্তের মধ্যে চেয়ে উধো চিত্পাত শুয়ে হাঁপাচ্ছে, আর বুধো ছট্ফট্ করে টাকে হাত বুলোচ্ছে।

বুধো কান্না শুরু করল, “ওরে ভাই উধো রে, তুই এখন কোথায় গেলি রে?” উধো কাঁদতে লাগল, “ওরে হায় হায়! আমাদের বুধোর কি হল রে!”তার পর দুজনে উঠে খুব খানিক গলা জড়িয়ে কেঁদে, আর খুব খানিক কোলাকুলি করে, দিব্যি খোশমেজাজে গাছের ফোকরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তাই দেখে কাকটাও তার দোকানপাট বন্ধ করে কোথায় যেন চলে গেল।

আমি ভাবছি এইবেলা পথ খুঁজে বাড়ি ফেরা যাক, এমন সময় শুনি পাশেই একটা ঝোপের মধ্যে কিরকম শব্দ হচ্ছে, যেন কেউ হাসতে হাসতে আর কিছুতেই হাসি সামলাতে পারছে না। উঁকি মেরে দেখি, একটা জন্তু- মানুষ না বাঁদর, প্যাঁচা না ভূত, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না- খালি হাত-পা ছুঁড়ে হাসছে, আর বলছে, “এই গেল গেল- নাড়ি-ভুঁড়ি সব ফেটে গেল!”

হঠাত্ আমায় দেখে সে একটু দম পেয়ে উঠে বলল, “ভাগ্যিস তুমি এসে পড়লে, তা না হলে আর একটু হলেই হাসতে হাসতে পেত ফেটে যাচ্ছিল।”আমি বললাম, “তুমি এমন সাংঘাতিক রকম হাসছ কেন?” জন্তুটা বলল, “কেন হাসছি শুনবে? মনে কর, পৃথিবীটা যদি চ্যাপটা হত, আর সব জল গড়িয়ে ডাঙায় এসে এসে পড়ত, আর ডাঙার মাটি সব ঘুলিয়ে প্যাচ্প্যাচে কাদা হয়ে যেত, আর লোকগুলো সব তরা মধ্যে ধপাধপ্ আছাড় খেয়ে পড়ত, তা হলে- হোঃ হোঃ হোঃ হো-” এই বলে সে আবার হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল।

আমি বললাম, “কি আশ্চর্য! এর জন্য তুমি এত ভয়ানক করে হাসছ?” সে আবার হাসি থামিয়ে বলল, “না, না, শুধু এর জন্য নয়। মনে কর, একজন লোক আসছে, তার এক হাতে কুলপিবরফ আর-এক হাতে সাজিমাটি, আর লোকটা কুলপি খেতে গিয়ে ভুলে সাজিমাটি খেয়ে ফেলেছে- হোঃ হোঃ, হোঃ হো, হাঃ হাঃ হাঃ হা-” আবার হাসির পালা।

আমি বললাম, “কেন তুমি এই-সব অসম্ভব কথা ভেবে খামকা হেসে-হেসে কষ্ট পাচ্ছ?” সে বলল, “না, না, সব কি আর অসম্ভব? মনে কর, একজন লোক টিকটিকি পোষে, রোজ তাদের নাইয়ে খাইয়ে শুকোতে দেয়, একদিন একটা রামছাগল এসে সব টিকটিকি খেয়ে ফেলেছে- হোঃ হোঃ হোঃ হো-” জন্তুটার রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কে? তোমার নাম কি?” সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “আমার নাম হিজি বিজ্ বিজ্। আমার নাম হিজি বিজ্ বিজ্, আমার ভায়ের নাম হিজি বিজ্ বিজ্, আমার বাবার নাম হিজি বিজ্ বিজ্, আমার পিসের নাম হিজি বিজ্ বিজ্-” আমি বললাম, “তার চেয়ে সোজা বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ সবাই হিজি বিজ্ বিজ্।”

সে আবার খানিক ভেবে বলল, “তা তো নয়, আমার নাম তকাই! আমার মামার নাম তকাই, আমার খুড়োর নাম তকাই, আমার মেসোর নাম তকাই, আমার শ্বশুরের নাম তকাই-” আমি ধমক দিয়ে বললাম, “সত্যি বলছ? না বানিয়ে?” জন্তুটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, “না না, আমার শ্বশুরের নাম বিস্কুট।”

আমার ভয়ানক রাগ হল, তেড়ে বললাম, “একটা কথাও বিশ্বাস করি না।”অমনি কথা নেই বার্তা নেই, ঝোপের আড়াল থেকে একটা মস্ত দাড়িওয়ালা ছাগল হঠাত্ উঁকি মেরে জিজ্ঞাসা করল, “আমার কথা হচ্ছে বুঝি?” আমি বলতে যাচ্ছিলাম ‘না’ কিন্তু কিছু না বলতেই তড়্তড়্ করে সে বলে যেতে লাগল, “তা তোমরা যতই তর্ক কর, এমন অনেক জিনিস আছে যা ছাগলে খায় না।

তাই আমি একটা বক্তৃতা দিতে চাই, তার বিষয় হচ্ছে- ছাগলে কি না খায়।” এই বলে সে হঠাত্ এগিয়ে এসে বক্তৃতা আরম্ভ করল- “হে বালকবৃন্দ এবং স্নেহের হিজি বিজ্ বিজ্, আমার গলায় ঝোলানো সার্টিফিকেট দেখেই তোমরা বুঝতে পারছ যে আমার নাম শ্রী ব্যাকরণ শিং বি. এ. খাদ্যবিশারদ।

আমি খুব চমত্কার ব্যা করতে পারি, তাই আমার নাম ব্যাকরণ, আর শিং তো দেখতেই পাচ্ছ। ইংরাজিতে লিখবার সময় লিখি B.A. অর্থাত্ ব্যা। কোন-কোন জিনিস খাওয়া যায় আর কোনটা-কোনটা খাওয়া যায় না, তা আমি সব নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি, তাই আমার উপাধি হচ্ছে খাদ্যবিশারদ।

তোমরা যে বল- পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়- এটা অত্যন্ত অন্যায়। এই তো একটু আগে ঐ হতভাগাটা বলছিল যে রামছাগল টিকটিকি খায়! এটা এক্কেবারে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি অনেকরকম টিকটিকি চেটে দেখেছি, ওতে খাবার মতো কিচ্ছু নেই। অবশ্যি আমরা মাঝে-মাঝে এমন অনেক জিনিস খাই, যা তোমরা খাও না, যেমন- খাবারের ঠোঙা, কিম্বা নারকেলের ছোবড়া, কিম্বা খবরের কাগজ, কিম্বা সন্দেশের মতো ভালো ভালো মাসিক পত্রিকা।

কিন্তু তা বলে মজবুত বাঁধানো কোনো বই আমরা কক্ষনো খাই না। আমরা ক্বচিত্ কখনো লেপ কম্বল কিম্বা তোষক বালিশ এ-সব একটু আধটু খাই বটে, কিন্তু যারা বলে আমরা খাট পালং কিম্বা টেবিল চেয়ার খাই, তারা ভয়ানক মিথ্যাবাদী। যখন আমাদের মনে খুব তেজ আসে, তখন শখ করে অনেকরকম জিনিস আমরা চিবিয়ে কিম্বা চেখে দেখি, যেমন, পেনসিল রবার কিম্বা বোতলের ছিপি কিম্বা শুকনো জুতো কিম্বা ক্যামবিসের ব্যাগ।

শুনেছি আমার ঠাকুরদাদা একবার ফুর্তির চোটে এক সাহেবের আধখানা তাঁবু প্রায় খেয়ে শেষ করেছিলেন। কিন্তু তা বলে ছুরি কাঁচি কিম্বা শিশি-বোতল, এ-সব আমরা কোনোদিন খাই না। কেউ-কেউ সাবান খেতে ভালোবাসে, কিন্তু সে-সব নেহাত ছোটোখাটো বাজে সাবান। আমার ছোটভাই একবার একটা আস্ত বার্-সোপ খেয়ে ফেলেছিল-” বলেই ব্যাকরণ শিং আকাশের দিকে চোখ তুলে ব্যা-ব্যা করে ভয়ানক কাঁদতে লাগল।

তাতে বুঝতে পারলাম যে সাবান খেয়ে ভাইটির অকালমৃত্যু হয়েছিল।হিজি বিজ্ বিজ্টা এতক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল, হঠাত্ ছাগলটার বিকট কান্না শুনে সে হাঁউ-মাঁউ করে ধড়্মড়িয়ে উঠে বিষম-টিষম খেয়ে একেবারে অস্থির! আমি ভাবলাম বোকাটা বুঝি মরে এবার! কিন্তু একটু পরেই দেখি, সে আবার তেমনি হাত-পা ছুঁড়ে ফ্যাক্ফ্যাক্ করে হাসতে লেগেছে।

আমি বললাম, “এর মধ্যে আবার হাসবার কি হল?” সে বলল, “সেই একজন লোক ছিল, সে মাঝে-মাঝে এমন ভয়ংকর নাক ডাকাত যে সবাই তার উপর চটা ছিল! একদিন তাদের বাড়ি বাজ পড়েছে, আর অমনি সবাই দৌড়ে তাকে দমাদম মারতে লেগেছে- হোঃ হোঃ হোঃ হো-” আমি বললাম, “যত-সব বাজে কথা।

” এই বলে যেই ফিরতে গেছি, অমনি চেয়ে দেখি একটা নেড়ামাথা কে-যেন যাত্রার জুড়ির মতো চাপকান আর পায়জামা পরে হাসি-হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে আমার গা জ্বলে গেল। আমায় ফিরতে দেখেই সে আবদার করে আহ্লাদীর মতো ঘাড় বাঁকিয়ে দুহাত নেড়ে বলতে লাগল, “না ভাই, না ভাই, এখন আমায় গাইতে বোলো না।

সত্যি বলছি, আজকে আমার গলা তেমন খুলবে না।”আমি বললাম, “কি আপদ! কে তোমায় গাইতে বলছে?”লোকটা এমন বেহায়া, সে তবুও আমার কানের কাছে ঘ্যান্ঘ্যান্ করতে লাগল, “রাগ করলে? হ্যাঁ ভাই, রাগ করলে? আচ্ছা নাহয় কয়েকটা গান শুনিয়ে দিচ্ছি, রাগ করবার দরকার কি ভাই?” আমি কিছু বলবার আগেই ছাগলটা আর্ হিজি বিজ্ বিজ্টা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ, গান হোক, গান হোক।

” অমনি নেড়াটা তার পকেট থেকে মস্ত দুই তাড়া গানের কাগজ বার করে, সেগুলো চোখের কাছে নিয়ে গুনগুন করতে করতে হঠাত্ সরু গলায় চীত্কার করে গান ধরল- “লাল গানে নীল সুর, হাসি হাসি গন্ধ।”ঐ একটিমাত্র পদ সে একবার গাইল, দুবার গাইল, পাঁচবার, দশবার গাইল।

আমি বললাম, “এ তো ভারি উত্পাত দেখছি, গানের কি আর কোনো পদ নেই?”নেড়া বলল, “হ্যাঁ আছে, কিন্তু সেটা অন্য একটা গান। সেটা হচ্ছে- অলিগলি চলি রাম, ফুটপাথে ধুমধাম, কালি দিয়ে চুনকাম। সে গান আজকাল আমি গাই না। আরেকটা গান আছে- নাইনিতালের নতুন আলু- সেটা খুব নরম সুরে গাইতে হয়।

সেটাও আজকাল গাইতে পারি না। আজকাল যেটা গাই, সেটা হচ্ছে শিখিপাখার গান।” এই বলে সে গান ধরল- মিশিপাখা শিখিপাখা আকাশের কানে কানে………. শিশি বোতল ছিপিঢাকা সরু সরু গানে গানে……….. আলাভোলা বাঁকা আলো আধো আধো কতদূরে,……… সরু মোটা সাদা কালো ছলছল ছায়াসুরে।

আমি বললাম, “এ আবার গান হল নাকি? এর তো মাথামুণ্ডু কোনো মানেই হয় না।”হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “হ্যাঁ, গানটা ভারি শক্ত।”ছাগল বলল, “শক্ত আবার কোথায়? ঐ শিশি বোতলের জায়গাটা একটু শক্ত ঠেকল, তা ছাড়া তো শক্ত কিছু পেলাম না।” নেড়াটা খুব অভিমান করে বলল, “তা, তোমরা সহজ গান শুনতে চাও তো সে কথা বললেই হয়। অত কথা শোনাবার দরকার কি? আমি কি আর সহজ গান গাইতে পারি না?” এই বলে সে গান ধরল-

বাদুড় বলে, ওরে ও ভাই সজারু, ……… আজকে রাতে দেখবে একটা মজারু।আমি বললাম, “মজারু বলে কোনো-একটা কথা হয় না।”নেড়া বলল, “কেন হবে না- আলবত্ হয়। সজারু কাঙ্গারু দেবদারু সব হতে পারে, মজারু কেন হবে না?”ছাগল বলল, “ততক্ষণ গানটা চলুক-না, হয় কি না হয় পরে দেখা যাবে।” অমনি আবার গান শুরু হল-

বাদুড় বলে, ওরে ও ভাই সজারু,……. আজকে রাতে দেখবে একটা মজারু।……… আজকে হেথায় চাম্চিকে আর পেঁচারা……. আসবে সবাই, মরবে ইঁদুর বেচারা।……. কাঁপবে ভয়ে ব্যাঙগুলো আর ব্যাঙাচি,….. ঘামতে ঘামতে ফুটবে তাদের ঘামাচি,…… ছুটবে ছুঁচো লাগবে দাঁতে কপাটি,……. দেখবে তখন ছিম্বি ছ্যাঙা চপাটি।

আমি আবার আপত্তি করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সামলে গেলাম। গান আবার চলতে লাগল, সজারু কয়, ঝোপের মাঝে এখনি……. গিন্নী আমার ঘুম দিয়েছেন দেখ নি?…… এনে রাখুন প্যাঁচা এবং প্যাঁচানি,…….. ভাঙলে সে ঘুম শুনে তাদের চ্যাঁচানি,……. খ্যাংরা-খোঁচা করব তাদের খুঁচিয়ে-……. এই কথাটা বলবে তুমি বুঝিয়ে।….. বাদুড় বলে, পেঁচার কুটুম কুটুমী,…… মানবে না কেউ তোমার এ-সব ঘুঁতুমি।……. ঘুমোয় কি কেউ এমন ভুসো আঁধারে?……. গিন্নী তোমার হোঁত্লা এবং হাঁদাড়ে।……. তুমিও দাদা হচ্ছ ক্রমে খ্যাপাটে……. চিমনি-চাটা ভোঁপসা-মুখো ভ্যাঁপাটে।

গানটা আরো চলত কি না জানি না, কিন্তু এইপর্যন্ত হতেই একটা গোলমাল শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি আমার আশেপাশে চারদিকে ভিড় জমে গিয়েছে। একটা সজারু এগিয়ে বসে ফোঁত্ ফোঁত্ করে কাঁদছে আর একটা শাম্‌লাপরা কুমির মস্ত একটা বই নিয়ে আস্তে-আস্তে তার পিঠ থাবড়াচ্ছে আর ফিস্‌ফিস্ করে বলছে, “কেঁদো না, কেঁদো না, সব ঠিক করে দিচ্ছি।” হঠাত্ একটা তক্‌মা-আঁটা পাগড়ি-বাঁধা কোলাব্যাঙ রুল উঁচিয়ে চীত্কার করে বলে উঠল- “মানহানির মোকদ্দমা।”

অমনি কোত্থেকে একটা কালো ঝোল্লা-পরা হুতোমপ্যাঁচা এসে সকলের সামনে একটা উঁচু পাথরের উপর বসেই চোখ বুজে ঢুলতে লাগল, আর একটা মস্ত ছুঁচো একটা বিশ্রী নোংরা হাতপাখা দিয়ে তাকে বাতাস করতে লাগল।প্যাঁচা একবার ঘোলা-ঘোলা চোখ করে চারদিকে তাকিয়েই তক্ষুনি আবার চোখ বুজে বলল, “নালিশ বাতলাও।

বলতেই কুমিরটা অনেক কষ্টে কাঁদো-কাঁদো মুখ করে চোখের মধ্যে নখ দিয়ে খিমচিয়ে পাঁচ ছয় ফোঁটা জল বার করে ফেলল। তার পর সর্দিবসা মোটা গলায় বলতে লাগল, “ধর্মাবতার হুজুর! এটা মানহানির মোকদ্দমা। সুতরাং প্রথমেই বুঝতে হবে মান কাকে বলে। মান মানে কচু। কচু অতি উপাদেয় জিনিস। কচু অনেকপ্রকার, যথা- মানকচু, ওলকচু, কান্দাকচু, মুখিকচু, পানিকচু, শঙ্খকচু, ইত্যাদি।

কচুগাছের মূলকে কচু বলে, সুতরাং বিষয়টার একেবারে মূল পর্যন্ত যাওয়া দরকার।”এইটুকু বলতেই একটা শেয়াল শাম্‌লা মাথায় তড়াক্ করে লাফিয়ে উঠে বলল, “হুজুর, কচু অতি অসার জিনিস। কচু খেলে গলা কুট্কুট্ করে, কচুপোড়া খাও বললে মানুষ চটে যায়। কচু খায় কারা? কচু খায় শুওর আর সজারু।

ওয়াক্ থুঃ।” সজারুটা আবার ফ্যাঁত্ফ্যাঁত্ করে কাঁদতে যাচ্ছিল, কিন্তু কুমির সেই প্রকাণ্ড বই দিয়ে তার মাথায় এক থাবড়া মেরে জিজ্ঞাসা করল, “দলিলপত্র সাক্ষী-সাবুদ কিছু আছে?” সজারু নেড়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঐ তো ওর হাতে সব দলিল রয়েছে।” বলতেই কুমিরটা নেড়ার কাছ থেকে একতাড়া গানের কাগজ কেড়ে নিয়ে হঠাত্ এক জায়গা থেকে পড়তে লাগল-

একের পিঠে দুই গোলাপ চাঁপা জুঁই সান্ বাঁধানো ভুঁই…….. চৌকি চেপে শুই ইলিশ মাগুর রুই গোবর জলে ধুই…….. পোঁটলা বেঁধে থুই হিন্চে পালং পুঁই কাঁদিস কেন তুই।সজারু বলল, “আহা ওটা কেন? ওটা তো নয়।” কুমির বলল, “তাই নাকি? আচ্ছা দাঁড়াও।” এই বলে সে আবার একখানা কাগজ নিয়ে পড়তে লাগল-

চাঁদনি রাতের পেতনীপিসি সজনেতলায় খোঁজ্ না রে-….. থ্যাঁতলা মাথা হ্যাংলা সেথা হাড় কচাকচ্ ভোজ মারে।….. চালতা গাছে আল্তা পরা নাক ঝুলানো শাঁখচুনি….. মাক্ড়ি নেড়ে হাঁকড়ে বলে, আমায় তো কেঁউ ডাঁকছ নি!…… মুণ্ডু ঝোলা উল্টোবুড়ি ঝুলছে দেখ চুল খুলে,……. বলছে দুলে, মিন্সেগুলোর মাংস খাব তুলতুলে।সজারু বলল, “দূর ছাই! কি যে পড়ছে তার নেই ঠিক।”

 

Read more

হযবরল (৩য় পর্ব) – সুকুমার রায়

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *