হিমু শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

হিমু শেষ – পর্ব

ইয়াদের বাড়ি সব সময় আলোয় ঝলমল করে। সন্ধ্যার পর থেকেই এরা বোধহয় সব ক’টা বাতি জ্বালিয়ে রাখে। আজ ওদের বাড়ি অন্ধকার। গেট থেকে গাড়ি-বারান্দা পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশের বাতিগুলো পর্যন্ত নেভানো। শুধু বারান্দায় বাতি জ্বলছে। আমি গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‍কেউ নেই নাকি?

‘আপা আছেন।’ ‘কুকুর দু’টা কোথায়—টুটি-ফুটি?’ ‘ওরা বান্ধা আছে। ভয় নাই, যান।’ ভয় নেই বললেই ভয় বেশি লাগে। আমি ভয়ে-ভয়ে এগুচ্ছি। বারান্দায় বেতের চেয়ারে নীতুকে বসে থাকতে দেখলাম। আজ তার গায়ে শাদা রঙের শাড়ি। শাদা শাড়িতে নীল ফুলের সুতার কাজ। গায়ের চাদরটাও শাদা। শাদা রঙ মেয়েদের এত মানায় আজ প্রথম জানলাম। নীতু আমাকে দেখে উঠে এল। সহজ গলায় বলল, আসুন।

‘ভাল আছেন?’ ‘হ্যাঁ, ভাল। এখানে বসবেন, না ভেতরে যাবেন?’ ‘বারান্দাই ভাল।’ ‘হ্যাঁ, বারান্দাই ভাল। আপনি কি লক্ষ করেছেন বেশির ভাগ সময় আমি বারান্দায় বসে থাকি?’ ‘আমি লক্ষ করেছি।’ ‘আপনার তাড়া নেই তো? আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে; আমি চা দিতে বলি। টুটি-ফুটিকে খাবার দিয়ে আসি। আমি খাবার না দিলে ওরা কিছু খায় না।’

নীতু উঠে গেল। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ভেবেছিলাম নীতুকে খুব আপসেট দেখব। সে রকম মনে হচ্ছে না। আপসেট যদি হয়েও থাকে নিজেকে সামলে নিয়েছে। আমি লক্ষ করেছি ছোটখাট ব্যাপারে যারা অস্থির হয়, বড় ব্যাপারগুলিতে তারা মোটামুটি ঠিক থাকে। ঘরে তৈরি সমুচা এবং পটভর্তি চা। ট্রে নীতু নিয়ে এসেছে। এই কাজ সে কখনো করে না। খাবার আনার অন্য লোক আছে।‘সমুচাগুলি এইমাত্র ভাজা হয়েছে, খান। ভাল লাগবে। সঙ্গে টক দেব?’ ‘না। টুটি-ফুটিবে খাবার দেয়া দেয়া হয়েছে?’ ‘দেয়া হয়েছে।’ ‘ওরাও কি সমুচা খাচ্ছে?’

‘না, ওরা সেদ্ধ মাংস খাচ্ছে। হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করা মাংস। দিনে ওরা একবারই খায়।’ আমি সমুচা খেতে-খেতে বললাম, বিলেতি কুকুর একবার খায়, কিন্তু দেশীগুলি সারাক্ষণ খায়—কিছু পেলেই খেয়ে ফেলে। ‘ট্রেনিং দেয়া হয় না বলে সারাদিন খায়। ট্রেনিং দিলে ওরা একবেলা খেত। চা ঢেলে দেব?’ ‘দিন।’ নীতু চা ঢেলে কাপ এগিয়ে দিল। আমি লক্ষ করলাম,শাদা শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নীতু কানে মুক্তার দুল পরেছে। ‘মিষ্টি হয়েছে?’

‘হয়েছে।’নীতু চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। বড় নিঃশ্বাস নিল। মনে হচ্ছে সে এখন কঠিন কিছু কিথা বলবে। ‘আপনি গিয়েছিলেন ইয়াদের কাছে?’ ‘জ্বি।’ ‘তাকে বলেছিলেন পাগলামি বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসতে?’ ‘না।’ ‘আমিও তাই ভেবেছিলাম। আপনি তাকে দেখে খুব মজা পেয়েছেন। একজনকে শুধু কথায় ভুলিয়ে ভিখিরিদের সঙ্গে ভিড়িয়ে দেয়া তো সহজ কাজ না। কঠিন কাজ। সবাই পারে না। আপনি পারেন।’

আমি হাই তুলতে-তুলতে বললাম, আমি ওকে কিছু বলিনি, কারণ বলার প্রয়োজন দেখিনি। কেন প্রয়োজন দেখেননি?’ ও ফিরে আসবে। ওর প্রতি আপনার ভালবাসা প্রবল, সেই ভালবাসা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ওর নেই।’ ‘বড়-বড় কথা বলে আমাকে ভোলাতে চাচ্ছেন?’ ‘না। যা সত্যি তাই বললাম।’ ‘যা সত্যি তা আপনি কাউকে বলনে না, কারণ সত্যটা কি তা আপনি নিজেও জানেন না। আপনি বিভ্রম তৈরি করতে পারেন বলেই বিভ্রমের কথা বলেন।

আমি খুব বিনীতভাবে আপনাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। আশা করেছিলাম আপন আসবেন। আসেননি। ইয়াদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন—তাও আমার কারণে যাননি। ইয়াদকে আপনি কানে মন্ত্র দিয়েছেন—তাকে বলেছেন যে দু’জন লোক তার পেছনে লাগানো আছে। যে জন্যে সে ভোররাতে সবার চোখে ধুলা দিয়ে পালিয়ে যায়। আমি কি ঠিক বলছি না? চুপ করে থাকবেন না। উত্তর দিন।’ আমি বললাম , একটা সিগারেট কি খেতে পারি?

নীতু নরম গলায় বলল, অবশ্যই খেতে পারেন। আপনার বন্ধু গাঁজা খেয়ে মাঠে পড়ে ছিল, আপনি সিগারেট খাবেন না কেন? তবে ভাববেন না আপনাকে আমি সহজে ছেড়ে দেব। আপনাকে আমি শাস্তি দেব। ‘কি শাস্তি?’ ‘আপনি তো ভবিষ্যৎ বলে বেড়ান। কাজেই আপনি নিজেই অনুমান করুন। দেখি আপনার অনুমান ঠিক হয় কি না।’

‘অনুমান করতে পারছি না।’ ‘চা খাবেন আরেক কাপ? পটে চা আছে।’ ‘না, আর খাব না। আমি এখন উঠব।আর আপনি দুঃশ্চিন্তা করবেন না। ইয়াদ চলে আসবে।’ ‘সান্ত্বনার জন্যে ধন্যবাদ।’ নীতু হাসল। কিন্তু তার চোখ অসুস্থ মানুষের চোখের মতো ঝকঝক করছে। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। নীতু বলল,আপনাকে কি শাস্তি দেব তা না বলেই চলে যাচ্ছেন যে। অনুমান করতে পারছেন না?

‘না।’ ‘একটু চেষ্টা করুন। চেষ্টা করলেই পারবেন।’ ‘পারছি না।’ ‘আচ্ছা যান।’ নীতু উঠে দাঁড়াল। আমি গেটের দিকে এগুচ্ছি—এবং ভয় পাচ্ছি।অকারণ তীব্র ভয়। মনে হচ্ছে শীরর ভারী হয়ে এসেছে। ঠিকমতো পা ফেলতে পারছি না। গেটের প্রায় কাছাকাছি চলে যাবার পর বুঝতে পারলাম নীতু কি শাস্তি দিতে যাচ্ছে। একবার ইচ্ছা করল চেঁচিয়ে বলি—‘না নীতু , না।’

তার সময় পাওয়া গেল না—টুটি-ফুটি উল্কার মতো ছুটে এল। মাটিতে পড়ে যাবার আগে এক ঝলক দেখলাম বারান্দায় আঙুল দিয়ে উঁচিয়ে নীতু দাঁড়িয়ে আছে। ধবধবে শাদা পোশাকে তাকে দেখাচ্ছে দেবী প্রতিমার মতো। নীতু হিসহিস করে বলল, Kill him. Kill him.

আমি বাস করছি অন্ধকারে এবং আলোয়। চেতন এবং অবচেতন জগতের মাঝামাঝি। Twilight zon. আমার চারপাশের জগৎ অস্পষ্ট। আমি কি বেঁচে আছি? আমাকে ঘিরে অনেক লোকের ভিড় । এটা কি কোনো হাসপাতাল? আমার কোনো ক্ষুধাবোধ নেই, কিন্তু প্রবল তৃষ্ণা । পানি পানি বলে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে। চিৎকার করতে পারছি না। স্বপ্ন ও সত্য একাকার হয়ে গেছে। বাস্তব এবং কল্পনা পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে এগুচ্ছে। আমি এদের আলাদা করতে চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না।

মোটা গম্ভীর স্বরে একজন কেউ বলছেন, ‘হিমু সাহেব! হিমু সাহেব। আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? জবাব দেবার দরকার নেই—জবাব দেবার চেষ্টা করবেন না। শুধু আঙুল নড়ানোর চেষ্টা করুন। আমি আপনার ডাক্তার। আপনি যদি আমার কথা শুনতে পান তাহলে পায়ের আঙুল নড়ানোর চেষ্টা করুন।’

আমি প্রাণপ্রণে পায়ের আঙুল নাড়াতে চেষ্টা করি।পারি কি পারি না বুঝতে পারি না। মোটা গলার ডাক্তার সাহেবের কথাও শুনতে পাই না। আশেপাশে সব শব্দ অস্পষ্ট হয়ে আসে—তখন গভীর কোনো নৈঃশব্দ থেকে আমার বাবার গলা শুনতে পাই— ‘খোকা! খোকা! আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস? শুনতে পেলে আঙুল-ফাঙুল নাড়াতে হবে না। মনে-মনে বল শুনতে পাচ্ছি। তা হলেই আমি বুঝব।শুনতে পাচ্ছিস খোকা?’

‘পাচ্ছি। তুমি আমাকে খোকা ডাকছ কেন? তুমিই তো নাম দিলে হিমালয়।’ ‘তোর মা খোকা ডাকত—এই জন্যে ডাকছি। শোন্ খোকা, তোর অবস্থা তো কাহিল—টুটি-ফুটি তোর পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলেছে। আমি অবশ্যি খুব খুশি।’ ‘তুমি খুশি?’ ‘খুব খুশি। মহাপুরুষ হবার একটা ট্রেনিং বাকি ছিল—তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার ট্রেনিং। সেটি হচ্ছে।’ ‘আমি কি মারা যাচ্ছি?’

‘বলা মুশকিল। ফিফটি-ফিফটি চান্স। এটাও ভাল হল—ফিফটি-ফিফটি চান্সে দীর্ঘদিন থাকার দরকার আছে। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’ ‘বাবা তুমি কি সত্যি আমার সঙ্গে কথা বলছ, না এসব আমার মনের কল্পনা?’ এটাও বলা মুশকিল, ফিফটি-ফিফটি চান্স। শতকরা পঞ্চাচ ভাগ সম্ভবনা, পুরোটি তোর অসুস্থ থাকার কল্পনা। আবার পঞ্চাশ ভাগ সম্ভবনা আমি কথা বলছি তো সঙ্গে। বেশিক্ষণ কথা বলতে পারব না, খোকা। ওরা তোকে মর্ফিয়া দিচ্ছে। তুই এখন ঘুমিয়ে পড়বি।’ ‘আজ কী বার বাবা? কত তারিখ?’

‘জানি না। তোরও জানার দরকার নেই। আমি এবং তুই আমরা দু’জনই এখন বাস করছি সময়হীন জগতে। এই জগতটা অদ্ভুত খোকা। ভারি অদ্ভুত। এই জগতে সময় বলে কিছু নেই। আলো নেই, অন্ধকার নেই…কিছুই নেই…’ ‘আমার তারিখ জানার খুব দরকার। এগারো তারিখ এষা চলে যাবে। মোরশেদ সাহেবের এয়ারপোর্টে যাবার কথা। উনি কি গেছেন? এষা কি তাঁর সঙ্গে ফিরে এসেছে?’ ‘তুই কি চাস সে ফিরে আসুক?’

‘চাই।’ ‘তা হলে ফিরে এসেছে। সময়হীন জগতের মজা হচ্ছে, এই জগতের বাসিন্দারা যা চায়—তাই হয়। সমস্যা হচ্ছে এই জগতের কেউ কিছু চায় না।’ ‘হিমু সাহেব। হিমু সাহেব। আমি আপনার ডাক্তার। আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? শুনতে পেলে পায়েল আঙুল নাড়ান। গুড, ভেরি গুড। দেখি, এবার পারবেন। ভেঙে পড়লে চলবে না—আপনাকে মনে জোর রাখতে হবে। সাহস রাখতে হবে।’

একসময় আমার জ্ঞান ফেরে। ডাক্তার চোখের বাঁধন খুলে দেন। আমি অবাক হয়ে চারপাশের অসহ্য সুন্দর পৃথিবীকে দেখি। ফিনাইলের গন্ধভরা হাসপাতালের ঘরটাকে ইভপুরীর মতো লাগে। মায়াময় একটি মুখ এগিয়ে আসে আমার দিকে ‘ছোটমামা, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি মোরশেদ। চিনতে পারছেন?’ ‘পারছি। এষা কোথায়?’ ‘ও বারান্দায় আছে। ভেতরে আসতে লজ্জা পাচ্ছে। ওকে কি ডাকব?’

‘না, ডাকার দরকার নেই।’ ‘আপনি কথা বলবেন না, ছোটমামা। আপনার কথা বলা নিষেধ।’ আমি কথা বলি না। চোখ বন্ধ করে ফেলি—আবারো তলিয়ে যাই গভীর ঘুমে। ঘুমের ভেতরই একটা বিশাল আমগাছ দেখতে পাই। সেই গাছের পাতায় ফোঁটা-ফোঁটা জোছনা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। হাত ধরাধরি করে দু’জন হাঁটছে গাছের নিচে। মানব ও মানবী। কারা এরা? কি ওদের পরিচয়? দু’জনকেই খুব পরিচিত মনে হয়। অনেক দুর থেকে চাপা হাসির শব্দ ভেসে আসে। আমি চমকে উঠে বলি, কে আপনি? কে? ভারী গম্ভীর গলায় উত্তর আসে। আমি কেউ না, I am nobody!

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *