হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৮

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৮

কথা বল ।কেন কথা বলার ইচ্ছা তা তো জিজ্ঞেস করলে না ।জিজ্ঞেস করলাম না কারণ কেন কথা বলার ইচ্ছা তা আমি জানি । তুমি লক্ষ্য করেছ যে আমি তোমার প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ বোধ করিনি । গায়ে পড়ে কথা বলতে যাইনি, টেলিফোন করিনি, হঠাৎ বাসায় উপস্থিত হইনি । ব্যাপারটা তোমার অহংকারে লেগেছে । সুন্দরী মেয়েরা খুব অহংকারী হয় ।

তারা সবসময় তাদের চারপাশে একদল মুগ্ধ পুরুষ দেখতে চায় । রূপা মাথার চুল ঝাঁকিয়ে বলল, তোমার কথা মোটেও ঠিক না । আমি সেজন্যে তোমার কাছে আসিনি । আমি শুনেছি, তুমি ভবিষ্যতের কথা বলতে পার, হাত দেখতে পার । অলৌকিক কিছু ক্ষমতা তোমার আছে । আমি সেই সম্পর্কে জানতে চাই । আমার সঙ্গে মিথ্যা বলার দরকার নেই । সত্যি করে বল তোমার কি এ জাতীয় কোনো ক্ষমতা আছে ?

আছে ।

কী ধরনের ক্ষমতা ? আমার কাছে একটা নদী আছে । যে-কোনো সময় সেই নদীটাকে বের করতে পারি ।

রূপা বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে বলল, এইসব আজেবাজে কথা বলে লাভ নেই । তুমি আমাকে কনফিউজ করতে পারবে না । আমার সম্পর্কে কি তুমি কিছু বলতে পার ? অবশ্যই পারি । তুমি একটা লাল গাড়িতে করে আস । সম্ভবত গাড়ির নাম্বার ঢাকা ভ৮৭৮২.

রূপার ঠোঁটের কোণে হাসির আভাস দেখলাম । সম্ভবত আরো কিছু বলতে পারি ।

বলব?

ময়ূরাক্ষী খন্ড- ২৮

বল ।

খুব ছোটবেলায় তুমি ইলেকট্রিকের তারে হাত দিয়ে দুহাত পুড়িয়ে ফেলেছিলে । রূপা চোখ তীক্ষ্ণ করে বলল, কী করে বললে ?

অলৌকিক ক্ষমতায় ।

অলৌকিক ক্ষমতা না ছাই । আমার এই গল্প সবাই জানে । আমি অনেকের সঙ্গে হাত পুড়ে যাওয়ার গল্প করেছি । আমার মনে হয় আমাদের ক্লাসের সব ছেলেই জানে । তুমি আমাদের কারো কাছ থেকে শুনেছ-ঠিক না ?

হ্যাঁ ঠিক ।

তাহলে তোমার কোনো ক্ষমতা-টমটা নেই ?

না । তবে একটা নদী আছে । নদীটার নাম ময়ূরাক্ষী ।

আবার ফাজলামি করছ ?

ফাজলামি করছি না । নদীটা সত্যি আছে । এবং আমার কোনো ক্ষমতা যে নেই তাও ঠিক না । কিছু ক্ষমতা আছে ।

কেমন ?

যেমন ধর, আজ তোমাকে নিতে গাড়ি আসবে না । তোমাকে রিকশা নিয়ে ফিরতে হবে ।

এটা ঠিক হয়েছে । কাকতালীয়ভাবে বলে ফেলেছ । আমাদের গাড়ি গ্যারেজে । সাইলেন্সার পাইপ নষ্ট হয়ে গেছে । সারাতে দিয়েছে ।

এছাড়াও আমি বলতে পারি তোমার হ্যান্ডব্যাগে কত টাকা আছে ।

কত আছে ?

একশ’ টাকার নোট আছে দুটা, একটা কুড়ি টাকার নোট । এক টাকার নোট আছে সাতটা । কিছু খুচরা পয়সা, কত বলতে পারছি না ।

রূপা হাসিমুখে তাকিয়ে রইল হ।

আমি বললাম, বাক্স খুলে তুমি গুণে দেখ, ঠিক বললাম কিনা ।

আমি গুণতে চাই না ।

গুণতে চাও না কেন ?

ময়ূরাক্ষী খন্ড- ২৮

গুণতে দেখা যাবে তুমি ঠিক বলনি । তখন আমার মনটা খারাপ হয়ে যাবে । তোমার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে এটা বিশ্বাস করতে আমার ভালো লাগছে । চারদিকে এতসব সাধারণ মানুষ, এর মধ্যে একজন কেউ থাকুক যে সাধারণ নয়, অসাধারণ ।

তুমি গুণে দেখ না ।

রূপা গুণল এবং অবাক হয়ে বলল, কী করে হলো? কী করে তুমি বলতে পারলে? আমি বললাম, আমি জানি না রূপা । মাঝে মাঝে কাকতালীয়ভাবে আমার কিছু কথা মিলে যায় । আচ্ছা, আমি যাই । আমি উঠে দাঁড়ালাম । রূপা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল ।

পরের তিনমাস আমি ইউনিভার্সিটিতে গেলাম না । আমি জানি রূপা আমাকে খুঁজবে । যা পাওয়া যায় না তার প্রতি আমাদের আগ্রহের সীমা থাকে না । মেঘ আমরা কখনো স্পর্শ করতে পারি না বলেই মেঘের প্রতি মমতার আমাদের সীমা নেই ।

তিনমাস পর হঠাৎ একরাতে রূপাদের বাসায় টেলিফোন করে বললাম, রূপা, তুমি কেমন আছ ?

ভালো ।

চিনতে পারছ ?

চিনতে পারব না কেন ?

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের শেষ খন্ড

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *