হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৫

ময়ূরাক্ষী

তোর কাছে আসলাম একটা পরামর্শের জন্যে!

আজই ওদের বিয়ে লাগিয়ে দাও ।

আজই বিয়ে লাগিয়ে দেব ? 

হু । কাজি ডেকে এনে বিয়ে পড়িয়ে দাও- ঝামেলা চুকে যাক । তারপর ওরা যত ইচ্ছা রাত জেগে গল্প করুক । আসল অনুষ্ঠান পরে হবে । বিয়েটা হয়ে যাক । ফুপু নিঃশ্বাস ফেললেন-মনে হচ্ছে আমার কথা তার মনে ধরেছে । আমি বললাম, তুমি চাইলে আমি ছেলেকে বলতে পারি ।

ওরা আবার ভাববে না তো যে আমরা চাপ দিচ্ছি ।

চাপাচাপির কী আছে ? ছেলে এমন কী রসগোল্লা ? মার্বেলের মতো সাইজ  বিয়ে যে দিচ্ছি এতেই তার ধন্য হওয়া উচিত । তার তিনপুরুষের ভাগ্য যে, আমরা… ফুপু বিরক্ত স্বরে বললেন, ছেলে এমনকী খারাপ ?

খারাপ তা তো বলছি না- একটু শর্ট । তা পুরুষ মানুষের শটে কিছু যায় আসে না । পুরুষ হচ্ছে সোনার চামুচ । সোনার চামুচ বাঁকাও ভালো ।

আজই বিয়ের ব্যাপারে ছেলে কি রাজি হবে ?

দেখি কথা বলে । আমার ধারণা, হবে ।

তোর কথা তো সবসময় আবার মিলে যায়-একটু দেখ কথা বলে ।

আমি আমার পাঞ্জাবি খুঁজে পেলাম না । ফুপু বললেন, বাদল ভোরবেলায় ঐ পাঞ্জাবি গায়ে ‍দিয়ে বের হয়েছে ।

আমি বাদলের একটা শার্ট গায়ে দিয়ে নিচে নামতেই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সাহেব লাজুক গলায় বললেন, হিমুভাই আপনাকে একটা কথা বলতে চাই । খুব লজ্জা লাগছে অবশ্যি ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৫

 

বলে ফেল ।

রিনকির খুব শখ পূর্ণিমা রাতে সমুদ্র কেমন দেখায় সেটা দেখবে । দুদিন পরেই পূর্ণিমা ।

ও আচ্ছা-দুদিন পরেই পূর্ণিমা তা তো জানতাম না ।

মানে কথার কথা বলছি । ধরুন, আজ যদি বিয়েটা হয়ে যায়-তাহলে আজ রাতের ট্রেনে রিনকিকে নিয়ে কক্সবাজারের দিকে রওনা হতে পারি । বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাটা শেষ করে রাখা আর কী । পরে একটা রিসিপশানের ব্যবস্থা না হয় হবে ।

তোমার ‍দিকের আত্মীয়স্বজনরা…ওদের আমি ম্যানেজ করব ।আপনি যদি শুধু এদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটু রাজি করান- মানে রিনকি বেচারির দীর্ঘদিনের শখ । ওর জন্যেই খারাপ লাগছে ।

না না, তা তো বটেই । দীর্ঘদিনের শখ থাকলে তা তো মেটানোই উচিত । রাতের টিকেট পাওয়া যাবে তো ? পুরো ফাস্টক্লাস বার্থ রিজার্ভ করতে হবে । রেলওয়েতে আমার লোক আছে, হিমুভাই ।

তাহলে তুমি বরং ঐটাই আগে দেখ । আমি এদিকটা ম্যানেজ করছি । আনন্দে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের চোখ চকচক করছে । সে গাঢ় গলায় বলল, রিনকি আমাকে বলেছিল- হিমুভাইকে বললেই উনি ম্যানেজ করে ‍দিবেন । আপনি যে সত্যি সত্যি করবেন বুঝিনি ।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, কী নিয়ে গল্প করলে সারারাত ?

গল্প আর কী করব বলুন । রিনকি এমন অভিমানী-কিছু বলতেই তার চোখে পানি এসে যায় । সুপার সেনসিটিভ মেয়ে । কথায় কথায় একসময় বলেছিলাম যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় হেনা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে সামান্য পরিচয় হয়েছিল-এতেই রিনকি কেঁদে অস্থির । আমাকে বলছে আর কোনোদিন যদি ঐ মেয়ের নাম মুখে আনি সে নাকি সুইসাইড করবে । এরকম সেনসিটিভ মেয়ে নিয়ে বাস করা কঠিন হবে । খুবই দুঃশ্চিন্তা লাগছে হিমু ভাই ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৫

 

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে কিন্ত্ত ও চিন্তিত মনে হলো না । বরং খুবই আনন্দিত মনে হলো । আমার ধারণা, প্রায়ই সে হেনার কথা বলে রিনকিকে কাঁদাবে । কাঁঁদিয়ে আনন্দ পাবে । রিনকিও কেঁদে আনন্দ পাবে। ওদের এখন আনন্দেরই সময় ।

আমি বললাম, কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই, তুমি তোমার আত্মীয়স্বজনকে বল, তারচেয়ে যা জরুরি তা হচ্ছে টিকিটের ব্যবস্থা । আমি ফুপা-ফুপুকে রাজি করাচ্ছি ।

রাজি হয়েছেন কিনা জেনে গেলে ভালো হতো না হিমুভাই ?

আমি ভবিষ্যৎ বলতে পারি তুমি কি এটা জানো না ?

জানি ।

আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি তোমরা দুজন হাত ধরাধরি করে সমুদ্রের পাড়ে হাঁটছ । অসম্ভব সুন্দর জোছনা হয়েছে ।

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৬

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *