ঘুম আনার চেষ্টা করছি। লাভ হচ্ছে না। কোনোভাবেই শুয়ে আরাম পাচ্ছি না। বুকপকেটে রাখা খামটা খচখচ করছে। তার চিঠিটা পড়ে ফেলা দরকার।চিঠি পড়ার মুহূর্ত আসছে না। প্রিয় চিঠি পড়ার জন্যে প্রয়োজন প্রিয় মুহূর্তের। আমার প্রিয় মুহূর্ত হল মধ্যরাত, যখন পৃথিবীর সব তক্ষক গম্ভীল স্বরে দু’ বার ডেকে ওঠে।দরজায় আবার ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। জীবনবাবু ডাকলেন—হিমু ভাই, হিমু ভাই।আমি জবাব না দিয়ে রূপার চিঠি বের করলাম।
‘হিমু ভাই।’ ‘বলুন। কথা কি মনে পড়েছে?’ ‘জ্বি-না, মনে পড়েনি। অন্য একটা কথা বলতে এসেছি। বলব?’ ‘বলুন।’ ‘তাসখেলা নিয়ে উনাদের কিছু বলবেন না। রাগ করতে পারেন।’ ‘আচ্ছা বলব না। আর শুনুন জীবনবাবু, এখন একটা জরুরি কাজ করছি—চিঠি পড়ছি। আমাকে বিরক্ত করবেন না। ঐ লোকের নাম মনে পড়লে—কাগজে লিখে ফেলবেন।’ ‘জ্বি আচ্ছা।’
ঘরে চিঠি পড়ার মত আলো নেই—আধো আলো আধো আঁধার আমি চিঠি পড়ছি—
ভেবেছিলাম তোমার জন্মদিনে উদ্ভট কিছু করে তোমাকে চমকে দেব। কি করা যায় অনেক ভাবলাম। দামী গিফ্টের কথা একবার মনে হয়েছিল। গিফ্টের ব্যাপারে তোমার আসক্তি নেই—মাঝখান থেকে টাকা নষ্ট হবে। তারপর ভাবলাম সব ক’টি দৈনিক পত্রিকায় একপাতার বিজ্ঞাপন দিই—বিজ্ঞাপনে লেখা থাকবে—শুভ জন্মদিন হিমু। বাবার ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে এনে বললাম পরিকল্পনার কথা। শুনে তাঁর চোয়াল ঝুলে পড়ল। তিনি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন তো তাকিয়েই আছেন। আমি বললাম—পরিকল্পনাটা আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না?
তিনি বললেন, হচ্ছে।আমি বললাম, তাহলে খোঁজ নিয়ে বলুন কত লাগবে। আমি চেক লিখে দিচ্ছি। তিনি বললেন,হিমু লোকটা কে?’ ‘আমার চেনা একজন। পাগলা ধরনের মানুষ।’ তিনি মাথা চুলকে বললেন, পাগলা ধরনের একজন মানুষের জন্মদিনের কথা যত কম লোক জানে ততই ভাল। দেশসুদ্ধ লোককে জানিয়ে লাভ কি?
ম্যনেজার চাচার কথা আমার মনে ধরল। আসলেই তো, সবাইকে জানিয়ে কী হবে? যার জানার কথা সেই তো জানবে না। তুমি নিজেই তো পত্রিকা পড় না। ম্যনেজার চাচা বললেন, মা, তুমি সুন্দর দেখে একটা কার্ড কিনে লিখে দাও—হ্যাপি বাথ ডে। আমি অনাকে দিয়ে আসব। এক শ’ টাকার মধ্যে গোলাপের তোড়া পাওয়া যায়, ঐ একটাও না হয় সঙ্গে দিয়ে দিব।আমি বললাম, আচ্ছা, তাই করব।
ম্যনেজার চাচা চলে গেলেন যাবার সময় অদ্ভুত চোখে আসার দিকে তাকাতে লাগলেন, যেন আমার নিজের মাথার সুস্থতা বোধ করছি। নানান ধরনের ছোটখাটো পাগলামি করছি। ইচ্ছা করে যে করছি তা নয়। সেদিন বাবার সঙ্গে ঝগরা করলাম। আমার ছো্টমামা স্টেটস থেকে মেম-বউ নিয়ে দেশে এসেছেন। সেই মেমসাহেবের সস্মানে পাটি। সবাই সেজেগুজে তৈরি হয়ে আচ্ছে। আমি নিজেও খুব সেজেছি। গয়নাটয়না পরে একটা কান্ড করেছি—গাড়িতে ওঠার সময় কী যে হল, আমি বললাম, আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
বাবা বললেন, তার মানে কি? আমি বললাম, আমার রিসিপশনে যেতে ভাল লাগছে না। ‘তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?’ ‘না, শরীর খারাপ লাগছে না—শুধু যেতে ইচ্ছে করছে না।’ বাবা বললেন, তুমি আমার সঙ্গে ড্রয়িংরুমে আস। আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলব।সবাই গাড়ি- বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। বাবা আমাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলেন। স্কুলের হেডমাষ্টারদের মতো গলার বললেন, সিট ডাউন ইয়াং লেডি।
আমি বসলাম। বাবা বললেন, তোমার ছোটমামাকে যে পার্টি দেয়া হচ্ছে সেই পার্টি আমরা দিচ্ছি। আমরা হচ্ছি হোস্ট। কাজেই আমাদের উপস্থিত থাকতেই হবে। তোমার শরীর খারাপ থাকলে তোমাকে কিছু বলতাম না। তোমার শরীর ভাল আছে। তোমার যেতে ইচ্ছে করছে না, সেটা বুঝতে পারছি। অনেক সময় আমাদের অনেককিছু করতে ইচ্ছা করে না। তবু আমরা করি। মানুষ হয়ে জন্মালে সামাজিক রীতিনীতি মানতে হয়। এখন চল আমার সঙ্গে – সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বললাম, না। বাবা খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমি বুঝতে পারছি ভেতরে-ভেতরে রাগে তিনি কাঁপছেন। তার পরেও রাগ সমলে নিয়ে বললেন, রূপা, তুমি না হয় খানিক্ষণ থেকে চলে এসো।আমি আবারো বললাম, না। বাবা আর কিছু বললেন না। আমাকে রেখে চলে গেলেন। খালি বাসায় আমি একা। তখন আবার মনে হল—কেন যে থাকলাম, চলে গেলেই হত।
হিমু, আমি এরকম হয়ে যাচ্ছি কেন বল তো? ইদানীং বিকট-বিকট সব দুঃস্বপ্ন দেখছি। শুধু যে বিকট তাই না—নোংরা সব স্বপ্ন। এত নোংরা যে ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। কি দেখি জান? দেখি লম্বা রোগা বিকলাঙ্গ একজন মানুষ সমনে মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে।কুষ্ঠ রোগীর হাতের মত হাত। তার হাত থেকে পুঁজ,রক্ত আমার সারা গায়ে লেগে যাচ্ছে। চিৎকার করে জেগে উঠি। সারা গা ঘিনঘিন করতে থাকে।
আমি বাথরুমে ঢুকে সাবান দিয়ে গা ধুই। হিমু, আমার কি হচ্ছে বল তো? আমার মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিনা কে জানে। তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। দেখা হলে বলতাম, আমার হাতটা একটু দেখে দাও তো! কোথায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাব তা না, আজেবাজে সব কথা বলে সময় নষ্ট করছি। জন্মদিনের শুভেচ্ছা নাও। আমি কথার কথা হিসেবে শুভেচ্ছা বলছি না।আমি মনেপ্রাণে কামনা করছি। তোমার দিন সুন্দর হোক।
রাতে দরজা-জানালা বন্ধ করে আমি অনেকক্ষণ তোমার জন্যে প্রার্থনা করেছি, যেন তুমি সুখে থাক। মধ্যবিত্তের সহজ সুখ নয়—অসাধারণ সুখ—খুব অল্প মানুষই যে-সুখের সন্ধান পায়।তোমার সঙ্গে অনেকদিন আমার দেখা হয় না। এবার দেখা হলে কী করব জান? এবার দেখা হলে তোমাকে যশোর নিয়ে আসব। এখানে আমাদের একটা খামারবাড়ি আছে। বাংলো প্যার্টের্নের বাড়ি। চারদিক গাছ-গাছড়ায় ঢাকা। বাড়ির সামনেই পুকুর।
তোমাকে ঐ খামারবাড়িতে নিয়ে যেতে চাই—একটা জিনিস দেখানোর জন্যে—সেটা হচ্ছে—পুকুরের পানি কত পরিষ্কার হতে পারে সেটা স্বচক্ষে দেখা। শীত-বর্ষা, শরৎ-হেমন্ত সব সময় এই পুকুরের পানি কাঁচের মতো ঝকঝক করছে। আমি এই পুকুরের নাম দিয়েছি—‘অশ্রুদিঘি। বল তো কেন?’ আমার জীবনে অসংখ্য বাসনার একটি হচ্ছে কোনো-এক ভরা পূর্ণিমায় তোমার সঙ্গে অশ্রুদিঘিতে সাঁতার কাটব। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি সাতাঁর জানি না।আচ্ছা হিমু, আমার এই চাওয়া কি খুব বড় কিছু চাওয়া? আমি কখনো কারো কাছে কিছু চাই না। ঠিক করেছি এ জীবনে কিছু চাইব না।
আলাদীনের চেরাগের দৈত্য যদি হঠাৎ উপস্থিত হয়ে আমাকে বলে—রূপা, চট-চট করে বল। তোমার তিনটা ইচ্ছা আমি পূর্ণ করব। তাহলে মাথা চুলকে আমি বলব, স্যার থ্যাংক য্যু, আপনার কাছে আমার কিছু চাইবার নেই। আমার যা চাইবার তা চাইতে হবে হিমুর কাছে। ওকে একটু আমার কাছে এনে আপনি বিদেয় হোন। আপনার গা থেকে বিশ্রী গন্ধ আসছে।…… দরজায় মিহি করে টোকা পড়ছে। জীবনবাবু কয়েক বার কেশে ফিসফিস করে ডাকলেন,হিমু ভাই! হিমু ভাই! আমি চিঠি পড়া বন্ধ রেখে বললাম, কি হল জীবন বাবু?
‘নামটা মনে পড়েছে।’ ‘বলুন। বলে বিদেয় হোন।’ ‘এটা ছাড়াও আরো একটা কথা বলতে চাচ্ছি।’ ‘কাগজে লিখে রাখুন। আমি পরে পড়ব।’ ‘লিখে রাখতে গিয়েছিলাম—তারপর দেখি বল পয়েন্টে কালি নেই। আপনার কাছে কি বল পয়েন্ট আছে?’ আমি দরজা খুলে বললাম, লিখতে হবে না। মুখে বলুন, শুনে নিচ্ছি।তরঙ্গিণী স্টোর থেকে মুহিব সাহেব এসেছিলেন। ‘কিছু বলেছেন?’ ‘জ্বি-না, কিছু বললেনি।’ ‘ও, আচ্ছা।’
‘প্রায় সারা দিন বসে ছিলেন। দুপুরে কিছু খানওনি। এক কাপ চা আনিয়ে দিয়েছিলাম—সেটাও খাননি।’ ‘চা না খাওয়ারই কথা। মুহিব সাহেব চা পান সিগারেট কিছুই খান না। কি জন্যে এসেছিলেন কিছু বলেননি?’ ‘জ্বি-না।’ ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন তা হলে যান।’ ‘অন্য অরেকটা কথা হিমু ভাই। গোপন কথা।’ ‘বলুন কি বলবেন?’ জীবনবাবু বসলেন। মাথা নিচু করে বসলেন। অসহায় বসার ভঙ্গি। ‘খুব বিপদে পড়েছি হিমু ভাই। ভয়ংকর বিপদ।’ ‘বলুন।’ ‘আজ থাক, অন্য একদিন বলব।’ ‘আপনার মেয়ে ভাল আছে তো?’
‘জ্বি জ্বি । মেয়ে ভাল আছে। ওর কোনো সমস্যা নয়।মেয়েটার বিয়েও মোটামুটি ঠিকঠাক। সিরাজগঞ্জের ছেলে। কাপড়ের ব্যবসা আছে। অতসীকে দেখে পছন্দ করেছে। তিন লাখ টাকা পণ চাচ্ছে। দেব তিন লাখ টাকা। মেসবাড়িটা বেচে দেব। একটাই তো মেয়ে। আমিও একা মানুষ—মেয়ে বিয়ে দিয়ে বাকি জীবণটা হোটেলে কাটিয়ে দেব।বুদ্ধিটা ভাল না হিমু ভাই?’
‘হ্যাঁ, ভাল।’ ‘আমি আজ উঠি, অন্য আরেকদিন এসে আমার বিপদের কথাটা বলব।’ ‘আমাকে বললে আপনার বিপদ কি কমবে? যদি মনে করেন বিপদ কমবে, তা হলে বলুন। আর যদি বিপদ না কমে, শুধুশুধু কেন বলবেন? রুপার চিঠির শেষটা আমার পড়া হল না। চিঠি ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিলাম—আজ থাক। অন্য কোনো সময় পড়া যাবে।
বড় রাস্তার ফুটপাতে উবু হয়ে বসে বয়স্ক এক ভদ্রলোক ঠোঙ্গা থেকে বাদাম নিয়ে নিয়ে খাচ্ছেন। খাওয়ার ব্যাপারটায় বেশ আয়োজন আছে। খোসা থেকে বাদাম ছড়ানো হয়। খোসাগুলি রাখা হয় সামনে। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ বাদামে ফুঁ দিতে থাকেন। ফুঁয়ের কারণে বাদামের গায়ে লেগে থাকা লাল খোসা উড়ে যায়। তখন তিনি অনেক উপর থেকে একটা একটা করে বাদাম তাঁর মুখে ফেলেন। আমি কৌতুহলী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার মতো আরো কয়েকজন কৌতুহলী হয়েছে। তারাও দেখি দূর থেকে তাকিয়ে আছে।
ভদ্রলোক শেষ বাদামের টুকরো মুখে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে আনন্দিত গলায় বললেন, ছোটমামা না? আজ তিনিই প্রথম আমাকে চিনলেন। আমি চিনতে পারিনি। এখন চিনলাম—মোরশেদ সাহেব। ঐদিন স্যুট-টাই পরা ছিলেন, আজ পায়জামা পাঞ্জাবি চাদর। ভদ্রলোককে পায়জামা-পাঞ্জাবিতে আরো সুন্দর লাগছে।
‘কি করছিলেন মোরশেদ সাহেব?’ ‘বাদাম খাচ্ছিলাম। অনেক দিন বাদাম খাই না। একটা ছেলে গরম-গরম বাদাম ভাজছিল। দেখে লোভ লাগল। দু’ টাকার কিনলাম। অনেকে হাঁটতে-হাঁটতে বাদাম খেতে পারে। আমি পারি না। ফুটপাতে বসে বাদাম খাচ্ছিলাম। লোকজন এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন যেন আমি একটা পাগল।’
‘আপনি ভাল আছেন?’ ‘জ্বি ছোটমামা ভাল।’ ‘এষা, এষা কেমন আছে?’ ‘মনে হয় ভালই আছে। আর খারাপ থাকলেও আমাকে বলবে না।’ ‘আপনি গিয়েছিলেন কি এর মধ্যে গিয়েছিলেন ওর কাছে?’ ‘আমি তো দু’-তিন দিন পরপর যাই। ও খুব বিরক্ত হয়। তার পরেও যাই।’ ‘যান ভাল করেন। নিজের স্ত্রীর কাছে যাবেন না তো কার কাছে যাবেন?’
মোরশেদ সাহেব বিষণ্ন গলায় বললেন, এষাকে এখনও স্ত্রী বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না। ও উকিলের নোটিশ পাঠিয়েছে। ডিভোর্স চায়। ‘নোটিশ কবে পাঠিয়েছে?’ ‘কবে পাঠিয়েছে সেই তারিখ দেখিনি। আমি পেয়েছি আজ। মন খুব খারাপ হয়েছে। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না ছোটমামা, নোটিশ পাওয়ার পর আমার চোখে পানি এসে গেল। সকালে যখন নাশতা খাচ্ছি তখন নোটিশটা এসেছে।
তারপর আর নাশতা খেতে পারি না। পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিয়েছি। চাবাচ্ছি তো চাবাচ্ছিই, গলা দিয়ে আর নামছে না। এক ঢোক পানি খেলাম, যদি পানির সঙ্গে পরোটা নেমে যায়। পানে পেটে চলে গেল কিন্তু পরোটা মুখে রইল।’ ‘আসুন মোরশেদ সাহেব, কোথাও গিয়ে বসি। আপনাকে ক্লান্ত লাগছে। সারা দিনই বোধহয় হাঁটাহাঁটি করছেন?’ ‘জ্বি। দুপুরেও কিছু খাইনি। এমন খিদে লেগেছে। তারপর বাদাম কিনে ফেললাম দু’ টাকার। কিনতাম না, ছেলেটা গরম গরম বাদাম ভাজছিল। দেখে খুব লোভ লাগল।’
আমি ভদ্রলোককে নিয়ে গেলাম সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে। সময় কাটানোর জন্যে খুব ভাল জায়গা। জোড়ায়-জোড়ায় ছেলেমেয়ে গল্প করে। দেখতে ভাল লাগে। এরা যখন গল্প করে তখন মনে হয় পৃথিবীতে এরা দু’ জন ছাড়া আর কেউ নেই। কোনদিন থাকবেও না। ক্ষুধা-তৃষ্ণা, শীত-বর্ষা কোনোকিছুই এদের স্পর্শ করে না। একবার ঘোর বর্ষায় দু’জনকে দেখেছি ভিজে-ভিজে গল্প করছে। মেয়েটি কাজল পরে এসেছিল। পানিতে সেই কাজল ধুয়ে তাকে ডাইনীর মত লাগছিল। সেই ভয়ংকর দৃশ্যও ছেলেটির চোখে পড়ছে না। সে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ চোখে।
‘মোরশেদ সাহেব।’ ‘জ্বি?’ ‘কিছু খাবেন? এখানে ভ্রাম্যমান হোটেল আছে, চা, কোল্ড ড্রিংস এমনকি বিরিয়ানীর প্যাকেট পর্যন্ত পাওয়া যায়।’ ‘আমি কিছু খাব না। আচ্ছা ছোটমামাত, আপনি আমাকে মোরশেদ সাহেব ডাকেন কেন? আপনি আমার নাম ধরে ডাকবেন। আপনি হচ্ছেন এষার মামা।’ ‘আচ্ছা তাই ডাকব। এখন বলুন তো দেখি—এষা আপনাকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছে কেন?’
‘আমি তো মামা অসুস্থ। খারাপ ধরণের এপিলেপ্সি। ডাক্তাররা বলেন গ্রান্ডমোল। একেকবার যখন অ্যাটাক হয় ভয়ংকর অবস্থা হয়। অসুখের জন্য চাকরি টাকরি সব চলে গেছে।’ ‘অ্যাটাক কি খুব ঘন ঘন হয়?’ ‘আগে হত না। এখন হচ্ছে।’ ‘চিকিৎসা করাচ্ছেন না?’
‘চিকিৎসা তো মামা নেই। ডাক্তাররা কড়া ঘুমের অষুধ দেন। এগুলি খেয়ে-খেয়ে মাথা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাসার সামনে কোনো আমগাছ নেই। কিন্তু যখনই আমি বাইরে থেকে বাসায় যাই তখনি আমি দেখি বিশাল এক আমগাছ। ‘চোখে দেখেন?’ ‘জ্বি, দেখি। শুধু গাছটা দেখি তাই না, গাছে পাখি বসে থাকে,সেগুলি দেখি। ওরা কিচিরমিচির করে, সেই শব্দ শুনতে পাই’ ‘বলেন কী!’
মোরশেদ সাহেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কিন্তু যেতে ইচ্ছা করে না। তার উপর শুনেছি ওরা অনেক টাকা নেয়। জমানো টাকা খরচ করে করে চলছি তো মামা। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ‘আমার চেনা একজন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। আমি একদিন তাঁর কাছে আপনাকে নিয়ে যাব।’ ‘জ্বি আচ্ছা।’ ‘চলুন, আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি।’
‘আমি এখন বাসায় যাব না মামা। উকিল নোটিশটা টেবিলে ফেলে এসেছি। বাসায় গেলেই নোটিশটা চোখে পড়বে। মনটা খারাপ হবে। এখানে বসে থাকতেই ভাল লাগছে।’ ‘বেশ, তাহলে বসে থাকুন।’ মোরশেদ সাহেব ইতস্তত করে বললেন, মামা, আপনি কি একটু এষার সঙ্গে কথা বলে দেখবেন? কোনো লাভ হবে না জানি, তবু যদি একটু…’
‘আমি বলব।’ ‘আমার একটা ক্যামেরা আছে। ক্যামেরাটা বিক্রি করে দেব বলে ঠিক করেছি। হাত এক্কেবারে খালি হয়ে এসেছে। দেখবেন তো কাউকে পাওয়া যায় কিনা। বিয়ের সময় কিনেছিলাম। এষার খুব ছবি তোলার শখ ছিল। ওর জন্যেই কেনা।’ ‘আচ্ছা দেখব, ক্যামেরা বিক্রি করা যায় কিনা।’ ‘থ্যাংকস মামা। আপনি সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোকের সঙ্গেও একটু কথা বলবেন। কত টাকা নেন, এইসব।’
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চলে এলাম। মোরশেদ সাহেব পা তুলে সন্ন্যাসীর ভঙ্গিতে বসে আছেন। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখতে ভাল লাগছে। নীতু একজন সাইকিয়াট্রিস্টের ঠিকানা দিয়েছিল। কার্ডটা হারিয়ে ফেলেছি। নীতুর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে একবার ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করে আসতে হবে।
